বিতর্কিত ফটোশুটে নগ্নতার দাবি উড়িয়ে দিলেন পূজা ভাট
তিন দশক ধরে যে ছবিটিকে 'নগ্নতা'র তকমা দিয়ে বিতর্কিত করা হয়েছিল, অবশেষে সেই বডি পেইন্ট ফটোশুটের আসল সত্য ও ভেতরের রহস্য ফাঁস করলেন বলিউড অভিনেত্রী পূজা ভাট! তৎকালীন সমাজের রক্ষণশীলতা ও বর্তমানের মিথ্যাচারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কেন এই সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তিনি, জানতে পড়ুন বিস্তারিত।
নিজস্ব প্রতিবেদক
হিন্দুস নিউজ
প্রকাশিত:
০১ জুন ২০২৬, ০৬:২২
85 জন পড়েছেন
নব্বইয়ের দশকের বলিউডে যে কজন অভিনেত্রী নিজের স্বাধীনচেতা মনোভাব, স্পষ্টভাষী ব্যক্তিত্ব এবং সাহসী সিদ্ধান্তের জন্য সনাতনী সমাজ ও সাধারণ দর্শকদের মাঝে সদাবিলড়িত আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম পূজা ভাট। অভিনয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রগতিশীল ও ব্যতিক্রমী ভাবনার কারণে ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই তিনি বারবার খবরের শিরোনাম হয়েছেন। তবে সেই সময়ের সমস্ত আলোচনা-সমালোচনাকে ছাপিয়ে গিয়েছিল একটি ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদের জন্য করা তাঁর বডি পেইন্ট ফটোশুট, যা প্রকাশের পর তৎকালীন সমাজে তুমুল বিতর্কের ঝড় তোলে।
দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় পার করে অবশেষে সেই ঐতিহাসিক ও বহুল চর্চিত ফটোশুট নিয়ে মুখ খুলেছেন এই অভিনেত্রী। সম্প্রতি প্রবীণ সাংবাদিক ভিকি লালওয়ানিকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে পূজা ভাট স্পষ্ট করেছেন যে, সমাজকে চমকে দেওয়া বা কোনো সস্তা বিতর্ক তৈরি করা কখনোই তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না। বরং এটি ছিল সম্পূর্ণ একটি সৃজনশীল শৈল্পিক ভাবনার বহিঃপ্রকাশ, যা প্রথম দেখাতেই তাঁর মন ছুঁয়ে গিয়েছিল। তিনি জানান, সেই সময় সমাজের একদল মানুষের কাছ থেকে তিনি যেমন তীব্র সমালোচনা ও কটূক্তি পেয়েছিলেন, তেমনই প্রগতিশীল ও শিল্পমনা অন্য একটি বড় অংশের কাছ থেকে পেয়েছিলেন অকুণ্ঠ ভালোবাসা ও সমর্থন।
জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী পূজা ভাট তাঁর স্মৃতিচারণে জানান, এই ব্যতিক্রমী ফটোশুটের মূল অনুপ্রেরণা এসেছিল হলিউড তারকা ডেমি মুরের বিশ্বখ্যাত ‘ভ্যানিটি ফেয়ার’ ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ থেকে। তৎকালীন প্রখ্যাত সাংবাদিক দিনেশ রাহেজা এবং আলোকচিত্রী জিতু যখন তাঁকে ডেমি মুরের সেই নান্দনিক কভারটি দেখান, তখন এর শৈল্পিক রূপ দেখে তিনি মুগ্ধ হন। সনাতন সংস্কৃতির উদার শিল্পবোধের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এবং সহকর্মীদের ওপর গভীর আস্থা থাকায় তিনি কোনো দ্বিধা ছাড়াই এই পুনর্নির্মাণের প্রস্তাবে তাৎক্ষণিক সম্মতি দিয়েছিলেন। বিখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনার আনা সিংয়ের তত্ত্বাবধানে অত্যন্ত অল্প সময়ের প্রস্তুতিতে এই কাজ সম্পন্ন হয়েছিল। পূজা তখন ‘ফির তেরি কাহানি ইয়াদ আয়ি’ চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় গান ‘তেরে দর পার সনম’-এর শুটিংয়ে ব্যস্ত ছিলেন। রাতের শিফটে শুটিং শেষ করে ক্লান্ত শরীরে তিনি আলোকচিত্রী জগদিশ মালির স্টুডিওতে যান, যেখানে তাঁর শরীরে নিখুঁতভাবে বডি পেইন্ট করা হয় এবং গভীর রাতেই ফটোশুটটি শেষ হয়। কাজটি এতটাই পেশাদারত্বের সাথে করা হয়েছিল যে, শুট শেষ করার পর পূজা বিষয়টি প্রায় ভুলেই গিয়েছিলেন, কিন্তু ম্যাগাজিনটি বাজারে আসার পর চারদিকে এক অভূতপূর্ব আলোড়ন তৈরি হয়।
তবে সেই সময় এই বিতর্ক দীর্ঘস্থায়ী না হওয়ার পেছনে দেশের একটি বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক ট্র্যাজেডি ভূমিকা রেখেছিল বলে উল্লেখ করেন পূজা। ম্যাগাজিনটি প্রকাশের পরপরই শহরে একটি ভয়াবহ বোমা হামলার ঘটনা ঘটে, যার ফলে পুরো দেশের মানুষের মনোযোগ এবং মানবিক সমবেদনা সেই ট্র্যাজেডির দিকে চলে যায়। স্বাভাবিকভাবেই, একজন নারী নিজের শরীরে রঙ মেখে ছবি তুলেছেন কি না, তার চেয়ে দেশের মানুষের নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের বিষয়টি তখন প্রধান হয়ে উঠেছিল। এই সাক্ষাৎকারে পূজা ভাট তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় এবং দীর্ঘদিনের একটি ভুল ধারণার অবসান ঘটিয়েছেন, যা এতদিন সাধারণ দর্শক ও সংবাদমাধ্যম সত্য বলে বিশ্বাস করে আসছিল। অনেকেই ভাবতেন যে সেই বডি পেইন্ট ফটোশুটে তিনি সম্পূর্ণ নগ্ন ছিলেন, কিন্তু এই দাবিকে পুরোপুরি ভিত্তিহীন ও মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন অভিনেত্রী। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে জানান যে, হলিউড তারকা ডেমি মুর বডি পেইন্টের নিচে সম্পূর্ণ নগ্ন বা ‘বার্থডে স্যুট’-এ থাকলেও, তিনি নিজে শালীনতার সীমারেখা বজায় রেখেছিলেন।
নিজের সততা ও সাহসিকতার পুনরাবৃত্তি করে পূজা ভাট স্পষ্ট করে বলেন যে, ফটোশুটের সময় তিনি অন্তর্বাস পরিহিত ছিলেন। তিনি এবং তাঁর পুরো টিম খুব ভালো করেই জানতেন যে শিল্প ও নগ্নতার মধ্যকার সীমারেখাটি ঠিক কোথায় এবং তাঁরা সচেতনভাবেই সেই সীমা অতিক্রম করেননি। শুধুমাত্র সৃজনশীল আইডিয়াটি পছন্দ হওয়া এবং টিমের প্রতি অগাধ বিশ্বাস থাকার কারণেই তিনি এই সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, কোনো বিতর্ক বা আলোড়ন সৃষ্টি করার সস্তা মানসিকতা থেকে নয়। তিন দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও আজও তরুণ প্রজন্মের মাঝে এই ছবিটিকে একটি ‘কাল্ট ইমেজ’ বা আইকনিক সৃষ্টি হিসেবে আলোচনা করতে দেখে তিনি বিস্মিত হন। বর্তমান যুগের সামাজিক অবক্ষয় ও মিথ্যাচারের সংস্কৃতির প্রতি আক্ষেপ প্রকাশ করে পূজা ভাট তাঁর বক্তব্য শেষ করেন এই বলে যে, আজ আমরা এমন এক অদ্ভুত ও জটিল পৃথিবীতে বাস করছি, যেখানে চারিদিকের মিথ্যার চাদর এত বেশি ঘন হয়ে উঠেছে যে, যেকোনো সরল ও সাহসিক সত্যকে প্রকাশ করাই আজ সবচেয়ে বড় বিতর্কিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।