গাজনের অন্তরালের প্রায়শ্চিত্ত: বিশ্বাস, শুদ্ধতা ও ঐতিহ্যের এক অনন্য অধ্যায়
চিরনজিত চন্দ্র বাইন
ভোলা জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশিত:
১৫ এপ্রিল ২০২৬, ১৬:৩৫
129 জন পড়েছেন
গাজন নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও ‘প্রায়শ্চিত্ত’-এর বিষয়টি থেকে যায় আড়ালে। অথচ শিব ওঠা, ঝাঁপ, নীল ও চড়ক—এই সমগ্র আচারধারার ভেতরে লুকিয়ে আছে বাঙালির প্রাচীন বিশ্বাস, আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক সাধনার এক গভীর প্রকাশ।
বছরশেষ ও নববর্ষের সন্ধিক্ষণে সন্ন্যাসীরা স্নান সেরে শিব মন্দিরে গিয়ে ‘আদেশ’ গ্রহণ করেন। শিবের অষ্টোত্তর শতনাম পাঠ শেষে বাবার মাথা থেকে ধুতরা ফুল পড়ে যাওয়াকেই ধরা হয় সেই নির্দেশের প্রতীক হিসেবে। এরপর পুনরায় শুদ্ধ হয়ে তারা সমবেত হন ঝাঁপতলায়, যেখানে পুরো গ্রাম অপেক্ষায় থাকে এক পবিত্র মুহূর্তের সাক্ষী হতে।
ঝাঁপতলার পরিবেশ তখন উৎসুক জনসমুদ্রে ভরপুর। উৎসর্গীকৃত ফলকে পবিত্র মনে করে মা-বোনেরা আঁচল পেতে দাঁড়িয়ে থাকেন প্রসাদ গ্রহণের আশায়। কিন্তু এই আচার সম্পন্ন হওয়ার আগে রয়েছে কঠোর বিধিনিষেধ—ঈশ্বরের অনুমতি ছাড়া ঝাঁপ শুরু হয় না। বিশ্বাস অনুযায়ী, আকাশে চিল উড়তে দেখা গেলে তবেই শুরু করা যায় এই আচার।
কিন্তু কখনো কখনো দেখা যায় দীর্ঘ অপেক্ষার পরও চিলের দেখা মেলে না। তখন মনে করা হয়, কোনো সন্ন্যাসীর দ্বারা শুদ্ধতার বিধি ভঙ্গ হয়েছে—হোক তা অজান্তে জল পান, কিংবা মনের অশুদ্ধ চিন্তা। আর এই ত্রুটির পরিশুদ্ধির জন্যই শুরু হয় ‘প্রায়শ্চিত্ত’।
সন্ন্যাসী তখন বাবার সম্মুখে নতজানু হয়ে গভীর অনুতাপে নিজেকে শাস্তি দেন। ভেজা গামছার আঘাতে দেহকে কষ্ট দিয়ে, চোখের জলে মনকে শুদ্ধ করার এই প্রক্রিয়া কেবল দেহ নয়, আত্মার পরিশুদ্ধির এক প্রতীকী প্রকাশ।
হঠাৎ করেই আকাশ চিরে ভেসে আসে সেই প্রতীক্ষিত ধ্বনি—চিলের ডাক। মুহূর্তেই উল্লাসে ফেটে পড়ে জনতা। ফিরে আসে বিশ্বাস, প্রাণ পায় ঐতিহ্য। শুরু হয় ঝাঁপ, আর মুখরিত হয়ে ওঠে চারদিক—
“ব্যোম ভোলে, জয় বিশ্বনাথ।”
এইভাবেই গাজনের আচার শুধু উৎসব নয়, বরং আত্মশুদ্ধি, বিশ্বাস ও বাঙালির চিরন্তন সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।