নরসিংদীর গ্যারেজে হিন্দু যুবক চঞ্চল ভৌমিক হত্যাকান্ডের ঘটনায় সর্বশেষ যা জানা গেল
নিজস্ব প্রতিবেদক
হিন্দুস নিউজ
প্রকাশিত:
২৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:৪৬
206 জন পড়েছেন
নরসিংদীর সদর উপজেলার চিনিশপুর ইউনিয়নের দগরিয়া এলাকায় এক গ্যারেজে ভোররাতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় চঞ্চল ভৌমিক (২৫) নামে এক গ্যারেজকর্মীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।
প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে জ্বলতে থাকা আগুনে পুড়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পরিবার, সহকর্মী ও স্থানীয়দের দাবি, এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়—বরং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
গত শনিবার ভোরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে দগরিয়া এলাকায় অবস্থিত রুবেল মিয়ার গ্যারেজ থেকে চঞ্চলের পুড়ে যাওয়া মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটি ‘পেট্রোল বা মবিল ঢেলে পুড়িয়ে হত্যার’ ঘটনা হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়দের ভাষ্যেও এটি একটি পরিকল্পিত ঘটনা বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।
চঞ্চল ভৌমিক কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামের খোকন ভৌমিকের ছেলে। তিনি দীর্ঘ সাত বছর ধরে ওই গ্যারেজে কাজ করতেন এবং নিয়মিত রাতেও সেখানেই ঘুমাতেন।
ছয় মাস আগে তার বাবা মারা যান। গ্রামের বাড়িতে তার মা ও বড় ভাই থাকেন। বড় ভাই উজ্জ্বল ভৌমিক শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ায় উপার্জনে অক্ষম। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন চঞ্চল।
ঘটনাস্থলে পাশাপাশি তিনটি টিনশেড দোকান রয়েছে। মাঝখানের দোকানটি গ্যারেজ, দুই পাশে একটি গাড়ি রংয়ের দোকান এবং আরেকটি পার্টসের দোকান। আশ্চর্যের বিষয় হলো, গ্যারেজে ভয়াবহ আগুন লাগলেও পাশের দুই দোকানে আগুন লাগার কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। এতে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা আরও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে।
চঞ্চলের সহকর্মী শান্ত দেবনাথ জানান, শুক্রবার সকালে আগুন লাগার খবর পেয়ে গ্যারেজে গিয়ে তিনি চঞ্চলের পুড়ে যাওয়া মরদেহ দেখতে পান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, চঞ্চলের কারও সঙ্গে শত্রুতা ছিল বলে তিনি কখনো শোনেননি বা দেখেননি।
চঞ্চল কাজ ছাড়া খুব একটা বাইরে যেতেন না। তিনি আরও জানান, সিসিটিভি ফুটেজে এক অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে দেখা গেছে, যাকে আগে কখনো এলাকায় দেখা যায়নি। ওই ব্যক্তি আশপাশ থেকে মবিলমাখা কাগজ ও কাপড় কুড়িয়ে এনে গ্যারেজের শাটারের সামনে আগুন ধরান।
পুরো গ্যারেজই মবিলে ভেজানো ছিল, ফলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং শাটারের ভেতরে ঢুকে ঘুমন্ত চঞ্চলের শরীরে লাগে।
গ্যারেজের মালিক রুবেল মিয়া বলেন, তিনি কোনোভাবেই এটিকে দুর্ঘটনা বলে মনে করছেন না। তার মতে, এটি স্পষ্ট হত্যাকাণ্ড। তিনি জানান, শনিবার সন্ধ্যায় চঞ্চলের মরদেহ কুমিল্লার গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় এবং রোববার দুপুরে স্থানীয় শ্মশানে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়।
চঞ্চলের মা ববিতা ভৌমিক কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তার ছেলেকে কেউ আগুন লাগিয়ে মেরে ফেলেছে। চঞ্চলের কোনো শত্রু ছিল না বলে তিনি দাবি করেন। স্বামী মারা যাওয়ার ছয় মাসের মাথায় ছোট ছেলেকেও হারিয়ে তিনি দিশেহারা। প্রতিবন্ধী বড় ছেলে কোনো কাজ করতে পারে না—এখন সংসার চালাবে কে, এই প্রশ্নেই তিনি ভেঙে পড়েন।
নরসিংদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ আর আল মামুন জানান, ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিকে এখনো শনাক্ত বা আটক করা যায়নি। তাকে ধরতে থানা-পুলিশের পাশাপাশি র্যাব ও ডিবি যৌথভাবে অভিযান চালাচ্ছে। পুলিশ জানায়, সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, অজ্ঞাতনামা ওই ব্যক্তি প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে ঘটনাস্থলে অবস্থান করেন এবং আগুন জ্বলতে থাকলেও সেখান থেকে সরে যাননি।
শুক্রবার রাতে গ্যারেজে ঘুমিয়ে ছিলেন চঞ্চল। গভীর রাতে আগুন লাগার পর খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।
পরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তার আগুনে পোড়া মরদেহ উদ্ধার করে।
ঘটনার নেপথ্যে কারা জড়িত এবং কী উদ্দেশ্যে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে, তা উদ্ঘাটনের অপেক্ষায় এখন পরিবার ও স্থানীয় মানুষ।