প্রিন্ট এর তারিখ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৬ মার্চ ২০২৬
নৈহাটির রহস্যময়ী ‘বড়মা’: অঘোর রূপের আড়ালে পরম করুণাময়ী দেবী
||
নৈহাটির জনমানসে ‘বড়মা’ নামটি কেবল কোনো দেবীর নাম নয়, বরং এক অলৌকিক গাম্ভীর্য ও মহাশক্তির প্রতিচ্ছবি। গঙ্গার দক্ষিণ তীরের প্রাচীন শ্মশানপ্রান্তর থেকে উদ্ভূত এই দেবীমূর্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বহু শতাব্দী প্রাচীন তন্ত্রসাধনার ঐতিহ্য। স্থানীয় জনশ্রুতি ও পৌরাণিক প্রেক্ষাপটে বড়মা যেন একই সঙ্গে ভয়ঙ্করী এবং মমতাময়ী এক রক্ষাকারিণী শক্তি। ‘বামকল্পতন্ত্র’ ও ‘রুদ্রযামল’-এর মতো প্রাচীন গ্রন্থে উল্লিখিত ‘অঘোরমা’ বা মহাকালীর এক বিশেষ রূপ হিসেবেই ভক্তরা তাঁকে পূজা করেন। গাঢ় নীলাভ কালো বর্ণ, উন্মুক্ত কেশ এবং অগ্নিশিখার মতো দৃষ্টির এই দেবীর আরাধনা সাধারণ কালীপূজা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে মূর্তি নয়, বরং শিলা বা পাথর রূপেই দেবীর পূজা হয়।বড়মার আবির্ভাবের ইতিহাস জড়িয়ে আছে উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের এক ভক্তিপরায়ণ গৃহস্থ পরিবারের সঙ্গে। শোনা যায়, স্বপ্নদেশের নির্দেশ অনুযায়ী মাটি খুঁড়ে পাওয়া গিয়েছিল দেবীর অর্ধভাস্বর মুখচ্ছবি। এরপর থেকেই এই অঞ্চলে বড়মার পূজার সূত্রপাত। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, বড়মার উপাসনায় আলোর কোনো প্রয়োজন নেই, কারণ দেবী নিজেই জ্যোতির্ময়ী। পূজার গভীর রাতে অদ্ভুত সুগন্ধ ও পরিবেশের পরিবর্তন ভক্তদের মনে এক অলৌকিক ভীতির সঞ্চার করলেও, তাঁর আশীর্বাদই নাকি অসংখ্য মানুষকে রোগ, শোক ও দুর্ভাগ্য থেকে রক্ষা করে এসেছে। মন্দিরের নিত্য উপাসনায় ব্যবহৃত গোপন মন্ত্র ও তান্ত্রিক রীতিগুলো এই দেবীর মাহাত্ম্যকে আরও গভীর করে তুলেছে।
পৌরাণিক ব্যাখ্যায় বড়মাকে ‘চামুণ্ডা’ ও ‘ভদ্রকালী’-র সাথে তুলনা করা হয়। কথিত আছে, বড়মা কেবল অশুভ শক্তির বিনাশকই নন, বরং মৃত প্রেতাত্মাদের শান্তিকারীও বটে। নৈহাটির তন্ত্রসাধকদের মতে, বড়মার চরণে ভয় নত হয়; কারণ তিনি সাধকের অহং ধ্বংস করে চেতনার নতুন দিগন্ত খুলে দেন। তাঁর উপাসনায় রক্তচন্দনের বদলে বিল্বপত্র, হরিদ্রা এবং লাল-নীল পদ্ম ব্যবহার করা হয়, যা তাঁর পূজার পবিত্রতা ও তান্ত্রিক গূঢ়তাকে নির্দেশ করে। এছাড়া বড়মার মন্দিরের আঙিনায় অলৌকিকভাবে আবির্ভূত শিবলিঙ্গটি শিব ও শক্তির মিলনতত্ত্বের এক অনন্য নিদর্শন বহন করছে।নৈহাটির এই দেবী কেবল ভৌগোলিক সীমায় সীমাবদ্ধ নন, তিনি বঙ্গভূমির তন্ত্রসাধনার এক জীবন্ত প্রতীক। বন্যা থেকে রক্ষা পাওয়া কিংবা অসম্ভব রোগ নিরাময়ের মতো অসংখ্য অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী স্থানীয় মানুষজন আজও বড়মার মধ্যে শ্মশানের শীতলতা ও পরম আশ্রয়ের উষ্ণতা খুঁজে পান। দীপান্বিতা অমাবস্যার রাতে যখন হাজার হাজার ভক্ত মায়ের দর্শনে সমবেত হন, তখন বোঝা যায়—ভয়ঙ্করী রূপের আড়ালে বড়মা আসলে এক করুণাময়ী মা। তিনি শিখিয়ে যান, মৃত্যুকে জয় করা মানেই অমৃতের সন্ধান পাওয়া। নৈহাটির বড়মা তাই ইতিহাস ও জনশ্রুতির মেলবন্ধনে এক আধ্যাত্মিক পরম সত্য হিসেবে আজও বিরাজমান।
প্রকাশক & সম্পাদক: শুভ চন্দ্র দে,🔴HINDUS NEWS মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক ঢাকা থেকে প্রকাশিত।🔴যোগাযোগ: +88 01890890920🔴 ই-মেইল: news@hindus.news 🔴 বিজ্ঞাপন: ads@hindus.news