প্রিন্ট এর তারিখ : ২৪ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাবার এজলাস থেকে আপিল বিভাগ: সব বাধা পেরিয়ে ইতিহাস গড়া প্রথম হিন্দু নারী বিচারক কৃষ্ণা দেবনাথ
||
বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ও গৌরবোজ্জ্বল নাম বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ। শৈশবে বাবার বিচারকক্ষের সেই ছোট্ট অভিজ্ঞতা থেকে শুরু করে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আপিল বিভাগ পর্যন্ত তাঁর এই দীর্ঘ চার দশকের যাত্রা শুধু কোনো ব্যক্তিগত অর্জনের গল্প নয়; বরং এটি সংখ্যালঘু সনাতনী সম্প্রদায়, নারী সমাজ এবং সার্বিক মানবাধিকার রক্ষায় প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে এক অদম্য সংগ্রামের মহাকাব্য। বাংলাদেশের প্রথম হিন্দু নারী বিচারক হিসেবে বিচারালয়ে সত্য ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান দেশের বিচারাঙ্গনে এক অনন্য মাইলফলক হয়ে থাকবে।১৯৫৫ সালের ১০ অক্টোবর রাজবাড়ীর এক সম্মানিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন কৃষ্ণা দেবনাথ। তাঁর বাবা দীনেশ চন্দ্র দেবনাথ ছিলেন বিচার বিভাগের একজন নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা। বাবার বদলির চাকরির সুবাদে দেশের বিভিন্ন জেলায় কেটেছে তাঁর শৈশব। খুব ছোটবেলাতেই বাবার এজলাসে বসে বিচার কার্যক্রম গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পান তিনি। সেই বয়স থেকেই মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার আকুলতা এবং বিচারপীঠের মর্যাদা দেখে তাঁর মনে বিচারক হওয়ার সুপ্ত স্বপ্ন জেগে ওঠে। সেই স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিতেই পরবর্তীতে নিজের পড়াশোনার গতিপথ নির্ধারণ করেন তিনি। ১৯৭০ সালে সিলেট গার্লস স্কুল থেকে বিজ্ঞান বিভাগে কৃতিত্বের সাথে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করলেও বিচারক হওয়ার লক্ষ্যে উচ্চমাধ্যমিকে মানবিক বিভাগে ভর্তি হন এবং রংপুরের বেগম রোকেয়া কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে তা সম্পন্ন করেন। এরপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী আইন বিভাগ থেকে বি.জুর ও এম.জুর ডিগ্রি অর্জন করে শুরু করেন তাঁর আইনি যাত্রা। রাজশাহী জেলা আইন সমিতিতে প্রাকটিস শুরু করার মাধ্যমে আইন পেশায় যুক্ত হন তিনি।আইন পেশায় মাত্র এক বছর পার করার পর, ১৯৮১ সালের ৮ ডিসেম্বর মাত্র ২৬ বছর বয়সে জুডিশিয়াল সার্ভিসে মুনসেফ (বর্তমান সহকারী জজ) হিসেবে যোগ দেন কৃষ্ণা দেবনাথ। তবে একজন সংখ্যালঘু হিন্দু নারী হিসেবে দেশের বিচার বিভাগে এই পথচলা মোটেই সহজ বা মসৃণ ছিল না। কর্মজীবনের মোড়ে মোড়ে তাঁকে মুখোমুখি হতে হয়েছিল নানা বৈষম্য ও প্রতিকূলতার। ১৯৯২ সালে সাবজজ থেকে অতিরিক্ত জেলা জজ হিসেবে তাঁর পদোন্নতি রহস্যজনকভাবে আটকে দেওয়া হয়। সুপ্রিম কোর্টের ফুল কোর্ট সভায় পরপর তিনবার পদোন্নতির জোরালো সুপারিশ করা সত্ত্বেও তা কার্যকর করা হয়নি। (News copied from- 'হিন্দুস নিউজ') একের পর এক প্রশাসনিক অবহেলা ও বৈষম্যে গভীরভাবে ব্যথিত হয়ে তিনি একপর্যায়ে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত পর্যন্ত নিয়েছিলেন, এমনকি সঙ্গে পদত্যাগপত্রও প্রস্তুত রাখতেন। কিন্তু ন্যায়ের পথে অটল কৃষ্ণা দেবনাথ হাল ছাড়েননি। সেই কঠিন দিনগুলোতে পরিবার এবং দেশের জ্যেষ্ঠ নীতিবান আইনজীবীরা তাঁর পাশে এসে দাঁড়ান। অবশেষে দীর্ঘ অপেক্ষার পর ১৯৯৪ সালে অতিরিক্ত জেলা জজ এবং ১৯৯৮ সালে জেলা জজ হিসেবে পদোন্নতি পান তিনি।তাঁর এই সুদীর্ঘ কর্মময় যাত্রায় পারিবারিক সমর্থন ও আত্মত্যাগ ছিল অপরিসীম। ১৯৮১ সালে বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী স্বপন দত্তের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। সরকারি চাকরির বদলিজনিত কারণে তাঁকে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় যেতে হলেও, দুই কন্যা—ড. আনন্দী কল্যাণ ও ড. ইন্দিরা কল্যাণের সঠিক লালন-পালন ও শিক্ষার দায়িত্ব সুচারুভাবে সামলেছেন তাঁর স্বামী ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। পিতা-মাতার এই আদর্শের পথ ধরেই তাঁর দুই কন্যা পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় নিয়োজিত হন।বিচারিক দক্ষতায় অনন্য কৃষ্ণা দেবনাথ ২০১০ সালের ১০ জানুয়ারি ঢাকা জেলার প্রথম নারী জেলা জজ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। এরপর তাঁর কর্মদক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে একই বছরের ১৮ এপ্রিল হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারক এবং ২০১২ সালের ১৫ এপ্রিল হাইকোর্ট বিভাগে স্থায়ী বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান। পরবর্তীতে ২০২২ সালের ৯ জানুয়ারি আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে শপথ গ্রহণের মাধ্যমে তিনি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপীঠে আসন গ্রহণ করেন এবং আপিল বিভাগের তৃতীয় নারী বিচারপতি হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।ধৈর্য, সততা ও পেশাগত নিষ্ঠাকে সাফল্যের মূলমন্ত্র মেনে চলা বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ সর্বদা জুনিয়র বিচারকদের সততার নীতিতে অবিচল থাকার পরামর্শ দিতেন। বৈষম্য ও বাধা সত্ত্বেও নিষ্ঠা ধরে রাখলে যে সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানো সম্ভব, তা নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন তিনি। বাংলাদেশের বিচারালয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের স্বাধিকার, মানবাধিকার ও নারী অগ্রযাত্রার এক আলোকবর্তিকা হয়ে চিরকাল অনুপ্রেরণা জুগিয়ে যাবে কৃষ্ণা দেবনাথের এই ঐতিহাসিক পথচলা।
প্রকাশক & সম্পাদক: শুভ চন্দ্র দে,🔴HINDUS NEWS মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক ঢাকা থেকে প্রকাশিত।🔴যোগাযোগ: +88 01890890920🔴 ই-মেইল: news@hindus.news 🔴 বিজ্ঞাপন: ads@hindus.news