প্রিন্ট এর তারিখ : ০৭ নভেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৭ নভেম্বর ২০২৬
দীপাবলির মাহাত্ম্য ও ধর্মীয় তাৎপর্য
সৌরভ সাহা , রাঙ্গুনিয়া প্রতিনিধি ||
আলো, আনন্দ, ধর্মীয় বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক চেতনার এক অনন্য উৎসব দীপাবলি। অন্ধকার দূর করে আলোর প্রতিষ্ঠা, অসত্যের ওপর সত্যের জয় এবং অশুভ শক্তির বিনাশের চিরন্তন বার্তা নিয়ে প্রতিবছর কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে উদযাপিত হয় এ উৎসব। ঘরে ঘরে প্রদীপ প্রজ্বালন, আলোকসজ্জা, পূজা-অর্চনা এবং প্রার্থনার মধ্য দিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পালন করেন দীপাবলি। তবে এটি কেবল আলোকসজ্জা কিংবা আনন্দ-উৎসব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সনাতন ধর্মের পৌরাণিক ইতিহাস, আধ্যাত্মিক দর্শন ও মানবিক মূল্যবোধ।
দীপাবলি শব্দটি এসেছে সংস্কৃত 'দীপ' ও 'আবলি' শব্দ থেকে। 'দীপ' অর্থ প্রদীপ এবং 'আবলি' অর্থ সারি। অর্থাৎ দীপাবলি বলতে প্রদীপের সারিকে বোঝায়। এদিন সন্ধ্যায় ঘরে ঘরে প্রদীপ জ্বালানোর মধ্য দিয়ে অন্ধকার দূর করে আলোর আগমনকে স্বাগত জানানো হয়। ধর্মীয় বিশ্বাসে আলো জ্ঞান, পবিত্রতা, সত্য ও শুভ শক্তির প্রতীক; অন্যদিকে অন্ধকার অজ্ঞতা, অন্যায়, হিংসা ও অশুভ প্রবৃত্তির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
দীপাবলির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শ্রীরামচন্দ্রের অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তনের বহুল প্রচলিত পৌরাণিক কাহিনি। রামায়ণ অনুসারে, পিতৃসত্য পালনের জন্য শ্রীরামচন্দ্রকে ১৪ বছর বনবাসে থাকতে হয়েছিল। বনবাসকালে লঙ্কার রাজা রাবণ সীতাকে অপহরণ করলে শ্রীরামচন্দ্র ভাই লক্ষ্মণ ও বানরসেনার সহযোগিতায় রাবণকে পরাজিত করে সীতাকে উদ্ধার করেন।
১৪ বছরের বনবাস শেষে সীতা ও লক্ষ্মণকে সঙ্গে নিয়ে শ্রীরামচন্দ্র অযোধ্যায় ফিরে এলে রাজ্যজুড়ে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। প্রিয় রাজপুত্রের প্রত্যাবর্তনকে স্মরণীয় করে রাখতে অযোধ্যাবাসী ঘরে ঘরে প্রদীপ জ্বালিয়ে নগরী আলোকিত করেন। সেই ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে দীপাবলি আলোর উৎসব হিসেবে বিশেষ পরিচিতি লাভ করে। এ কাহিনি অন্যায় ও অহংকারের বিরুদ্ধে ন্যায়, সত্য ও শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক।
দীপাবলির সঙ্গে সম্পর্কিত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পৌরাণিক ঘটনা হলো নরকাসুর বধ। পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, প্রাগজ্যোতিষপুরের অত্যাচারী অসুর নরকাসুরের অত্যাচারে দেবতা ও সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলেন। তার অত্যাচার থেকে মুক্তি দিতে শ্রীকৃষ্ণ ও সত্যভামা যুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং নরকাসুরকে বধ করেন।
এই ঘটনা অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয় এবং অত্যাচার থেকে মুক্তির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। বিশেষ করে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে নরকাসুর বধের স্মৃতিতে দীপাবলির আগে বা আশপাশের সময়ে নরক চতুর্দশী পালিত হয়।
দীপাবলির অমাবস্যা তিথিতে বহু অঞ্চলে ধন-সম্পদ ও সমৃদ্ধির দেবী লক্ষ্মীর পূজা করা হয়। সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাসে দেবী লক্ষ্মী ঐশ্বর্য, সৌভাগ্য, শ্রী ও সমৃদ্ধির প্রতীক। এদিন ভক্তরা ঘরবাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে প্রদীপ ও আলোকসজ্জায় সাজিয়ে দেবীর আরাধনা করেন।
পূজার মধ্য দিয়ে পরিবারে সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি ও মঙ্গল কামনা করা হয়। তবে ধর্মীয় দর্শনে প্রকৃত সমৃদ্ধি শুধু অর্থ-সম্পদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সৎ উপার্জন, নৈতিকতা, পরিশ্রম, দয়া ও পরোপকারও জীবনের প্রকৃত ঐশ্বর্যের অংশ।
বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দীপাবলির অমাবস্যা তিথিতে শ্যামা বা কালীপূজা অনুষ্ঠিত হয়। দেবী কালীর আরাধনার মধ্য দিয়ে ভক্তরা অশুভ শক্তির বিনাশ, ভয় ও বিপদ থেকে মুক্তি এবং জগতের কল্যাণ কামনা করেন।
সনাতন ধর্মীয় দর্শনে দেবী কালী শক্তি, সাহস, সময় ও অশুভ বিনাশের প্রতীক। তাঁর ভয়ংকর রূপের অন্তরালে রয়েছে জগতের কল্যাণ ও ধর্মের প্রতিষ্ঠার তাৎপর্য। শ্যামাপূজার রাতে মন্দির ও পূজামণ্ডপে বিশেষ পূজা, অঞ্জলি, আরতি, প্রসাদ বিতরণ এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনেক ভক্ত বাড়িতেও প্রদীপ প্রজ্বালন করে দেবীর আরাধনা করেন।
দীপাবলির সবচেয়ে গভীর শিক্ষা নিহিত রয়েছে মানুষের অন্তর্জগৎ আলোকিত করার মধ্যে। বাইরে অসংখ্য প্রদীপ জ্বালানোর পাশাপাশি নিজের মনের অন্ধকার দূর করাও এ উৎসবের অন্যতম প্রধান দর্শন।
মানুষের অন্তরে থাকা লোভ, হিংসা, অহংকার, ক্রোধ, বিদ্বেষ ও অজ্ঞতা জীবনের অন্ধকার হিসেবে বিবেচিত। এসব নেতিবাচক প্রবৃত্তি পরিহার করে সত্য, ন্যায়, ক্ষমা, সহমর্মিতা ও ভালোবাসার চর্চা করার আহ্বান জানায় দীপাবলি।
উপনিষদের বিখ্যাত প্রার্থনা 'তমসো মা জ্যোতির্গময়'—অর্থাৎ অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে চলো। এই আধ্যাত্মিক ভাবনার সঙ্গে দীপাবলির মূল দর্শনের গভীর মিল রয়েছে। প্রদীপের আলো যেমন অন্ধকারকে দূর করে, তেমনি জ্ঞান ও বিবেক মানুষের জীবন থেকে অজ্ঞতা ও অন্যায় দূর করতে পারে।
দীপাবলি শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের কাছেও দিনটির ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক গুরুত্ব রয়েছে।
জৈন ধর্মাবলম্বীদের কাছে দীপাবলি মহাবীরের মোক্ষলাভের স্মৃতিবিজড়িত। তাঁদের বিশ্বাস অনুযায়ী, মহাবীরের নির্বাণলাভের স্মরণে প্রদীপ প্রজ্বালনের ঐতিহ্য গড়ে ওঠে। অন্যদিকে শিখ সম্প্রদায়ের কাছে দীপাবলি 'বন্দী ছোড় দিবস' হিসেবে পরিচিত। এদিন ষষ্ঠ শিখ গুরু গুরু হরগোবিন্দজি মুঘল বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে অমৃতসরে ফিরে এসেছিলেন বলে শিখ সম্প্রদায়ের মধ্যে দিনটি বিশেষভাবে পালিত হয়।
দীপাবলি মানুষের মধ্যে আনন্দ, ভালোবাসা ও সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় করারও একটি উপলক্ষ। পরিবার, প্রতিবেশী ও স্বজনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সমাজে শান্তি ও সহাবস্থানের পরিবেশ গড়ে তোলার শিক্ষা দেয় এ উৎসব।
বর্তমান সময়ে উৎসব উদযাপনে পরিবেশের প্রতিও দায়িত্বশীল থাকার গুরুত্ব রয়েছে। প্রদীপ ও পরিবেশবান্ধব আলোকসজ্জার ব্যবহার, শব্দ ও বায়ুদূষণ এড়িয়ে চলা এবং নিরাপদভাবে উৎসব পালন করা সবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে দীপাবলি কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি সত্য, জ্ঞান, ন্যায়, মানবিকতা ও সম্প্রীতির এক চিরন্তন প্রতীক। প্রদীপের ক্ষুদ্র শিখা যেমন চারপাশের অন্ধকার দূর করে আলো ছড়ায়, তেমনি মানুষের একটি ভালো কাজও অন্যের জীবনে আশার আলো জ্বালাতে পারে।
দীপাবলির মূল শিক্ষা—অসত্যের ওপর সত্যের জয়, অশুভ শক্তির ওপর শুভ শক্তির বিজয় এবং অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করে জ্ঞানের আলোয় জীবনকে আলোকিত করা। মানুষের অন্তরে ভালোবাসা, শান্তি, সহমর্মিতা ও মানবিকতার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার মধ্যেই দীপাবলির প্রকৃত মাহাত্ম্য নিহিত।
প্রকাশক & সম্পাদক: শুভ চন্দ্র দে,🔴HINDUS NEWS মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক ঢাকা থেকে প্রকাশিত।🔴যোগাযোগ: +88 01890890920🔴 ই-মেইল: news@hindus.news 🔴 বিজ্ঞাপন: ads@hindus.news