কারাগারে বসেই আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্র নিয়ন্ত্রণ করেন লরেন্স বিষ্ণোই
নিজস্ব প্রতিবেদক
হিন্দুস নিউজ
প্রকাশিত:
০৯ জুলাই ২০২৬, ১৪:৪৯
32 জন পড়েছেন
নিশ্চয়ই বলিউডে লরেন্স বিষ্ণোইয়ের জীবন নিয়ে সিনেমা বানানো হবে। চিত্রনাট্যকারকে অবশ্য খুব বেশি কষ্ট করতে হবে না।
লরেন্স বিষ্ণোইয়ের জীবন অনুসরণ করলেই হবে, আলাদা কোনো মাসালা লাগবে না। সিনেমার মতো নয়, কখনো কখনো সিনেমার চেয়েও উত্তেজনাকর লরেন্স বিষ্ণোইয়ের জীবন। তবে অন্য সব অপরাধীদের মতো বিষ্ণোইয়ের অপরাধী হওয়ার পেছনে দারিদ্র্য বা প্রতিশোধপরায়ণতার কোনো গল্প নেই। কিছু একটা হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা, অপরাধ জগতের ‘গ্ল্যামার’ই তাকে টেনে এনেছে অন্ধকার এই জগতে।
পাঞ্জাবের ফিরোজপুরের একটি গ্রামে জন্ম নেওয়া লরেন্স ছাত্রজীবনেই অপরাধ চক্রে জড়িয়ে পড়েন। পাঞ্জাব থেকে ধীরে ধীরে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে নিজের অপরাধ সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটান লরেন্স। শুধু ভারত নয়; যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপেও রয়েছে লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের বিশাল নেটওয়ার্ক। মাত্র ৩৩ বছর বয়সেই আন্তর্জাতিক গ্যাংস্টারের তকমা পেয়েছেন লরেন্স।
কানাডায় লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের নেতৃত্ব দেন তার ছাত্রজীবনের সহযোগী গোল্ডি ব্রার, আর ইউরোপের নেতৃত্ব রোহিত গোদারারের হাতে।
মজার ব্যাপার হলো, ২০১৫ সাল থেকেই বন্দি থাকা লরেন্স কারাগারে বসেই তার আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রের নেতৃত্ব দেন। তার বিরুদ্ধে হত্যা, মাদক চোরাচালানের ৩০টিরও বেশি মামলা বিচারাধীন।
লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাং ও ভারতের বিভিন্ন অপরাধ চক্রের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশের এক সমন্বিত যৌথ অভিযান লরেন্স বিষ্ণোইকে নতুন করে আন্তর্জাতিক পরিসরে আলোচনায় এনেছে। ‘অপারেশন হার্ড বল’ নামে এই যৌথ অভিযানে ৫০টিরও বেশি স্থানে একযোগে অভিযান চালিয়ে অন্তত ২৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক এ অভিযানে এক হাজার কেজি কোকেন ও হিরোইন, বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ এবং ডজনখানেক অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র জব্দ করা হয়েছে।
বলিউড সুপারস্টার সালমান খানকে হত্যার হুমকি দিয়ে প্রথম জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনায় আসেন লরেন্স বিষ্ণোই। ১৯৯৮ সালে রাজস্থানের যোধপুরে ‘হাম সাথ সাথ হ্যায়' সিনেমার শুটিং চলাকালে সালমান খানের বিরুদ্ধে দুটি ‘কৃষ্ণসার হরিণ’ শিকারের অভিযোগ ওঠে। বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের মানুষ প্রকৃতি এবং বন্যপ্রাণী রক্ষাকে তাদের পরম ধর্মীয় কর্তব্য বলে মনে করে। তারা ‘কৃষ্ণসার হরিণ’কে অত্যন্ত পবিত্র জ্ঞান করে এবং তাদের আধ্যাত্মিক নেতা গুরু জাম্বেশ্বরের পুনর্জন্ম হিসেবে বিশ্বাস করে। তাই হরিণ হত্যার এই ঘটনা পুরো বিষ্ণোই সম্প্রদায়কে গভীরভাবে ক্ষুব্ধ করে। তাদের দায়ের করা মামলায় ২০১৮ সালে যোধপুর আদালত সালমান খানকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দিলেও পরবর্তীতে তিনি জামিনে মুক্তি পান। হরিণ শিকারের ঘটনার সময় লরেন্স নিতান্তই শিশু ছিলেন। কিন্তু ঘটনাটি তার মনে গভীর রেখাপাত করে। ২০১৮ সালে যোধপুর আদালতে হাজিরার সময় লরেন্স প্রকাশ্যে প্রথমবার ঘোষণা দেন, ‘আমরা যোধপুরেই সালমান খানকে হত্যা করব। তখন তিনি বুঝবেন আমরা কারা।’
তবে হুমকি দিয়ে বসে থাকেননি লরেন্স বিষ্ণোই। এরপর ধারাবাহিক হুমকি সালমান পরিবারকে শঙ্কিত করে তোলে। ২০২২ সালে সালমানের বাবা সেলিম খান প্রাতঃভ্রমণের সময় একটি চিরকুট পান, যাতে বাবা-ছেলেকে হত্যার হুমকি ছিল। ২০২৩ সালেও গোল্ডি ব্রারের পক্ষ থেকে সালমানকে হুমকি দিয়ে ইমেইল পাঠানো হয়। ২০২৪ সালের ১৪ এপ্রিল ভোর ৫টায় মুম্বাইয়ের বান্দ্রা এলাকায় সালমানের বিলাসবহুল ‘গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্ট’-এর বাইরে মোটরবাইকে চড়ে আসা দুই শ্যুটার ভবনের দেয়াল ও সালমানের বারান্দা লক্ষ্য করে অন্তত ৫ রাউন্ড গুলি চালায়। ঘটনার সময় সালমান খান এবং তার পরিবারের সদস্যরা ঘরের ভেতরেই ঘুমাচ্ছিলেন, তবে সৌভাগ্যবশত কেউ আহত হননি। হামলার কয়েক ঘণ্টা পরেই লরেন্স বিষ্ণোইয়ের ভাই আনমোল বিষ্ণোই ফেসবুকে এই হামলার দায় স্বীকার করে এটিকে সালমান খানের জন্য ‘শেষ সতর্কতা’ হিসেবে অভিহিত করেন। পরে পুলিশ দুই শ্যুটারকে গ্রেপ্তার করে।
তারা জানায়, কারাগার থেকে লরেন্স বিষ্ণোই নিজেই তাদের গুলি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সালমান খানকে হত্যা করতে না পারলেও ২০২৪ সালেই তার ঘনিষ্ঠ রাজনীতিবিদ বাবা সিদ্দিকীকে হত্যা করে লরেন্স গ্যাং। ১৯৯৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পাঞ্জাবের একটা সচ্ছল পরিবারে লরেন্স বিষ্ণোইয়ের জন্ম। ১০০ একরেরও বেশি জমি দ্বারা বেষ্টিত প্রশস্ত বাংলোতে বাস করে বিষ্ণোই পরিবার। লরেন্সের বাবা পুলিশে চাকরি করতেন। তবে পারিবারিক সম্পত্তি দেখাশোনা করতে পুলিশের চাকরি ছেড়ে দেন তিনি। প্রাচুর্যে মোড়া ছিল লরেন্স বিষ্ণোইয়ের ছেলেবেলা। স্থানীয় এক কনভেন্ট স্কুলে তার পড়াশোনা শুরু হয়। ২০০৮ সালে স্কুল শেষ করার পর চণ্ডীগড়ের একটা কলেজে ভর্তি হন তিনি। ২০১১ সালে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন লরেন্স। সেখানে যোগ দেন ছাত্র রাজনীতিকে। একবার ছাত্র সংসদ নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পরই অপরাধ জগতের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়। পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনে পড়ার সময়ই লরেন্স বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন।
২০১৫ সাল থেকে কারাগার থাকলেও লরেন্সের বিরুদ্ধে ২০২২ সালে পাঞ্জাবি গায়ক সিধু মুস ওয়ালাকে হত্যা, ২০২৩ সালে কানাডায় শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হরদীপ সিং নিজ্জার হত্যা, ২০২৪ সালে রাজনীতিবিদ বাবা সিদ্দিকীকে হত্যার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি করাগারে থেকে তিনি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকারও দিয়েছেন। ২০২২ সালে গুজরাটের উপকূলে জখৌ বন্দরের কাছে একটি পাকিস্তানি নৌকা থেকে প্রায় ১৯৪ কোটি রুপি মূল্যের ৪০ কেজি হেরোইন জব্দের মামলায়ও আসামি করা হয় কারাবন্দি লরেন্সকে। এই মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্যই ২০২৩ সালে তিহার জেল থেকে লরেন্সকে গুজরাটের আহমেদাবাদের সবরমতী সেন্ট্রাল জেলে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে এখানকার একটি হাই সিকিউরিটি ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে তাকে। তার বিরুদ্ধে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে মামলা থাকলেও নিরাপত্তার স্বার্থে তাকে অন্য কোনো কারাগারে স্থানান্তর বা বা সরাসরি আদালতে তোলা হয় না।
সিনেমায় সালমান খান যেমন স্টাইলের জন্য জনপ্রিয়, বাস্তবে লরেন্সও তেমনি স্টাইলিস্ট। পরিপাটি করে ছাঁটা দাড়ি, হুডি দিয়ে প্রায় ঢাকা তার দুই সতর্ক চোখ তাকে অপরাধ জগতে অন্য স্টাইল দিয়েছে।