প্রিন্ট এর তারিখ : ০৮ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৭ অক্টোবর ২০২৬
গণপতি পরিবার হত্যাকাণ্ড: দেড় মাসেও কাটেনি ভয়, এলাকায় নেই পূজার আমেজ
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
রংপুর নগরীর হিন্দু অধ্যুষিত মাছুয়াপাড়া মহল্লায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী, মেয়ে ও একমাত্র ছেলেকে হত্যার ঘটনায় দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও আতঙ্ক কাটেনি স্থানীয় বাসিন্দাদের। বরং শারদীয় দুর্গাপূজা সামনে এলেও হত্যাকাণ্ডের রেশে মহল্লাটিতে এবার উৎসবের আমেজ অনেকটাই ম্লান। স্থানীয়দের প্রশ্ন, এত বড় একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্তের অগ্রগতি কোথায়? প্রকৃত হত্যাকারী ও এর নেপথ্যের কারণ কি আদৌ উদঘাটন হবে?সরেজমিন মঙ্গলবার রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া মহল্লায় গিয়ে দেখা যায়, গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির সামনে এখনো পুলিশ পাহারা রয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পর মহল্লার একমাত্র মন্দিরে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি চলছে। তবে সেখানে নেই আগের মতো সাজসজ্জা, কর্মব্যস্ততা কিংবা উৎসবের উচ্ছ্বাস। সাদামাটাভাবেই প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ করা হয়েছে। পুরো এলাকায় বিরাজ করছে এক ধরনের নীরবতা।স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সাধারণত দুর্গাপূজা ঘিরে মাছুয়াপাড়ায় কয়েক দিন আগে থেকেই উৎসবের আবহ তৈরি হয়। শিশু-কিশোরদের মধ্যে থাকে নতুন পোশাক কেনার আনন্দ, মন্দির সাজানোর ব্যস্ততা এবং বিভিন্ন আয়োজন। কিন্তু এবার চার সদস্যের একটি পরিবারের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। সন্ধ্যার পর প্রয়োজন ছাড়া অনেকেই বাড়ির বাইরে বের হচ্ছেন না। শিশুদের মধ্যেও আগের মতো উৎসবের উচ্ছ্বাস নেই।মন্দিরের সহকারী পুরোহিত অভিলাষ বর্মন বলেন, কোনো রকমে হলেও পূজা করতে হবে, তাই প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তবে এবার তেমন কোনো সাজসজ্জা করা হবে না। মানুষের মধ্যে এখনো আতঙ্ক রয়েছে। পূজা উদযাপন করতে হয় বলেই আয়োজন করা হচ্ছে।হত্যাকাণ্ডের শিকার গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, প্রবেশপথের গেটের ভেতরে পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। কর্তব্যরত এক পুলিশ সদস্য জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী তাঁরা বাড়িটি পাহারা দিচ্ছেন। অনুমতি ছাড়া কাউকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। এ বিষয়ে তিনি আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।বাড়িটির সামনে কথা হয় স্থানীয় গৃহবধূ তুলশী দাসের সঙ্গে। তিনি বলেন, দেড় মাস ধরে তাঁরা চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। দিনের বেলায় তেমন ভয় না লাগলেও সন্ধ্যার পর জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ বাড়ির বাইরে বের হন না। ফলে এবার পূজার আনন্দও ফিকে হয়ে গেছে।তুলশী দাস বলেন, একটি পরিবারের চারজন মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। এমন ঘটনার পর কীভাবে স্বাভাবিক থাকা সম্ভব? ছেলেমেয়েদের জন্য এখনো নতুন জামাকাপড় কেনা হয়নি। মনে শান্তি নেই। তারপরও তাঁরা পূজা উদযাপন করবেন। তবে নিহত পরিবারটিকে এবার ভীষণভাবে মনে পড়বে।দীর্ঘদিন ধরে মাছুয়াপাড়ায় বসবাস করা আশিষ দাসও বলছেন একই কথা। তাঁর ভাষায়, প্রায় ৩০ বছর ধরে তিনি এই মহল্লায় বসবাস করছেন, কিন্তু এমন আতঙ্ক কখনো দেখেননি।আশিষ দাস বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর থেকে তাঁরা সার্বক্ষণিক ভয়ের মধ্যে আছেন। দুর্বৃত্তরা তাঁদের ওপরও হামলা করতে পারে, এমন আশঙ্কা রয়েছে। কারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে এবং এর নেপথ্যে কারা রয়েছে, সেটিও এখনো তাঁরা নিশ্চিত হতে পারেনি।পরপর কয়েক দিন পুলিশ, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন মানুষের আনাগোনা ছিল। এখন কেন সবাই অনেকটা চুপচাপ, সেটি তাঁরা বুঝতে পারছেন না। তাঁরা প্রকৃত হত্যারহস্য উদঘাটন চান। হত্যাকারী ও তাঁদের সহযোগীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।মহল্লার প্রবীণ বাসিন্দা মনু বালা দাস বলেন, আবারও একই ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে কি না, সেই আতঙ্কে রয়েছেন তাঁরা। ভয়ে অনেকে ঘর থেকেও বের হতে চান না। কখন কী ঘটে, সেই শঙ্কা রয়েছে।তিনি বলেন, এবার তাঁরা আগের মতো আনন্দ-উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা পালন করতে পারবেন না। তারপরও বছরে একটি বড় ধর্মীয় উৎসব হওয়ায় যতটুকু আয়োজন করা সম্ভব, সেটুকু করার চেষ্টা করছেন তাঁরা।গৃহবধূ বিনু দাস বলেন, তাঁরা চরম আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। প্রশাসন তাঁদের পূর্ণ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারছে বলে মনে হচ্ছে না। একটি পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার মতো এত বড় ঘটনার পরও কেন তদন্তের পুরো রহস্য উন্মোচিত হচ্ছে না, সেটিই তাঁদের প্রশ্ন।পুলিশ বিভিন্ন আলামত পরীক্ষার জন্য নিয়ে গেছে উল্লেখ করে বিনু দাস বলেন, পরীক্ষার প্রতিবেদন পেতে এত সময় লাগছে কেন, সেটিও তাঁরা বুঝতে পারছেন না। নিরাপত্তাহীনতার কারণে তাঁরা স্বাভাবিক হতে পারছেন না। এবার আতঙ্ক নিয়েই তাঁদের দুর্গাপূজায় বসতে হবে।মাছুয়াপাড়ায় হত্যাকাণ্ডের প্রভাব পড়েছে গ্রেপ্তার আসামি মুগ্ধ দাসের পরিবারেও। তাঁর বাবা বিনয় দাস বলেন, ছেলে কারাগারে থাকায় তাঁদের বাড়িতেও এবার কোনো উৎসবের আয়োজন নেই। বাড়িতে কান্নার পরিবেশ। এর মধ্যেই তাঁদের পূজা করতে হবে।এদিকে হত্যাকাণ্ডের পর মহল্লার বাসিন্দারা পূজা উপলক্ষে বাড়তি নিরাপত্তার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের আশঙ্কা, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন না হওয়া পর্যন্ত নিরাপত্তা নিয়ে তাঁদের মধ্যে ভয় পুরোপুরি কাটবে না। দুর্গাপূজা চলাকালে মন্দির ও আশপাশের এলাকায় কঠোর নজরদারি এবং পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।গত রোববার রংপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে দুর্গাপূজা উপলক্ষে একটি বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় মাছুয়াপাড়া মহল্লায় নিরাপত্তা নিয়ে প্রশাসনের পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক ইসরাত জানান, নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।যেভাবে ঘটেছিল হত্যাকাণ্ডগত ২১ আগস্ট রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া মহল্লার একটি বাড়ি থেকে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রতীলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এবং স্কুলছাত্র একমাত্র ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।ঘটনার পরদিন মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁরা আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।বর্তমানে মামলাটির তদন্ত করছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তদন্তের অংশ হিসেবে দুই আসামির ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া ৩৫ ধরনের আলামত সিআইডির কাছে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এসব পরীক্ষার কোনো প্রতিবেদন তদন্তকারীদের হাতে পৌঁছায়নি বলে জানা গেছে।পুলিশের দাবি, দুই আসামি চারজনকে একে একে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে। তবে নিহতদের স্বজন ও স্থানীয়দের একটি অংশ পুলিশের এই বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। তাঁদের মতে, চারজনকে হত্যার মতো ঘটনায় আরও কোনো ব্যক্তি জড়িত ছিল কি না, হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না এবং পুরো ঘটনার সঙ্গে আর কেউ সম্পৃক্ত কি না, এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।ফলে চার সদস্যের পরিবারের হত্যাকাণ্ডের দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও মাছুয়াপাড়াবাসীর আতঙ্ক কাটেনি। সামনে দুর্গাপূজা হলেও উৎসবের আনন্দের চেয়ে নিরাপত্তা ও হত্যারহস্য উদঘাটনের দাবিই এখন স্থানীয়দের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাঁদের ভাষায়, ‘দুর্গাপূজা আসছে, কিন্তু মন থেকে ভয়টা যাচ্ছে না।’
প্রকাশক & সম্পাদক: শুভ চন্দ্র দে,🔴HINDUS NEWS মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক ঢাকা থেকে প্রকাশিত।🔴যোগাযোগ: +88 01890890920🔴 ই-মেইল: news@hindus.news 🔴 বিজ্ঞাপন: ads@hindus.news