‘ধর্মীয় সহাবস্থানই বাংলাদেশের সৌন্দর্য’: সংসদে চরমপন্থার বিরুদ্ধে এমপি ফজলুর রহমানের ক্ষোভ
জয় দাশ
রাউজান প্রতিনিধি
প্রকাশিত:
২৬ জুন ২০২৬, ০২:১৩
21 জন পড়েছেন
বাংলাদেশের শতাব্দীপ্রাচীন ধর্মীয় সম্প্রীতি, সহনশীলতা ও সুফিবাদী ঐতিহ্যকে রক্ষার আহ্বান জানিয়ে জাতীয় সংসদে চরমপন্থী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান। তিনি বলেছেন, ধর্মীয় বৈচিত্র্য ও পারস্পরিক সহাবস্থানই বাংলাদেশের প্রকৃত সৌন্দর্য, অথচ এক শ্রেণির উগ্রপন্থী গোষ্ঠী সেই ঐতিহ্যকে বিনষ্ট করার অপচেষ্টায় লিপ্ত।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে বহুত্ববাদী সংস্কৃতি, পরমতসহিষ্ণুতা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অধিকার নিয়ে তৈরি হওয়া উদ্বেগের প্রসঙ্গ তুলে ফজলুর রহমান বলেন, অলি-আউলিয়াদের হাত ধরে বাংলার মাটিতে যে শান্তি, মানবতা ও সুফিবাদের চর্চা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা আজ কিছু ধর্মব্যবসায়ী ও চরমপন্থী গোষ্ঠীর কারণে হুমকির মুখে পড়েছে।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্নে তিনি বলেন, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে এ ভূখণ্ড শুধু মুসলমানদের নয়; হিন্দু, বৌদ্ধসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষেরও সমান ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের প্রায় দেড় কোটি হিন্দু নাগরিক এই মাটিরই সন্তান এবং তাদের ধর্মীয় অনুশীলনের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকা উচিত।
এমপি ফজলুর রহমান বলেন, “হিন্দুরা তাদের মন্দিরে মূর্তি নির্মাণ করে পূজা করবে, মুসলমানরা মসজিদ নির্মাণ করে ইবাদত করবে—এতে কারও ক্ষতি হওয়ার কথা নয়। বরং এ ধরনের পারস্পরিক সহাবস্থানই বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যকে আরও সমৃদ্ধ করে।”
তিনি আরও বলেন, যদি রাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থান হয় যে মন্দির বা মূর্তি নির্মাণ করা যাবে না, তবে তা আইনগতভাবে স্পষ্ট করতে হবে। কিন্তু আইন বহাল থাকা অবস্থায় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সংস্কৃতির ওপর আঘাত কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
সুফিবাদী ঐতিহ্যের গুরুত্ব তুলে ধরে ফজলুর রহমান বলেন, হযরত খাজা মইনুদ্দিন চিশতী (রহ.), হযরত শাহজালাল (রহ.), শাহ পরান (রহ.) এবং খান জাহান আলীর মতো মহাপুরুষেরা মানবতা, সহমর্মিতা ও শান্তির বাণী প্রচার করেছেন। কিন্তু বর্তমানে সেই আদর্শের অনুসারীদের ওপর হামলার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তিনি অভিযোগ করেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে পীর-মাশায়েখ ও সুফিবাদী ধারার অনুসারীদের ওপর হামলা হচ্ছে, এমনকি মাজারভিত্তিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধেও উসকানিমূলক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ডকে সামাজিক সম্প্রীতি ও জাতীয় ঐক্যের জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সংসদ সদস্য বলেন, উগ্রবাদ, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা এবং ভিন্নমত দমনের প্রবণতা রোধে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কেউ চাইলে মাজারে যাবে, কেউ চাইলে যাবে না; কেউ আহলে হাদিসের অনুসারী হবে, কেউ অন্য কোনো ধারার। কিন্তু কারও ওপর জোরপূর্বক মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়া কিংবা অন্যের উপাসনালয়, ধর্মীয় স্থাপনা বা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর হামলা চালানোর অধিকার কারও নেই।
বক্তব্যের শেষাংশে তিনি ধর্মীয় সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশের বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির পরিবেশ অটুট রাখার আহ্বান জানান।