ড. কুশল বরণ চক্রবর্ত্তী: জ্ঞান, নেতৃত্ব ও সনাতন সমাজের নির্ভরতার এক উজ্জ্বল নাম
বাংলাদেশের সনাতন সমাজের ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের পরিচয় কোনো একটি পেশা, পদবি কিংবা প্রতিষ্ঠানের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। জ্ঞান, কর্ম ও সাহসের সমন্বয়ে তাঁরা হয়ে ওঠেন একটি সময়ের কণ্ঠস্বর, নতুন প্রজন্মের পথপ্রদর্শক এবং সংকটে মানুষের নির্ভরতার প্রতীক। ড. কুশল বরণ চক্রবর্ত্তী তেমনই একজন বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব।একাধারে শিক্ষক, গবেষক, প্রাবন্ধিক, লেখক, সংগঠক ও সমাজচিন্তক তিনি। তবে এসব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সনাতন সমাজের অধিকার, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অস্তিত্বের প্রশ্নে তিনি একজন দৃঢ় ও দায়িত্বশীল কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন।বরিশাল সদর হাসপাতালে জন্মগ্রহণ করলেও ড. কুশল বরণ চক্রবর্ত্তীর শেকড় মাদারীপুর সদর উপজেলার পৌর ভবনসংলগ্ন ঐতিহ্যবাহী ঠাকুরবাড়ি এলাকায়। সেখানকার সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যসমৃদ্ধ পরিবেশেই কেটেছে তাঁর শৈশব ও বেড়ে ওঠার সময়।তিনি জন্মগ্রহণ করেন একটি শিক্ষিত ও মূল্যবোধসম্পন্ন পরিবারে। তাঁর পিতা বীর মুক্তিযোদ্ধা জগদীশ চন্দ্র চক্রবর্তী মাদারীপুর জজ কোর্টের একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ছিলেন। পারিবারিক পরিমণ্ডল থেকেই কুশল বরণ চক্রবর্ত্তী দেশপ্রেম, ন্যায়বোধ, মানবিকতা এবং সমাজের প্রতি দায়িত্বশীলতার শিক্ষা লাভ করেন।শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই তিনি মেধা ও অধ্যবসায়ের পরিচয় দেন। উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে এবং সেখান থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে ভারতের ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ে শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণের ওপর উচ্চতর গবেষণা করে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।এই দীর্ঘ একাডেমিক যাত্রা তাঁকে শুধু একজন বিদ্বান হিসেবে গড়ে তোলেনি; শাস্ত্র, দর্শন, ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে আধুনিক যুক্তিবোধ এবং গবেষণার আলোকে বিশ্লেষণ করার একটি স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গিও দিয়েছে।২০১২ সালে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রাচ্যভাষা বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির সংস্কৃত বিভাগে শিক্ষকতা ও গবেষণায় নিয়োজিত রয়েছেন। তাঁর কাছে শিক্ষকতা কেবল শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ কোনো পেশা নয়। তিনি বিশ্বাস করেন, জ্ঞান তখনই পূর্ণতা লাভ করে, যখন তা মানুষের কল্যাণ ও সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে ব্যবহৃত হয়।এই দর্শন থেকেই তিনি সনাতন ধর্মের শাস্ত্র, দর্শন, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের বিভিন্ন বিষয় সাধারণ মানুষের কাছে সহজ ও যুক্তিনির্ভর ভাষায় উপস্থাপন করে চলেছেন। বেদ, উপনিষদ, পুরাণ এবং ধর্মীয় আচারের অন্তর্নিহিত তাৎপর্যকে গবেষণা, তথ্য ও যুক্তির আলোকে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে তাঁর বিশেষ দক্ষতা রয়েছে।ড. কুশল বরণ চক্রবর্ত্তী একজন প্রাবন্ধিক ও লেখক হিসেবেও পরিচিত। দীর্ঘদিনের জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার ধারাবাহিকতায় তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজে তিন হাজারের বেশি প্রবন্ধ, নিবন্ধ, বিশ্লেষণ এবং গবেষণাভিত্তিক আলোচনা প্রকাশিত হয়েছে। ধর্ম, দর্শন, ইতিহাস, সংস্কৃতি, সমাজচিন্তা ও সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর এসব লেখা অসংখ্য পাঠকের সামনে চিন্তা ও আলোচনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।গবেষণাক্ষেত্রেও তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নাল ও গবেষণা প্রকাশনায় তাঁর ১৫টির বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন একাডেমিক ও গবেষণামূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি সনাতন ধর্ম, দর্শন ও সংস্কৃতিবিষয়ক গবেষণাকে সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন।তাঁর গবেষণা ও লেখনীর স্বীকৃতি হিসেবে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র প্রকাশিত ‘বাঙালির ধর্মচিন্তা রচনা সংগ্রহ’-এর ষষ্ঠ ও সপ্তম খণ্ডে তাঁর দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে। প্রবন্ধ দুটি হলো—‘বেদে বৈষ্ণব বা ভাগবতীয় তত্ত্ব’ এবং ‘সংক্ষেপে বেদবিদ্যার পরিচয়’। এসব রচনা বৈদিক জ্ঞান ও সনাতন ধর্মতত্ত্বে তাঁর গভীর অধ্যয়ন এবং গবেষণার সাক্ষ্য বহন করে।তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ ‘গোলাকার পৃথিবীতে গোলাকার ঘটনাবৃত্ত’ পাঠকমহলে আলোচিত হয়েছে। গবেষণালব্ধ জ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে বোধগম্য করে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়াস তাঁকে একজন শিক্ষক ও গবেষকের পাশাপাশি প্রভাবশালী চিন্তাবিদ হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করেছে।তবে ড. কুশল বরণ চক্রবর্ত্তীর কর্মজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—সনাতন সমাজের অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নে তাঁর সক্রিয় সাংগঠনিক ভূমিকা।সনাতন বিদ্যার্থী সংসদ বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে তিনি তরুণ প্রজন্মকে ধর্মীয় মূল্যবোধ, নৈতিকতা, শিক্ষা, মানবিকতা ও সাংস্কৃতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করার কাজ করছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিরাপত্তা, ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদার দাবিতে দেশের বিভিন্ন আন্দোলন, সমাবেশ ও গণজাগরণমূলক কর্মসূচিতে তাঁকে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে দেখা গেছে।চট্টগ্রামের লালদীঘি মাঠ থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অনুষ্ঠিত সমাবেশে সনাতন সমাজের ন্যায্য দাবি ও অধিকারের পক্ষে তাঁর বক্তব্য অনেক মানুষের মধ্যে সাহস, সচেতনতা ও আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করেছে। তিনি বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের সহমুখপাত্র হিসেবেও সনাতন সমাজের বিভিন্ন দাবি, সংকট ও উদ্বেগের বিষয়ে কথা বলে আসছেন।নেতৃত্বের প্রকৃত মূল্যায়ন কেবল সুসময়ের প্রশংসায় হয় না; দুঃসময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেই নেতৃত্বের দায়িত্ব ও সাহসের পরিচয় পাওয়া যায়। চিন্ময় কৃষ্ণ ব্রহ্মচারীর গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে ২০২৪ সালের ২৫ নভেম্বর শাহবাগে অনুষ্ঠিত সমাবেশে হামলার শিকার হওয়ার ঘটনাটি তাঁর সংগ্রামী পথচলার একটি আলোচিত অধ্যায়। তাঁর অনুসারী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হুমকি, চাপ ও প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি নিজের অবস্থান থেকে সরে দাঁড়াননি।দিপু দাসের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে সহায়তা ও সহযোগিতা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টায়ও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সংগঠন ও তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষীরা জানিয়েছেন।২০২৫ সালের ৪ জুলাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কার্যালয়ে তাঁর ওপর সংঘটিত হামলার অভিযোগ তাঁর জীবনের আরেকটি গুরুতর ঘটনা। কিন্তু এসব প্রতিকূলতা তাঁর পথচলাকে থামাতে পারেনি। প্রতিটি আঘাত ও বাধার পর তিনি আরও দৃঢ়ভাবে জ্ঞান, যুক্তি, ঐক্য, সংগঠন এবং ন্যায়ভিত্তিক অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন।তাঁর কর্মদর্শনের মূল কথা হলো—অধিকার কেবল প্রত্যাশা করে পাওয়া যায় না; জ্ঞান, ঐক্য, সংগঠন ও ন্যায়ের শক্তিতে তা প্রতিষ্ঠা করতে হয়।বর্তমান বাংলাদেশে সনাতন সমাজের নিরাপত্তা, অধিকার, মর্যাদা ও অস্তিত্বের বিভিন্ন প্রশ্ন যখন সামনে আসছে, তখন ড. কুশল বরণ চক্রবর্ত্তীর মতো শিক্ষিত, গবেষণাভিত্তিক এবং সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি অনেক মানুষের কাছে আশাবাদের কারণ।তিনি শুধু বক্তৃতা দেন না; ইতিহাস ও শাস্ত্রের আলোকে যুক্তি উপস্থাপন করেন। তিনি শুধু প্রতিবাদ করেন না; সমস্যার সামাজিক, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। তিনি শুধু তরুণদের সংগঠিত করেন না; তাঁদের জ্ঞান, মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও আত্মপরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করতে সচেষ্ট থাকেন।এ কারণেই বহু সনাতনী মানুষের কাছে তিনি নির্ভরতার একটি পরিচিত নাম, আশার একটি কণ্ঠস্বর এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অন্যতম সহায়ক শক্তি। তাঁকে ঘিরে তৈরি হওয়া প্রত্যাশার মূলে রয়েছে একটি বিশ্বাস—একজন জ্ঞানী মানুষ যখন নিপীড়িত ও সংকটে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়ান, তখন তাঁর কণ্ঠস্বর আর শুধু একজন ব্যক্তির থাকে না; সেটি একটি সমাজের প্রত্যাশা, বেদনা ও স্বপ্নের প্রতিধ্বনিতে পরিণত হয়।একজন গবেষক হিসেবে ড. কুশল বরণ চক্রবর্ত্তী শাস্ত্রের গভীরে প্রবেশ করেন। একজন শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও স্বাধীন চিন্তার পথ দেখান। একজন লেখক হিসেবে মানুষের চিন্তার দুয়ার খুলে দেন। আর একজন সংগঠক হিসেবে সনাতন সমাজের ন্যায্য দাবি ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করেন। তাঁর জীবনের এই বহুমাত্রিক ভূমিকা সমসাময়িক সনাতন সমাজে তাঁকে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান দিয়েছে।আজ তাঁর জন্মদিনে আমরা শুধু একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি না; শুভেচ্ছা জানাচ্ছি এমন একজন গবেষককে, যিনি জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে চলেছেন। এমন একজন লেখককে, যিনি কলমের মাধ্যমে সমাজ ও সময়ের কথা বলেছেন। এমন একজন সংগঠককে, যিনি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করছেন। সর্বোপরি, এমন একজন কণ্ঠস্বরকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি, যিনি সনাতন সমাজের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নে প্রতিকূলতার মধ্যেও কথা বলে চলেছেন।ড. কুশল বরণ চক্রবর্ত্তী—আপনি শুধু একজন শিক্ষক নন; বহু মানুষের কাছে আপনি জ্ঞান, সাহস ও আশার এক উজ্জ্বল নাম।আপনার জ্ঞানচর্চা আরও বিস্তৃত হোক, গবেষণা আরও সমৃদ্ধ হোক, সামাজিক উদ্যোগ আরও শক্তিশালী হয়ে উঠুক এবং সনাতন সমাজ ও দেশের মানুষের কল্যাণে আপনার পথচলা দীর্ঘ হোক—এই আমাদের প্রত্যাশা।আপনার সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু, সাফল্য ও কর্মময় জীবনের জন্য রইল আন্তরিক শুভকামনা।শুভ জন্মদিন, ড. কুশল বরণ চক্রবর্ত্তী।**ওঁ সর্বে ভবন্তু সুখিনঃ।****ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।**—সম্পাদকীয় বিভাগHindus NewsVoice of Hinduism