ফাঁসির দড়ির নিচে দাঁড়িয়েও তিনি হাসছিলেন—প্রত্যক্ষদর্শীর সেই ভয়ংকর বর্ণনা
নিজস্ব প্রতিবেদক
হিন্দুস নিউজ
প্রকাশিত:
১১ আগস্ট ২০২৬, ১৪:১২
59 জন পড়েছেন
১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ও বেদনাবিধুর দিন। মুজফ্ফরপুর জেলের ফাঁসির মঞ্চে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছিলেন মাত্র ১৮ বছর বয়সী বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু। ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লবের পথ বেছে নেওয়া এই তরুণের মৃত্যুর মুহূর্তের দৃঢ়তা ও হাসিমুখ আজও ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রতীক হয়ে আছে।
ক্ষুদিরামের ফাঁসির ঘটনা নিয়ে তৎকালীন বিভিন্ন স্মৃতিচারণে যে বিবরণ পাওয়া যায়, তার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হলো মুজফ্ফরপুরে অবস্থানরত বাঙালি আইনজীবী ও সাংবাদিক উপেন্দ্রনাথ বসুর স্মৃতিচারণ। তাঁর বর্ণনায় উঠে এসেছে এমন এক দৃশ্য, যেখানে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও ক্ষুদিরামের মধ্যে ভয়ের কোনো প্রকাশ দেখা যায়নি।
মুজফ্ফরপুরে তখন কয়েকজন বাঙালি আইনজীবীর একটি ছোট আড্ডা ছিল। সেখানেই একদিন খবর আসে, এক বাঙালি ছাত্রকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। পরদিন আদালতে গিয়ে তাঁরা দেখতে পান কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছে এক কিশোর। শ্যামবর্ণ, সুদর্শন সেই তরুণের বয়স খুব বেশি নয়। আদালতে উপস্থিত বাঙালিদের দেখে সে বিচলিত হয়নি; বরং তার মুখে ছিল মৃদু হাসি।
সেই কিশোরই ছিলেন ক্ষুদিরাম বসু।
ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে বিচার শুরু হয়। মামলায় সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করা হয়, চলে যুক্তিতর্ক। শেষ পর্যন্ত আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে। কিন্তু মৃত্যুদণ্ডের রায় শুনেও ক্ষুদিরামের আচরণ ছিল অস্বাভাবিকভাবে শান্ত।
স্মৃতিচারণে বলা হয়, আদালতে তিনি বিচারকের কাছে কাগজ ও কলম চেয়েছিলেন। বোমাটি দেখতে কেমন—তা অনেকেই জানেন না উল্লেখ করে তিনি তার একটি ছবি এঁকে দেখাতে চেয়েছিলেন। সেই অনুমতি না পাওয়ার পরও তাঁর মধ্যে আতঙ্ক বা হতাশার কোনো প্রকাশ দেখা যায়নি।
মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা হয়। অনেকেই আশা করেছিলেন, হয়তো তাঁর সাজা পরিবর্তিত হয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। কিন্তু ক্ষুদিরামের নিজের অবস্থান ছিল দৃঢ়। কারাগারে দীর্ঘ জীবন কাটানোর চেয়ে দেশের জন্য মৃত্যুবরণ করাকেই তিনি শ্রেয় মনে করতেন বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।
শেষ পর্যন্ত আপিলও খারিজ হয়ে যায়। নির্ধারিত হয় ফাঁসির দিন—১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট।
সেদিন ভোরে মুজফ্ফরপুর জেলের সামনে মানুষের ভিড় জমে যায়। উপেন্দ্রনাথ বসুর স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, তিনি ভোর পাঁচটার দিকে কারাগারের ফটকে পৌঁছেছিলেন। জেলের ভেতরে ছিল ফাঁসির মঞ্চ। কিছুক্ষণ পর কয়েকজন পুলিশ ক্ষুদিরামকে নিয়ে সেখানে উপস্থিত হয়।
কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় সবচেয়ে আলোচিত হয়ে আছে সেই মুহূর্তটি—ক্ষুদিরামের মুখে তখনও ছিল হাসি। তিনি স্নান করে, শান্ত ও দৃঢ়ভাবে ফাঁসির মঞ্চের দিকে এগিয়ে যান। তাঁর চলনে কোনো দ্বিধা ছিল না, ছিল না মৃত্যুভয়ের দৃশ্যমান কোনো চিহ্ন।
ফাঁসির মঞ্চে উঠে তাঁর হাত পিছনে বাঁধা হয়। এরপর তাঁর মুখ ও গলা ঢেকে দেওয়া হয়। গলায় পরানো হয় ফাঁসির দড়ি। তিনি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন।
তারপর আসে সেই শেষ মুহূর্ত।
ম্যাজিস্ট্রেটের সংকেতের পর ফাঁসির মঞ্চের ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়। মুহূর্তের মধ্যেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তরুণ বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু। মাত্র ১৮ বছরের এক তরুণের জীবন শেষ হয়ে যায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের পরিণতিতে।
তাঁর মৃত্যুর পরও মানুষের ভালোবাসা থেমে থাকেনি। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, মরদেহ শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার সময় পথের দুই পাশে মানুষের ভিড় ছিল। অনেকে ফুল ছুড়ে শ্রদ্ধা জানান। শেষকৃত্যের সময় তাঁর মরদেহ ফুলে ঢেকে যায়।
ক্ষুদিরামের মৃত্যুর দৃশ্য প্রত্যক্ষ করা মানুষের স্মৃতিতে সবচেয়ে গভীরভাবে থেকে যায় তাঁর মুখের হাসি। যে বয়সে একজন তরুণের জীবনের সামনে থাকার কথা ছিল অসংখ্য স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ, সেই বয়সেই তিনি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন অবিচলচিত্তে।
ক্ষুদিরাম বসুর জীবন ও আত্মত্যাগ পরবর্তী প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতা আন্দোলনের সাহসী অধ্যায়ের প্রতীক হয়ে ওঠে। তাঁর নাম উচ্চারিত হয়েছে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে, বিপ্লবী চেতনার আলোচনায় এবং তরুণদের আত্মত্যাগের অনুপ্রেরণা হিসেবে।
আজও ১১ আগস্ট এলেই ফিরে আসে সেই কিশোর বিপ্লবীর কথা। ফিরে আসে মুজফ্ফরপুরের সেই ফাঁসির মঞ্চ, ফিরে আসে মৃত্যুর মুখেও তাঁর হাসিমুখের স্মৃতি।
ক্ষুদিরাম বসু ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী আন্দোলনের এক অতি পরিচিত তরুণ মুখ। তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও আত্মত্যাগ নিয়ে ইতিহাসে নানা মূল্যায়ন রয়েছে। তবে একটি বিষয়ে তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায় আজও গভীরভাবে আলোচিত—মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তাঁর অসাধারণ মানসিক দৃঢ়তা।
একটি কিশোর বয়সী জীবনের এমন পরিণতি আজও হৃদয়কে নাড়া দেয়। তাঁর আত্মত্যাগ কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এটি সাহস, সংকল্প ও আত্মত্যাগের এক স্মরণীয় অধ্যায়।
HindusNews-এর পক্ষ থেকে বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।