রংপুরে চার হিন্দু হত্যাকাণ্ডে নতুন মোড়, পুলিশের বয়ানের সঙ্গে আগামী চক্রবর্তীর শেষ চ্যাটের সময় নিয়ে অসঙ্গতি
নিজস্ব প্রতিবেদক
হিন্দুস নিউজ
প্রকাশিত:
২৬ আগস্ট ২০২৬, ২২:১৫
155 জন পড়েছেন
রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের তিন সদস্যকে হত্যার ঘটনায় পুলিশের দেওয়া ব্যাখ্যা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে নিহত গণপতি চক্রবর্তীর মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর সঙ্গে তাঁর বান্ধবী সাবিলা নাজ সুমির ফেসবুক মেসেঞ্জারে কথোপকথনের একটি স্ক্রিনশট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর হত্যাকাণ্ডের সময় নিয়ে দেখা দিয়েছে নতুন প্রশ্ন।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার রাতে গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হয়। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই স্ক্রিনশটের দাবি অনুযায়ী, আগামী চক্রবর্তীর সঙ্গে তাঁর বান্ধবীর মেসেঞ্জারে শুক্রবার ভোর ৫টা ৫০ মিনিটেও কথোপকথন হয়েছে। ফলে পুলিশের নির্ধারিত হত্যাকাণ্ডের সময়ের সঙ্গে ওই কথোপকথনের সময়ের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। তবে স্ক্রিনশটটির সত্যতা ও কথোপকথনের প্রকৃত সময় স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
রংপুর নগরীর কামালকাছনা এলাকার একটি তিনতলা বাড়ি থেকে গত শনিবার রাতে গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর (১৩) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে পুলিশ জানায়, বৃহস্পতিবার রাতেই হত্যাকাণ্ডটি ঘটে থাকতে পারে। পরে প্রতিবেশী দুই যুবক সিদ্ধার্থ দাস (১৯) ও মুগ্ধ দাসকে (২৩) আটক করা হয়।
রোববার সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ দাবি করেন, ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে ওই দুই যুবক পরিবারের চার সদস্যকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যার পর অভিযুক্তরা বাড়িতে গোসল করেন, ফ্রিজ থেকে শসা ও খেজুর খান এবং নিজেদের মোবাইল ফোন পানিতে ডিটারজেন্ট দিয়ে নষ্ট করার চেষ্টা করেন। এরপরও তারা শুক্রবার জুমার নামাজের সময় পর্যন্ত ওই বাড়িতে অবস্থান করেন বলে পুলিশ দাবি করে।
পুলিশের এই বর্ণনা প্রকাশের পর থেকেই ঘটনাটি নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্তরা কেন এত দীর্ঘ সময় একটি বাড়িতে অবস্থান করবেন, কেন গোসল করবেন, ফ্রিজ খুলে খাবার খাবেন কিংবা নিজেদের মোবাইল ফোন নষ্ট করার মতো পদক্ষেপ নেবেন—এসব বিষয়ে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা প্রয়োজন বলে মনে করছেন আন্দোলনকারীরা।
এরই মধ্যে নিহত আগামী চক্রবর্তীর বান্ধবীর নামে ছড়িয়ে পড়া মেসেঞ্জার কথোপকথনের স্ক্রিনশটটি আলোচনায় এসেছে। সেখানে ভোর ৫টা ৫০ মিনিটে কথোপকথনের সময় দেখানো হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। যদি স্ক্রিনশটটি প্রকৃত ও অপরিবর্তিত হয়ে থাকে, তাহলে আগামী চক্রবর্তীর মৃত্যুর সময় সম্পর্কে পুলিশের প্রাথমিক বর্ণনা পুনরায় যাচাই করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে ওই কথোপকথনের ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষা করে সময় ও সত্যতা নিশ্চিত করার দাবিও উঠেছে।
ঘটনার শুরু থেকেই পুলিশের দেওয়া বক্তব্য নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছেন রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তাঁদের অভিযোগ, গ্রেপ্তার দুই যুবককে হত্যাকাণ্ডের মূল আসামি হিসেবে দেখানোর মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা হতে পারে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে এখনো কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। প্রকৃত ঘটনা কী, তা নির্ধারণে নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
সোমবার রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন। কর্মসূচিতে বক্তারা পুলিশের দেওয়া হত্যাকাণ্ডের বর্ণনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানান। সাবেক শিক্ষক শফিয়ার রহমান বলেন, পুলিশের দেওয়া গল্প অনেকের কাছেই বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। সাবেক শিক্ষার্থী শরিফুলও হত্যাকাণ্ডের পেছনে প্রকৃত ঘটনা খুঁজে বের করার দাবি জানান।
হত্যাকাণ্ডের তদন্তে মরদেহের অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে। মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশ ও সিআইডির প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে মুখমণ্ডলে তরল পদার্থের উপস্থিতি দেখে রাসায়নিক বা অ্যাসিড ব্যবহারের সন্দেহের কথা সামনে এসেছিল। তবে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস জানিয়েছেন, মরদেহে অ্যাসিড বা রাসায়নিক দিয়ে পোড়ানোর কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। দীর্ঘ সময় পড়ে থাকার কারণে রক্ত ও টিস্যুর পরিবর্তন এবং স্বাভাবিক পচন প্রক্রিয়ায় মুখ কালচে ও বিকৃত দেখা যেতে পারে বলে তিনি জানিয়েছেন।
পুলিশ কমিশনার আগামী চক্রবর্তীর চোয়াল ভেঙে যাওয়া ও চোখ বের হয়ে যাওয়ার কথা বললেও ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের বক্তব্যে এমন আলামত পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয়েছে। চিকিৎসকের ভাষ্য অনুযায়ী, আগামী চক্রবর্তীর চোয়াল ভাঙা বা চোখ বের হয়ে যাওয়ার বিষয়টি পাওয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে শ্বাসরোধে হত্যার ধারণা করা হলেও পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক রিপোর্ট হাতে না পাওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলেও জানানো হয়েছে।
ঘটনার নানা ব্যাখ্যা ও প্রশ্নের মধ্যেই মামলাটি থানা থেকে রংপুর মহানগর গোয়েন্দা শাখা—ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়েছে। ডিবির উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী জানিয়েছেন, পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের স্বার্থে মামলাটি ডিবিতে দেওয়া হয়েছে। গ্রেপ্তার দুই যুবকের আদালতে দেওয়া জবানবন্দির সঙ্গে পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যের মিল রয়েছে বলে জানানো হলেও তদন্তে আরও কিছু নতুন তথ্য পাওয়া গেছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
এদিকে রংপুর জেলা মহিলা পরিষদ ও মহানগর নাগরিক কমিটিও হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছে। আন্দোলনকারীরা দ্রুত প্রকৃত হত্যাকারী ও হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কারণ শনাক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিন দিনের মধ্যে প্রকৃত ঘটনা সামনে না এলে বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তাঁরা।
চারজন মানুষের নৃশংস মৃত্যুর এই ঘটনায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত সময়, ঘটনাস্থলে কারা কখন উপস্থিত ছিল, ডিজিটাল ডিভাইস ও মেসেঞ্জার কথোপকথনের তথ্য এবং ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ ফলাফল। আগামী চক্রবর্তীর কথিত শেষ মেসেঞ্জার কথোপকথনের স্ক্রিনশটটি সত্য হলে সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ আলামত হতে পারে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্যের ওপর নির্ভর না করে ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষা, কল ডিটেইল রেকর্ড, সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ডেটা এবং অন্যান্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত এগিয়ে নেওয়ার দাবি উঠেছে।
রংপুরের এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার দুই যুবকই প্রকৃত হত্যাকারী কি না, নাকি ঘটনার পেছনে আরও কোনো ব্যক্তি বা কারণ রয়েছে—এ প্রশ্নের উত্তর এখন নির্ভর করছে তদন্তের পরবর্তী ধাপ এবং বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ওপর। পুলিশের বক্তব্য, প্রত্যক্ষদর্শী ও ডিজিটাল প্রমাণের মধ্যে কোনো অসঙ্গতি থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে প্রকৃত সত্য জনগণের সামনে তুলে ধরার দাবি জানিয়েছেন নিহত পরিবারের স্বজন, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয় নাগরিকরা।