প্রিন্ট এর তারিখ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ৩১ মে ২০২৬
শুভেন্দু সরকারের ‘ডিপোর্ট’ নীতি ও ঢাকার অস্বস্তি: সম্পর্কের নতুন অগ্নিপরীক্ষা
||
ভারত থেকে কথিত ‘অবৈধ অভিবাসী’ বা ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ আখ্যা দিয়ে বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার একতরফা প্রবণতা সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এক উদ্বেগজনক ও আশঙ্কাজনক রূপ ধারণ করেছে। প্রায় প্রতিদিনই বাংলাদেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে তথাকথিত ‘পুশ-ইন’-এর ঘটনা ঘটছে, যা শুধু সীমান্ত ব্যবস্থাপনা বা অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের মৌলিক নাগরিক পরিচয়, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার এবং দুই প্রতিবেশী দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের গভীর সংকট। বিশেষ করে ২০২৬ সালের ৯ মে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি নেতা ও মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। কথিত বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্ত করে বিতাড়িত করার রাজনৈতিক ঘোষণার পর সীমান্তজুড়ে তীব্র আতঙ্ক ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক চরম বাস্তবতার সৃষ্টি হয়েছে।ভারতের আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, দিল্লি, কর্ণাটক ও মহারাষ্ট্রের মতো রাজ্যগুলোতে গত কয়েক বছর ধরে চলা তথাকথিত ‘বাংলাদেশি শনাক্তকরণ’ অভিযানের নামে মূলত দরিদ্র, প্রান্তিক ও বাংলা ভাষাভাষী শ্রমজীবী মানুষদের বলির পাঁঠা বানানো হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, কেবল ভাষা, ধর্ম বা সামাজিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষকে নাগরিকত্বের অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করানো হচ্ছে। বন্যা বা নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে যেসব প্রান্তিক পরিবারের পুরোনো নথিপত্র হারিয়ে গেছে, তারা আজ নিজেদের জন্মভূমির নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারছে না। আসামের বিতর্কিত এনআরসি প্রক্রিয়ার পর এখন পশ্চিমবঙ্গের নতুন প্রশাসনের ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ নীতি এবং বিতর্কিত এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটার তালিকা পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ সীমান্তমুখী মানবিক চাপকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই সংকটের পেছনে ভারতের অভ্যন্তরে গড়ে উঠেছে একটি অন্ধকার দালাল অর্থনীতি। আটক করার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, ভুয়া কাগজপত্র তৈরি কিংবা টাকা দিতে না পারলে জোর করে সীমান্তে নিয়ে আসার মতো অমানবিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় রয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্র। আটকের পর দীর্ঘ বন্দিজীবন এবং ডিটেনশন ক্যাম্পের অমানুষিক মানসিক নির্যাতন এড়াতে অনেকেই বাধ্য হয়ে নিজেদের বাংলাদেশি বলে স্বীকার করছেন, যা আন্তর্জাতিক আইনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।এই ভূ-রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক টানাপোড়েনের সবচেয়ে নিষ্ঠুর ও অন্ধকার দিকটি ফুটে উঠছে সীমান্তের জিরো লাইন, অস্থায়ী ক্যাম্প কিংবা বিভিন্ন খোলা আকাশের নিচে আটকে থাকা নিরপরাধ মানুষের কান্নায়। চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন শত শত নারী, শিশু ও বৃদ্ধ, যাদের ভবিষ্যৎ আজ কোনো দেশের আইনি কাঠামোর মধ্যে সুরক্ষিত নয়। সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে বড় ধরনের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে এই পুশ-ইনের ঘটনা ভারতের পক্ষ থেকে এক ধরনের ‘প্রেসার ট্যাকটিক্স’ বা কৌশলগত চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সীমান্তভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘সপ্রাণ’-এর তথ্য বলছে, বিগত ২০২৫ সালেই ২ হাজার ৪৩৬ জনকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে পুশ-ইন করার অভিযোগ রয়েছে, যার একটি বড় অংশ ঘটেছিল মে ও জুন মাসে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট নিয়ে এক বিশাল মানবিক ও অর্থনৈতিক বোঝা বহন করছে। এই অবস্থায় সুনির্দিষ্ট দ্বিপাক্ষিক যাচাই-বাছাই ও আনুষ্ঠানিক আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া একতরফাভাবে যেকোনো পুশ-ইন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার জন্য এক বিরাট হুমকি।মানবাধিকার সংগঠন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকারকর্মীরা একে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালার চরম লঙ্ঘন ও বাংলাদেশের জন্য একটি গভীর ‘অশনিসংকেত’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। জোরপূর্বক ও একতরফা এই পুশ-ইন নীতি সীমান্ত হত্যা, সংঘাত এবং দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এমনকি এই পুশ-ইনের আড়ালে অতীতে গুম হওয়া কোনো নাগরিকের অন্তর্ভুক্তি রয়েছে কি না, তাও গভীর তদন্তের দাবি রাখে। সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ যখন বৈশ্বিক রাজনীতিতে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করছে এবং প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্যে নতুন নতুন আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব গড়ছে, তখন ভারতকে এই মানবিক সংকট সৃষ্টি থেকে বিরত রাখতে বাংলাদেশকে অত্যন্ত জোরালো, কৌশলগত ও কঠোর কূটনৈতিক অবস্থান নিতে হবে। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ইতোমধ্যে সীমান্তে কঠোর নজরদারি ও সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। যেকোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো তার জনগণের মানবাধিকার রক্ষা করা। তাই যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো মানুষকে সীমান্ত পার করে দেওয়া শুধু দ্বিপাক্ষিক আস্থার সংকটই তৈরি করে না, বরং তা বিশ্ব মানবতার বুকেও এক বড় আঘাত।
প্রকাশক & সম্পাদক: শুভ চন্দ্র দে,🔴HINDUS NEWS মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক ঢাকা থেকে প্রকাশিত।🔴যোগাযোগ: +88 01890890920🔴 ই-মেইল: news@hindus.news 🔴 বিজ্ঞাপন: ads@hindus.news