প্রিন্ট এর তারিখ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৭ এপ্রিল ২০২৬
হরিজন সম্প্রদায়ের প্রতি উদাসীনতা কেন? ভ্রাতৃত্বের দোহাইয়ের আড়ালে বিভাজনের নির্মম বাস্তবতা
||
বাংলাদেশের শহর-নগরীর প্রতিটি ভোর শুরু হয় একদল নিরলস মানুষের শ্রমে। যখন অধিকাংশ মানুষ ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন নগরীর রাজপথ, অলিগলি, ডাস্টবিন, নর্দমা ও আবর্জনার স্তূপ পরিষ্কার করতে ব্যস্ত থাকেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। সমাজ তাদের ‘হরিজন’—অর্থাৎ ‘ঈশ্বরের সন্তান’ বলে অভিহিত করলেও বাস্তবতা হলো, এই নামের আড়ালে লুকিয়ে আছে বহু শতকের বঞ্চনা, অপমান, সামাজিক অবজ্ঞা এবং অদৃশ্য এক বিভাজনের প্রাচীর। মুখে ভ্রাতৃত্বের জয়গান থাকলেও, সামাজিক বাস্তবতায় আজও তাদের জন্য অদৃশ্যভাবে টাঙানো থাকে ‘নিষিদ্ধ’–এর বোর্ড।দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সুইপার কলোনি, পরিচ্ছন্নতাকর্মী পল্লী এবং বংশানুক্রমিক পেশায় নিযুক্ত পরিবারগুলোর জীবনযাত্রা পর্যবেক্ষণ করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, এই জনগোষ্ঠী এখনো মূলধারার সামাজিক মর্যাদা থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি থাকলেও, সামাজিক আচরণে তারা প্রায়ই ‘অন্য’ হিসেবে চিহ্নিত। আধুনিক নগর সভ্যতার আবর্জনা সরিয়ে যে মানুষগুলো শহরকে বাসযোগ্য রাখে, সেই মানুষগুলোরই বসবাস অনেক ক্ষেত্রে অস্বাস্থ্যকর, ঘিঞ্জি ও অবহেলিত পরিবেশে। বহু সুইপার কলোনিতে এখনও নেই পর্যাপ্ত স্যানিটেশন, নিরাপদ পানীয় জল, স্বাস্থ্যসেবা, উন্নত বাসস্থান কিংবা মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ।সামাজিক বৈষম্যের সবচেয়ে নির্মম প্রতিফলন দেখা যায় শিশুদের জীবনে। একটি হরিজন শিশু যখন স্কুলে যায়, তখন তার পরিচয় হওয়া উচিত তার মেধা, স্বপ্ন ও সম্ভাবনা। কিন্তু বাস্তবতা বহু ক্ষেত্রে ভিন্ন। সহপাঠীদের অবজ্ঞা, টিফিন ভাগ করে না নেওয়া, একসঙ্গে বসতে অনীহা, এমনকি শিক্ষকদের নীরব উদাসীনতা—সব মিলিয়ে শিশুটিকে খুব অল্প বয়সেই বুঝিয়ে দেওয়া হয়, সমাজ তার প্রতিভার চেয়ে তার জন্মপরিচয়কে বড় করে দেখে। জন্মের সঙ্গে কোনো অপরাধ জড়িয়ে না থাকলেও, বংশগত পেশা ও সামাজিক পরিচয়ের দায় তাকে বহন করতে হয় ছোটবেলা থেকেই। এর ফলে অনেক শিশুই শিক্ষাজীবনে আত্মবিশ্বাস হারায়, মূলধারার সঙ্গে মিশতে সংকোচবোধ করে এবং ক্রমে সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যে বড় হয়ে ওঠে।হরিজন সম্প্রদায়ের প্রতি বৈষম্য কেবল শিক্ষাঙ্গনেই সীমাবদ্ধ নয়; সামাজিক মেলামেশা, ভোজসভা, উৎসব, পারিবারিক আমন্ত্রণ এবং দৈনন্দিন মানবিক সম্পর্কেও এর গভীর প্রভাব রয়েছে। বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, সমাজ পরিচ্ছন্ন শহর চায়, কিন্তু সেই পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা মানুষের সঙ্গে এক পাত্রে জল ভাগ করে নিতে, একসঙ্গে বসে খেতে বা ঘনিষ্ঠ সামাজিক সম্পর্ক গড়তে দ্বিধা করে। এই ‘একসাথে বসে না খাওয়া’ সংস্কৃতি নিছক সামাজিক রীতি নয়; এটি এক ধরনের মানসিক দূরত্ব, যা প্রতিনিয়ত হরিজন সম্প্রদায়কে মনে করিয়ে দেয়—তারা প্রয়োজনীয়, কিন্তু গ্রহণযোগ্য নয়; তারা নাগরিক, কিন্তু সমমর্যাদার মানুষ হিসেবে স্বীকৃত নয়।সবচেয়ে স্পষ্ট ও কঠিন দেয়ালটি দৃশ্যমান হয় বৈবাহিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে। সমাজের বহু মানুষ হয়তো কর্মক্ষেত্রে, হাসপাতালে, রক্তদানে বা জরুরি প্রয়োজনে হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষের সহায়তা গ্রহণ করতে দ্বিধা করেন না; কিন্তু আত্মীয়তার বন্ধন, বিবাহ বা পারিবারিক সম্পর্কের প্রসঙ্গ এলে তথাকথিত ‘কুলীনতা’ ও ‘আভিজাত্য’ সামনে চলে আসে। একজন শিক্ষিত, চরিত্রবান, কর্মঠ ও মেধাবী হরিজন তরুণ বা তরুণীর যোগ্যতা অনেক সময়ই জন্মগত পরিচয়ের কাছে ম্লান হয়ে যায়। এই দ্বিচারিতা সমাজের মানবিক ও নৈতিক সংকটকে আরও প্রকট করে তোলে। জীবনের প্রয়োজনে গ্রহণ, কিন্তু জীবনের বন্ধনে বর্জন—এই মানসিকতা সামাজিক প্রগতির পথে বড় বাধা।সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরে একটি জনগোষ্ঠীকে বংশগত পেশায় আটকে রাখা এবং তাদের বিকল্প সামাজিক পরিচয় গড়ে ওঠার সুযোগ সীমিত করে দেওয়ার ফলে এক ধরনের কাঠামোগত বৈষম্য তৈরি হয়। বাংলাদেশের বহু পরিচ্ছন্নতাকর্মী পরিবার এখনও অভিযোগ করেন, সরকারি বা স্থানীয় পর্যায়ে নির্দিষ্ট চাকরির সুযোগ, সংরক্ষিত সুবিধা কিংবা বিশেষ নিয়োগব্যবস্থা অনেক সময় প্রভাবশালী মহলের দখলে চলে যায়। ফলে যে সুবিধা প্রকৃত বঞ্চিতদের কাছে পৌঁছানোর কথা, তা নানা উপায়ে অন্যদের হাতে চলে যাচ্ছে। এতে হতাশা, ক্ষোভ ও অবিশ্বাস আরও বাড়ছে।এদিকে, ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের সঙ্গে বাস্তব সামাজিক আচরণের এই বৈপরীত্য আরও গভীর প্রশ্নের জন্ম দেয়। সনাতন ধর্মের মূল দর্শনেই রয়েছে সাম্য, একাত্মবাদ ও সর্বজীবের মধ্যে ঈশ্বরচেতনার উপলব্ধি। ঋগ্বেদের বাণী “অজ্যেষ্ঠাসো অকনিষ্ঠাসো এতে সং ভ্রাতরো” মানবসমাজে বড়-ছোটের বিভাজনকে প্রত্যাখ্যান করে। উপনিষদের “অমৃতস্য পুত্রাঃ” ঘোষণা সকল মানুষকে সমান আত্মিক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করে। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণও জ্ঞানীর দৃষ্টিতে ব্রাহ্মণ, গরু, কুকুর কিংবা চণ্ডালের মধ্যে সমদৃষ্টি শেখান। মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য সমাজের বঞ্চিত মানুষদের বুকে টেনে নিয়েছিলেন ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে। কিন্তু বাস্তব সমাজে সেই আধ্যাত্মিক সাম্য আজ বহু ক্ষেত্রেই কেবল শাস্ত্র, মন্ত্র ও বক্তৃতার পাতায় সীমাবদ্ধ। ধর্মের অন্তর্নিহিত সাম্যের বাণীকে উপেক্ষা করে, সামাজিক জীবনযাত্রায় জন্মভিত্তিক বিভাজন টিকিয়ে রাখার প্রবণতা আজও সমাজকে বিব্রত করছে।ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এই অমানবিকতার বিরুদ্ধে বহু মনীষী ও সমাজসংস্কারক সংগ্রাম করেছেন। মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী এবং আর্য সমাজ জন্মগত জাতিভেদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে ঘোষণা করেছিলেন—মানুষের মর্যাদা তার গুণ ও কর্মে, জন্মে নয়। বঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে বৈদিক শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করা, ধর্মীয় অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং সামাজিক মর্যাদার দাবিতে তাদের পাশে দাঁড়ানো ছিল তাদের আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ দিক। বীর বিনায়ক দামোদর সাভারকার রত্নগিরিতে ‘পতিত পাবন মন্দির’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেখিয়েছিলেন, ঈশ্বরের দরজায় কোনো মানুষ অচ্ছুৎ হতে পারে না। তিনি সহভোজনের আয়োজন করে তথাকথিত উচ্চবর্ণ ও বঞ্চিত শ্রেণির মধ্যে সামাজিক দূরত্ব ভাঙার প্রয়াস চালান। একইভাবে স্বামী শ্রদ্ধানন্দ, জ্যোতিরাও ফুলে, সাবিত্রীবাঈ ফুলে প্রমুখ ব্যক্তিত্ব শিক্ষা, সামাজিক সংস্কার ও মানবমর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিজেদের উৎসর্গ করেছিলেন। তাদের কর্ম আজও সমাজের সামনে এক জোরালো বার্তা রেখে যায়—একটি জাতির উন্নয়ন অসম্ভব, যদি তার এক বৃহৎ অংশকে অন্ধকারে ফেলে রাখা হয়।সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, এই দীর্ঘস্থায়ী অবজ্ঞা কেবল একটি সম্প্রদায়কে আঘাত করে না; এটি গোটা সমাজের ঐক্য, সংহতি ও আত্মিক শক্তিকে দুর্বল করে দেয়। যখন একটি জনগোষ্ঠী বারবার লাঞ্ছিত, বঞ্চিত ও অপমানিত হয়, তখন তাদের মধ্যে মূলধারার সমাজের প্রতি অবিশ্বাস জন্ম নেয়। এই শূন্যতাকে অনেক সময় বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী, প্রভাবশালী মহল কিংবা ধর্মান্তরকারী চক্র ব্যবহার করতে পারে। যখন নিজের সমাজে তারা সমমর্যাদা পায় না, তখন বাইরের ‘সমতা’ ও ‘স্বীকৃতি’র আহ্বান তাদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। ফলে বিষয়টি শুধু সামাজিক বৈষম্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি ধীরে ধীরে সাংস্কৃতিক ও সম্প্রদায়গত নিরাপত্তার প্রশ্নেও রূপ নেয়।বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, হরিজন সম্প্রদায়ের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় কেবল আবেগঘন বক্তৃতা নয়, প্রয়োজন বাস্তব পদক্ষেপ। প্রথমত, তাদের বসবাসের পরিবেশ উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও আবাসন নিশ্চিত করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, শিশুদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, বৃত্তি, স্কুলে বৈষম্যবিরোধী নীতিমালা এবং সামাজিক সচেতনতা কার্যক্রম প্রয়োজন। তৃতীয়ত, সরকারি ও স্থানীয় পর্যায়ে যে সুবিধা ও চাকরির সুযোগ প্রকৃতপক্ষে এই সম্প্রদায়ের জন্য বরাদ্দ, তা যাতে প্রভাবশালীদের হাতে না যায়, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি জরুরি। চতুর্থত, মন্দির, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সামাজিক অনুষ্ঠান, ভোজসভা এবং পারিবারিক আয়োজনে সমমর্যাদাভিত্তিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সবচেয়ে বড় কথা, পরিবার থেকেই শিশুদের শেখাতে হবে—মানুষের পরিচয় তার পেশা বা জন্ম নয়, তার চরিত্র, কর্ম ও মানবিকতায়।সমাজের একাংশের প্রতি অবজ্ঞা আসলে গোটা সমাজের মানবিক পরাজয়। যে মানুষটি শহর পরিষ্কার রাখে, যে শ্রমিক প্রতিদিন নোংরা ও দুর্গন্ধের মধ্যে দাঁড়িয়ে অন্যদের সুস্থ জীবনযাত্রা নিশ্চিত করে, তার প্রতি ঘৃণা বা দূরত্ব আসলে আমাদের নিজেদের নৈতিক দারিদ্র্যকে প্রকাশ করে। ভ্রাতৃত্ব যদি সত্যিই আমাদের বিশ্বাস হয়, তবে তা কেবল ধর্মসভা, উৎসবের মঞ্চ বা বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; তা প্রতিফলিত হতে হবে আমাদের ড্রয়িংরুমে, ভোজসভায়, বিদ্যালয়ে, সামাজিক সম্পর্কে এবং অন্তরের গভীরে।হরিজন সম্প্রদায়ের প্রতি উদাসীনতা ও অস্পৃশ্যতার মানসিকতা যতদিন না ভাঙবে, ততদিন ভ্রাতৃত্বের দাবি পূর্ণতা পাবে না। সমাজের প্রতিটি মানুষকে সমমর্যাদায় গ্রহণ করা, তাদের সঙ্গে বসে খাওয়া, তাদের সন্তানদের পাশে দাঁড়ানো, তাদের শ্রমকে কেবল প্রয়োজন নয়—সম্মানের চোখে দেখা—এসবের মধ্য দিয়েই সত্যিকারের সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব। ভ্রাতৃত্বের বুলি তখনই অর্থবহ হবে, যেদিন ‘হরিজন’ শব্দটি করুণা বা দূরত্বের প্রতীক না হয়ে সত্যিকার অর্থে ‘ঈশ্বরের সন্তান’ হিসেবে মর্যাদার স্বীকৃতি পাবে।“ধর্ম মানে সাম্যবাদ, মুছে যাক অস্পৃশ্যতার এই বিষাদ।”
প্রকাশক & সম্পাদক: শুভ চন্দ্র দে,🔴HINDUS NEWS মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক ঢাকা থেকে প্রকাশিত।🔴যোগাযোগ: +88 01890890920🔴 ই-মেইল: news@hindus.news 🔴 বিজ্ঞাপন: ads@hindus.news