শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩
হিন্দুস নিউজ
Hindus News Voice of Hinduism
আপনার পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিন Hindus News এ।

ইতিহাস & ঐতিহ্য

নারায়ণগঞ্জের বুক ঘেঁষে শত বছরের ইতিহাস: মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ি

নারায়ণগঞ্জের বুক ঘেঁষে শত বছরের ইতিহাস: মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ি

ঢাকা শহরের ব্যস্ততা থেকে একটু দূরে, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে গেলে দেখা মিলবে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের অনন্য এক স্থাপত্যশৈলী—মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ি। ইতিহাস, রাজকীয় মহিমা আর চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্যের এক অসাধারণ মেলবন্ধন এই শত বছরের প্রাচীন প্রাসাদটি, যা বর্তমানে 'সরকারি মুড়াপাড়া কলেজ' নামেও পরিচিত। ইতিহাসের সূচনা ও রাজকীয় বিস্তার:ব্রিটিশ আমলে জমিদার বাবু রামরতন ব্যানার্জী এই বাড়ির প্রাথমিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পরে তাঁর ছেলে প্রতাপচন্দ্র ব্যানার্জী ১৮৮৯ সালে ভবনের পেছনের অংশ সম্প্রসারণ করে এখানে বসবাস শুরু করেন।পরবর্তীতে ১৮৯৯ সালে প্রতাপচন্দ্রের পুত্র বিজয় চন্দ্র ব্যানার্জী প্রাসাদের সামনের অংশ নির্মাণসহ দুটি সুবিশাল দীঘি খনন করান। সবশেষে ১৯০৯ সালে বিজয় চন্দ্রের দুই সুযোগ্য পুত্র—জগদীশ চন্দ্র ব্যানার্জী ও আশুতোষ চন্দ্র ব্যানার্জী ভবনটিকে দোতলা করে পূর্ণাঙ্গ রাজপ্রাসাদে রূপ দেন। উল্লেখ্য, জগদীশ চন্দ্র ব্যানার্জী পর পর দুইবার দিল্লির 'কাউন্সিল অব স্টেটের' সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন, যা তাঁদের প্রভাব ও পরিচিতি আরও বৃদ্ধি করে।দেশভাগ ও রূপান্তরের গল্প:১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় ব্যানার্জী পরিবার তাঁদের এই সুবিশাল সম্পত্তি ছেড়ে ভারতে চলে যান। এরপর দীর্ঘ সময় বাড়িটি পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকে। ১৯৪৮ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার এর নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং একে হাসপাতাল ও কিশোরী সংশোধন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে।পরবর্তীতে ১৯৬৬ সালে ঐতিহাসিক এই প্রাসাদে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে "মুড়াপাড়া কলেজ" তার যাত্রা শুরু করে। ১৯৮৬ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর একে প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করে। বর্তমানে এটি "সরকারি মুড়াপাড়া কলেজ" হিসেবে একদিকে যেমন জ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছে, অন্যদিকে ভ্রমণপিপাসুদের মনে খোরাক জোগাচ্ছে।যা আপনাকে মুগ্ধ করবে:স্থাপত্যশৈলী: ইউরোপীয় ও ঔপনিবেশিক ধারার এক অপূর্ব মিশ্রণ দেখা যায় এর মূল কাঠামোতে।বিশালতা: সুবিশাল প্রাসাদে রয়েছে প্রায় ৯৫টি কক্ষ এবং রাজকীয় প্রবেশের জন্য দুটি বিশাল সিংহদ্বার।দীঘি ও প্রাঙ্গণ: প্রাসাদের কোল ঘেঁষে থাকা দুটি বড় দীঘি ও সবুজ খোলা প্রাঙ্গণ এক প্রশান্তিময় পরিবেশ তৈরি করে।আপনি যদি ইতিহাসপ্রেমী হন, উইকএন্ডে শর্ট ট্রিপে শান্ত কোনো পরিবেশ খুঁজছেন কিংবা চমৎকার কিছু ছবি তোলার জন্য ব্যাকড্রপ চান—তবে আজই প্ল্যান করে ফেলতে পারেন মুড়াপাড়া জমিদার বাড়িতে।

চুকনগর গণহত্যা: কয়েক ঘণ্টায় রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল চুকনগরের মাটি, প্রাণ হারান হাজারো মানুষ

একটি দিন, মাত্র কয়েকটি ঘণ্টা। অথচ সেই কয়েক ঘণ্টাতেই খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগরের মাটি রঞ্জিত হয়েছিল হাজারো মানুষের তাজা রক্তে। ১৯৭১ সালের ২০ মে সংঘটিত চুকনগর গণহত্যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে। বিভিন্ন বর্ণনা ও গবেষণায় নিহতের সংখ্যা ১০ থেকে ১২ হাজারের বেশি বলে উল্লেখ করা হলেও কোথাও কোথাও এ সংখ্যা ১৫ হাজার পর্যন্ত বলা হয়েছে।১৯৭১ সালের মে মাসে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ ও নির্যাতন থেকে জীবন বাঁচাতে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ ভারতে আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে সীমান্তের দিকে ছুটছিলেন। খুলনা, বাগেরহাট, বরিশাল, ফরিদপুরসহ বিভিন্ন এলাকার নারী, পুরুষ, শিশু ও বৃদ্ধদের একটি বড় অংশ তখন নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে দেশ ছাড়ার চেষ্টা করছিলেন।চুকনগর ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সে সময় শরণার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়েছিল। খুলনা, সাতক্ষীরা ও যশোরের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ভদ্রা ও ঘ্যাংরাইল নদীর সংযোগস্থলের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে ভারতে যাওয়ার পথে বহু মানুষ সেখানে সাময়িকভাবে অবস্থান করছিলেন। ১৮ ও ১৯ মে-র মধ্যে হাজার হাজার শরণার্থী চুকনগর বাজার, পাতখোলা বিল ও আশপাশের মাঠে আশ্রয় নেন।২০ মে সকাল। চুকনগরে তখনও হাজারো মানুষ ভারতের উদ্দেশ্যে যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। আনুমানিক সকাল ১১টার দিকে সাতক্ষীরা দিক থেকে ট্রাকে করে পাকিস্তানি সেনাসদস্যরা চুকনগরে এসে পৌঁছায়। তারা বাজারের পশ্চিম পাশে ঝাউতলা এলাকায় অবস্থান নেয়। এরপর কোনো ধরনের বাছবিচার ছাড়াই জড়ো হওয়া নিরস্ত্র ও অসহায় মানুষের ওপর গুলি চালানো শুরু হয়।ভারী মেশিনগান ও আধা-স্বয়ংক্রিয় রাইফেল দিয়ে চালানো নির্বিচার গুলিতে মুহূর্তের মধ্যে চুকনগরের জনপদ পরিণত হয় মৃত্যুপুরীতে। প্রাণ বাঁচাতে মানুষ যে যেদিকে পারছিলেন ছুটে পালানোর চেষ্টা করেন। অনেকে আতঙ্কে পদদলিত হন, আবার অনেকে গুলির হাত থেকে বাঁচতে পাশের নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েন।হত্যাযজ্ঞের ভয়াবহতায় চুকনগরের চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে অসংখ্য মরদেহ। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায়, নিহত মানুষের রক্ত ও মরদেহে ভদ্রা ও ঘ্যাংরাইল নদীর পানিও রক্তাক্ত হয়ে উঠেছিল। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হাজারো নিরপরাধ মানুষের জীবন নিভে যায়। নিহতদের মধ্যে নারী, শিশু, বৃদ্ধসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ ছিলেন।চুকনগর গণহত্যা শুধু একটি নির্দিষ্ট এলাকার মানুষের ওপর সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ছিল না; এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের পরিচালিত ব্যাপক হত্যাযজ্ঞের ভয়াবহ একটি দৃষ্টান্ত। জীবন বাঁচানোর আশায় সীমান্তের দিকে যাত্রা করা নিরস্ত্র মানুষের ওপর এ ধরনের নির্বিচার হত্যাকাণ্ড মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গভীর ও বেদনাদায়ক স্মৃতি হয়ে আছে। ১৯৭১ সালের ২০ মে চুকনগরের সেই ভয়াবহ দিন আজও ইতিহাসের পাতায় রক্তাক্ত স্মৃতি হয়ে রয়েছে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হাজারো মানুষের প্রাণহানির সেই ঘটনা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অন্যতম গভীর ক্ষত হিসেবে স্মরণ করা হয়। নিহতদের স্মরণে চুকনগর গণহত্যার স্থানটি আজও ইতিহাসের নির্মমতার সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।

চুকনগর গণহত্যা: কয়েক ঘণ্টায় রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল চুকনগরের মাটি, প্রাণ হারান হাজারো মানুষ

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের ৯৪তম আত্মাহুতি দিবস আজ

চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবে ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়ার ৯৪ বছর পূর্ণ হলো আজ। ১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর অভিযান শেষে ব্রিটিশ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মাহুতি দেওয়া বিপ্লবী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের ৯৪তম আত্মাহুতি দিবস আজ।ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে সাহস ও আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবে স্মরণ করা হয় প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে। ১৯৩২ সালের এই দিনে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবে ব্রিটিশবিরোধী অভিযানে নেতৃত্ব দেন তিনি। অভিযান শেষে ফেরার পথে গুলিবিদ্ধ হন প্রীতিলতা। পরে ব্রিটিশ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় পটাশিয়াম সায়ানাইড গ্রহণ করে আত্মাহুতি দেন তিনি।মাস্টারদা সূর্য সেনের ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা প্রীতিলতার জন্ম ১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট ইউনিয়নে। তাঁর বাবা জগদ্বন্ধু ওয়াদ্দেদার চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল অফিসের হেড কেরানি এবং মা প্রতিভা দেবী ছিলেন গৃহিণী।শিক্ষাজীবনেও মেধার স্বাক্ষর রাখেন প্রীতিলতা। ১৯২৭ সালে ডা. খাস্তগীর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কয়েকটি বিষয়ে লেটার মার্কসহ ম্যাট্রিক পাস করেন। পরে ইডেন মহিলা কলেজে পড়ার সময় বিপ্লবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯২৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আইএ পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধাতালিকায় পঞ্চম এবং মেয়েদের মধ্যে প্রথম হন তিনি। পরে কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে দর্শনে স্নাতক সম্পন্ন করেন।শিক্ষাজীবন শেষে নন্দনকানন উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন প্রীতিলতা। পাশাপাশি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে নারী বিপ্লবীদের সংগঠিত ও প্রশিক্ষিত করতেও ভূমিকা রাখেন তিনি।মাত্র ২১ বছর বয়সে জীবনাবসান হলেও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের সাহস ও আত্মত্যাগ ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের ৯৪তম আত্মাহুতি দিবস আজ

কোরআন শরিফের প্রথম বাংলা অনুবাদক গিরিশচন্দ্রের বাড়ির দুয়ারে দখল-আবর্জনা

পবিত্র কোরআন শরিফের প্রথম বাংলা অনুবাদক  গিরিশচন্দ্র সেন। শুধু নরসিংদী বা বাংলাদেশ নয়, গোটা উপমহাদেশেরই একটি অতিপরিচিত নাম। তার প্রধান পরিচয় ইসলাম ধর্মের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআন শরিফ প্রথম বাংলায় অনুবাদক হিসেবে। বাংলা ভাষায় কোরআন শরিফের সার্থক ও পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ তিনিই প্রথম করেন। ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ ও ইসলামে পাণ্ডিত্যের কারণে ‘ভাই’ ও ‘মৌলভী’ তার নামের সঙ্গে যুক্ত।ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে নরসিংদী সদর উপজেলার মেহেরপাড়া ইউনিয়নের পাঁচদোনা গ্রামে ১৮৩৪ সালে এক বিখ্যাত বৈদ্য দেওয়ান বংশে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ১৯১০ সালের ১৫ আগস্ট ঢাকায় তিনি মারা যান। তার ইচ্ছানুযায়ী গ্রামের বাড়ি পাঁচদোনাতে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।সংস্কারের অভাবে আর দখলদারিত্বের চাপে শতবর্ষী বাড়িটি তার পুরোনো ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলেছিল। ২০০৮ সালে বাড়িটির মূল কাঠামো ঠিক রেখে সংস্কারে অনুদান দিতে আগ্রহ প্রকাশ করে ভারতীয় হাইকমিশন। ২০১৫ সালে নরসিংদী জেলা প্রশাসন ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা কেন্দ্র ঐতিহ্য অন্বেষণের মধ্যে এক কোটি ২৮ লাখ টাকায় বাড়িটি সংরক্ষণ ও একটি প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর নির্মাণের চুক্তি হয়। এরপর সরকারের নিয়ন্ত্রণে এবং দিকনির্দেশনায় জাদুঘর সংস্কারের কাজ ২০১৭ সালে সম্পন্ন হয় এবং দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। আর এই জাদুঘরটির নাম রাখা হয় ‘ভাই গিরিশচন্দ্র সেন স্মৃতি জাদুঘর’।বাড়িটি সংস্কারে চুন-সুরকির পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আনা মূল্যবান কাঠ ও টালি ব্যবহার করা হয়েছে। অন্দরমহল সাজানো হয়েছে ব্রিটিশ আমলের আসবাবপত্র দিয়ে। জাদুঘরে গিরিশচন্দ্র সেনের বাস্তুভিটায় আবিষ্কৃত প্রত্নতত্ত্ব এবং তার লেখা বই রাখা হয়েছে। প্রতি সপ্তাহের রোববার ছাড়া অন্য ৬ দিন জাদুঘর সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকে। গ্রীষ্মকালে (এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৬টা এবং শীতকালে (অক্টোবর থেকে মার্চ) সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত।জাদুঘরের তত্ত্বাবধায়ক ও ট্যুরিস্ট গাইড মো. কাউসারুল হক কানন জানান, ভাই গিরিশচন্দ্র সেন ছিলেন ব্রাহ্ম সমাজের সদস্য। রাজা রামমোহন রায় প্রতিষ্ঠা করেন ব্রাহ্ম সমাজ। সতীদাহ প্রথা বিলুপ্ত করার জন্য রামমোহন রায় আন্দোলন গড়ে তোলেন। সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। রামমোহন রায় যখন ১৮৩০ সালে মারা যান, তখন এই সমাজের অনুসারী হন ভাই গিরিশচন্দ্র সেন, কেশবচন্দ্র সেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ আরও অনেকে। তখন এই সমাজ থেকে সভাপতি নির্বাচিত হন কেশবচন্দ্র সেন। কেশবচন্দ্র সেন চারজনকে চারটা ধর্ম নিয়ে রিসার্চ করার জন্য বলেন। ভাই গিরিশচন্দ্র সেনের ভাগে পড়ে পবিত্র কোরআন। তারপরই তিনি কোরআনের অনুবাদটা করেন। অনুবাদ করতে সময় লাগে ১৮৮১ থেকে ১৮৮৫ সাল পর্যন্ত।ব্রাহ্ম সমাজের নেতারা বলতেন, প্রত্যেক ধর্মের মধ্যে একটি সাধারণ সত্য আছে এবং প্রত্যেক ধর্মের মধ্যে একটি ভালো কথা আছে; যেমন আমরা জানি মুসলমান ধর্মের মধ্যে সুদ, ঘুষ ইত্যাদি হারাম। হিন্দু ধর্মের মধ্যেও অনেক কিছু নিষেধ। এজন্যই তারা প্রতিটি ধর্মের মধ্যে যে ভালো ভালো দিক আছে, সেগুলো নিয়ে একটি নতুন ধর্ম তৈরি করেন। যেটার নাম দেওয়া হয় ব্রাহ্মধর্ম।জাদুঘরে গিরিশচন্দ্র সেনের ব্যবহৃত কোনো জিনিস আছে কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, চিনামাটির থালাবাটি ওই সময়ের। তবে উনার ব্যবহৃত না। এটি যেহেতু একটি জমিদারবাড়ি, আর জমিদারবাড়িতে যেমন জিনিসপত্র ব্যবহার করত, ওই সময়ের জিনিসপত্র দিয়ে এ জাদুঘরটি করা হয়েছে।সম্প্রতি জাদুঘরটি চরম অযত্নের মুখে পড়েছে। পাঁচদোনার মেহেরপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, জাদুঘরটির সামনের রাস্তা দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে রিকশার গ্যারেজ। সেখানে তৈরি করা হয় ব্যাটারিচালিত রিকশা। এ রিকশা তৈরি করতে প্রতিনিয়ত শ্রমিকরা রাস্তার ওপর রিকশার বিভিন্ন যন্ত্রাংশে ঝালাই করছেন এবং যন্ত্রাংশ রেখে রাস্তা বন্ধ করে রেখেছেন। তবে এসব ব্যাপারে কথা বলতে নারাজ রিকশার গ্যারেজের মালিকরা। এছাড়াও রাস্তার দুপাশেই মানুষের মলমূত্রসহ ময়লা-আবর্জনার স্তূপ পড়ে রয়েছে।জাদুঘরের ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, দোতলা বাড়িটিতে ব্যালকনিসহ ৬টি কক্ষ রয়েছে। এর মধ্যে নিচতলায় একটি ব্যালকনি ও দুটি কক্ষ এবং ওপরের তলায় একটি ব্যালকনি ও দুটি কক্ষ।নিচতলার প্রথমেই রয়েছে একটি রিসিপশন কক্ষ, পরের কক্ষটা (ব্যালকনি) ভাষা গ্যালারি, পরের কক্ষটিতে ১৯ শতকের ব্যবহৃত জিনিসপত্র রাখা। বাড়ির পেছন দিয়ে সিঁড়ির মাধ্যমে দ্বিতীয় তলায় উঠতে হয়। সিঁড়ি বেয়ে দ্বিতীয় তলায় উঠলে প্রথমে একটি বিশ্রামকক্ষ, পরেরটি ব্যালকনি যেখানে মুক্তিযুদ্ধ গ্যালারি এবং পরের কক্ষটি বিশ্রামের জন্য। এসব কক্ষে নব্বই দশকে ব্যবহৃত তামা, কাঁসা ও চিনামাটির থালাবাটি, মুড়ির টিন, হ্যাজাক লাইট, হারিকেন, খড়ম (কাঠের জুতা), দোয়াত, ময়ূরের পাখনার কলম, রেডিও, কাপড় রাখার টাং এবং আসবাবপত্রের মধ্যে রয়েছে- খাট, পালং, কাঠের আলনা, আলমারি, টেবিল ইত্যাদি। এছাড়া বাংলায় অনুবাদ করা পবিত্র কোরআন, গিরিশচন্দ্রের জীবন সম্পর্কে বিভিন্ন বই, ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে বইসহ ইত্যাদি সংরক্ষণে রয়েছে। দর্শনার্থীরা চাইলে বইগুলো পড়তে পারবেন।জাদুঘর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গিরিশচন্দ্র সেনের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৩৩টি। তার মধ্যে বাংলায় পবিত্র কোরআনের অনুবাদসহ ইসলাম ধর্মবিষয়ক গ্রন্থ ২২টি।পরিদর্শনে আসা ওসমান গণি খান নামে এক কলেজ শিক্ষার্থী বলেন, ভাই গিরিশচন্দ্র সেনের বাড়িতে আসার জন্য ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক থেকে যে গলি রাস্তাটি করা হয়েছে, তা এখন দখল করে রাখা হয়েছে। রাস্তার ওপর রিকশা তৈরি ও মেরামত করা হচ্ছে। এতে রাস্তা দিয়ে আসতে আমাদের সমস্যা হচ্ছে।ইডেন মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী সাদিয়া আক্তার বলেন, ইতিহাস-ঐতিহ্যের অন্বেষণে প্রতি বছর অসংখ্য লোক এ মহামানবের স্মৃতিচিহ্ন দেখতে আসেন নরসিংদীতে। তবে বাড়ির চারপাশ অপরিষ্কারসহ নানা অব্যবস্থাপনা রয়েছে। সরকারি তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী আতিকা খান মারিয়া বলেন, আমরা পাঠ্যপুস্তকে গিরিশচন্দ্র সেনকে কোরআনের বাংলা অনুবাদক হিসেবে জেনেছি। কিন্তু এ মহান ব্যক্তির বাড়ি নরসিংদীতে হওয়া সত্ত্বেও তার জীবন ও কৃতকর্ম সম্পর্কে তেমন জানা সম্ভব হয়নি। আমরা সরকারের কাছে আশা করব, এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে।মেহেরপাড়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের উপসহকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন জানান, গিরিশচন্দ্র সেনের ভিটি বাড়িটি মূলত ১.৩৬ শতাংশের। পরে ভিটি বাড়িটির চারপাশে আরও ১.৫৮ শতাংশ জমি অধিগ্রহণ করা হয়। পরে সরকার বাড়ির সামনে আরও ২.৪৬ শতাংশ ভূমি অধিগ্রহণ করার উদ্যোগ গ্রহণ করে এবং বর্তমানে অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া প্রায় সম্পন্ন। জমি অধিগ্রহণের পর গিরিশচন্দ্র সেনের ভিটি বাড়িটির পরিমাণ হবে ৫.৪০ শতাংশ।এ ব্যাপারে নরসিংদী জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ইসরাত জাহান কেয়া বলেন, ভাই গিরিশচন্দ্র সেন জাদুঘরটি নরসিংদী জেলার জন্য একটি ব্র্যান্ডিং। এটি নরসিংদীর একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে এটা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এ ছাড়া জাদুঘরটি আরও সমৃদ্ধ করতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কাজ করে যাচ্ছে। পাশাপাশি নরসিংদী জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হচ্ছে।দর্শনার্থী যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে জাদুঘরটি পরিদর্শন করতে পারেন, সে জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এ ছাড়া চারপাশের যে অব্যবস্থাপনার কথা জানিয়েছেন, সে ব্যাপারেও দ্রুতই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে

কোরআন শরিফের প্রথম বাংলা অনুবাদক গিরিশচন্দ্রের বাড়ির দুয়ারে দখল-আবর্জনা

বাবার এজলাস থেকে আপিল বিভাগ: সব বাধা পেরিয়ে ইতিহাস গড়া প্রথম হিন্দু নারী বিচারক কৃষ্ণা দেবনাথ

​বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ও গৌরবোজ্জ্বল নাম বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ। শৈশবে বাবার বিচারকক্ষের সেই ছোট্ট অভিজ্ঞতা থেকে শুরু করে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আপিল বিভাগ পর্যন্ত তাঁর এই দীর্ঘ চার দশকের যাত্রা শুধু কোনো ব্যক্তিগত অর্জনের গল্প নয়; বরং এটি সংখ্যালঘু সনাতনী সম্প্রদায়, নারী সমাজ এবং সার্বিক মানবাধিকার রক্ষায় প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে এক অদম্য সংগ্রামের মহাকাব্য। বাংলাদেশের প্রথম হিন্দু নারী বিচারক হিসেবে বিচারালয়ে সত্য ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান দেশের বিচারাঙ্গনে এক অনন্য মাইলফলক হয়ে থাকবে।​১৯৫৫ সালের ১০ অক্টোবর রাজবাড়ীর এক সম্মানিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন কৃষ্ণা দেবনাথ। তাঁর বাবা দীনেশ চন্দ্র দেবনাথ ছিলেন বিচার বিভাগের একজন নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা। বাবার বদলির চাকরির সুবাদে দেশের বিভিন্ন জেলায় কেটেছে তাঁর শৈশব। খুব ছোটবেলাতেই বাবার এজলাসে বসে বিচার কার্যক্রম গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পান তিনি। সেই বয়স থেকেই মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার আকুলতা এবং বিচারপীঠের মর্যাদা দেখে তাঁর মনে বিচারক হওয়ার সুপ্ত স্বপ্ন জেগে ওঠে। সেই স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিতেই পরবর্তীতে নিজের পড়াশোনার গতিপথ নির্ধারণ করেন তিনি। ১৯৭০ সালে সিলেট গার্লস স্কুল থেকে বিজ্ঞান বিভাগে কৃতিত্বের সাথে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করলেও বিচারক হওয়ার লক্ষ্যে উচ্চমাধ্যমিকে মানবিক বিভাগে ভর্তি হন এবং রংপুরের বেগম রোকেয়া কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে তা সম্পন্ন করেন। এরপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী আইন বিভাগ থেকে বি.জুর ও এম.জুর ডিগ্রি অর্জন করে শুরু করেন তাঁর আইনি যাত্রা। রাজশাহী জেলা আইন সমিতিতে প্রাকটিস শুরু করার মাধ্যমে আইন পেশায় যুক্ত হন তিনি।​আইন পেশায় মাত্র এক বছর পার করার পর, ১৯৮১ সালের ৮ ডিসেম্বর মাত্র ২৬ বছর বয়সে জুডিশিয়াল সার্ভিসে মুনসেফ (বর্তমান সহকারী জজ) হিসেবে যোগ দেন কৃষ্ণা দেবনাথ। তবে একজন সংখ্যালঘু হিন্দু নারী হিসেবে দেশের বিচার বিভাগে এই পথচলা মোটেই সহজ বা মসৃণ ছিল না। কর্মজীবনের মোড়ে মোড়ে তাঁকে মুখোমুখি হতে হয়েছিল নানা বৈষম্য ও প্রতিকূলতার। ১৯৯২ সালে সাবজজ থেকে অতিরিক্ত জেলা জজ হিসেবে তাঁর পদোন্নতি রহস্যজনকভাবে আটকে দেওয়া হয়। সুপ্রিম কোর্টের ফুল কোর্ট সভায় পরপর তিনবার পদোন্নতির জোরালো সুপারিশ করা সত্ত্বেও তা কার্যকর করা হয়নি। (News copied from- 'হিন্দুস নিউজ') একের পর এক প্রশাসনিক অবহেলা ও বৈষম্যে গভীরভাবে ব্যথিত হয়ে তিনি একপর্যায়ে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত পর্যন্ত নিয়েছিলেন, এমনকি সঙ্গে পদত্যাগপত্রও প্রস্তুত রাখতেন। কিন্তু ন্যায়ের পথে অটল কৃষ্ণা দেবনাথ হাল ছাড়েননি। সেই কঠিন দিনগুলোতে পরিবার এবং দেশের জ্যেষ্ঠ নীতিবান আইনজীবীরা তাঁর পাশে এসে দাঁড়ান। অবশেষে দীর্ঘ অপেক্ষার পর ১৯৯৪ সালে অতিরিক্ত জেলা জজ এবং ১৯৯৮ সালে জেলা জজ হিসেবে পদোন্নতি পান তিনি।​তাঁর এই সুদীর্ঘ কর্মময় যাত্রায় পারিবারিক সমর্থন ও আত্মত্যাগ ছিল অপরিসীম। ১৯৮১ সালে বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী স্বপন দত্তের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। সরকারি চাকরির বদলিজনিত কারণে তাঁকে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় যেতে হলেও, দুই কন্যা—ড. আনন্দী কল্যাণ ও ড. ইন্দিরা কল্যাণের সঠিক লালন-পালন ও শিক্ষার দায়িত্ব সুচারুভাবে সামলেছেন তাঁর স্বামী ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। পিতা-মাতার এই আদর্শের পথ ধরেই তাঁর দুই কন্যা পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় নিয়োজিত হন।​বিচারিক দক্ষতায় অনন্য কৃষ্ণা দেবনাথ ২০১০ সালের ১০ জানুয়ারি ঢাকা জেলার প্রথম নারী জেলা জজ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। এরপর তাঁর কর্মদক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে একই বছরের ১৮ এপ্রিল হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারক এবং ২০১২ সালের ১৫ এপ্রিল হাইকোর্ট বিভাগে স্থায়ী বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান। পরবর্তীতে ২০২২ সালের ৯ জানুয়ারি আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে শপথ গ্রহণের মাধ্যমে তিনি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপীঠে আসন গ্রহণ করেন এবং আপিল বিভাগের তৃতীয় নারী বিচারপতি হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।​ধৈর্য, সততা ও পেশাগত নিষ্ঠাকে সাফল্যের মূলমন্ত্র মেনে চলা বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ সর্বদা জুনিয়র বিচারকদের সততার নীতিতে অবিচল থাকার পরামর্শ দিতেন। বৈষম্য ও বাধা সত্ত্বেও নিষ্ঠা ধরে রাখলে যে সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানো সম্ভব, তা নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন তিনি। বাংলাদেশের বিচারালয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের স্বাধিকার, মানবাধিকার ও নারী অগ্রযাত্রার এক আলোকবর্তিকা হয়ে চিরকাল অনুপ্রেরণা জুগিয়ে যাবে কৃষ্ণা দেবনাথের এই ঐতিহাসিক পথচলা।

বাবার এজলাস থেকে আপিল বিভাগ: সব বাধা পেরিয়ে ইতিহাস গড়া প্রথম হিন্দু নারী বিচারক কৃষ্ণা দেবনাথ

পরমেশ্বর শিবের ধাম কৈলাস: যে টানে ছুটে যান চার ধর্মের মানুষ

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪ হাজার ৬০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত নীল জলরাশির মানস সরোবর এবং তার কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা ৬ হাজার ৬৩৮ মিটার উঁচু তুষারাবৃত কৈলাস পর্বত বিশ্বজুড়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে এক পরম পবিত্র ও অলৌকিক ধাম। একই সাথে বৌদ্ধ, জৈন ও প্রাচীন তিব্বতি বন ধর্মের অনুসারীদের কাছেও এটি এক অপার আধ্যাত্মিকতার প্রতীক। সম্প্রতি এই দুর্গম অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে কয়েকজন তীর্থযাত্রী নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার পর আবারও নতুন করে আলোচনায় এসেছে এই মহাশূন্যতুল্য পুণ্যভূমি। ধর্মীয় স্বাধীনতা ও বিশ্ব মানবজাতির আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য রক্ষার তাগিদেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার পুণ্যার্থী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই তীর্থপথে পা বাড়ান।​সনাতন শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, কৈলাস পর্বত হলো পরমেশ্বর ভগবান শিব ও জগৎজননী দেবী পার্বতীর পবিত্র আবাসস্থল। পাশে অবস্থিত মানস সরোবরের নির্মল জল সনাতনী সংস্কৃতিতে অত্যন্ত পবিত্র বলে বিবেচিত, যা পূজার্চনা ও আত্মশুদ্ধির কাজে ব্যবহৃত হয়। তিব্বতি বৌদ্ধ ঐতিহ্যে এই পর্বতটি 'কাং রিনপোচে' বা 'তুষারের রত্ন' নামে পরিচিত এবং এটিকে মহাবিশ্বের কেন্দ্র হিসেবে গণ্য করা হয়। জৈন ধর্মাবলম্বীদের মতে, তাদের প্রথম তীর্থঙ্কর ভগবান ঋষভদেব এই কৈলাসেই পরম নির্বাণ লাভ করেছিলেন। (News copied from- 'হিন্দুস নিউজ') তিব্বতের প্রাচীন বন ধর্মের অনুসারীদের কাছেও এটি এক পরম প্রার্থনার স্থান। চার ধর্মের আচার-অনুষ্ঠান ও পথ আলাদা হলেও, পরম সত্তার প্রতি ভক্তি ও আত্মিক মুক্তির জায়গায় এই স্থানটি বিশ্ব মানবজাতির এক অভূতপূর্ব ধর্মীয় সহাবস্থানের নিদর্শন গড়ে তুলেছে।​ভৌগোলিক দিক থেকেও এই অঞ্চলের গুরুত্ব অপরিসীম। জাতিসংঘের ইউনেস্কোর তথ্য মতে, কৈলাস-মানস সরোবর অঞ্চল থেকেই এশিয়ার প্রধান চারটি নদী—সিন্ধু, শতদ্রু, ব্রহ্মপুত্র ও কর্ণালীর উৎপত্তি হয়েছে। তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে অবস্থিত এই পবিত্র ভূমিতে প্রবেশের জন্য কঠোর ভূরাজনৈতিক বিধিনিষেধ রয়েছে। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের পুণ্যার্থীদের নেপাল হয়ে বিশেষ অনুমতিপত্রের মাধ্যমে অতি দুর্গম পথ অতিক্রম করে সেখানে পৌঁছাতে হয়। তীব্র ঠান্ডা, অক্সিজেনের স্বল্পতা, আকস্মিক ভূমিধস এবং দীর্ঘ ৫২ কিলোমিটারের 'কোরা' বা পর্বত প্রদক্ষিণের পথ অত্যন্ত কঠিন হলেও, সনাতনী ভক্তি ও বিশ্ব মানবতার আধ্যাত্মিক আকুলতা সব প্রাকৃতিক ও কূটনৈতিক বাধাকে জয় করে চলেছে।

পরমেশ্বর শিবের ধাম কৈলাস: যে টানে ছুটে যান চার ধর্মের মানুষ

দেড় লাখ দিয়াশলাই কাঠি ও রেশমি সুতায় মহালয়ার আগে ফুটে উঠলেন দেবী দুর্গা

বাংলার আবহমান সনাতনী ঐতিহ্যে শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত প্রতিমা শিল্পীরা। প্রতিটি মণ্ডপে চলছে দেবী দুর্গার অনন্য রূপ ফুটিয়ে তোলার নিরন্তর প্রচেষ্টা। তবে এবারের দুর্গোৎসবে বিশেষ এক আকর্ষণ তৈরি হয়েছে সাতক্ষীরার ব্রহ্মরাজপুর সর্বজনীন দুর্গাপূজা মন্দিরে। যেখানে মাটির ছোঁয়া ছাড়াই কেবল দিয়াশলাই কাঠি ও রেশমি সুতার নিখুঁত বুননে ফুটে উঠছে দেবী দুর্গার রূপ। এমন ব্যতিক্রমী ও উদ্ভাবনী প্রচেষ্টা একদিকে যেমন শৈল্পিক নান্দনিকতাকে তুলে ধরছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের সনাতনীদের সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের প্রতি তাদের অবিচল নিষ্ঠাকে উজ্জ্বল করে তুলছে।​সনাতনী রীতিনীতি অনুযায়ী প্রতি বছর মা, খড় ও বাঁশের মাধ্যমে দুর্গা প্রতিমা তৈরি করা হলেও ব্রহ্মরাজপুরের আয়োজকরা এবার বেছে নিয়েছেন একেবারে ভিন্ন মাধ্যম। গত বছর একশো কেজি চিনিগুঁড়া চাল দিয়ে তৈরি প্রতিমা ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছিল, এবার তারা দেড় লাখেরও বেশি দিয়াশলাই কাঠি এবং প্রায় দশ কেজি রেশমি সুতা ব্যবহার করে এই অনন্য কাজটি করছেন। এটি কেবল একটি সৃজনশীল প্রয়াসই নয়, বরং সনাতনী সংস্কৃতির প্রতি তাদের বিশেষ শ্রদ্ধা ও উৎসর্গকেও প্রকাশ করে।​চারজন দক্ষ প্রতিমা শিল্পী গত কয়েক মাস ধরে দিনরাত পরিশ্রম করে অত্যন্ত নিখুঁত কারুকাজের মাধ্যমে প্রতিটি দিয়াশলাই কাঠি ও সুতার বুননে দেবীর ভিন্ন ভিন্ন রূপ গড়ে তুলেছেন। প্রতিটি আঙ্গিককে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সাজানো হচ্ছে, যা দর্শকদের জন্য এক অনন্য আধ্যাত্মিক ও শৈল্পিক অভিজ্ঞতা দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই মন্দির কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শিল্পীদের পারিশ্রমিক ও উপকরণের ব্যয় মিলিয়ে আনুমানিক পাঁচ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে এই প্রতিমা তৈরিতে। এটি সাতক্ষীরা জেলার পাশাপাশি পুরো বাংলাদেশের সনাতনী সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি উদাহরণের সৃষ্টি করবে।​(News copied from- 'হিন্দুস নিউজ')​এই ব্যতিক্রমী প্রতিমা দেখার জন্য শুধু স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীরাই নন, বরং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটক ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা আসবে বলে মন্দির কর্তৃপক্ষ আশা প্রকাশ করছে। এই ধরনের অভিনব আয়োজনের মাধ্যমে তারা আশা করেন যে, সনাতনী সংস্কৃতি ও ধর্মের প্রতি বিশেষ বার্তা দেওয়া যাবে। দিয়াশলাই কাঠি ও সুতার সংমিশ্রণে দেবীর দশভুজা রূপে দুর্গার মূর্তি এক অনন্য শিল্পের নিদর্শন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। এছাড়া দাহ্যতা নিয়ে সচেতনতার অংশ হিসেবে মন্দির কর্তৃপক্ষ বিশেষ কেমিক্যাল ব্যবহার করে আগুনের ঝুঁকি কমিয়ে এনেছে। ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে এর কার্যকারিতাও যাচাই করা হয়েছে।​শারদীয় দুর্গোৎসব মানেই নতুনত্ব আর আনন্দের উৎসব। ব্রহ্মরাজপুরের এই ব্যতিক্রমী আয়োজন সেই আনন্দে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে বিশ্বাস সনাতনী সম্প্রদায়ের। এই ধরনের সাহসী ও অভিনব উদ্যোগ বাঙালি সনাতনীদের সৃজনশীলতা ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের উজ্জ্বল স্বাক্ষর হয়ে থাকবে।

দেড় লাখ দিয়াশলাই কাঠি ও রেশমি সুতায় মহালয়ার আগে ফুটে উঠলেন দেবী দুর্গা

নওগাঁ পোরশা কানাপাড়া পুকুর থেকে ২০ কেজি কষ্টিপাথরের শ্রী বিষ্ণুমূর্তি উদ্ধার

নওগাঁ জেলার পোরশা উপজেলায় প্রায় ২০ কেজি ওজনের একটি কষ্টিপাথর সদৃশ হিন্দু ধর্মীয় দেবতার মূর্তি উদ্ধার করেছে পুলিশ।মঙ্গলবার বিকাল আনুমানিক সারে ৩ টার সময় স্থানীয় লোকজন মোবাইল ফোনে পোরশা থানার অফিসার ইনচার্জকে জানান যে, থানাধীন ঘাটনগর ইউনিয়নের ঘাটনগর কানা পাড়া গ্রামের কুজা পুকুরের পশ্চিম পাশে পানির ধারে কাদামাটির নিচে একটি মূর্তি পড়ে আছে।সংবাদ পেয়ে পুলিশ সুপার নওগাঁ মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামের নির্দেশে পোরশা থানার অফিসার ইনচার্জ পুলিশ ফোর্স নিয়ে বিকাল আনুমানিক ৪:০৫টায় ঘটনাস্থলে যান। সেখানে কাদামাটির নিচে পরিত্যক্ত অবস্থায় মূর্তিটি দেখতে পাওয়া যায়। উপস্থিত সাক্ষীদের সামনে মূর্তিটি উদ্ধার করে জব্দ করা হয়।উদ্ধারকৃত মূর্তিটির উচ্চতা আনুমানিক বড ২৫ ইঞ্চি, প্রস্থ ১১ ইঞ্চি এবং ওজন প্রায় ১৯ কেজি ৮০০ গ্রাম। এর আনুমানিক মূল্য ১০ লক্ষাধিক টাকা। বর্তমানে মূর্তিটি পোরশােয থানায়েযে সংরক্ষিত রয়েছে। এ বিষয়ে পরবর্তীযেে আইনগত কার্যক্রমে চলমান।

নওগাঁ পোরশা কানাপাড়া পুকুর থেকে ২০ কেজি কষ্টিপাথরের শ্রী বিষ্ণুমূর্তি উদ্ধার

বগুড়ায় বিষ্ণুমূর্তির পাদদেশে মিলেছে প্রাচীন গৌড়ীয় লিপির খোদাই

বগুড়ায় পাওয়া বিষ্ণুমূর্তির পাদদেশে মিলেছে প্রাচীন গৌড়ীয় লিপির খোদাই। সংস্কৃত ভাষায় লেখা এ লিপি মূর্তিটির ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরছে। গবেষকদের মতে, একই বৈশিষ্ট্যের বহু বিষ্ণুমূর্তি থাকলেও এমন লিপিসহ নিদর্শন বিরল। গত ডিসেম্বরে উদ্ধার হওয়া মূর্তিটি এখন সংরক্ষিত আছে মহাস্থান প্রত্নতত্ত্ব জাদুঘরে।  পাল যুগের বিষ্ণুমূর্তি বাংলার প্রাচীন ভাস্কর্য ও প্রত্নঐতিহ্যের অনন্য নিদর্শন। সম্প্রতি বগুড়ার মহাস্থান জাদুঘরে থাকা মূর্তিটির পাদদেশের দুই লাইনের গৌড়ীয় লিপি থেকে জানা যায়, আনুমানিক ১০৪০ খ্রিস্টাব্দে শ্রী অগতভদ্র এটি প্রতিষ্ঠা করেন। নিচে খোদাই করা আছে প্রতিষ্ঠাতা ও তার স্ত্রীর ক্ষুদ্র প্রতিকৃতিও।মহাস্থানগড় প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর কাস্টোডিয়ান রাজিয়া সুলতানা বলেন, ‘আনুমানিক ১০৪০ খ্রিস্টাব্দে শ্রী অগতভদ্র এটি প্রতিষ্ঠা করেন। নিচে খোদাই করা আছে প্রতিষ্ঠাতা ও তার স্ত্রীর ক্ষুদ্র প্রতিকৃতিও।’প্রত্নতাত্বিক গবেষক মুকন্ত বিশ্বাস বলেন, ‘নয়পালদেবের রাজত্বকাল ১০৩৫ থেকে ১০৫০ খ্রিস্টাব্দ। মূর্তিটি তার রাজত্বের পঞ্চম বছরে অর্থাৎ ১০৪০ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করা হয়।’রাজশাহী প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক এ কে এম সাইফুর রহমান বলেন, ‘মহাস্থান প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরের এ মূর্তি শুধু গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন নয়, বরং বরেন্দ্র অঞ্চলে পাল আমলের শিল্প, ধর্মীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও লিপিচর্চার মূল্যবান নিদর্শন।’মহাস্থান প্রত্নতত্ত্ব জাদুঘরে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে ৬টি বিষ্ণুমূর্তি। এছাড়া স্টোরেও সংরক্ষিত আছে বিভিন্ন আকার ও ওজনের আরও বেশ কয়েকটি বিষ্ণুমূর্তি।

বগুড়ায় বিষ্ণুমূর্তির পাদদেশে মিলেছে প্রাচীন গৌড়ীয় লিপির খোদাই

​৩০০ বছরের পোড়ামাটির ইতিহাস: শিল্প ও মানবতাবোধের অমর প্রতীক দিনাজপুর কান্তজিউ মন্দির

দিনাজপুরের কান্তনগরে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কান্তজিউ মন্দির কেবল এক সনাতনী ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, এটি সনাতন সংস্কৃতির ঐতিহ্য, বাংলার অনন্য টেরাকোটা শিল্প এবং মানবাতাবোধের এক মহাকাব্যিক রূপ। ১৭০৪ খ্রিস্টাব্দে মহারাজা প্রাণনাথ রায় এই স্থাপত্যের সূচনা করেছিলেন, যা পরবর্তীতে তাঁর পোষ্যপুত্র মহারাজা রামনাথ রায়ের হাত ধরে ১৭৫২ সালে পূর্ণতা পায়। শ্রীকৃষ্ণ ও রুক্মিণী দেবীর উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত এই মন্দিরটির বাইরের দেয়ালজুড়ে ১৫ হাজারেরও বেশি পোড়ামাটির ফলকে অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে রামায়ণ, মহাভারত, কৃষ্ণলীলার পুণ্যময় আখ্যান। এর পাশাপাশি স্থান পেয়েছে তৎকালীন বাংলার রাজদরবার, শিকার, যুদ্ধ ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, যা প্রায় তিনশ বছরের বাঙালির ইতিহাসকে সজীব করে রেখেছে। ঐতিহ্যবাহী এই নবরত্ন মন্দিরের নয়টি শিখর ১৮৯৭ সালের প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়ে গেলেও এর আধ্যাত্মিক ও শৈল্পিক মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রয়েছে। (News copied from- 'হিন্দুস নিউজ')স্থাপত্যের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত গড়ে এই মন্দির নির্মাণে কাজ করেছিলেন পারস্যের কারিগরেরা, যাদের নামাজের সুবিধার্থে কাছেই নির্মিত হয় ঐতিহাসিক নয়াবাদ মসজিদ, যা একই সাথে ভিন্ন ধর্মের সহাবস্থান ও সর্বজনীন মানবাধিকারের এক অনবদ্য প্রতীক। প্রতিবছর শীতের শুরুতে এখানকার ঐতিহ্যবাহী রাস মেলায় বাংলাদেশ ও ভারত থেকে ছুটে আসা সব ধর্মের হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মানুষের মেলবন্ধন প্রমাণ করে এর চিরন্তন আবেদন। সম্প্রতি ২০২৫ সালে বাংলাদেশের ২০ টাকার নোটে স্থান পেয়ে মন্দিরটি তার জাতীয় ও বৈশ্বিক গুরুত্বের নতুন স্বীকৃতি লাভ করেছে, যা মনে করিয়ে দেয় যে সময় বহু কিছু গ্রাস করলেও সত্য, শিল্প এবং বাঙালির মূল ধারার ইতিহাসকে কখনো মুছে ফেলা যায় না।

​৩০০ বছরের পোড়ামাটির ইতিহাস: শিল্প ও মানবতাবোধের অমর প্রতীক দিনাজপুর কান্তজিউ মন্দির

রাজা জয়নারায়ণের স্মৃতিধন্য হাটকেশ্বর শিবমন্দির: সংরক্ষণের অভাবে চরম জীর্ণদশা

সিলেট অঞ্চলের প্রাচীন সনাতন ধর্মের ঐহিত্যবাহী ধারক, সেনগ্রামের ঐতিহাসিক হাটকেশ্বর শিবমন্দির আজ চরম অবহেলা ও ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। প্রাচীন শ্রীহট্টের গৌড় রাজ্যের সমৃদ্ধির অংশ এই মন্দিরটির বর্তমান অবস্থা খুবই শোচনীয়। রাজা গৌড়গোবিন্দের আমল থেকে শুরু করে মুঘল যুগের কিংবদন্তি জড়ানো এই তীর্থস্থানটি নদী ভাঙনের কবলে পড়ে এখন ধসে পড়ার উপক্রম হয়েছে, যা প্রতিটি সনাতন ধর্মাবলম্বীর হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছে। মন্দিরটির জীর্ণ অবস্থা স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান; এর কাঠামোটি ভেঙে এবং হেলে পড়ে নদীর ঘোলা পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। ছাদের উপরে বিশাল বিশাল গাছপালা ও আগাছা জন্মেছে, যা ভবনটিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। জানালার লোহার গ্রিলগুলো মরচে পড়া ও নড়বড়ে। নদীর পাড়ের ক্রমাগত ভাঙনের ফলে মন্দিরটির আশেপাশের কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেই, যার ফলে এটি যে কোনো মুহূর্তে সম্পূর্ণ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। স্থানীয়রা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এই অমূল্য সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যটি চিরতরে হারিয়ে যাবে।​(News copied from- 'হিন্দুস নিউজ')​ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী, রাজা গৌড়গোবিন্দের পতনের পর দীর্ঘদিন হাটকেশ্বর শিবের পূজা বন্ধ ছিল। প্রায় চারশ বছর পর আগমবাগীশ নামক এক ব্রাহ্মণের মাধ্যমে শিবলিঙ্গটির পুনরায় খোঁজ পাওয়া যায়, যার পেছনে রয়েছে অলৌকিক গাভী ও বড়হাওরের কিংবদন্তি। পরে জৈন্তিয়ার রাজা জয়নারায়ণ সসৈন্যে এসে শিবলিঙ্গটি নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও অলৌকিকভাবে তা ব্যর্থ হয় এবং তিনি আগমবাগীশকে সেবায়েত নিযুক্ত করে এখানেই মন্দির নির্মাণ করেন। অচ্যুতচরণ চৌধুরীর 'শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত' গ্রন্থেও এই ঘটনার বিবরণ রয়েছে। চারখাই পরগনা ও জৈন্তিয়া রাজ্যের তৎকালীন ক্ষমতার সম্পর্কেরও এক ঐতিহাসিক স্মারক এই মন্দির। কিন্তু ইতিহাস, লোককথা ও রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার এমন এক অনন্য নিদর্শন আজ অযত্ন আর ভাঙনের এক করুণ প্রতিচ্ছবি। সনাতনীদের এই ধর্মীয় স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনাটি অবিলম্বে সংস্কার ও নদী ভাঙন থেকে সুরক্ষার মাধ্যমে ঐতিহ্যকে রক্ষা করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানাচ্ছি।

রাজা জয়নারায়ণের স্মৃতিধন্য হাটকেশ্বর শিবমন্দির: সংরক্ষণের অভাবে চরম জীর্ণদশা

ধ্বংসের মুখে পুরান ঢাকার ৪০০ বছরের প্রাচীন ঐতিহাসিক ৩৬ ফুট উচ্চতার মঠ

পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক বকশীবাজার এলাকায় ঢাকা মেডিকেল কলেজের ড. ফজলে রাব্বি হল প্রাঙ্গণে আজও নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় তিনশ থেকে চারশ বছরের প্রাচীন এক ঐতিহাসিক শতবর্ষী মঠ। অনন্য স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত আনুমানিক ৩৬ ফুট উচ্চতার এই অবকাঠামোটি মূলত একটি 'আট-চালা' মঠ, যা একটি চার-চালা কাঠামোর ওপর অপর একটি চার-চালা ছাদ স্থাপন করে গড়ে তোলা হয়েছে। যদিও সাধারণ দর্শনার্থীরা প্রায়শই এটিকে প্রাচীন মন্দির হিসেবে ভুল করে থাকেন, তবে প্রকৃত সনাতন ধর্মীয় অনুশাসন ও ঐতিহ্য অনুযায়ী এটি কোনো দেবালয় নয়, বরং প্রয়াত কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তির স্মৃতি সংরক্ষণে নির্মিত পরম শ্রদ্ধেয় স্মৃতিস্তম্ভ। মঠটির নান্দনিক কারুকাজ ও নির্মাণরীতির সাথে মুঘল স্থাপত্যশৈলীর অসামান্য সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়, যা ঢাকা শহরের প্রাচীন সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সনাতনী ইতিহাসের এক বিরল প্রতিফলন।​মুঘল যুগের ঐতিহ্য বহনকারী এই স্থাপত্যকে কেন্দ্র করে বকশীবাজার এলাকার প্রবীণ অধিবাসীদের মুখে মুখে আজও নানান লোকগাঁথা ও ভৌতিক কাহিনী প্রচলিত রয়েছে। স্থানীয় প্রবীণদের মতে, গভীর নিঝুম রাতে এই মঠ প্রাঙ্গণে সাদা শাড়ি পরিহিত এক রহস্যময়ী নারীমূর্তির বিচরণ লক্ষ্য করা যায়, যা আজও জনমনে এক অলৌকিক কৌতূহল ও রহস্যের সৃষ্টি করে রেখেছে। তবে লোককাহিনীর আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে এক নির্মম সত্য। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কালের সাক্ষী হয়ে টিকে থাকা এই অনন্য সনাতনী ঐতিহ্যটি আজ চরম অবহেলা ও তদারকির অভাবে ধ্বংসের শেষ প্রান্তে পৌঁছেছে। বর্তমানে মঠটির চারপাশ ও মূল অবকাঠামো সুবিশাল অশ্বত্থ গাছ ও ঘন লতা-গুল্মের শিকড়ে আচ্ছন্ন হয়ে প্রায় বিলীন হতে বসেছে। (News copied from- 'hindus news') ইতিহাস গবেষক ও সংসংরক্ষণবাদীদের মতে, প্রাচীন এই মঠটি কেবল একটি ইট-পাথরের কাঠামো নয়, এটি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার বহুজাতিক ঐতিহ্য, সনাতনী ইতিহাস ও মানবাধিকার সংরক্ষণের এক জীবন্ত অঙ্গ। দেশের হাজার বছরের ঐতিহ্য ও ধর্মীয় স্মৃতিচিহ্ন রক্ষায় কার্যকর প্রশাসনিক উদ্যোগ গ্রহণ করা না হলে চিরতরে হারিয়ে যাবে ঐতিহাসিক এই স্মৃতিস্তম্ভটি। তাই পুরান ঢাকার ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টিকে অনতিবিলম্বে সরকারিভাবে প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা ও পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের জন্য জোর দাবি জানিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা।

ধ্বংসের মুখে পুরান ঢাকার ৪০০ বছরের প্রাচীন ঐতিহাসিক ৩৬ ফুট উচ্চতার মঠ

ঢাকা মহিলা পলিটেকনিকের স্থপতি, বাংলার প্রথম নারী ইঞ্জিনিয়ার: ইলা ঘোষের বীরত্বপূর্ণ যাত্রা

১৯৪৭ সালের দেশভাগ-পরবর্তী অস্থির ও রক্ষণশীল বাংলায় নারীদের উচ্চশিক্ষা ছিল এক দুর্লভ স্বপ্ন, আর ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার চিন্তা তো ছিল রীতিমতো আকাশকুসুম। সেই অন্ধকার সময়ে সমাজ ও ধর্মের কড়াকড়ি উপেক্ষা করে এক অদম্য জেদ আর সাহসের প্রদীপ জ্বালিয়েছিলেন মাদারীপুরের এক কৃতি কন্যা। তাঁর নাম ইলা ঘোষ। মাত্র ১৬ বছর বয়সে জিপ চালিয়ে যিনি তৎকালীন পুরুষতান্ত্রিক সমাজকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন, সেই সাহসী কিশোরীই পরে সিদ্ধান্ত নেন কারিগরি শিক্ষার মতো কঠিন ও তথাকথিত 'পুরুষের' পেশাকে আপন করে নেওয়ার। তাঁর সেই প্রবল জেদ আর আত্মবিশ্বাস বাংলার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।​মহিলা কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রে এক অনন্য মাইলফলক ইলা ঘোষ। তিনি কেবল বাংলার প্রথম নারী ইঞ্জিনিয়ারই নন, বরং প্রথম নারী শিক্ষানবিশ হিসেবে বিদেশে গিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার গৌরবও অর্জন করেছিলেন। এই অদম্য স্পৃহা থেকে ১৯৬৫ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন আজকের ঢাকা মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, যা নারী উন্নয়নে এবং তাঁদের কারিগরি জ্ঞান দিয়ে স্বাবলম্বী করে তুলতে आजही সফলভাবে কাজ করে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠালগ্নে প্রতিষ্ঠানটিতে ছিল মাত্র ১২ জন শিক্ষক, ৭০ জন ছাত্রী এবং ২টি বিভাগ, কিন্তু এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। (News copied from- 'হিন্দুস নিউজ')। একজন নারী হিসেবে এতসব প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে আসা ছিল মানবাধিকার রক্ষার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, কারণ তিনি নিজের কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন নারীদেরও সমান অধিকার ও ক্ষমতা আছে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে অবদান রাখার। তাঁর কর্ম ও আদর্শ আজকের প্রজন্মের কাছে এক বড় অনুপ্রেরণা।​ঢাকা মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট আজ মহিলা কারিগরি শিক্ষার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, যা ইলা ঘোষের দূরদর্শিতা ও নিষ্ঠার ফসল। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় হলো, বাংলার মাটি থেকে উঠে আসা এই সাহসী মহীয়সী নারীকে ক'জন আজ মনে রেখেছে? রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শিক্ষার আলো ছড়ানো এই আলোকিত মানুষকে ভুলে যাওয়া কী আমাদের নৈতিক অবক্ষয় নয়? একজন সনাতনী কন্যা হিসেবে তাঁর এই সংগ্রামী জীবন এবং জাতির উন্নয়নে অবদান সকলের কাছে নতুনভাবে পরিচিত করার প্রয়োজনীয়তা আজ অনস্বীকার্য, যাতে তাঁর স্মৃতির সঠিক মূল্যায়ন হয় এবং তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে আরো অনেক নারী তাদের স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাওয়ার সাহস পায়।

ঢাকা মহিলা পলিটেকনিকের স্থপতি, বাংলার প্রথম নারী ইঞ্জিনিয়ার: ইলা ঘোষের বীরত্বপূর্ণ যাত্রা

ফাঁসির দড়ির নিচে দাঁড়িয়েও তিনি হাসছিলেন—প্রত্যক্ষদর্শীর সেই ভয়ংকর বর্ণনা

১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ও বেদনাবিধুর দিন। মুজফ্‌ফরপুর জেলের ফাঁসির মঞ্চে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছিলেন মাত্র ১৮ বছর বয়সী বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু। ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লবের পথ বেছে নেওয়া এই তরুণের মৃত্যুর মুহূর্তের দৃঢ়তা ও হাসিমুখ আজও ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রতীক হয়ে আছে।ক্ষুদিরামের ফাঁসির ঘটনা নিয়ে তৎকালীন বিভিন্ন স্মৃতিচারণে যে বিবরণ পাওয়া যায়, তার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হলো মুজফ্‌ফরপুরে অবস্থানরত বাঙালি আইনজীবী ও সাংবাদিক উপেন্দ্রনাথ বসুর স্মৃতিচারণ। তাঁর বর্ণনায় উঠে এসেছে এমন এক দৃশ্য, যেখানে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও ক্ষুদিরামের মধ্যে ভয়ের কোনো প্রকাশ দেখা যায়নি।মুজফ্‌ফরপুরে তখন কয়েকজন বাঙালি আইনজীবীর একটি ছোট আড্ডা ছিল। সেখানেই একদিন খবর আসে, এক বাঙালি ছাত্রকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। পরদিন আদালতে গিয়ে তাঁরা দেখতে পান কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছে এক কিশোর। শ্যামবর্ণ, সুদর্শন সেই তরুণের বয়স খুব বেশি নয়। আদালতে উপস্থিত বাঙালিদের দেখে সে বিচলিত হয়নি; বরং তার মুখে ছিল মৃদু হাসি।সেই কিশোরই ছিলেন ক্ষুদিরাম বসু।ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে বিচার শুরু হয়। মামলায় সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করা হয়, চলে যুক্তিতর্ক। শেষ পর্যন্ত আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে। কিন্তু মৃত্যুদণ্ডের রায় শুনেও ক্ষুদিরামের আচরণ ছিল অস্বাভাবিকভাবে শান্ত।স্মৃতিচারণে বলা হয়, আদালতে তিনি বিচারকের কাছে কাগজ ও কলম চেয়েছিলেন। বোমাটি দেখতে কেমন—তা অনেকেই জানেন না উল্লেখ করে তিনি তার একটি ছবি এঁকে দেখাতে চেয়েছিলেন। সেই অনুমতি না পাওয়ার পরও তাঁর মধ্যে আতঙ্ক বা হতাশার কোনো প্রকাশ দেখা যায়নি।মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা হয়। অনেকেই আশা করেছিলেন, হয়তো তাঁর সাজা পরিবর্তিত হয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। কিন্তু ক্ষুদিরামের নিজের অবস্থান ছিল দৃঢ়। কারাগারে দীর্ঘ জীবন কাটানোর চেয়ে দেশের জন্য মৃত্যুবরণ করাকেই তিনি শ্রেয় মনে করতেন বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।শেষ পর্যন্ত আপিলও খারিজ হয়ে যায়। নির্ধারিত হয় ফাঁসির দিন—১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট।সেদিন ভোরে মুজফ্‌ফরপুর জেলের সামনে মানুষের ভিড় জমে যায়। উপেন্দ্রনাথ বসুর স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, তিনি ভোর পাঁচটার দিকে কারাগারের ফটকে পৌঁছেছিলেন। জেলের ভেতরে ছিল ফাঁসির মঞ্চ। কিছুক্ষণ পর কয়েকজন পুলিশ ক্ষুদিরামকে নিয়ে সেখানে উপস্থিত হয়।কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় সবচেয়ে আলোচিত হয়ে আছে সেই মুহূর্তটি—ক্ষুদিরামের মুখে তখনও ছিল হাসি। তিনি স্নান করে, শান্ত ও দৃঢ়ভাবে ফাঁসির মঞ্চের দিকে এগিয়ে যান। তাঁর চলনে কোনো দ্বিধা ছিল না, ছিল না মৃত্যুভয়ের দৃশ্যমান কোনো চিহ্ন।ফাঁসির মঞ্চে উঠে তাঁর হাত পিছনে বাঁধা হয়। এরপর তাঁর মুখ ও গলা ঢেকে দেওয়া হয়। গলায় পরানো হয় ফাঁসির দড়ি। তিনি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন।তারপর আসে সেই শেষ মুহূর্ত।ম্যাজিস্ট্রেটের সংকেতের পর ফাঁসির মঞ্চের ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়। মুহূর্তের মধ্যেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তরুণ বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু। মাত্র ১৮ বছরের এক তরুণের জীবন শেষ হয়ে যায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের পরিণতিতে।তাঁর মৃত্যুর পরও মানুষের ভালোবাসা থেমে থাকেনি। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, মরদেহ শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার সময় পথের দুই পাশে মানুষের ভিড় ছিল। অনেকে ফুল ছুড়ে শ্রদ্ধা জানান। শেষকৃত্যের সময় তাঁর মরদেহ ফুলে ঢেকে যায়।ক্ষুদিরামের মৃত্যুর দৃশ্য প্রত্যক্ষ করা মানুষের স্মৃতিতে সবচেয়ে গভীরভাবে থেকে যায় তাঁর মুখের হাসি। যে বয়সে একজন তরুণের জীবনের সামনে থাকার কথা ছিল অসংখ্য স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ, সেই বয়সেই তিনি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন অবিচলচিত্তে।ক্ষুদিরাম বসুর জীবন ও আত্মত্যাগ পরবর্তী প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতা আন্দোলনের সাহসী অধ্যায়ের প্রতীক হয়ে ওঠে। তাঁর নাম উচ্চারিত হয়েছে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে, বিপ্লবী চেতনার আলোচনায় এবং তরুণদের আত্মত্যাগের অনুপ্রেরণা হিসেবে।আজও ১১ আগস্ট এলেই ফিরে আসে সেই কিশোর বিপ্লবীর কথা। ফিরে আসে মুজফ্‌ফরপুরের সেই ফাঁসির মঞ্চ, ফিরে আসে মৃত্যুর মুখেও তাঁর হাসিমুখের স্মৃতি।ক্ষুদিরাম বসু ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী আন্দোলনের এক অতি পরিচিত তরুণ মুখ। তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও আত্মত্যাগ নিয়ে ইতিহাসে নানা মূল্যায়ন রয়েছে। তবে একটি বিষয়ে তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায় আজও গভীরভাবে আলোচিত—মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তাঁর অসাধারণ মানসিক দৃঢ়তা।একটি কিশোর বয়সী জীবনের এমন পরিণতি আজও হৃদয়কে নাড়া দেয়। তাঁর আত্মত্যাগ কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এটি সাহস, সংকল্প ও আত্মত্যাগের এক স্মরণীয় অধ্যায়।HindusNews-এর পক্ষ থেকে বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

ফাঁসির দড়ির নিচে দাঁড়িয়েও তিনি হাসছিলেন—প্রত্যক্ষদর্শীর সেই ভয়ংকর বর্ণনা

অষ্টগ্রামের কৃষ্ণপুরে পাক-রাজাকারদের নারকীয় তাণ্ডব: ১৩১ জন সনাতনীকে ব্রাশফায়ারে হত্যার স্মৃতি

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকারেরা বাঙালি জাতির ওপর যে নির্মম ও নৃশংস অত্যাচার চালিয়েছিল, তার অন্যতম ভয়াবহ সাক্ষী কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার হিন্দু অধ্যুষিত কৃষ্ণপুর গ্রাম। ১৭ই সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া তাণ্ডবের ধারাবাহিকতায় ১৮ই সেপ্টেম্বর ভোরের আলো ফোটার আগেই নেমে আসে অমাবস্যার অন্ধকার। কিশোরগঞ্জের স্থানীয় পাক সেনা ক্যাম্প থেকে ১০ থেকে ১৫ জনের একটি সশস্ত্র হানাদার দল এসে পৌঁছায় কৃষ্ণপুরে, আর তাদের সাথে যোগ দেয় ৪০ থেকে ৫০ জনের স্থানীয় একদল নরঘাতক রাজাকার। এরপরই শুরু হয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ওপর এক পরিকল্পিত গণহত্যা ও মধ্যযুগীয় বর্বরতা।​গ্রামের নির্দোষ ও নিরপরাধ সনাতনী মানুষদের ঘরবাড়ি থেকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে এনে স্থানীয় কমলাময়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে লাইনে দাঁড় করায় ঘাতকের দল। মোট ১৩১ জন পুরুষকে সেখানে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে কোনো সুযোগ না দিয়ে ব্রাশফায়ারের মাধ্যমে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা, মুহূর্তেই রঞ্জিত হয় কৃষ্ণপুরের মাটি। একই সাথে গ্রামের বাড়িঘরে নির্বিচারে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় এবং চলে ব্যাপকমাত্রায় লুটপাট। হানাদার বাহিনী ও তাদের সঙ্গী রাজাকারদের পাশবিক নির্যাতন থেকে রক্ষা পাননি গ্রামের নারী ও অবলারাও। (News copied from- 'হিন্দুস নিউজ') প্রাণভয়ে জীবন বাঁচাতে বহু মানুষ সেদিন পার্শ্ববর্তী পুকুরের কচুরিপানার নিচে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লুকিয়ে থেকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার আকুতি জানান।​এই নৃশংস গণহত্যার পর দীর্ঘদিন কেটে গেলেও আজও গণহত্যার শিকার হওয়া সব মানুষের নাম ও পূর্ণাঙ্গ পরিচয় উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তবে স্থানীয়দের উদ্যোগে সংরক্ষিত একটি তালিকা থেকে অন্তত ৪৭ জন শহীদ সনাতনীর পরিচয় পাওয়া গেছে। এই বীর শহীদদের মধ্যে রয়েছেন কালী দাস রায়, ডা. ননী রায়, রাধিকা মোহন রায়, গোপী মোহন সূত্রধর, সুনীল শর্মা, মুকুন্দ সূত্রধর, যোগেন্দ্র সূত্রধর, মহেন্দ্র রায়, অনিল মাঝি, চন্দ্র কুমার রায়, জয় কুমার রায়, শান্ত রায়, কিশোর রায়, ননী চক্রবর্তী, সুনীল চক্রবর্তী, ব্রজেন্দ্র দাস, জগদীশ দাস, ইশান দাস, ধীরেন্দ্র রায়, হরিচরণ রায়, মদন রায়, দাশু শুক্লবৈদ্য, হরি দাশ রায়, শব লঞ্জন রায়, রামাচরণ রায়, ডা. অবিনাশ রায়, শৈলেস রায়, ক্ষিতিশ গোপ, নীতিশ গোপ, হীরা লাল গোপ, প্যারি দাস, সুভাষ সূত্রধর, প্রমোদ দাস, সুদর্শন দাস, গোপাল রায়, দীগেন্দ্র আচার্য্য, রেবতী রায়, শুকদেব দাস, দীনেশ বিশ্বাস, মনোরঞ্জন বিশ্বাস, রস রাজ দাস, জয় গোবিন্দ্র দাস, বিশ্বনাথ দাস, মহাদেব দাশ, মহেশ দাস, শবরঞ্জন রায় ও মনোরঞ্জন বিশ্বাস। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও রক্তে ভেজা এই ইতিহাসের বিচার ও শহীদদের সঠিক মর্যাদার দাবি আড়ালেই রয়ে গেছে।

অষ্টগ্রামের কৃষ্ণপুরে পাক-রাজাকারদের নারকীয় তাণ্ডব: ১৩১ জন সনাতনীকে ব্রাশফায়ারে হত্যার স্মৃতি

বাঙ্কারের অন্ধকার থেকে বিজয়ের মিছিলে: ঝালকাঠির সাহসী সনাতনী বীর মুক্তিযোদ্ধা শেফালী রানীর অমর কাব্য

গ্রামের অতি সাধারণ এক কৃষক পরিবারে জন্ম নিয়েও অদম্য আত্মবল আর সাহসিকতার শক্তিতে প্রতিবন্ধকতা জয় করে উচ্চশিক্ষার সংকল্প নিয়ে পথচলা শুরু করেছিলেন ঝালকাঠির সনাতনী কন্যা শেফালী রানী। ১৯৫৪ সালের ১০ অক্টোবর ঝালকাঠির রাখাল রায় ও জ্ঞানদা রায়ের ঘর আলো করে জন্মগ্রহণ করা এই তেজস্বী নারী ১৯৭১ সালে চাখার এ কে ফজলুল হক কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। পরীক্ষার সকল প্রস্তুতি ও ফরম পূরণ সম্পন্ন হলেও ১৯৭১ সালের অগ্নিঝরা মার্চে শুরু হওয়া মহান মুক্তিযুদ্ধ তাঁর জীবনের গতিপথ চিরতরে বদলে দেয় এবং সনাতনী নারীদের চিরাচরিত সহনশীলতার পাশাপাশি বীরত্বের এক অনন্য ইতিহাস রচনার সুযোগ করে দেয়।​মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের স্থানীয় সহযোগীদের অত্যাচার ও নির্বিচার গুলির মুখে স্বজনদের সুরক্ষায় তিনি পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। সেই দিনগুলোর বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে শেফালী রানী জানান, একদিন তাঁদের বাড়িতে ২০ থেকে ২৫ জন অতিথি অবস্থান করছিলেন এবং তিনি সকলের জন্য অন্ন প্রস্তুত করছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই চারপাশ থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর গুলির শব্দ ভেসে আসে এবং ঘরেও এসে বুলেটের আঘাত লাগে, যা দেখে চরম আতঙ্কের মধ্যে ভাতের পাতিল বাগানে লুকিয়ে তাঁরা নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে পালিয়ে যান। এর পরবর্তীতে নিরাপত্তার প্রয়োজনে পেয়ারাবাগানের মাটির নিচের বাঙ্কারে ১৮ থেকে ২০ জনের দলবদ্ধ হয়ে জীবনসংগ্রাম চালাতে হয়েছিল এবং একদিন মাত্র ২০ হাত দূর দিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংস উপস্থিতি প্রত্যক্ষ করলেও ভাগ্যের জোড়ে শত্রুপক্ষের চোখ এড়াতে সক্ষম হন।​মাতৃভূমির স্বাধীনতা ও জাতিসত্তার সুরক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়ে শেফালী রানী কিছুদিন পর কলকাতায় গিয়ে বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী কার্যালয় খুঁজে বের করেন এবং সেখানে বীর নারীনেত্রী সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী ও মতিয়া চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়ার অভিপ্রায় প্রকাশ করেন। (News copied from- 'হিন্দুস নিউজ') সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর দিকনির্দেশনায় তিনি ঐতিহাসিক গোবরা প্রশিক্ষণ শিবিরে যোগ দেন, যেখানে তাঁর মতো প্রায় সাড়ে তিনশত সাহসী নারীকে প্রাথমিক চিকিৎসা ও অস্ত্র চালনাসহ আত্মরক্ষার কঠোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পাঠানোর আগেই ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আসে কাঙ্ক্ষিত পরম বিজয় এবং প্রশিক্ষণ শিবিরের হোস্টেল সুপার মতিয়া চৌধুরীর নেতৃত্বে ধর্মতলা পর্যন্ত এক আনন্দঘন বিজয় মিছিলে বীরদর্পে অংশগ্রহণ করেন শেফালী রানী।​স্বাধীনতার পর ঝালকাঠিতে ফিরে উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক শ্রেণিতে অধ্যয়ন সম্পন্ন করে যশোরের একটি উচ্চ বিদ্যালয় এবং পরবর্তীতে ডুমুরিয়ার অন্য একটি বিদ্যাপীঠে কিছুকাল শিক্ষাদানে নিয়োজিত থাকলেও তৎকালীন সামাজিক ও পারিবারিক বাধার মুখে তাঁকে নিজের ক্যারিয়ার ত্যাগ করে পুরোপুরি সংসার জীবনের পরিমণ্ডলে মনোনিবেশ করতে হয়। স্বাধীনতার দীর্ঘ তিন দশক অতিক্রমের পর ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক নথিপত্র উপস্থাপন করে ২০০৬ সাল থেকে সরকারিভাবে বীর মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পেতে শুরু করেন তিনি এবং পরবর্তীতে ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক নারী দিবসে ঝালকাঠি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াছ লস্করের হাত থেকে সম্মাননা পদক গ্রহণ করেন এই মহীয়সী সনাতনী নারী।​(ছবি: শুকান্ত | কৃতজ্ঞতা: ডয়েচে ভেলে

বাঙ্কারের অন্ধকার থেকে বিজয়ের মিছিলে: ঝালকাঠির সাহসী সনাতনী বীর মুক্তিযোদ্ধা শেফালী রানীর অমর কাব্য