অষ্টগ্রামের কৃষ্ণপুরে পাক-রাজাকারদের নারকীয় তাণ্ডব: ১৩১ জন সনাতনীকে ব্রাশফায়ারে হত্যার স্মৃতি
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকারেরা বাঙালি জাতির ওপর যে নির্মম ও নৃশংস অত্যাচার চালিয়েছিল, তার অন্যতম ভয়াবহ সাক্ষী কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার হিন্দু অধ্যুষিত কৃষ্ণপুর গ্রাম। ১৭ই সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া তাণ্ডবের ধারাবাহিকতায় ১৮ই সেপ্টেম্বর ভোরের আলো ফোটার আগেই নেমে আসে অমাবস্যার অন্ধকার। কিশোরগঞ্জের স্থানীয় পাক সেনা ক্যাম্প থেকে ১০ থেকে ১৫ জনের একটি সশস্ত্র হানাদার দল এসে পৌঁছায় কৃষ্ণপুরে, আর তাদের সাথে যোগ দেয় ৪০ থেকে ৫০ জনের স্থানীয় একদল নরঘাতক রাজাকার। এরপরই শুরু হয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ওপর এক পরিকল্পিত গণহত্যা ও মধ্যযুগীয় বর্বরতা।গ্রামের নির্দোষ ও নিরপরাধ সনাতনী মানুষদের ঘরবাড়ি থেকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে এনে স্থানীয় কমলাময়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে লাইনে দাঁড় করায় ঘাতকের দল। মোট ১৩১ জন পুরুষকে সেখানে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে কোনো সুযোগ না দিয়ে ব্রাশফায়ারের মাধ্যমে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা, মুহূর্তেই রঞ্জিত হয় কৃষ্ণপুরের মাটি। একই সাথে গ্রামের বাড়িঘরে নির্বিচারে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় এবং চলে ব্যাপকমাত্রায় লুটপাট। হানাদার বাহিনী ও তাদের সঙ্গী রাজাকারদের পাশবিক নির্যাতন থেকে রক্ষা পাননি গ্রামের নারী ও অবলারাও। (News copied from- 'হিন্দুস নিউজ') প্রাণভয়ে জীবন বাঁচাতে বহু মানুষ সেদিন পার্শ্ববর্তী পুকুরের কচুরিপানার নিচে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লুকিয়ে থেকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার আকুতি জানান।এই নৃশংস গণহত্যার পর দীর্ঘদিন কেটে গেলেও আজও গণহত্যার শিকার হওয়া সব মানুষের নাম ও পূর্ণাঙ্গ পরিচয় উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তবে স্থানীয়দের উদ্যোগে সংরক্ষিত একটি তালিকা থেকে অন্তত ৪৭ জন শহীদ সনাতনীর পরিচয় পাওয়া গেছে। এই বীর শহীদদের মধ্যে রয়েছেন কালী দাস রায়, ডা. ননী রায়, রাধিকা মোহন রায়, গোপী মোহন সূত্রধর, সুনীল শর্মা, মুকুন্দ সূত্রধর, যোগেন্দ্র সূত্রধর, মহেন্দ্র রায়, অনিল মাঝি, চন্দ্র কুমার রায়, জয় কুমার রায়, শান্ত রায়, কিশোর রায়, ননী চক্রবর্তী, সুনীল চক্রবর্তী, ব্রজেন্দ্র দাস, জগদীশ দাস, ইশান দাস, ধীরেন্দ্র রায়, হরিচরণ রায়, মদন রায়, দাশু শুক্লবৈদ্য, হরি দাশ রায়, শব লঞ্জন রায়, রামাচরণ রায়, ডা. অবিনাশ রায়, শৈলেস রায়, ক্ষিতিশ গোপ, নীতিশ গোপ, হীরা লাল গোপ, প্যারি দাস, সুভাষ সূত্রধর, প্রমোদ দাস, সুদর্শন দাস, গোপাল রায়, দীগেন্দ্র আচার্য্য, রেবতী রায়, শুকদেব দাস, দীনেশ বিশ্বাস, মনোরঞ্জন বিশ্বাস, রস রাজ দাস, জয় গোবিন্দ্র দাস, বিশ্বনাথ দাস, মহাদেব দাশ, মহেশ দাস, শবরঞ্জন রায় ও মনোরঞ্জন বিশ্বাস। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও রক্তে ভেজা এই ইতিহাসের বিচার ও শহীদদের সঠিক মর্যাদার দাবি আড়ালেই রয়ে গেছে।