প্রিন্ট এর তারিখ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬
হিন্দুসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর কথা চিন্তা করে শরিয়াহ আইনের দিকে যাবে না জামায়াত! অবস্থান বদল নাকি ভোটের কৌশল?
||
'জামায়াতে ইসলামী রাষ্ট্র ক্ষমতায় গেলে শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন করবে না!'দলটির এমন অবস্থান ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়েছে। বুধবার জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি দলের পক্ষ থেকে এই বক্তব্য সামনে আসার পর বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। ধর্মভিত্তিক দল হওয়া সত্ত্বেও সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতের নেওয়া কিছু পদক্ষেপকে অনেকে তুলনামূলকভাবে ‘উদার’ হিসেবে দেখছেন। তবে এই অবস্থান আদৌ নীতিগত পরিবর্তন, নাকি আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে কৌশলগত পদক্ষেপ—তা নিয়েই মূলত বিতর্ক।এর আগে জামায়াতে ইসলামী প্রথমবারের মতো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দুইজন প্রার্থীকে জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়। এই সিদ্ধান্ত, পাশাপাশি শরিয়াহ আইন না করার আশ্বাস—সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে, দলটির বক্তব্য ও কার্যক্রম তাদের গঠনতন্ত্র এবং দীর্ঘদিনের আদর্শের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ঢাকার মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। বৈঠক শেষে ন্যাশনাল খ্রিস্টান ফেলোশিপ অব বাংলাদেশের জেনারেল সেক্রেটারি মার্থা দাস গণমাধ্যমকে জানান, জামায়াতের আমির স্পষ্ট করে বলেছেন যে রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে তারা বাংলাদেশে শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন করবেন না। তার ভাষায়, “যদি মহান সৃষ্টিকর্তা ওনাদের এই দেশ পরিচালনার সুযোগ দেন, তাহলে এই বাংলাদেশে শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন করা হবে না।”এই সময় জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়েরও উপস্থিত ছিলেন। পরে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, প্রতিনিধি দলের মূল প্রশ্ন ছিল—জামায়াত সরকার গঠন করলে কোন আইনে দেশ পরিচালিত হবে। তার জবাবে আমির জানিয়েছেন, বাংলাদেশ বিদ্যমান সংবিধান ও আইনি কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হবে, যেখানে সব ধর্মের মানুষের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা নিশ্চিত করা হবে।তবে এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা নিয়ে জামায়াতের ভেতরেই ভিন্ন সুর শোনা গেছে। দলটির আরেক কেন্দ্রীয় নেতা মতিউর রহমান আকন্দ দাবি করেন, আমির শফিকুর রহমান “এই ভাষায়” শরিয়াহ আইন না করার কথা বলেননি। তার মতে, আমির মূলত বলেছেন—আইন প্রণয়ন বা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে জনগণের মতামতই চূড়ান্ত বিবেচ্য হবে। অন্যদিকে এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বিবিসি বাংলাকে বলেন, জামায়াত রাষ্ট্র পরিচালনায় সংবিধান ও বিদ্যমান আইনি কাঠামোকেই অনুসরণ করবে।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, জামায়াতের রাজনীতিতে আগের তুলনায় গুণগত পরিবর্তন এসেছে। দৈনিক নয়াদিগন্তের সম্পাদক ও বিশ্লেষক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবরের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতের বক্তব্যে সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে, যা আগে তেমন ছিল না। তিনি উদাহরণ হিসেবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জামায়াতের সাম্প্রতিক সমাবেশের কথা উল্লেখ করেন। তার মতে, দুইজন হিন্দু প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়াও জামায়াতের রাজনীতিতে এক ধরনের ‘নতুন বন্দোবস্ত’-এর ইঙ্গিত।সালাহউদ্দিন বাবর মনে করেন, বাংলাদেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ হলেও তারা উগ্র ধর্মীয় শাসন চায় না। ফলে শরিয়াহ আইন নিয়ে কঠোর অবস্থান নিলে শুধু সংখ্যালঘু নয়, মুসলমানদের মধ্যেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। জামায়াত সম্ভবত এই বাস্তবতা বুঝতে পেরেই তাদের অবস্থান কিছুটা নমনীয় করছে।অন্যদিকে অনেক বিশ্লেষকই একে সরাসরি নির্বাচনী কৌশল হিসেবে দেখছেন। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌসের মতে, নির্বাচনের আগে ভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংলাপ এবং নরম বক্তব্য দেওয়া প্রায় সব দলেরই একটি সাধারণ কৌশল। তিনি বলেন, এসব বক্তব্যকে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হিসেবেই দেখতে হবে, যার বাস্তবায়ন পরে আদৌ হবে কি না—সে বিষয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ মনে করেন, জামায়াতকে প্রথাগত ইসলামপন্থি রাজনীতির পাশাপাশি আধুনিক বা সংস্কারমুখী ইসলামী রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকেও ব্যাখ্যা করা যায়। তার মতে, দলটি শরিয়াহকে গুরুত্ব দিলেও সরাসরি আইন হিসেবে প্রয়োগের বদলে সংস্কারমূলক ভাষ্য সামনে আনতে পারে।জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দলটি ১৯৪১ সালে সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদীর হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয়। পাকিস্তান আমলে ইসলামি সংবিধানের দাবিতে আন্দোলন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা এবং পরবর্তীতে রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা—সব মিলিয়ে দলটির পথচলা ছিল বিতর্কপূর্ণ। ২০০৮ সালের পর যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হলে দলটি বড় ধরনের রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ে। এরপর ২০১২ সালে নির্বাচন কমিশনের শর্ত পূরণ করতে গিয়ে জামায়াত তাদের গঠনতন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে, যেখানে ‘ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা’-র পরিবর্তে ‘গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা’-র কথা উল্লেখ করা হয়।যদিও ২০১৩ সালে হাইকোর্ট জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল ঘোষণা করে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর দলটি আবারও রাজনীতিতে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। আসন্ন ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে তারা নতুন করে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে বলেই মনে করছেন অনেক পর্যবেক্ষক।তবে সমালোচকরা এটাও উল্লেখ করছেন যে, সব ধর্মের প্রতিনিধিত্বের কথা বলা হলেও এখনো পর্যন্ত জামায়াত কোনো নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়নি। অতীতে নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর মতো মন্তব্যও সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল।সব মিলিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—জামায়াতে ইসলামীর এই অবস্থান কি সত্যিই নীতিগত পরিবর্তনের প্রতিফলন, নাকি কেবল ভোটের অঙ্কে নেওয়া একটি কৌশল? রাজনৈতিক বাস্তবতায় এর উত্তর হয়তো সময়ই দেবে। তবে আপাতত জামায়াতের সাম্প্রতিক বক্তব্য ও পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
প্রকাশক & সম্পাদক: শুভ চন্দ্র দে,🔴HINDUS NEWS মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক ঢাকা থেকে প্রকাশিত।🔴যোগাযোগ: +88 01890890920🔴 ই-মেইল: news@hindus.news 🔴 বিজ্ঞাপন: ads@hindus.news