প্রিন্ট এর তারিখ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১২ মার্চ ২০২৬
স্বপ্নাদেশ থেকে জমিদারি সংস্কার: সংগ্রামপুর কালীবাড়ির ছয়শ বছরের অমীমাংসিত রহস্য
||
উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাটে ইছামতী নদীর তীরে অবস্থিত সংগ্রামপুর কালীবাড়ি আজ কেবল একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বরং ছয়শ বছরের প্রাচীন ইতিহাস, স্থাপত্যশৈলী এবং অগাধ বিশ্বাসের এক অনন্য মিলনস্থলে পরিণত হয়েছে। লোকপ্রথা ও জনশ্রুতি অনুযায়ী, এই মন্দিরের অধিষ্ঠাত্রী দেবী দক্ষিণাকালী অত্যন্ত জাগ্রত এবং তাঁর মাহাত্ম্য ভক্তমহলে দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী মায়ের সমতুল্য হিসেবে বিবেচিত। এই মন্দিরের উৎপত্তির সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজা প্রতাপাদিত্য ও রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের মতো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের নাম। কথিত আছে, রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় নৌবিহারের সময় স্বপ্নাদেশ পেয়ে জঙ্গলঘেরা এক ভগ্নপ্রায় মন্দিরে দেবীর অস্তিত্ব খুঁজে পান এবং পরবর্তীতে গ্রামবাসীর সহযোগিতায় মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ করেন। তবে অনেক ঐতিহাসিকের মতে, এই মন্দিরের আদি ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন রাজা প্রতাপাদিত্য। এমনকি ‘সংগ্রামপুর’ নামটির পেছনেও মুঘল সম্রাট আকবরের বাহিনীর সঙ্গে প্রতাপাদিত্যের লড়াইয়ের ইতিহাসের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।মন্দিরের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে নানা রোমাঞ্চকর ও অলৌকিক কাহিনী। এক সময় মন্দিরটি অযত্নের শিকার হলেও পরবর্তীতে এক মুসলিম ডাকাত সর্দার মায়ের পুজোর দায়িত্ব নিয়েছিলেন বলে শোনা যায়। পরবর্তীকালে টাকির জমিদার সূর্যকান্ত রায়ের উদ্যোগে মন্দিরটির ব্যাপক সংস্কার সাধন করা হয়। মন্দিরের গর্ভগৃহে থাকা মাতৃমূর্তিটি ঠিক কী উপাদান দিয়ে তৈরি, তা আজও এক রহস্য। মন্দির সংলগ্ন জনৈক ব্যক্তির নিয়ে আসা একটি অলৌকিক ঘটকে কেন্দ্র করেই এই উপাসনার সূচনা বলে অনেকে বিশ্বাস করেন। লোকবিশ্বাস এতটাই প্রবল যে, মন্দির প্রাঙ্গণের এক মাইলের মধ্যে অন্য কোনো কালীপুজো করার নিয়ম নেই। জনশ্রুতি আছে, অতীতের এক ব্যবসায়ী এই প্রথা অমান্য করে সর্বস্বান্ত হয়েছিলেন। আজও এখানে প্রাচীন রীতি মেনে চিংড়ি মাছ, কচু শাক ও পাঁঠা বলির মাধ্যমে দেবীর আরাধনা করা হয়। প্রায় ছয় শতাব্দী ধরে চলে আসা এই বলি প্রথা গ্রামবাসীর অমঙ্গল আশঙ্কায় আজও অম্লান।
সংগ্রামপুরের এই মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানসিংহ ও প্রতাপাদিত্যের যুদ্ধের স্মৃতিও। লোকমতে, মানসিংহের আক্রমণ থেকে বাঁচতে প্রতাপাদিত্যের বাহিনী যে পথ দিয়ে পলায়ন করেছিল, তা আজও ‘মানসিংহ রোড’ নামে পরিচিত। ঐতিহ্যের এই ধারাকে বহন করে চলেছেন নির্দিষ্ট বংশের পুরোহিতরা। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সময় থেকে আজ অবধি চক্রবর্তী পরিবারের বংশধররাই পালাক্রমে মায়ের সেবা করে আসছেন। বর্তমানে মানিক চক্রবর্তী, সদানন্দ চক্রবর্তী ও শিবু চক্রবর্তীসহ আটজন শরিক সদস্য নিষ্ঠার সঙ্গে দেবীর নিত্যপূজা ও ভোগ নিবেদন করেন। প্রতিদিন ভোরে ধূপ-ধুনোর গন্ধে এবং ভক্তদের ‘জয় মা কালী’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে এই প্রাঙ্গণ। আধ্যাত্মিকতা ও ইতিহাসের এমন মেলবন্ধন সংগ্রামপুর কালীবাড়িকে বাংলার এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ তীর্থক্ষেত্রে পরিণত করেছে।
প্রকাশক & সম্পাদক: শুভ চন্দ্র দে,🔴HINDUS NEWS মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক ঢাকা থেকে প্রকাশিত।🔴যোগাযোগ: +88 01890890920🔴 ই-মেইল: news@hindus.news 🔴 বিজ্ঞাপন: ads@hindus.news