প্রিন্ট এর তারিখ : ২৪ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
স্বপ্নে দেখা শিবমন্দির বাস্তবে গড়লেন সত্য ভূষণ, ৩৮ বছর ধরে একাই চলেছে নির্মাণযাত্রা
||
একটি স্বপ্ন। ঘুম ভাঙার পরও সেই স্বপ্নের ছবি মন থেকে মুছে যায়নি। বরং সেই স্বপ্নই হয়ে উঠেছিল জীবনের সবচেয়ে বড় প্রেরণা। স্বপ্নে দেখা সেই শিবমন্দিরকে বাস্তবে রূপ দিতে নিজের পৈতৃক জমিতে শুরু করেছিলেন নির্মাণকাজ। এক-দুই বছর নয়, বছরের পর বছর নিজের হাতে সেই কাজ চালিয়ে গেছেন হিমাচল প্রদেশের সত্য ভূষণ। তাঁর তৈরি সেই মন্দিরের নাম—‘টেম্পল ইন মাই ড্রিম’, অর্থাৎ ‘আমার স্বপ্নের মন্দির’।হিমাচল প্রদেশের সোলান জেলার চাইল এলাকার পাহাড়ি পরিবেশে পাইন ও দেবদারু গাছে ঘেরা একটি পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে এই ব্যতিক্রমী শিবমন্দির। প্রকৃতির নির্জনতার মধ্যে গড়ে ওঠা মন্দিরটির স্থাপত্য যেমন আলাদা, তেমনই এর নির্মাণের পেছনের গল্পও অসাধারণ।ঘটনার শুরু ১৯৮০ সালে। এক রাতে সত্য ভূষণ স্বপ্নে একটি শিবমন্দির দেখেছিলেন। ঘুম থেকে ওঠার পরও সেই মন্দিরের দৃশ্য তাঁর মনে গভীরভাবে গেঁথে থাকে। শেষ পর্যন্ত তিনি সিদ্ধান্ত নেন, স্বপ্নে দেখা মন্দিরটির আদলেই বাস্তবে একটি মন্দির তৈরি করবেন। নিজের পৈতৃক জমিতেই শুরু হয় সেই দীর্ঘ নির্মাণযাত্রা।এই কাজে তাঁর পাশে ছিল না কোনও বড় নির্মাণদল, ছিল না কোনও পেশাদার স্থপতির দল বা সরকারি প্রকল্প। নিজের হাতে এবং নিজের শেখা শিল্পকৌশল কাজে লাগিয়েই ধীরে ধীরে মন্দিরটি গড়ে তুলতে থাকেন তিনি। স্কুলজীবনে মাটির মূর্তি তৈরি ও কাঠ খোদাইয়ের যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন, পরবর্তী সময়ে সেই দক্ষতাই কাজে লাগে মন্দিরের বিভিন্ন নকশা ও অলংকরণ তৈরিতে।সিমেন্ট ও ধাতব তার ব্যবহার করে নিজের হাতে মন্দিরের বিভিন্ন অংশ তৈরি করেন সত্য ভূষণ। মহাদেবের জটা, সাপ, ফুলের নকশাসহ নানা অলংকার তাঁর হাতের কাজেই ধীরে ধীরে আকৃতি পায়। ফলে মন্দিরটি শুধু একটি উপাসনালয় হয়ে ওঠেনি, বরং একজন মানুষের শিল্পীসত্তা ও সৃষ্টিশীলতারও প্রতিফলন হয়ে উঠেছে।নির্মাণকাজ চলার সময় অনেকেই তাঁর এই উদ্যোগ নিয়ে হাসাহাসি করেছিলেন বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু তাতে দমে যাননি তিনি। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর একই নিষ্ঠায় কাজ করে গেছেন। নিজের অর্থ ব্যয় করার পাশাপাশি পরবর্তীকালে মন্দিরে আসা ভক্তদের কাছ থেকেও কিছু সহযোগিতা পেতে শুরু করেন।২০১৮ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, তখন পর্যন্ত মন্দিরটি নির্মাণে প্রায় ১৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছিল। কিন্তু ৩৮ বছর পেরিয়ে গেলেও নির্মাণকাজ তখনও সম্পূর্ণ হয়নি। অর্থাৎ, ১৯৮০ সালে যে স্বপ্নের শুরু, কয়েক দশক পরেও সেটি ছিল চলমান এক নির্মাণযাত্রা।মন্দিরটির অন্যতম আকর্ষণ এর নিজস্ব নির্মাণশৈলী। ধূসর রঙের সিমেন্টের তৈরি বিভিন্ন অলংকরণ এবং মূর্তির নকশা মন্দিরটিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র চেহারা। মন্দিরের চূড়ার দিকে ধাতব তারের সাহায্যে লেখা রয়েছে ‘Temple in My Dream’—যেন স্থাপনাটির পুরো পরিচয়ই লুকিয়ে রয়েছে এই নামের মধ্যে।মন্দিরের ভেতরে রয়েছে একটি ভূগর্ভস্থ গুহাও। পাহাড়ের ওপর অবস্থানের কারণে এখান থেকে আশপাশের পাহাড়, উপত্যকা ও অরণ্যের মনোরম দৃশ্য দেখা যায়। শহরের কোলাহল থেকে দূরে শান্ত পরিবেশ মন্দিরটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।মন্দিরটির প্রতি সত্য ভূষণের ব্যক্তিগত টানও ছিল গভীর। ২০১৮ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা মন্দিরের নির্মাণ ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজে সময় দিতেন। নতুন কোনও নকশা বা মূর্তি তৈরির ভাবনা এলে সেটিও নিজের হাতে তৈরি করার চেষ্টা করতেন।মন্দির থেকে প্রায় ৫০ মিটার দূরেই ছিল তাঁর বাড়ি। জানলা দিয়ে কোনও দর্শনার্থীকে মন্দিরের দিকে আসতে দেখলে তিনি দ্রুত সেখানে চলে যেতেন। দর্শনার্থীদের জন্য বিদ্যুতের ব্যবস্থা চালু করে দিতেন, যাতে শিবমূর্তির ওপর জল পড়ার ব্যবস্থা সক্রিয় হয় এবং মন্দিরে ভক্তিগীতি বাজতে থাকে।একসময় স্থানীয় কয়েকজন মানুষ ছাড়া এই মন্দির সম্পর্কে খুব বেশি মানুষ জানতেন না। পরবর্তীকালে দর্শনার্থীদের তোলা ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ‘টেম্পল ইন মাই ড্রিম’ সম্পর্কে মানুষের আগ্রহও বাড়তে থাকে।একটি রাতের স্বপ্ন থেকে শুরু হয়েছিল যে যাত্রা, তা পরিণত হয়েছিল কয়েক দশকের সাধনায়। সত্য ভূষণের তৈরি এই শিবমন্দির তাই কেবল একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়; এটি একজন মানুষের বিশ্বাস, সৃষ্টিশীলতা, অধ্যবসায় ও স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার এক অনন্য গল্প। পাহাড়ের নির্জনতায় দাঁড়িয়ে থাকা ‘আমার স্বপ্নের মন্দির’ যেন আজও বলে যায়—একটি স্বপ্নকে সত্যি করার জন্য কখনও কখনও প্রয়োজন হয় শুধু বিশ্বাস, ধৈর্য এবং থেমে না যাওয়ার মানসিকতা।
প্রকাশক & সম্পাদক: শুভ চন্দ্র দে,🔴HINDUS NEWS মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক ঢাকা থেকে প্রকাশিত।🔴যোগাযোগ: +88 01890890920🔴 ই-মেইল: news@hindus.news 🔴 বিজ্ঞাপন: ads@hindus.news