মহাস্নানের পর অনাবসর পর্ব শুরু, দর্শন থেকে বিরত থাকবেন ভক্তরা
হৃদয় চন্দ্র শীল
সুবর্ণচর প্রতিনিধি
প্রকাশিত:
০২ জুলাই ২০২৬, ০২:২৩
40 জন পড়েছেন
জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমায় ঐতিহ্যবাহী স্নানযাত্রা উৎসব সম্পন্ন হওয়ার পর শুরু হয়েছে প্রভু শ্রীজগন্নাথের অনাবসর (অনাসর) লীলা। প্রাচীন রীতি ও শাস্ত্রানুসারে, এই সময়ে ভগবান শ্রীজগন্নাথ, শ্রীবলভদ্র ও দেবী সুভদ্রা অসুস্থতার লীলা প্রকাশ করেন। ফলে আগামী প্রায় ১৫ দিন সাধারণ ভক্তদের জন্য তাঁদের সরাসরি দর্শন বন্ধ থাকবে।
প্রতি বছর রথযাত্রার পূর্বে জ্যৈষ্ঠ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে মহাসমারোহে পালিত হয় শ্রীজগন্নাথদেবের স্নানযাত্রা। এদিন ১০৮টি পবিত্র কলসের জল দিয়ে শ্রীজগন্নাথ, শ্রীবলভদ্র ও দেবী সুভদ্রার মহাভিষেক সম্পন্ন করা হয়। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই মহাস্নানের পর প্রভু মানবসমাজকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য অসুস্থতার লীলা করেন। এই কারণেই শুরু হয় অনাবসর পর্ব।
অনাবসর চলাকালে তিন বিগ্রহকে মূল মন্দিরের রত্নবেদী থেকে নির্দিষ্ট সেবাগৃহে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁদের ভেষজ চিকিৎসা, বিশ্রাম, অঙ্গরাগ এবং পুনরায় শৃঙ্গারের আচার সম্পন্ন করা হয়। মহাস্নানের ফলে বিগ্রহের রং কিছুটা বিবর্ণ হয়ে যায় বলে এই সময়ে বিশেষভাবে রূপ-সজ্জার কাজও সম্পন্ন করা হয়। ফলে এ সময় সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য মূল বিগ্রহ দর্শন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ থাকে।
এই সময়ে ভক্তরা মূল বিগ্রহের পরিবর্তে প্রভুর চিত্রপট দর্শনের সুযোগ পান। অনাবসর পর্ব শেষ হলে অনুষ্ঠিত হয় বহুল প্রতীক্ষিত নবযৌবন দর্শন। নতুন রূপে ও অপরূপ শৃঙ্গারে সজ্জিত হয়ে প্রভু শ্রীজগন্নাথ, শ্রীবলভদ্র ও দেবী সুভদ্রা আবারও ভক্তদের দর্শন দেন। এরপরই শুরু হয় বিশ্ববিখ্যাত রথযাত্রা।
পুরাণে উল্লেখ রয়েছে, ব্রহ্মার পুত্র স্বয়ম্ভূব মনু পৃথিবীতে ভগবানের দর্শন লাভের উদ্দেশ্যে মহাযজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন। সেই যজ্ঞের প্রভাবে জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমায় শ্রীজগন্নাথের আবির্ভাব ঘটে এবং তিনি ভক্তদের পবিত্র জলে মহাস্নান করানোর নির্দেশ দেন। সেই থেকেই স্নানযাত্রা উৎসবের প্রচলন হয়েছে বলে বিশ্বাস করা হয়।
অন্যদিকে, আরেকটি প্রচলিত কাহিনিতে বলা হয়, পরম বিষ্ণুভক্ত রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন বহু সাধনার পর নীলমাধবের সন্ধান লাভ করেন এবং জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমা তিথিতে ১০৮টি পবিত্র কলসের জল দিয়ে মহাভিষেকের মাধ্যমে শ্রীজগন্নাথদেবকে প্রতিষ্ঠা করেন। এই ঘটনাও স্নানযাত্রা উৎসবের অন্যতম ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।
শুধু শ্রীজগন্নাথদেবই নন, জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমা উপলক্ষে ভারতের বিভিন্ন মন্দিরে নানা দেব-দেবীর স্নানযাত্রাও পালিত হয়। তবে পুরীর শ্রীজগন্নাথদেবের স্নানযাত্রা সবচেয়ে প্রাচীন, ঐতিহ্যবাহী ও জাঁকজমকপূর্ণ উৎসবগুলোর একটি। প্রতি বছর দেশ-বিদেশ থেকে লাখো ভক্ত এই উৎসবে অংশগ্রহণ করেন।
হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, স্নানযাত্রায় অংশগ্রহণ, মহাস্নান দর্শন এবং ভক্তিভরে প্রার্থনা করলে পাপক্ষয় হয়, জীবনে শান্তি, সমৃদ্ধি ও ঈশ্বরের বিশেষ কৃপা লাভ করা যায়। তাই এই উৎসবকে ভক্তদের কাছে আত্মশুদ্ধি, ভক্তি ও আধ্যাত্মিকতার এক মহামিলন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বর্তমানে অনাবসর লীলা চলমান থাকায় আগামী প্রায় ১৫ দিন ভক্তরা প্রভুর সরাসরি দর্শন থেকে বিরত থাকবেন। অনাবসর শেষে নবযৌবন দর্শনের মাধ্যমে পুনরায় উন্মুক্ত হবে দর্শন, আর তার পরপরই অনুষ্ঠিত হবে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব—শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের পবিত্র রথযাত্রা।