প্রিন্ট এর তারিখ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর:এক মানুষ,এক মহাজাগরণ।
লেখক: সুজিত ঘোষ, লেখক,কলামিষ্ট,কবি ও সংগঠক। ||
একটি শিশুর হাতে যখন প্রথমবারের মতো ‘অ’ অক্ষরটি ধরা পড়ে, তখন সে হয়তো জানে না—এই অক্ষরের পথ ধরেই একদিন তার সামনে খুলে যাবে জ্ঞানের বিশাল পৃথিবী। বাংলা ভাষাভাষী অসংখ্য মানুষের শিক্ষাজীবনের সেই প্রথম সিঁড়ির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে একটি নাম—ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।তাঁকে শুধু ‘বর্ণপরিচয়’-এর রচয়িতা হিসেবে দেখলে তাঁর বিশাল কর্মযজ্ঞের প্রতি অবিচার করা হবে। তিনি ছিলেন শিক্ষাবিদ, ভাষাসংস্কারক, লেখক, সমাজসংস্কারক এবং জনহিতৈষী। উনিশ শতকের বাংলায় যখন সমাজ একদিকে ঔপনিবেশিক পরিবর্তনের অভিঘাত এবং অন্যদিকে বহু পুরোনো সামাজিক রীতিনীতির টানাপোড়েনে দাঁড়িয়ে, তখন বিদ্যাসাগর শিক্ষা ও যুক্তির আলো হাতে নিয়ে সামনে এগিয়ে এসেছিলেন। তাঁর কর্মজীবনের নানা সংস্কার বাংলা শিক্ষাব্যবস্থা ও সমাজচিন্তায় দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।দারিদ্র্যতা তাঁকে থামাতে পারেনি১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেই তাঁর শৈশব কেটেছে। পাঁচ বছর বয়সে গ্রামের পাঠশালায় শিক্ষার সূচনা; পরে কলকাতায় এসে ১৮২৯ সালে সংস্কৃত কলেজে ভর্তি হন।অসাধারণ মেধা, অধ্যবসায় ও জ্ঞানপিপাসার কারণে তিনি দ্রুতই সহপাঠী ও শিক্ষকদের মধ্যে স্বতন্ত্র হয়ে ওঠেন। ১৮৩৯ সালের মধ্যেই তিনি ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি অর্জন করেন। পরবর্তীকালে শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে তাঁর যে অসামান্য উত্থান, তার ভিত গড়ে উঠেছিল এই কঠোর সাধনা ও আত্মনির্মাণের মধ্য দিয়েই।শিক্ষা শুধু মুখস্থবিদ্যা নয়,সমাজ বদলের শক্তিবিদ্যাসাগরের শিক্ষা-ভাবনা ছিল তাঁর সময়ের তুলনায় অত্যন্ত অগ্রসর। তিনি শুধু বিদ্যাচর্চার বিস্তার চাননি; চেয়েছিলেন শিক্ষাব্যবস্থাকে বাস্তবসম্মত, সহজলভ্য ও আধুনিক করে তুলতে।সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে তিনি পাঠ্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনেন। শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ, বাংলা ভাষার মাধ্যমে ব্যাকরণ শিক্ষা, ইংরেজি শিক্ষার গুরুত্ব বৃদ্ধি এবং আধুনিক জ্ঞানচর্চার প্রতি জোর—এসব পদক্ষেপ তাঁর শিক্ষাচিন্তার বৈশিষ্ট্য বহন করে। তিনি শিক্ষাকে একটি বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে দেখেছিলেন।‘বর্ণপরিচয়’: বাংলা শিশুশিক্ষার ঐতিহাসিক অধ্যায়:১৮৫১ সালে প্রকাশিত ‘বর্ণপরিচয়’ বাংলা প্রাথমিক শিক্ষার ইতিহাসে এক মাইলফলক। এর আগে শিশুদের জন্য এমন সুসংবদ্ধ ও কার্যকর আদর্শ পাঠ্যপুস্তকের অভাব ছিল। সহজ উপস্থাপন, বর্ণ থেকে শব্দ এবং শব্দ থেকে বাক্যে অগ্রসর হওয়ার পদ্ধতি—সব মিলিয়ে বইটি দীর্ঘদিন বাংলা শিশুশিক্ষার অন্যতম প্রধান পাঠ্য হয়ে ছিল।তবে বিদ্যাসাগরের পাঠ্যপুস্তক রচনার উদ্দেশ্য ছিল আরও বিস্তৃত। তাঁর বোধোদয়, কথামালা, চরিতাবলী, জীবনচরিত প্রভৃতি গ্রন্থে জ্ঞান, নৈতিকতা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও বৃহত্তর বিশ্বের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল। অর্থাৎ তিনি শুধু শিশুকে পড়তে শেখাতে চাননি; তিনি চেয়েছিলেন শিশুর চিন্তার জগতও বড় হোক।বাংলা গদ্যে এক নতুন যুগ:বাংলা ভাষার ইতিহাসেও বিদ্যাসাগরের অবদান গভীর। তাঁর আগে বাংলা গদ্যে সংস্কৃতঘেঁষা ও অপেক্ষাকৃত আড়ষ্ট রীতির প্রভাব ছিল প্রবল। বিদ্যাসাগর বাক্যগঠন, শব্দের ব্যবহার ও ভাষার সৌন্দর্যকে নতুন মাত্রা দেন। বেতাল পঞ্চবিংশতি, শকুন্তলা, সীতার বনবাস প্রভৃতি রচনার মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা গদ্যকে আরও সাবলীল, সুসংগঠিত ও সাহিত্যোপযোগী করে তোলেন।তাঁর ভাষা শুধু পড়ার জন্য সহজ ছিল না; তার মধ্যে ছিল যুক্তির শৃঙ্খলা, আবেগের সংযম এবং বক্তব্য প্রকাশের শক্তি। ফলে বাংলা গদ্যের বিকাশে তাঁর ভূমিকা একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় হয়ে আছে।নারীশিক্ষা: অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর সংগ্রাম:যে সমাজে মেয়েদের শিক্ষার বিরোধিতা ছিল প্রবল, সেই সমাজেই বিদ্যাসাগর নারীশিক্ষার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেন। ১৮৫৫ সালে স্কুল পরিদর্শকের দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি গ্রামীণ অঞ্চলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেন। বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৮৫৭ সালের শেষ দিক থেকে ১৮৫৮ সালের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে তিনি বহু বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন।নারীকে শিক্ষার বাইরে রেখে সমাজের পূর্ণাঙ্গ উন্নয়ন সম্ভব নয়—তাঁর কর্মকাণ্ডে এই উপলব্ধিই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।বিধবা বিবাহ: মানবিকতার পক্ষে এক ঐতিহাসিক লড়াই:বিদ্যাসাগরের সমাজসংস্কার আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি ছিল বিধবা বিবাহ প্রচলনের আন্দোলন। তৎকালীন সমাজে বিধবাদের জীবন ছিল কঠোর সামাজিক বিধিনিষেধে আবদ্ধ। বিদ্যাসাগর শাস্ত্রীয় যুক্তি, সামাজিক বাস্তবতা ও মানবিকতার ভিত্তিতে বিধবা বিবাহের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে উদ্যোগী হন।১৮৫৫ সালে তিনি এ বিষয়ে গ্রন্থ প্রকাশ করেন এবং সরকারের কাছে আবেদন জানান। বিরোধীদের প্রবল প্রতিরোধ সত্ত্বেও তাঁর আন্দোলন ক্রমে সামাজিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব সৃষ্টি করে। ১৮৫৬ সালের ১৯ জুলাই বিধবা বিবাহ আইন পাস হয়। একই বছরের ডিসেম্বর মাসে তাঁর উদ্যোগ ও সহযোগিতায় একটি বিধবা বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়।এই অধ্যায় প্রমাণ করে—সমাজসংস্কার শুধু বক্তৃতায় হয় না,এর জন্য প্রয়োজন যুক্তি, অধ্যবসায় এবং প্রতিকূলতার সামনে দাঁড়ানোর সাহস।বিদ্যাসাগর:পদে বড় নন,হৃদয়ে বড়: তাঁর জীবনের সবচেয়ে গভীর পরিচয় সম্ভবত তাঁর মানবিকতা। বিদ্যাসাগর দানশীলতার জন্য ‘করুণাসাগর’ নামেও পরিচিত ছিলেন। তাঁর কাছে শিক্ষা ও সমাজসংস্কার কখনো নিছক তাত্ত্বিক বিষয় ছিল না; মানুষের বাস্তব দুঃখ-দুর্দশার সঙ্গে তার সরাসরি সম্পর্ক ছিল।নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী দরিদ্র, অসহায় ও শিক্ষার্থীদের সাহায্য করেছেন তিনি। উচ্চপদে থেকেও তাঁর জীবনযাপন ছিল সাদাসিধে। মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর যে মানসিকতা তাঁর মধ্যে ছিল, সেটিই তাঁকে কেবল একজন পণ্ডিতের আসন থেকে তুলে এনে মানুষের হৃদয়ে স্থান দিয়েছিল।বিদ্যাসাগরকে কেন আজও প্রয়োজন?প্রশ্নটি আজ আরও গুরুত্বপূর্ণ—দুই শতাব্দীর কাছাকাছি সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও কেন বিদ্যাসাগর আমাদের আলোচনায় ফিরে আসেন?কারণ সময় বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, শিক্ষার পদ্ধতি বদলেছে; কিন্তু সমাজে শিক্ষা, যুক্তিবোধ, নারীসম্মান, মানবিকতা ও সামাজিক ন্যায়ের প্রয়োজন শেষ হয়নি।আজ শিক্ষার সুযোগ বেড়েছে, কিন্তু শিক্ষার সঙ্গে মানবিকতার সম্পর্ক কতটা দৃঢ়—সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। তথ্যের বিস্ফোরণ ঘটেছে, কিন্তু যুক্তিবোধ কি একই গতিতে বেড়েছে? নারী শিক্ষায় অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু নারীর মর্যাদা ও সমঅধিকারের প্রশ্ন কি সম্পূর্ণ সমাধান হয়েছে?এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড়ালে বিদ্যাসাগরের জীবন নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।জন্মদিনের শ্রদ্ধা হোক আদর্শে:ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্মদিন কেবল ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর দিন নয়। এটি আত্মসমালোচনারও দিন। আমরা তাঁর ‘বর্ণপরিচয়’ স্মরণ করব, কিন্তু তাঁর শিক্ষার উদ্দেশ্যও মনে রাখব। তাঁর বিধবা বিবাহ আন্দোলনের কথা বলব, কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহসটিও ধারণ করতে হবে। তাঁর মানবিকতার কথা বলব, কিন্তু অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্বও নিতে হবে।কারণ বিদ্যাসাগরকে সত্যিকার অর্থে শ্রদ্ধা করার সবচেয়ে বড় উপায় তাঁর মূর্তিতে মালা দেওয়া নয়—তাঁর আদর্শকে জীবনের আচরণে পরিণত করা।ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর একটি সময়ের সন্তান হয়েও সময়কে অতিক্রম করেছেন। তাঁর হাতে ছিল বই, সামনে ছিল অন্ধকার; তিনি বেছে নিয়েছিলেন আলোর পথ। তাঁর অস্ত্র ছিল যুক্তি, তাঁর শক্তি ছিল জ্ঞান, আর তাঁর হৃদয়ের কেন্দ্র ছিল মানুষ।তাই বিদ্যাসাগর শুধু বর্ণপরিচয়ের পাতায় আটকে থাকা একটি নাম নন। তিনি বাংলা শিক্ষার ইতিহাসে এক মাইলফলক, সমাজসংস্কারের ইতিহাসে এক সাহসী অধ্যায় এবং মানবতার ইতিহাসে এক উজ্জ্বল প্রতীক।আজ তাঁর জন্মদিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক—অক্ষর শিখব, কিন্তু অক্ষরের অর্থও বুঝব;জ্ঞান অর্জন করব,কিন্তু সেই জ্ঞান মানুষের কাজে লাগাব।আর বিদ্যাসাগরকে স্মরণ করব শুধু কথায় নয়—মানবিকতায়, যুক্তিতে ও কর্মে।ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বেঁচে থাকুন আমাদের শিক্ষা, বিবেক ও মানবিকতার চর্চায়।
প্রকাশক & সম্পাদক: শুভ চন্দ্র দে,🔴HINDUS NEWS মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক ঢাকা থেকে প্রকাশিত।🔴যোগাযোগ: +88 01890890920🔴 ই-মেইল: news@hindus.news 🔴 বিজ্ঞাপন: ads@hindus.news