প্রিন্ট এর তারিখ : ৩১ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ৩০ অক্টোবর ২০২৬
খেতুরীধামে শুরু হলো শত বছরের ঐতিহ্যবাহী নরোত্তম দাসের মহোৎসব
অভ্র অর্পন ||
সনাতন বৈষ্ণব ধর্মের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাধক ও প্রেমভক্তির বার্তা বাহক ঠাকুর নরোত্তম দাসের ঐতিহ্যবাহী তিরোভাব তিথি মহোৎসবকে কেন্দ্র করে পদ্মাপাড়ের ঐতিহাসিক খেতুরীধামে সৃষ্টি হয়েছে অপূর্ব এক আধ্যাত্মিক পরিবেশ। রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার প্রেমতলীর এই প্রাচীন ধামে প্রতি বছরের মতো এবারও কার্তিক মাসের আগমনীতে বিশ্বশান্তি ও সনাতনী ঐতিহ্য রক্ষায় দেশ-বিদেশের লাখো ভক্ত ও সাধু-সন্যাসীর অনন্য মিলনমেলা ঘটেছে। গত বৃহস্পতিবার থেকে ধর্মীয় অধিবাস ও ভাবগম্ভীর আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া তিন দিনব্যাপী এই তিরোভাব তিথি মহোৎসবে এখন চারদিক হরিনাম সংকীর্তন, মধুর ভজন, আরতি এবং প্রার্থনার পুণ্য ধ্বনিতে মুখরিত। যুগ যুগ ধরে সনাতন ধর্মের অহিংসা, ভালোবাসা ও সকল মানুষের সমান অধিকার ও মানবিক মর্যাদার বার্তা ছড়িয়ে দিয়ে আসা এই মহাসংগম এখন কেবল একটি ধর্মীয় আয়োজন নয়, বরং সর্বজনীন সম্প্রীতি ও বৈষ্ণব ভাবধারার এক জাগ্রত তীর্থক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।শত শত বছরের ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সনাতনী বিশ্বাসকে বুকে ধারণ করে উৎসবের বহু দিন পূর্ব থেকেই পুণ্যার্থীরা দূর-দূরান্ত থেকে খেতুরীধামে সমবেত হতে শুরু করেন। বৃহস্পতিবার সূর্যোদয়ের পর থেকেই বাস, মাইক্রোবাসসহ নানা বাহনে চড়ে পুণ্যার্থীরা প্রয়োজনীয় রসদ নিয়ে মন্দিরের পবিত্র আঙিনায় জমায়েত হতে থাকেন। মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে শুরু করে প্রধান সড়কের দু'পাশে বসেছে সনাতনী লোকজ সংস্কৃতির হাজারো পসরা। বৈষ্ণবীয় ধর্মীয় উপকরণ, কারুশিল্প, ঐতিহ্যবাহী খাবার, মৃৎ ও লৌহজাত সামগ্রীর মনোহরী প্রদর্শনীতে গমগম করছে পুণ্যভূমি খেতুরীধামের দীর্ঘদিনের মেলা। কার্তিক মাসের প্রথম তিন দিন জুড়ে অনুষ্ঠিত এই উৎসবের সূচনায় ঠাকুর নরোত্তম দাস রচিত মধুর ভজন, সন্ধ্যা আরতি, দামোদর পূজা, শ্রীল প্রভুপাদ গুরুপূজা ও বিশেষ নরোত্তম চরিতকথা আলোচনা করা হয়। ভক্তদের পরম আকুলতায় অষ্টপ্রহরব্যাপী তারকব্রহ্মনাম সংকীর্তনের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে এক অনন্য পরমানন্দ। পরম সাধকের শিক্ষা ও সনাতনী চেতনা যেন প্রতিটি বৈষ্ণব হৃদয়ে পুনরুজ্জীবিত হয়ে উঠেছে।বিশ্বজনীন প্রেম ও সার্বিক মানবকল্যাণের যে মূল সুর সনাতন দর্শনে নিহিত, তার এক উজ্জ্বল বহির্প্রকাশ দেখা যায় এই খেতুরীধামে। ট্রাস্টি বোর্ড ও স্থানীয় আয়োজক সূত্রে জানা গেছে, লাখ লাখ সনাতনী ও বৈষ্ণব ভক্তের জন্য এখানে পরম যত্নে অন্নপ্রসাদ, বিশুদ্ধ পানীয় জল ও সুচিকিৎসার সুব্যবস্থা করা হয়েছে। (News copied from- 'হিন্দুস নিউজ') প্রেমতলী বাজার থেকে খেতুরীধাম পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার আলোকোজ্জ্বল পথ যেন ভক্তদের এক স্বর্গীয় অভিজ্ঞতার অনুভূতি দেয়। গোদাগাড়ী উপজেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শত শত সদস্য মোতায়েন করে সামগ্রিক নিরাপত্তা বিধান করছে, যাতে ঈশ্বরপ্রেমী সনাতনী ভক্তদের যাতায়াত ও ধর্মপালন সম্পূর্ণরূপে উৎসবমুখর এবং নির্দ্বিধায় সম্পন্ন হয়। শনিবার পবিত্র গঙ্গাস্নান ও অন্তিম প্রার্থনার মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটবে এই ঐতিহাসিক তিরোভাব উৎসবের।ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, ১৫৩১ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন গড়েরহাট পরগণার প্রখ্যাত জমিদার কৃষ্ণনন্দ দাস মজুমদার ও নারায়ণী রাণীর ঘরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এই মহান সাধক। পার্থিব ধন-সম্পদ ও ভোগবিলাস তুচ্ছ করে তিনি বৃন্দাবনে গিয়ে শ্রীল লোকনাথ গোস্বামীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন এবং বৈষ্ণব তত্ত্বের দীক্ষায় স্নাত হন। পরবর্তীতে নিজ জন্মভূমিতে ফিরে খেতুরীধামে প্রবর্তন করেন অহিংসা, হরিভক্তি ও জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের সমঅধিকারের বার্তা। ১৬১১ খ্রিস্টাব্দের কার্তিক কৃষ্ণা পঞ্চমী তিথিতে তার অপ্রাকট্য বা নিত্যলীলায় প্রবেশের স্মারক হিসেবে যুগ যুগ ধরে প্রজ্জ্বলিত হয়ে আসছে এই তিরোভাবের পুণ্যশিখা। আজকের এই হিংসা ও হানাহানির বিশ্বে ঠাকুর নরোত্তম দাসের প্রেম, অহিংসা ও সনাতনী মানবতাবাদী শিক্ষা সকল জাতির পারস্পরিক সম্মান ও মানবাধিকার সুরক্ষায় এক অনন্য আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করে চলেছে।
প্রকাশক & সম্পাদক: শুভ চন্দ্র দে,🔴HINDUS NEWS মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক ঢাকা থেকে প্রকাশিত।🔴যোগাযোগ: +88 01890890920🔴 ই-মেইল: news@hindus.news 🔴 বিজ্ঞাপন: ads@hindus.news