শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩
হিন্দুস নিউজ
Hindus News Voice of Hinduism
আপনার পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিন Hindus News এ।
Topic Ads 1
সম্পত্তি দান করেও আজীবন ভোগাধিকারের সুযোগ: হিন্দু পরিবারের জন্য সম্ভাবনা ও প্রশ্ন

সম্পত্তি দান করেও আজীবন ভোগাধিকারের সুযোগ: হিন্দু পরিবারের জন্য সম্ভাবনা ও প্রশ্ন

সন্তানকে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও নিজেদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগে থাকেন অনেক মা–বাবা। বিশেষ করে মেয়ের আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আগ্রহী হিন্দু পরিবারগুলোর সামনে প্রায়ই প্রশ্ন আসে—সম্পত্তি দান করার পর বৃদ্ধ বয়সে তাঁদের আশ্রয় ও জীবিকার নিশ্চয়তা থাকবে কি না। সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধনী সেই উদ্বেগ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট আইনজ্ঞরা। তবে এই ব্যবস্থায় হিন্দু নারীর উত্তরাধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে না; সম্পত্তির মালিকের স্বেচ্ছায় দানের সিদ্ধান্তই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।প্রথম আলোয় ২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত তপতী বর্মনের একটি মতামতধর্মী লেখায় সংশোধনীর সম্ভাব্য প্রভাব, আইনজ্ঞদের মূল্যায়ন এবং কয়েকটি হিন্দু পরিবারের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। ওই লেখার তথ্য অনুযায়ী, দান করার পরও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত সম্পত্তির ভোগাধিকার সংরক্ষণের বিধান রেখে গত ৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে দ্য ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল পাস হয়। এই ব্যবস্থার মূল তাৎপর্য হলো, সন্তানকে সম্পত্তি দেওয়ার পরিকল্পনার সঙ্গে দাতার নিজের জীবনকালীন নিরাপত্তার বিষয়টিও যুক্ত করা।সংশোধনীটি হিন্দু পরিবারগুলোর জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করতে পারে। প্রচলিত উত্তরাধিকারব্যবস্থায় অনেক নারী পৈতৃক সম্পত্তির মালিকানা থেকে বঞ্চিত হন। অন্যদিকে স্বামীর সম্পত্তিতে সীমিত অধিকার পাওয়া নারীরাও প্রয়োজনের সময় স্বাধীনভাবে আর্থিক সিদ্ধান্ত নিতে বাধার মুখে পড়েন। ফলে সম্পত্তি থাকা সত্ত্বেও সংকট মোকাবিলায় তাঁদের স্বজনদের ওপর নির্ভর করতে হয়।প্রথম আলোর লেখায় উল্লিখিত সুবর্ণা দেবীর অভিজ্ঞতায় সেই বাস্তবতা উঠে এসেছে। মা–বাবার মৃত্যুর পর তাঁদের সম্পত্তি দুই ছেলের হাতে গেলেও দুই মেয়ে কোনো অংশ পাননি। পরে অল্প বয়সে স্বামীকে হারিয়ে তিন সন্তানকে নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তায় পড়েন সুবর্ণা। স্বামীর সম্পত্তি ভোগ করার অধিকার থাকলেও তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তাঁর আর্থিক স্বাধীনতাকে সংকুচিত করেছে বলে লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়।একই পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সম্পত্তির ব্যবস্থা করতে গিয়েও দেখা দিয়েছে দ্বিধা। সুবর্ণার এক ভাই নিজের দুই মেয়েকে সম্পত্তি দিতে চান, যাতে ভবিষ্যতে তাঁদের একই পরিস্থিতিতে পড়তে না হয়। কিন্তু সম্পত্তি হস্তান্তরের পর নিজের ও স্ত্রীর দেখভাল নিয়ে তাঁর উদ্বেগ রয়েছে। দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণের ব্যবস্থা এমন পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ করতে পারে।ওই লেখায় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী প্রশান্ত কর্মকার ব্যাখ্যা করেছেন, সংশোধনীটি বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রচলিত পারিবারিক উত্তরাধিকার আইনকে প্রতিস্থাপন করছে না। নিজ নিজ উত্তরাধিকারব্যবস্থার পাশাপাশি জীবদ্দশায় সম্পত্তি দান করতে আগ্রহী নাগরিকদের জন্য এটি একটি অতিরিক্ত সুযোগ। অর্থাৎ, কেউ নিজের ভোগাধিকার সংরক্ষণ করে ছেলে বা মেয়েকে সম্পত্তি দিতে চাইলে এই ব্যবস্থার প্রাসঙ্গিকতা তৈরি হবে।আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথও সংশোধনীকে ইতিবাচক হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন বলে মূল লেখায় জানানো হয়েছে। তাঁর মূল্যায়নে, যেসব হিন্দু পরিবারে শুধু মেয়েসন্তান রয়েছে, সেসব পরিবারের জন্য এর বিশেষ উপযোগিতা থাকতে পারে। সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর নিজেদের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়বে—মা–বাবার এমন আশঙ্কা কমাতে দাতার অধিকার সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ।তবে ব্যবস্থাটির প্রয়োগ নিয়ে কিছু প্রশ্নও সামনে এসেছে। প্রথম আলোর লেখায় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন আইনজীবী জীবনকালীন ভোগাধিকারের পরিধি আরও স্পষ্ট করার প্রয়োজনের কথা বলেছেন। দাতা কী ধরনের ব্যবহার ও সুবিধা ভোগ করতে পারবেন, সেই অধিকারে বাধা এলে কীভাবে প্রতিকার পাবেন—এসব বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি। সম্পত্তির পূর্ণ মালিকানা ও ভোগাধিকারকে একই অর্থে বিবেচনা করা হলে পরিবারে নতুন বিরোধ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও থেকে যায়।সংশোধনীর সীমাবদ্ধতা নিয়ে ভিন্ন অভিজ্ঞতার কথাও রয়েছে লেখাটিতে। দীপা সরকার মা–বাবার দৈনন্দিন প্রয়োজন ও অসুস্থতায় পাশে থেকেও বাবার মৃত্যুর পর সম্পত্তির অংশ পাননি। তাঁর অভিজ্ঞতায়, সন্তান হিসেবে দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সম্পত্তিতে স্বীকৃতি পাওয়ার সম্পর্ক সব সময় সমান নয়। দানের ব্যবস্থা স্বেচ্ছাধীন হওয়ায় পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গি না বদলালে অনেক মেয়েই এর সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকতে পারেন বলে তিনি মনে করেন।পূর্ণিমা বসাকের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে সময়মতো সম্পত্তির ব্যবস্থা সম্পন্ন না হওয়ার পরিণতি। তাঁর বাবা ছেলে ও মেয়েকে সমানভাবে সম্পত্তি দিতে চাইলেও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ করার আগেই মারা যান বলে লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর সম্পত্তির অংশ চাওয়া নিয়ে পরিবারের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। মেয়ের বিয়েতে ব্যয় করাকে সম্পত্তি না দেওয়ার যুক্তি হিসেবে তুলে ধরার অভিজ্ঞতাও জানিয়েছেন তিনি।স্ত্রীর এই অভিজ্ঞতা থেকে পূর্ণিমার স্বামী বিধান বসাক নিজের সন্তানদের জন্য আগেই সম্পত্তির ব্যবস্থা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে মূল লেখায় জানানো হয়। তাঁর উদ্দেশ্য, ভবিষ্যতে ছেলে–মেয়ের মধ্যে সম্পত্তি নিয়ে দূরত্ব ও বিরোধের আশঙ্কা কমানো। এমন উদ্যোগে দাতার জীবদ্দশার নিরাপত্তা বজায় রাখার সুযোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হতে পারে।বাংলাদেশ হিন্দু আইন সংস্কার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক পুলক ঘটকও নারীর সম্পত্তির মালিকানাকে নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত করে দেখেছেন। মূল লেখায় তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সম্পত্তিতে অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলে হিন্দু নারীদের সামাজিক ও আর্থিক অবস্থান শক্তিশালী হতে পারে।এসব অভিজ্ঞতা ও মূল্যায়নে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—জীবদ্দশায় স্বেচ্ছায় সম্পত্তি দেওয়ার সুযোগ এবং উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পত্তি পাওয়ার অধিকার পৃথক বিষয়। আলোচিত সংশোধনী প্রথম ক্ষেত্রটিতে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু নিজে থেকেই দ্বিতীয় ক্ষেত্রের বৈষম্য দূর করে না। এর সুফল তাই নির্ভর করবে সম্পত্তির মালিকের সিদ্ধান্ত, পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গি এবং দাতার সংরক্ষিত অধিকার বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে নিশ্চিত হচ্ছে, তার ওপর।তথ্যসূত্র: প্রথম আলোয় প্রকাশিত তপতী বর্মনের মতামত, ‘সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধনী: হিন্দু পরিবার কী সুফল পাবে’, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬।