চট্টগ্রামের ধলঘাটে শতাব্দীপ্রাচীন জাগ্রত শক্তিপীঠ
অলৌকিক আবির্ভাবের ইতিহাসে সমৃদ্ধ শ্রীশ্রী বুড়াকালী মন্দির
জয় দাশ
রাউজান প্রতিনিধি
প্রকাশিত:
১৫ জুন ২০২৬, ১০:০৭
57 জন পড়েছেন
চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলা-র ধলঘাট গ্রামে অবস্থিত প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শ্রীশ্রী বুড়াকালী মন্দির বহু বছর ধরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম আধ্যাত্মিক সাধনপীঠ হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় ভক্ত ও পুরাতন কাহিনি অনুসারে, এই মন্দিরের আরাধ্যা দেবী জগজ্জননী শ্রীশ্রী বুড়াকালী মাতা স্বয়ং আবির্ভূতা হয়ে স্ববিভূতিতে প্রকাশিত হয়েছিলেন। সেই বিশ্বাসকে ঘিরেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এখানে পূজিত হয়ে আসছেন মা বুড়াকালী।
ধর্মীয় বিশ্বাস ও লোককথা অনুযায়ী, প্রায় ৭০০ বছর আগে রাজারাম দত্ত নামের এক ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি ভারত থেকে পরিবারসহ তীর্থভ্রমণে এসে চট্টগ্রামের এই অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সীতাকুণ্ড মহাতীর্থসহ বিভিন্ন পবিত্র স্থান পরিদর্শনের পর তিনি ধলঘাট গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। বলা হয়, এক রাতে স্বপ্নে মা কালী তাঁকে দর্শন দিয়ে জানান যে তিনি একটি নিমবৃক্ষের মধ্যে বিরাজ করছেন এবং কঠোর সাধনা ও তপস্যার মাধ্যমে তাঁকে লাভ করা সম্ভব।
স্বপ্নে দেবী আরও বলেন, “যে কাঠে বাঁচে মানুষের প্রাণ, সেই কাঠ দিয়েই প্রতিষ্ঠা হবে দেবীর প্রাণ।” এই অলৌকিক নির্দেশ পাওয়ার পর রাজারাম দত্ত সেই নিমগাছের নিচে কঠোর তপস্যা শুরু করেন। দীর্ঘ সাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে দেবী তাঁকে আবারও স্বপ্নে দর্শন দিয়ে জানান, ফাল্গুন মাসের অমাবস্যা তিথির মধ্যরাতে তিনি নিমবৃক্ষ থেকে আবির্ভূত হবেন।
নির্ধারিত সেই দিনটি ছিল শনিবার। ভক্তিভরে রাজারাম দত্ত বাদ্যযন্ত্র, পূজার্চনা ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। স্থানীয়দের বিশ্বাস অনুযায়ী, ঠিক মধ্যরাতে দেবী কালী দিব্যমূর্তি ধারণ করে সেই নিমগাছ থেকে বিগ্রহরূপে আবির্ভূত হন। পরে রাজারাম দত্ত মহাসমারোহে দেবীর বিগ্রহ গৃহে নিয়ে পূজা শুরু করলেও পুনরায় স্বপ্নাদেশে দেবী তাঁকে নির্দেশ দেন, তাঁকে যেন তাঁর আবির্ভাবস্থলেই স্থাপন করা হয়। এরপর সেই নিমগাছের স্থানেই দেবীর বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং পরবর্তীতে সেখানেই গড়ে ওঠে বর্তমান মন্দির।
মন্দিরটির ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তন্ত্রসাধনা, বৈদিক উপাসনা এবং বহু সাধকের আধ্যাত্মিক সাধনার কাহিনি। স্থানীয়দের মতে, মা কালী রাজারাম দত্তকে ভবিষ্যদ্বাণী করে জানিয়েছিলেন যে, এই সাধনপীঠে বহু মহাপুরুষ তপস্যার মাধ্যমে সিদ্ধিলাভ করবেন এবং তাঁদের খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে। সময়ের সঙ্গে সেই বিশ্বাসও বাস্তবে প্রতিফলিত হয়েছে বলে মনে করেন ভক্তরা।
এই সাধনপীঠে সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন বলে যাঁদের নাম প্রচলিত রয়েছে, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য তারাচরণ পরমহংসদেব। এছাড়া গুজরাট থেকে আগত সাধুবাবা ওঙ্কারগিরী মহারাজ এবং নাগাল্যান্ড থেকে আগত সাধুবাবা নারায়ণগিরি মহারাজও এখানে দীর্ঘদিন তপস্যা করেছিলেন বলে জানা যায়। তাঁদের মৃত্যুর পর মন্দিরসংলগ্ন স্থানেই সমাধিস্থ করা হয়।
বর্তমানে মন্দিরটিতে প্রতিদিন নিত্যপূজা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতি শনিবার, মঙ্গলবার এবং অমাবস্যা তিথিতে বিশেষ পূজার আয়োজন করা হয়। শ্যামাপূজা ও দীপাবলি উপলক্ষে এখানে অনুষ্ঠিত হয় বার্ষিক নিশিপূজা, যা এলাকাব্যাপী অন্যতম বড় ধর্মীয় আয়োজন হিসেবে বিবেচিত। এ সময় যজ্ঞ, হোম, আরতি, ছাগবলি ও বিভিন্ন ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে হাজার হাজার ভক্তের সমাগম ঘটে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভক্তরা এখানে এসে মানত করেন, পূজা দেন এবং প্রসাদ গ্রহণ করেন।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, জাগ্রত মা বুড়াকালীর কাছে প্রার্থনা করলে মনোবাসনা পূর্ণ হয় এবং জীবনের বিপদ-আপদ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। সেই বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক আকর্ষণেই প্রতিদিন অসংখ্য ভক্ত এই মন্দিরে এসে মায়ের চরণে প্রণাম নিবেদন করেন।
ধর্মীয় আবহ ও ভক্তিমূলক পরিবেশে আজও মুখরিত এই প্রাচীন শক্তিপীঠ। শত বছরের ইতিহাস, লোকবিশ্বাস, সাধনা ও ভক্তির ঐতিহ্য বহন করে চট্টগ্রামের ধলঘাটের শ্রীশ্রী বুড়াকালী মন্দির আজও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে গভীর আস্থার প্রতীক হয়ে রয়েছে।