বাংলাদেশের রক্তাক্ত ইতিহাসে এই ধরনের সুপরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও উচ্ছেদ অভিযান এটিই প্রথম নয়, বরং বিগত দিনে রামু (২০১২), নাসিরনগর (২০১৬), ঠাকুরপাড়া (২০১৭), ভোলা (২০১৯) এবং কুমিল্লায় (২০২১) ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনার নেপথ্যে একই চেনা চিত্রনাট্যের পুনরাবৃত্তি দেখা গেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত একটি পোস্ট, মিথ্যা অভিযোগ কিংবা সুপরিকল্পিত গুজবকে কেন্দ্র করে উগ্রবাদীরা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং উপাসনালয়কে টার্গেট করে অগ্নিসংযোগ ও হামলা চালিয়েছে, যার অনেকগুলোর তদন্তে পরবর্তীতে মূল অভিযোগেরই কোনো সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়নি।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সংগৃহীত ভয়াবহ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক দশকে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সনাতনী সম্প্রদায়ের ওপর শত শত সুপরিকল্পিত হামলা, ভাঙচুর ও জোরপূর্বক ভূমি দখলের ঘটনা ঘটেছে এবং প্রতিবারই রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক ও সুশীল সমাজ একে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলে এড়িয়ে যাওয়ার সস্তা চেষ্টা করেছেন। কিন্তু যখন একই নৃশংসতার পুনরাবৃত্তি বছরের পর বছর ধরে নিয়মিত বিরতিতে ঘটে, তখন তা আর কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা থাকে না; বরং তা সনাতনীদের এই দেশ থেকে নিশ্চিহ্ন করার একটি সুনির্দিষ্ট ও উদ্বেগজনক সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রবণতায় পরিণত হয়। (News copied from- 'HINDUS NEWS') কথিত ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের ধোঁয়াশা তুলে একদল উগ্রবাদী ও ধর্মান্ধ গোষ্ঠী সর্বদা দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির অপচেষ্টা চালায়, যা কোনো সভ্য সমাজে অপরাধের আওতায় পড়তে পারে না; আর যদি তর্কের খাতিরে একে অপরাধ ধরাও হয়, তবে তার জন্য দেশের স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ও আদালত রয়েছে। কিন্তু আইনের তোয়াক্কা না করে একদল উগ্র ধর্মান্ধ লাঠিয়াল বাহিনী যেভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে সনাতনীদের ঘরবাড়ি ও মন্দিরে হামলা চালায়, তাতে মনে হয় যেন সমস্ত নীতি-নৈতিকতা বিলুপ্ত হয়েছে, অন্যথায় আইন অমান্যের এই ধারায় সমস্ত উগ্র মোল্লাদের ঘরবাড়িতেও হামলা হওয়া উচিত ছিল। মনে রাখতে হবে, একটি পবিত্র মন্দির ভাঙা মানে শুধু কয়েকটি ইটের স্থাপনা ধ্বংস করা নয়, বরং একটি প্রাচীন শান্তিকামী জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক নিরাপত্তাবোধ ও আস্থাকে গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং একটি হিন্দু পরিবারে হামলা চালানো মানে শুধু দৃশ্যমান আর্থিক ক্ষতি নয়, তা একটি পরিবারের আজীবনের স্বপ্ন, স্মৃতি এবং ভবিষ্যৎ অস্তিত্বের ওপর কুঠারাঘাত।
বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানে দেশের সকল নাগরিককে সমান অধিকার, সমতা ও নির্বিঘ্নে ধর্ম পালনের পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেই বাংলাদেশে যদি একজন নাগরিককে শুধুমাত্র তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নিজ মাতৃভূমিতে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও জীবননাশের আতঙ্কে দিন কাটাতে হয়, তবে তা শুধু সনাতনীদের সংকট নয়—তা সামগ্রিকভাবে পুরো রাষ্ট্রের চরম ব্যর্থতা ও আইনি কাঠামোর দেউলিয়াত্ব প্রমাণ করে, যা স্পষ্ট করে দেয় যে বর্তমান ব্যবস্থায় গণতন্ত্রের এক গভীর ও ভয়াবহ সংকট বিদ্যমান। তাহিরপুরের ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে যেহেতু দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, ঠিক একইভাবে যারা প্রকাশ্য দিবালোকে আইন হাতে তুলে নিয়ে মন্দির ও ঘরবাড়িতে নারকীয় হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছে, তাদেরও অনতিবিলম্বে চিহ্নিত করে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে, কারণ বিচার প্রক্রিয়া যদি সর্বদা একপাক্ষিক ও পক্ষপাতদুষ্ট হয়, তবে দেশে কখনো প্রকৃত আইনের शासन ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। আজ সমগ্র সনাতনী সমাজের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রের কাছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—আমরা কি প্রকৃত আইনের শাসনের বাংলাদেশ চাই, নাকি স্রেফ গুজব ও উস্কানির ভিত্তিতে উগ্র জনতার বর্বর আদালতের বাংলাদেশ চাই? ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে রক্ত দিয়ে অর্জিত এই দেশ মুসলমানের যেমন, ঠিক তেমনি হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানসহ প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকারের চারণভূমি; তাই কোনো নাগরিককে নিজ দেশে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার জন্য ভয় ও আতঙ্ককে সঙ্গী করতে হবে—এটি স্বাধীনতার মূল চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। যে মৌলবাদী ও জেনোসাইডাল মানসিকতার গোষ্ঠী এদেশ থেকে সনাতনীদের চিরতরে নিশ্চিহ্ন করার মহাপরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে রাষ্ট্রকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং ধর্মীয় অনুভূতির নামে যারা উগ্র জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে, তাদের বিরুদ্ধে এখনই চূড়ান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা সময়ের দাবি, কারণ এই ধরনের আত্মঘাতী ধর্মীয় উন্মাদনাকে কোনো প্রগতিশীল সমাজ মেনে নিতে পারে না।
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে এক নির্মম ও বুক ফাটানো সত্য উন্মোচিত হয় যে, স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে বাংলাদেশে সনাতনীদের জনসংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার ২৯ শতাংশ, অথচ নব্বইয়ের দশকে পদ্ধতিগত নিপীড়নে তা এসে দাঁড়ায় ২১ শতাংশে, আর বর্তমান সময়ে তা আশঙ্কাজনকভাবে নেমে এসেছে মাত্র ৭ শতাংশে, যা আমাদের রাষ্ট্র ও কথিত গণতন্ত্রের প্রকৃত কঙ্কালসার অবস্থাকেই ফুটিয়ে তোলে যেখানে একটি প্রাচীন জনগোষ্ঠী প্রতিদিনের নির্যাতন ও বৈষম্যের শিকার হয়ে দলে দলে দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে, অথচ সংসদের ভেতরে ও বাইরে একদল মেকি রাজনীতিক জোর গলায় গণতন্ত্রের ফাঁকা বুলি আওড়াচ্ছেন। সনাতনীদের বাদ দিয়ে যে সংখ্যাগুরুবাদী ব্যবস্থা কায়েম করা হচ্ছে, সেই তথাকথিত গণতন্ত্র কি কেবলই একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের গণতন্ত্র—এমন প্রশ্ন এখন অবধারিত হয়ে উঠেছে। সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের এই বর্বরতার আগে গত বছরও ঠিক একইভাবে দোয়ারাবাজার উপজেলায় কথিত গুজবের নাটক সাজিয়ে পুরো সনাতনী গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু আজ পর্যন্ত তার কোনো দৃষ্টান্তমূলক রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি।
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, এই দেশেরই কিছু সুশীল ও লম্পট শ্রেণী যখন সীমানার ওপারে অন্য দেশের মানুষের অধিকার নিয়ে গলা ফাটিয়ে রাজপথ গরম করে, তখন নিজ দেশের সংখ্যালঘু সনাতনীদের ওপর চলা পৈশাচিক নির্যাতন নিয়ে তারা রহস্যজনকভাবে নিশ্চুপ থাকে; এমনকি শহিদুল আলম কিংবা রেহনুমার মতো নামধারী মানবাধিকারের কথিত পিতামাতারাও নিজ দেশের সনাতনীদের রক্ত ও কান্না দেখেও অন্ধ সেজে থাকেন, কারণ তাদের সমস্ত মানবাধিকার ও সিলেক্টিভ সহানুভূতি কেবল সুনির্দিষ্ট কিছু চরমপন্থী, জামাত ও রাজাকারদের এজেন্ডা রক্ষার জন্যই সংরক্ষিত, যা দেশের প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতার মুখে এক মস্ত বড় চড়।