প্রায় ৩০০ বছরের বিদ্যাকুট সতীদাহ মন্দির, বহন করছে উপমহাদেশের অন্ধকার ইতিহাস
হৃদয় চন্দ্র শীল
সুবর্ণচর প্রতিনিধি
প্রকাশিত:
০৩ জুলাই ২০২৬, ২১:৩৮
69 জন পড়েছেন
বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিদ্যাকুট গ্রামে প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো বিদ্যাকুট সতীদাহ মন্দির আজও ইতিহাসের এক বেদনাদায়ক অধ্যায়ের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একসময় যে স্থাপনাটি সতীদাহ প্রথার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল, বর্তমানে সেটি ইতিহাস, সমাজ ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে পরিচিত। তবে অপরিকল্পিত সংস্কার ও সংরক্ষণের অভাবে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এর আদি স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য।
ইতিহাসবিদদের তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যাকুট গ্রামের প্রসিদ্ধ হিন্দু জমিদার দেওয়ান বাড়ির বাসিন্দা দেওয়ান রাম মানিক এই সতীদাহ মন্দির নির্মাণ করেন। ব্রিটিশ আমলের খ্যাতনামা সাংবাদিক অনিলধন ভট্টাচার্য রচিত শাশ্বত ত্রিপুরা গ্রন্থেও মন্দিরটির উল্লেখ রয়েছে। ওই গ্রন্থে বিদ্যাকুট গ্রামকে তৎকালীন ত্রিপুরা রাজ্যের "নবদ্বীপ" হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বিদ্যাকুট ছাড়াও মেরকুটা, সেমন্তঘর, শিবপুর ও বাঘাউড়া গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ সতীদাহের জন্য এই মন্দিরটি ব্যবহার করতেন।
উপমহাদেশের ইতিহাসে ১৮২৯ সালে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। সমাজসংস্কারক রাজা রাম মোহন রায়ের দীর্ঘ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এবং ব্রিটিশ গভর্নর-জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংকের আইনি উদ্যোগে সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। তবে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে, নিষেধাজ্ঞার কয়েক বছর পর ১৮৩৫ সালে দেওয়ান রাম মানিকের মাতাকে এই মন্দিরে সর্বশেষ সতীদাহে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়েছিল বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
জানা যায়, সর্বশেষ সতীদাহ বরণকারিণীর স্মরণে একসময় মন্দিরে একটি শ্বেতপাথরের নামফলক স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় দেওয়ান পরিবারের সদস্যরা ভারত চলে গেলে এবং পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় মন্দিরটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেই ফলকটি নষ্ট হয়ে যায়। ফলে সর্বশেষ সতীদাহ বরণকারী নারীর পরিচয় আজ আর নিশ্চিতভাবে জানা সম্ভব নয়।
১৯৮০-এর দশকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার লোকসংস্কৃতি গবেষক জহিরুল ইসলাম চৌধুরী স্বপন স্থানীয় বাসিন্দা বনলতা দেবীর কাছ থেকে ব্রিটিশ সরকারের একটি ঐতিহাসিক চিঠি সংগ্রহ করেন। তৎকালীন ত্রিপুরার রাজার উদ্দেশে পাঠানো ওই চিঠিতে সতীদাহ প্রথা বন্ধের নির্দেশনা ছিল বলে গবেষণায় উল্লেখ পাওয়া যায়।
সতীদাহ ছিল উপমহাদেশের ইতিহাসে বহুল সমালোচিত একটি অমানবিক সামাজিক প্রথা, যেখানে স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবা নারীকে স্বামীর চিতায় সহমরণে যেতে বাধ্য করা হতো। সমাজ ও ধর্মীয় কুসংস্কারের আড়ালে দীর্ঘদিন এই নিষ্ঠুর প্রথা চালু ছিল। পরবর্তীতে সমাজসংস্কার আন্দোলন ও আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে এর অবসান ঘটে।
স্থাপত্যগত দিক থেকে বিদ্যাকুট সতীদাহ মন্দিরটি গোলাকার মঠ-আকৃতির এবং প্রায় ২০ ফুট উঁচু ইটের নির্মিত একটি স্থাপনা। মন্দিরের এক পাশে প্রবেশপথ রয়েছে এবং চারদিকে ছোট ছোট খুপরির মতো অংশ দেখা যায়। স্থানীয়দের ধারণা, এসব স্থানে আগুন জ্বালিয়ে রাখার ব্যবস্থা ছিল।
স্থানীয় ইতিহাসবিদদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে অপরিকল্পিত সংস্কারের কারণে মন্দিরটির অনেকটাই আদি রূপ হারিয়েছে। যথাযথ প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি ধীরে ধীরে তার স্বকীয়তা হারাচ্ছে।
ইতিহাসবিদদের মতে, বিদ্যাকুট সতীদাহ মন্দির শুধু একটি প্রাচীন স্থাপনা নয়; এটি উপমহাদেশের সামাজিক ইতিহাসের এক নির্মম অধ্যায়ের স্মারক। অতীতের অমানবিক প্রথার স্মৃতি ধারণ করে দাঁড়িয়ে থাকা এই নিদর্শন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইতিহাস জানার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে সংরক্ষণের দাবি রাখে।