রথযাত্রা উৎসব শুরু আগামীকাল, চলছে শেষ পর্যায়ের প্রস্তুতি
নিজস্ব প্রতিবেদক
হিন্দুস নিউজ
প্রকাশিত:
১৫ জুলাই ২০২৬, ১৪:২৩
5 জন পড়েছেন
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ধর্মীয় অনুষ্ঠান শ্রী শ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা উৎসব শুরু হচ্ছে আগামীকাল বৃহস্পতিবার। সনাতনী রীতি অনুযায়ী, প্রতি বছর আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে শুরু হয় জগন্নাথদেবের রথযাত্রা।
রথযাত্রাকে সামনে রেখে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে। রথের সংস্কার, রং ও সাজসজ্জার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন শিল্পী ও শ্রমিকরা। রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রাসহ নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠানমালার মাধ্যমে আনন্দমুখর পরিবেশে ৯ দিনব্যাপী শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা মহোৎসবের আয়োজন করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) সকাল ৮টায় রাজধানীর স্বামীবাগ মন্দিরে বিশ্বশান্তি ও মঙ্গল কামনায় অগ্নিহোত্র যজ্ঞের মধ্য দিয়ে রথযাত্রা মহোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে।
পরে বেলা ৩টায় মন্দির থেকে জগন্নাথদেবের রথযাত্রা বের হবে। সন্ধ্যা ৭টার দিকে রথ ঢাকেশ্বরী মন্দিরে পৌঁছাবে।
রথযাত্রা উপলক্ষে আয়োজিত ৯ দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালায় রয়েছে, হরিনাম সংকীর্তন, বিশ্ব শান্তি ও মঙ্গল কামনায় অগ্নিহোত্র যজ্ঞ, মহাপ্রসাদ বিতরণ, আলোচনাসভা, শোভাযাত্রা, পদাবলী কীর্তন, আরতি কীর্তন, ভগবত কথা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শ্রীমদ্ভাগবত গীতা পাঠ, ধর্মীয় চলচ্চিত্র প্রদর্শন ও ধর্মীয় নাটক মঞ্চায়ন।
রথযাত্রা উপলক্ষে দুপুর ১টায় আলোচনাসভা শেষে বিকেল ৩টায় রথের বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার উদ্বোধন করা হবে।
আলোচনাসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর উপস্থিত থাকবেন।
জানা যায়, রাজধানীর স্বামীবাগ আশ্রম থেকে রথযাত্রা শুরু হয়ে জয়কালী মন্দির, ইত্তেফাক মোড়, শাপলা চত্বর, দৈনিক বাংলার মোড়, পল্টন মোড়, জাতীয় প্রেস ক্লাব, হাইকোর্ট, দোয়েল চত্বর, শহীদ মিনার ও পলাশীর মোড় হয়ে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে গিয়ে শেষ হবে। পরে ২৫ জুলাই বিকেলে একই পথে উল্টো রথের শোভাযাত্রা ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে স্বামীবাগ আশ্রমে ফিরে আসবে।
সরকার, প্রশাসন ও পুলিশের সঙ্গে রথযাত্রা উপলক্ষে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। পুলিশসহ বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবেন।
এ ছাড়া ৫০০ স্বেচ্ছাসেবক শৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকবেন।
ধামরাইয়ে সাজছে ঐতিহ্যবাহী রথ
ঢাকার ধামরাইয়ে শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রাকে সামনে রেখে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে। ধামরাই বাজারের রথখোলা এলাকা থেকে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত রথ টানার মধ্য দিয়ে উৎসব শুরু হবে। ২৪ জুলাই উল্টোরথ অনুষ্ঠিত হওয়ার মাধ্যমে শেষ হবে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা। রথযাত্রাকে ঘিরে ১৬ জুলাই থেকে এক মাসব্যাপী ঐতিহ্যবাহী মেলা বসবে।
প্রচলিত কাহিনী অনুযায়ী, প্রায় ৪০০ বছর আগে ধামরাইয়ের জমিদার শ্রী যশোপাল একদিন সৈন্য-সামন্ত নিয়ে যাওয়ার পথে একটি ঢিবির সামনে এসে তার হাতি থেমে যায়। পরে ঢিবি খনন করে একটি মন্দির ও কয়েকটি দেবমূর্তি পাওয়া যায়। সেগুলো বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পর রাতে স্বপ্নে মাধব দেবতার নির্দেশ পান তিনি। এরপর নিজের নামের সঙ্গে ‘মাধব’ যুক্ত করে যশোমাধব নাম গ্রহণ করেন এবং ওই সময় থেকেই যশোমাধবের পূজা ও রথযাত্রার সূচনা হয়। সেই ঐতিহ্য আজও চলে আসছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলা ১২০৪ থেকে ১৩৪৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সাটুরিয়ার বালিয়াটির জমিদাররা বংশানুক্রমে এখানে চারটি রথ নির্মাণ করেন। ১৩৪৪ খ্রিষ্টাব্দে নারায়ণগঞ্জের স্বর্গীয় সূর্যনারায়ণ সাহার তত্ত্বাবধানে এক বছর সময় নিয়ে একটি রথ নির্মিত হয়। ধামরাই, কালিয়াকৈর, সাটুরিয়া ও সিঙ্গাইরের কাঠশিল্পীরা যৌথভাবে ৬০ ফুট উচ্চতার ত্রিতলবিশিষ্ট রথটি নির্মাণ করেছিলেন। পরে বালিয়াটির জমিদাররা এলাকা ছেড়ে গেলে রথের দেখভালের দায়িত্ব নেয় টাঙ্গাইলের রণদাপ্রসাদ সাহার পরিবার।
২০১০ সালে পুরোনো রথের আদলে প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন রথ নির্মাণ করা হয়। প্রায় ৪০ জন শিল্পী ছয় মাসের বেশি সময় ধরে কাজ করে ৩৭ ফুট উচ্চতা ও ২০ ফুট প্রস্থের কারুকার্যমণ্ডিত রথটি তৈরি করেন। লোহার কাঠামোর ওপর সেগুন ও চাম্বল কাঠ বসিয়ে খোদাই করা এ রথে রয়েছে ১৫টি লোহার চাকা। সামনে রয়েছে কাঠের তৈরি দুটি ঘোড়া ও একজন সারথির অবয়ব। বিভিন্ন স্তরে স্থাপন করা হয়েছে কাঠের তৈরি দেব-দেবীর মূর্তি।
রথটির দেখভালের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা জানান, সারা বছর খোলা আকাশের নিচে থাকায় রথের রং কিছুটা মলিন হয়ে যায়। তাই প্রতি বছর রথযাত্রার আগে প্রয়োজনীয় সংস্কার, রং ও সাজসজ্জার কাজ করা হয়। এরপর এই রথেই অনুষ্ঠিত হয় ধামরাইয়ের ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রা।