স্ত্রী কি স্বামীকে নাম ধরে ডাকতে পারেন? জেনে নিন সনাতন শাস্ত্র ও মনুসংহিতার স্পষ্ট বিধান!
সনাতন ধর্মে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কেবল সামাজিক চুক্তি নয়, এক পরম পারমার্থিক বন্ধন। পতিদেবকে নাম ধরে ডাকার শাস্ত্ৰীয় বিধান এবং 'ধর্মপত্নী'র প্রকৃত মাহাত্ম্য জানতে পড়ুন "HINDUS NEWS"-এর এই বিশেষ প্রতিবেদনটি।
আমাদের সনাতন শাস্ত্রে নারীদের অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নারীদের কোমল শরীর ও মন কঠোর তপস্যার জন্য উপযুক্ত নয়। আর তাই পরমপিতা ব্রহ্মা নারীদের অতি সহজে জাগতিক ও পারমার্থিক মুক্তির পথ হিসেবে পুরুষের সাথে পবিত্র বিবাহের বন্ধন সৃষ্টি করেছেন। এখানে সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো সেবা ও আধ্যাত্মিক উন্নতি। স্বামী পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণের সেবা আরাধনা করবেন, আর স্ত্রী তার স্বামীর সেবা ও যত্ন করবেন, যাতে স্বামী নির্বিঘ্নে ভগবানের ভক্তি ও সেবা সুসম্পন্ন করতে পারেন।
এই পরম ধর্মের অংশীদার বলেই স্ত্রীকে শাস্ত্রে 'ধর্মপত্নী' হিসেবে ভূষিত করা হয়েছে। স্ত্রী কেবল স্বামীর সেবা করেই আধ্যাত্মিক দিক থেকে পরম লাভবান হন। স্বামী ধর্মকর্ম বা ভক্তি করে যে আধ্যাত্মিক ফল লাভ করেন, অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে স্ত্রীও প্রাকৃতিকভাবেই তার অর্ধেকের ভাগী হন। এর পাশাপাশি, একজন বৈষ্ণব স্বামীর সেবাপরায়ণতার মাধ্যমে স্ত্রী পরম বৈষ্ণবসেবার ফলও লাভ করেন। ব্রহ্মা স্বয়ং স্ত্রীদের এই ইহলৌকিক ও পারমার্থিক কল্যাণ নিশ্চিত করতেই এই শ্বাশত বিধান দিয়েছেন।
আমাদের সনাতন ইতিহাসের পাতায় অনুসূয়ার মতো মহাসতী নারীদের উপাখ্যান রয়েছে, যাঁরা কেবল পতিসেবার মাধ্যমে অর্জিত পুণ্য ও অলৌকিক শক্তির বলে খেলার ছলে ইন্দ্রসহ অন্যান্য দেবতাদেরও পরাস্ত করার ক্ষমতা রাখতেন। পতির প্রতি এই পরম শ্রদ্ধা ও সমর্পণের সংস্কৃতি আজও সনাতন সমাজে অম্লান। বর্তমান যুগেও যদি কেউ পবিত্র ধাম বৃন্দাবনে যান, তবে দেখতে পাবেন পরম ভক্তি জাগানো এক দৃশ্য— গোবর্ধন পরিক্রমার সময় স্বামী প্রতি পদে পদে শ্রীগোবর্ধনকে দণ্ডবৎ প্রণাম করছেন, আর স্বামীর প্রতিটি প্রণামের সাথে সাথে স্ত্রীরা পরম শ্রদ্ধায় তাদের স্বামীর চরণধুলি মাথায় তুলে নিচ্ছেন। এই দৃশ্যই প্রমাণ করে সনাতন দাম্পত্যের গভীরতা ও আধ্যাত্মিক মাহাত্ম্য।
স্বয়ং দেবী লক্ষ্মী কিংবা দেবী পার্বতী কখনোই তাঁদের পরমেশ্বরকে নাম ধরে সম্বোধন করেননি। তাঁরা তাঁদের স্বামীকে পরম শ্রদ্ধায় 'হে প্রাণনাথ', 'হে পতিদেব', 'হে স্বামীন', 'হে আর্য', 'হে চক্রধর' কিংবা 'হে শূলপাণি' বলে সম্বোধন করতেন। যেহেতু স্বামী স্ত্রীর জন্য মহাগুরুর সমতুল্য, তাই সনাতন সমাজের প্রধান স্মৃতিশাস্ত্র 'মনুসংহিতা'-তে স্বামীর নাম ধরে ডাকার বিষয়ে স্পষ্ট নিষেধ করা হয়েছে।
শাস্ত্রমতে একজন সতী স্ত্রী স্বামীকে 'প্রভু', 'স্বামী', 'আর্য', 'প্রিয়' বা 'প্রিয়তম' বলে সম্বোধন করবেন। অথবা সাংসারিক সম্পর্কের সূত্রে 'অমুকের বাবা' বলেও ডাকতে পারেন। তবে বর্তমান ভক্তি ও বৈষ্ণব পরিমণ্ডলে স্বামীকে 'প্রভু' বলে সম্বোধন করার রীতিটি সবচেয়ে বেশি প্রচলিত এবং প্রশংসিত। সনাতন সংস্কৃতির এই চিরন্তন মূল্যবোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধই একটি পরিবারকে স্বর্গীয় করে তোলে, যা আজ বিশ্ব দরবারে মানবাধিকার ও পারিবারিক শৃঙ্খলার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।