অপহৃত কন্যাকে ফেরত আনতে গিয়ে নিভে গেল বাবার প্রাণ, সড়ক দুর্ঘটনায় আহত প্রশান্ত কুমার মন্ডলের মৃত্যু
নিজস্ব প্রতিবেদক
হিন্দুস নিউজ
প্রকাশিত:
১৫ মার্চ ২০২৬, ০৫:৫৫
8,902 জন পড়েছেন
খুলনার পাইকগাছা উপজেলার অপহৃত হিন্দু কিশোরী সুচনা রানী মন্ডলকে উদ্ধারের ঘটনায় যখন পরিবার ও এলাকাবাসীর মধ্যে স্বস্তির সঞ্চার হয়েছিল, ঠিক তখনই নেমে এলো আরেকটি হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডি। মেয়েকে ফিরিয়ে আনতে যাওয়ার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়া সুচনা মন্ডলের বাবা প্রশান্ত কুমার মন্ডল আর বাঁচলেন না। চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ দুপুর আনুমানিক ২টার দিকে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
পরিবারের ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে, গতকাল রাতেই প্রশান্ত কুমার মন্ডলের শারীরিক অবস্থার হঠাৎ অবনতি ঘটে। পরে দ্রুত তাকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ)-তে স্থানান্তর করা হয়। চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালালেও শেষ পর্যন্ত আজ দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এক ঘণ্টা আগেই তিনি এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন বলে স্বজনরা নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে, খুলনা জেলার পাইকগাছা থানার অপহরণ মামলায় গত ১১ মার্চ ২০২৬ দিবাগত রাতে ঢাকার আশুলিয়া থানাধীন জিরাবো এলাকার মুন্সি মার্কেট সংলগ্ন একটি বাড়ি থেকে অপহৃত কিশোরী সুচনা রানী মন্ডলকে উদ্ধার করে পুলিশ। একই অভিযানে মামলার প্রধান আসামি মান্না সরদারকেও গ্রেফতার করা হয়। খুলনা পুলিশ সুপার মো. মাহবুবুর রহমান, ডি-সার্কেল এসপি মো. আমির হামজা, পাইকগাছা থানা পুলিশ এবং আশুলিয়া থানা পুলিশের সহযোগিতায় এই উদ্ধার অভিযান পরিচালিত হয়।
সুচনা মন্ডলকে উদ্ধারের খবর পাওয়ার পর তার বাবা প্রশান্ত কুমার মন্ডল দুই ভাইকে সঙ্গে নিয়ে পাইকগাছা থানা পুলিশের সহায়তায় আশুলিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন, যাতে তিনি নিজের মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারেন। কিন্তু পথিমধ্যে ফেরিঘাট এলাকায় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তার এক ভাইকে সঙ্গে নিয়ে একটি ভাড়া করা মোটরসাইকেলে করে বাড়ির উদ্দেশ্যে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। অন্যদিকে তার আরেক ভাই পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে আশুলিয়ার পথে এগিয়ে যান।
কিন্তু বাড়ি ফেরার সেই পথই হয়ে ওঠে প্রাণঘাতী। দুপুরের দিকে ভাড়া করা মোটরসাইকেলটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। অভিযোগ রয়েছে, দুর্ঘটনার পর মোটরসাইকেল চালক গুরুতর আহত প্রশান্ত কুমার মন্ডল ও তার ভাইকে সড়কের পাশে মুমূর্ষ অবস্থায় ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয় লোকজন তাদের উদ্ধার করে দ্রুত যশোর হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করেন। সেখানে প্রশান্ত কুমার মন্ডলের অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় তাকে ঢাকায় রেফার করা হয়। পরবর্তীতে ঢাকার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার অবস্থার আরও অবনতি ঘটে এবং আইসিইউতে নেওয়ার পর আজ তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
একদিকে দীর্ঘ ১৮ দিন পর অপহৃত কন্যা সুচনা রানী মন্ডলকে ফিরে পাওয়ার স্বস্তি, অন্যদিকে মেয়েকে আনতে গিয়ে বাবার মৃত্যু—এই নির্মম পরিণতিতে শোকে স্তব্ধ পুরো পরিবার। যে বাবা বুকভরা আশায় মেয়েকে ঘরে ফিরিয়ে আনার জন্য রওনা দিয়েছিলেন, সেই বাবাই আর জীবিত অবস্থায় মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরতে পারলেন না—এই মর্মান্তিক বাস্তবতা এলাকায় গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রশান্ত কুমার মন্ডল ছিলেন একজন সংগ্রামী ও স্নেহশীল বাবা। মেয়ের নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে তিনি দুশ্চিন্তা, উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন। অবশেষে মেয়েকে ফিরে পাওয়ার সংবাদে যখন আশার আলো জ্বলেছিল, তখনই ঘটে যায় এই করুণ দুর্ঘটনা। ফলে সুচনা মন্ডলের পরিবারের ওপর নেমে এসেছে দ্বিগুণ শোক।
এদিকে, পরিবারের পক্ষ থেকে এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দুর্ঘটনার জন্য দায়ী মোটরসাইকেল চালককে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য প্রশাসন ও সমাজের বিবেকবান মানুষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।