প্রিন্ট এর তারিখ : ০৯ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৮ অক্টোবর ২০২৬
একই মন্ডপে ১৬০ প্রতিমায় রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনি
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
মণ্ডপে ঢুকলেই যেন খুলে যায় পৌরাণিক কাহিনির একেকটি পাতা। কোথাও পৌরাণিক যুদ্ধ, কোথাও বীরত্বের কাহিনি, আবার কোথাও তুলে ধরা হয়েছে দেব-দেবীর নানা গল্প। মণ্ডপজুড়ে এমন অসংখ্য কাহিনির সঙ্গে সারিবদ্ধভাবে সাজানো হয়েছে ১৬০টি প্রতিমা। ধর্মীয় আবহের পাশাপাশি শিল্প ও পৌরাণিক গল্পের এই ব্যতিক্রমী মেলবন্ধন ঘটেছে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার কবুতরখালী গ্রামের রাজমন্দিরে।ব্যতিক্রমী এই আয়োজন ঘিরে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার কবুতরখালী গ্রামের রাজমন্দিরে চলছে দুর্গাপূজার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। আয়োজকদের দাবি, বরিশাল বিভাগের অন্যতম বড় দুর্গাপূজার আয়োজন হতে যাচ্ছে এবার রাজমন্দিরে। বিশাল প্রাঙ্গণজুড়ে তৈরি হচ্ছে প্যান্ডেল। সেখানে সারিবদ্ধভাবে সাজানো হচ্ছে ১৬০টি প্রতিমা। এবারের মূল আকর্ষণ টেরাকোটা শিল্পের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে রামায়ণ এবং মহাভারতের অসংখ্য কাহিনি।টেরাকোটা মূলত পোড়ামাটির শিল্পকর্ম। বাংলার প্রাচীন মন্দির ও স্থাপত্যে পোড়ামাটির ফলক ও নকশার মাধ্যমে পৌরাণিক কাহিনি, লোকজ জীবন ও ঐতিহাসিক নানা ঘটনা তুলে ধরার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। সেই শিল্পরীতির ভাবনাকেই এবারের দুর্গোৎসবের মূল থিম হিসেবে নিয়েছেন আয়োজকরা।মঠবাড়িয়া উপজেলার গুলিসাখালী ইউনিয়নের কবুতরখালী গ্রামের হালদার বাড়িতে এই আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে প্রায় ছয় মাস ধরে। প্রতিমা নির্মাণের কাজে যুক্ত ছিলেন প্রায় ২০ জন কারিগর ও শ্রমিক। প্রতিমা তৈরির পাশাপাশি চলছে প্যান্ডেল, আলপনা, আলোকসজ্জা ও মণ্ডপের অন্যান্য সাজসজ্জার কাজ।২০১০ সালে ছোট পরিসরে শুরু হওয়া এই আয়োজন ২০১৬ সালে ৪৪টি প্রতিমা দিয়ে আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে। ২০১৮ সালে প্রতিমার সংখ্যা বেড়ে ৪৫০-এ পৌঁছায়। এরপর প্রতিমার সংখ্যা কমিয়ে আনা হলেও প্রতিবছরই আয়োজনের সঙ্গে নতুন কোনো না কোনো বিষয় যুক্ত করা হচ্ছে। ১৬ বছর যাবৎ ব্যক্তিগত উদ্যোগে এই আয়োজন করে যাচ্ছে ডা. সুদীপ কুমার হালদার ও তার স্ত্রী ডা. স্নিগ্ধা চক্রবর্তী নিজস্ব উদ্যোগে। ডা. সুদীপ কুমার হালদারের বাবার ইচ্ছে ছিল তার ছেলে এবং ছেলের স্ত্রী ডাক্তার হলে পূজার আয়োজন করবেন। বাবার ইচ্ছা থেকেই এই মহা আয়োজন।রাজমন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা অর্থোপেডিকস বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. সুদীপ কুমার হালদার বলেন, বাবার ইচ্ছা থেকেই এই পূজার আয়োজন শুরু হয়। বাবা চেয়েছিলেন, ছেলের বউ চিকিৎসক হলে বাড়িতে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হবে। সেই ইচ্ছাকে কেন্দ্র করেই পূজার সূচনা। তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে এই পূজা চলে আসছে। শুরুতে পারিবারিক পরিসরে আয়োজন করা হলেও মানুষের ভালোবাসা ও আগ্রহে ধীরে ধীরে এর পরিসর বাড়তে থাকে।ডা. সুদীপ কুমার হালদার বলেন, এবারের আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ টেরাকোটার কাজ। রামায়ণ ও মহাভারতের বিভিন্ন কাহিনি ও চরিত্রকে এই শিল্পরীতির মাধ্যমে দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে। আমরা প্রতিবছরই নতুনত্ব আনার চেষ্টা করি। পাশাপাশি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক নানা কার্যক্রমও থাকবে। আমরা দর্শনার্থীদের জন্য রেখেছি বুক কর্নার ও ব্রেস্টফিডিং কর্নার।পাশাপাশি রয়েছে ‘মানবতার দেওয়াল’, চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা, স্যানিটারি প্যাড বিতরণ এবং দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের সহায়তার উদ্যোগ। মন্দির প্রাঙ্গণ ও আশপাশে দেশের গুণীজনদের ছবি এবং বিভিন্ন উপদেশমূলক বাণীও প্রদর্শন করা হচ্ছে।আয়োজকদের মতে, পূজাকে শুধু ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এর মাধ্যমে সামাজিক সচেতনতা ও মানবিক মূল্যবোধের বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। পূজার পাঁচ দিন দুপুর ১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের খাবারের ব্যবস্থাও থাকবে বলে জানিয়েছে মন্দির কর্তৃপক্ষ। দেশের বিভিন্ন জেলা ছাড়া বিদেশ থেকে দর্শনার্থীরা এই আয়োজন দেখতে আসেন বলে জানান আয়োজকরা। প্রতিবছর তিন থেকে চার লাখ মানুষ এই পূজায় আসে। এ বছরও চার থেকে পাঁচ লাখ মানুষ আগমনের প্রত্যাশা তাদের।রাজমন্দির কর্তৃপক্ষ ও সৈয়দ ফজলুল হক কলেজের সহকারী অধ্যাপক পলাশ চন্দ্র গাইন বলেন, আমাদের এ বছর ব্যতিক্রম ধর্মীয় আয়োজন হতে যাচ্ছে। দক্ষিণবঙ্গের মধ্যে একটি মহা মিলনের স্থান হচ্ছে এই রাজমন্দির। এখানে লাখো লাখো ভক্তের উপস্থিতি হয় এবং মহা প্রসাদের ব্যবস্থা থাকে। গত বছরে নয়া দিল্লি, কোলকাতা, জাপান, চায়না, অ্যামেরিকা ও ইংল্যান্ড থেকে পর্যটকরা এখানে এসে এ মন্দির সম্পর্কে নোট বুকে মন্তব্য করে গেছেন। এজন্য আমরা ধন্য। আয়োজক আমার দাদা এবং বৌদির প্রতি কৃতার্থ।পূজা শুরুর প্রায় ছয় মাস আগে থেকেই শুরু হয়েছে মণ্ডপের প্রস্তুতির কাজ। দীর্ঘ ছয় মাস ধরে ২০ জন কারিগর ও শ্রমিক প্রতিমা তৈরি, মণ্ডপসজ্জা, আলপনা ও অন্যান্য কাজে ব্যস্ত সময় পার করেছেন। এখন চলছে প্রস্তুতির শেষ মুহূর্ত। প্রতিমা ও মণ্ডপসজ্জার কাজ প্রায় শেষ করে উৎসবের অপেক্ষায় রয়েছেন আয়োজক ও কারিগররা।প্রতিমা নির্মাণশিল্পী উজ্জ্বল বিশ্বাস গুরু জানান, কয়েক মাস ধরে কাজ করে প্রতিমা নির্মাণের কাজ শেষ করেছেন তারা। তার জানা মতে, এত বড় পরিসরে প্রতিমা ও পৌরাণিক কাহিনি উপস্থাপনের আয়োজন খুব কম জায়গাতেই হয়। তিনি বলেন, মন্দিরে দুই বছর ধরে কাজ করি। চার থেকে পাঁচ মাসের পরিশ্রমে প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ করেছি। এত বড় আয়োজন তার জানা মতে আর কোথাও হচ্ছে না। বড় এই আয়োজনের সঙ্গে থাকতে পেরে তিনি আনন্দিত।পূজা শুরুর আগেই রাজমন্দিরের আয়োজন দেখতে ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। শুধু পিরোজপুর নয়, আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকেও মানুষ ছুটে আসছেন শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি দেখতে। মণ্ডপজুড়ে প্রতিমা, টেরাকোটা শিল্পকর্ম ও সাজসজ্জার কাজ দেখতে প্রতিদিনই বাড়ছে দর্শনার্থীদের আগ্রহ।পাশের জেলা ঘুরতে আসা বরগুনা থেকে আসা তন্ময় মিত্র বলেন, পরিবার নিয়ে প্রতিবারই আসা হয়। এখন আসলাম আয়োজনটা ঘুরে দেখতে। এবারে এসে দেখলাম নতুন থিম। প্রতিবারের নতুনত্ব থাকে এখানে আয়োজনে। এবার টেরাকোটা শিল্পের মাধ্যমে মহাভারতের বিভিন্ন ঘটনা সুন্দরভাবে সাজিয়ে তোলা হয়েছে। এবারও পূজা শুরু হলে পরিবারকে নিয়ে আসব।এদিকে পিরোজপুরের সাত উপজেলায় এবার ৪৬২টি পূজামণ্ডপে দুর্গোৎসবের আয়োজন করা হচ্ছে। পূজাকে ঘিরে জেলার প্রতিটি মণ্ডপে পৃথক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে জেলা পুলিশ। পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকেও পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তালেবুর রহমান।আগামী ১৫ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা। এর আগেই শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত রাজমন্দিরের কারিগর ও আয়োজকরা। ১৬০টি প্রতিমায় রামায়ণ-মহাভারতের পৌরাণিক কাহিনি, টেরাকোটা শিল্পরীতির নান্দনিক উপস্থাপন এবং নানা সামাজিক উদ্যোগ—সব মিলিয়ে মঠবাড়িয়ার রাজমন্দিরে এবারও তৈরি হচ্ছে ব্যতিক্রমী এক দুর্গোৎসবের আয়োজন।
প্রকাশক & সম্পাদক: শুভ চন্দ্র দে,🔴HINDUS NEWS মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক ঢাকা থেকে প্রকাশিত।🔴যোগাযোগ: +88 01890890920🔴 ই-মেইল: news@hindus.news 🔴 বিজ্ঞাপন: ads@hindus.news