হিন্দুস নিউজ

ধর্মতত্ত্ব

দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা পূজার পুণ্যলগ্ন: সনাতনী ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও নির্মাণকলার শাস্ত্রীয় ইতিহাস

দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা পূজার পুণ্যলগ্ন: সনাতনী ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও নির্মাণকলার শাস্ত্রীয় ইতিহাস

আগামীকাল ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পরম আরাধ্য দেবশিল্পী ও প্রকৌশল বিদ্যার ঈশ্বর শ্রী শ্রী বিশ্বকর্মা পূজা। আবহমানকাল ধরে সনাতনী সংস্কৃতি ও সভ্যতায় কারিগরি দক্ষতা, সৃষ্টিশীলতা এবং নির্মাণকলার মূল উৎস হিসেবে ভগবান বিশ্বকর্মাকে আরাধনা করা হয়। তিনি কেবল জড় জগতের স্থপতি নন, বরং সনাতন শাস্ত্র অনুযায়ী তিনি সর্বজ্ঞ ও সর্বদর্শী; পরা বিদ্যার পাশাপাশি পুষ্পশিল্প, লৌহশিল্প, মৃৎশিল্প, অলংকারশিল্প, বয়নশিল্প, স্থাপত্য বেদসহ বিবিধ কলা ও প্রকৌশলবিদ্যার অধীশ্বর। প্রাচ্যের মহাকাব্য শ্রীমদ্ভাগবত ও রামায়ণে দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার অপার মহিমা ও অলৌকিক নির্মাণশৈলীর বহু বিবরণ বিস্তৃতভাবে বিধৃত রয়েছে।​মহাকাব্য রামায়ণের বিভিন্ন কাণ্ডে বিশ্বকর্মা ও তাঁর ঐশ্বরিক সৃষ্টির উল্লেখ পাওয়া যায়। মহর্ষি ভরদ্বাজের আশ্রমে ভরত যখন সমগ্র সেনাবাহিনী নিয়ে উপস্থিত হন, তখন ঋষি ভরদ্বাজ বিশ্বকর্মাকে আহ্বান করে ঐশ্বরিক আতিথ্য সৎকার ও সকল সামরিক সদস্যের ভোজনের সুব্যবস্থা করেছিলেন। এছাড়াও বিশ্বকর্মার স্থাপত্যকলা ও অপূর্ব নিপুণতার অন্যতম সেরা নিদর্শন ছিল সমুদ্রপরিবেষ্টিত সুবর্ণ লঙ্কাপুরী। রামায়ণের উত্তরকাণ্ডে উল্লেখ আছে, ধনাধ্যক্ষ কুবেরের বসবাসের জন্য দক্ষিণ সমুদ্রতীরের ত্রিকূট পর্বতের শিখরে দেবরাজ ইন্দ্রের অমরাবতীর ন্যায় স্বর্ণ ও বৈদূর্যমণির তোরণে সুশোভিত লঙ্কাপুরী বিশ্বকর্মাই নির্মাণ করেছিলেন। পরবর্তীতে রাক্ষসদের অধিকার থেকে মুক্ত সেই শূন্য লঙ্কাপুরীতে পিতা বিশ্রবার নির্দেশে কুবের তাঁর বাসস্থান স্থাপন করেন।​(News copied from- 'HINDUS NEWS')​লঙ্কায় সীত উদ্ধারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার সময় বিশাল মহাসমুদ্র অতিক্রম করা যখন অসম্ভব হয়ে পড়েছিল, তখন শ্রীরামচন্দ্রকে সমুদ্রদেব পরামর্শ দেন বিশ্বকর্মাপুত্র নলের দ্বারস্থ হতে। বিশ্বকর্মার প্রদত্ত বর ও প্রকৌশল শক্তিতে বলীয়ান মহাবলশালী বানরবীর নল সমুদ্রের বুকে শত যোজন দীর্ঘ ও দশ যোজন চওড়া এক অনন্য সেতু নির্মাণ করেন। নলের এই অবিশ্বাস্য প্রকৌশল বিদ্যা ও স্থাপত্য নিপুণতা দেখে আকাশে অবস্থানরত দেব, গন্ধর্ব, সিদ্ধ ও মহর্ষিগণ বিস্মিত হয়ে পড়েছিলেন। সমুদ্রের তরঙ্গে ভাসমান সেই অপূর্ব নলসেতু গগনে স্বাতীপথ বা ছায়াপথের ন্যায় দীপ্তিমান হয়ে উঠেছিল, যা সনাতনী ঐতিহ্য ও বিশ্বকর্মার দৈব কারিগরি ধারার এক চিরন্তন স্মারক।​বাংলাদেশসহ বিশ্বের সকল সনাতনী ও শোষিত-বঞ্চিত মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা, মানবাধিকার এবং অধিকার রক্ষায় দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার সৃজনশীল শক্তির চেতনা সদা জাগ্রত থাকুক। প্রকৌশল, শিল্প ও সভ্যতার এই মহান রূপকারের চরণে পূজা প্রাক্কালে কোটি কোটি সনাতনীর সশ্রদ্ধ প্রণাম।

গণেশ চতুর্থী উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে উৎসবের আমেজ

বিঘ্নহর্তা ও সিদ্ধিদাতা শ্রীগণেশের আরাধনায় মণ্ডপে মণ্ডপে নানা আয়োজনসনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম পবিত্র ও তাৎপর্যপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব গণেশ চতুর্থী। ভগবান শ্রীগণেশের আবির্ভাব বা জন্মতিথি স্মরণে এই উৎসব পালিত হয়। বিনায়ক চতুর্থী ও বিনায়ক চবিথি নামেও পরিচিত এই তিথি ভক্তদের কাছে জ্ঞান, বুদ্ধি, সিদ্ধি, শুভ সূচনা ও বিঘ্ননাশের বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের চতুর্থী তিথিতে গণেশ চতুর্থী পালিত হয়। এদিন ভক্তরা ভোরে স্নান করে শুদ্ধাচার পালন, সংকল্প গ্রহণ এবং বিধি-বিধান অনুযায়ী শ্রীগণেশের পূজা-অর্চনা করেন। বাড়ি, মন্দির ও বিভিন্ন সর্বজনীন মণ্ডপে গণেশের প্রতিমা স্থাপন করে ফুল, দূর্বা, ফল, মিষ্টান্ন ও মোদক নিবেদন করা হয়। অনুষ্ঠিত হয় মঙ্গলাচরণ, স্তোত্রপাঠ, আরতি, প্রসাদ বিতরণসহ নানা ধর্মীয় আয়োজন।সনাতন ধর্মীয় ঐতিহ্যে ভগবান গণেশকে গণপতি, বিনায়ক, গজানন, একদন্ত, লম্বোদর ও সিদ্ধিদাতাসহ বিভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়। তিনি দেবাদিদেব মহাদেব শিব ও দেবী পার্বতীর পুত্র হিসেবে পূজিত।শ্রীগণেশের মূর্তির প্রতিটি অঙ্গের মধ্যেও রয়েছে গভীর প্রতীকী শিক্ষা। তাঁর বৃহৎ মস্তক জ্ঞান ও বৃহৎ চিন্তার প্রতীক, বড় কান মনোযোগ দিয়ে শোনার শিক্ষা দেয়, ছোট চোখ গভীর মনোযোগ ও একাগ্রতার প্রতীক। হাতির মতো শুঁড় বিচক্ষণতা ও পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। তাঁর বাহন ইঁদুর মানুষের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতীক—যাকে নিয়ন্ত্রণ করে জ্ঞান ও বিবেকের পথে চলার শিক্ষা দেওয়া হয়।সনাতন ধর্মীয় আচারে যেকোনো শুভ কাজের সূচনায় শ্রীগণেশের পূজা করার প্রচলন রয়েছে। তাঁকে বিঘ্নহর্তা অর্থাৎ বাধা দূরকারী এবং সিদ্ধিদাতা অর্থাৎ সাফল্য ও সিদ্ধি প্রদানকারী হিসেবে ভক্তরা আরাধনা করেন।বিবাহ, গৃহপ্রবেশ, ব্যবসা শুরু, শিক্ষা গ্রহণ কিংবা অন্যান্য মঙ্গলজনক কাজের আগে গণেশের পূজা করার রীতি প্রচলিত। এর মাধ্যমে শুভ কাজটি নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হওয়ার জন্য ভগবানের আশীর্বাদ কামনা করা হয়।গণেশ চতুর্থীর অন্যতম প্রধান তাৎপর্য হলো—জ্ঞান ও বিবেকের মাধ্যমে জীবনের প্রতিবন্ধকতা অতিক্রমের শিক্ষা। ভক্তরা এই দিনে শুধু বাহ্যিক পূজা-অর্চনাই করেন না, নিজেদের অন্তরের অজ্ঞানতা, অহংকার, লোভ, হিংসা ও নেতিবাচক চিন্তা দূর করার সংকল্পও গ্রহণ করেন।গণেশকে বিদ্যা ও বুদ্ধির অধিষ্ঠাতা হিসেবে স্মরণ করা হয়। তাই শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও কর্মক্ষেত্রে সাফল্যের জন্য তাঁর কাছে প্রার্থনা করেন।গণেশ পূজায় দূর্বা ঘাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। পূজার নৈবেদ্যে দূর্বা নিবেদনের প্রচলন রয়েছে। একইভাবে মোদক গণেশের অন্যতম প্রিয় নৈবেদ্য হিসেবে পরিচিত। মোদকের মিষ্টতা মানুষের জীবনে জ্ঞান, সাধনা ও শুভকর্মের মাধ্যমে অর্জিত আনন্দ ও পরিতৃপ্তির প্রতীক হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হয়।গণেশ চতুর্থীর দিনে ভক্তরা ব্যক্তিগত কল্যাণের পাশাপাশি পরিবার, সমাজ ও দেশের শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য প্রার্থনা করেন। জীবনের সব বাধা-বিপত্তি দূর করে সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ পথে চলার শক্তি, জ্ঞান ও বিবেক প্রদানের জন্য শ্রীগণেশের আশীর্বাদ কামনা করা হয়।অনেক ভক্ত এই দিনে উপবাস পালন করেন এবং পূজা শেষে প্রসাদ গ্রহণ করেন। মণ্ডপে মণ্ডপে ধর্মীয় আলোচনা, ভজন-কীর্তন, আরতি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্রসাদ বিতরণের আয়োজনও করা হয়।বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসাহের সঙ্গে গণেশ চতুর্থী পালন করেন। স্থানীয় ঐতিহ্য ও সামর্থ্য অনুযায়ী কোথাও বাড়িতে, আবার কোথাও মন্দির ও সর্বজনীন মণ্ডপে গণেশ প্রতিমা স্থাপন করে পূজার আয়োজন করা হয়।পূজাকে কেন্দ্র করে সনাতন সম্প্রদায়ের নারী, পুরুষ, শিশু ও তরুণদের মধ্যে উৎসাহ দেখা যায়। বিভিন্ন স্থানে পূজা-অর্চনার পাশাপাশি প্রসাদ বিতরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।গণেশ চতুর্থী ধর্মীয় উৎসব হলেও এর সামাজিক গুরুত্বও রয়েছে। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে মানুষ একত্রিত হয়, পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পায় এবং সামাজিক বন্ধন আরও দৃঢ় হয়। ভক্তরা ধর্মীয় মূল্যবোধ, মানবিকতা, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতির চর্চার মাধ্যমে সমাজে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।গণেশ চতুর্থীর মূল শিক্ষা যেন শুধু মণ্ডপের পূজায় সীমাবদ্ধ না থাকে—জ্ঞান, বিবেক, বিনয়, শৃঙ্খলা ও সৎকর্মের মাধ্যমে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে শুভতার প্রতিষ্ঠাই হোক এই পবিত্র তিথির প্রকৃত বার্তা।গণেশ চতুর্থী উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে তাই বিরাজ করছে ভক্তি, আনন্দ ও উৎসবের আমেজ। বিঘ্নহর্তা ও সিদ্ধিদাতা শ্রীগণেশের কৃপায় মানুষের জীবনের অজ্ঞানতা, অশুভ ও সকল বাধা দূর হয়ে জ্ঞান, শান্তি, সাফল্য ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠিত হোক—এই প্রার্থনাই ভক্তদের।

গণেশ চতুর্থী উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে উৎসবের আমেজ

কৃষ্ণ জন্মাষ্টমীর ধর্মতত্ত্ব: অবতারতত্ত্ব, ধর্মসংস্থাপন ও পরম সত্যের সন্ধান

শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবের অন্তর্নিহিত আধ্যাত্মিক তাৎপর্যকৃষ্ণ জন্মাষ্টমী সনাতন ধর্মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তিথি। সাধারণ অর্থে এটি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মোৎসব; কিন্তু ধর্মতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে জন্মাষ্টমী হলো পরমাত্মার মানবজীবনে আবির্ভাব, ধর্মের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, অধর্মের বিনাশ এবং ভক্তির মহিমা উপলব্ধির এক গভীর আধ্যাত্মিক উপলক্ষ।হিন্দু দর্শনে পরমব্রহ্মকে অনাদি, অনন্ত ও সর্বব্যাপী বলে বিবেচনা করা হয়। সেই পরম সত্য যখন জগতের কল্যাণ ও ধর্মের প্রতিষ্ঠার জন্য বিশেষ রূপে প্রকাশিত হন, তখন তাকে বলা হয় অবতার। শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবকে বৈষ্ণব দর্শনে এই অবতারতত্ত্বের সর্বোচ্চ প্রকাশ হিসেবে দেখা হয়শ্রীকৃষ্ণের ক্ষেত্রে ‘জন্ম’ শব্দটির ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা সাধারণ মানুষের জন্মের মতো নয়। সাধারণ জীব কর্মফলের অধীন হয়ে জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু ঈশ্বর কর্মের দ্বারা আবদ্ধ নন। তিনি নিজের ইচ্ছায়, নিজের শক্তিতে জগতে প্রকাশিত হন।শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় কৃষ্ণ বলেন—“যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত,অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্।”অর্থাৎ, যখনই ধর্মের অবক্ষয় এবং অধর্মের প্রাধান্য ঘটে, তখনই তিনি নিজেকে প্রকাশ করেন।এই দৃষ্টিতে জন্মাষ্টমী হলো ঈশ্বরের স্বেচ্ছাময় আবির্ভাবের স্মরণ।বৈষ্ণব ধর্মতত্ত্বে বিষ্ণু বা নারায়ণ জগতের পালনকর্তা। ধর্মের ভারসাম্য নষ্ট হলে তিনি বিভিন্ন অবতারে প্রকাশিত হন। মৎস্য, কূর্ম, বরাহ, নৃসিংহ, বামন, রাম, কৃষ্ণসহ বিভিন্ন অবতারের মাধ্যমে ধর্ম প্রতিষ্ঠার ধারণা হিন্দু ধর্মে সুপ্রতিষ্ঠিত।তবে বিভিন্ন বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা এক নয়। গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনে শ্রীকৃষ্ণকে ‘স্বয়ং ভগবান’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, অর্থাৎ অন্যান্য অবতার তাঁরই প্রকাশ বা অবতাররূপ। অন্যদিকে বৈষ্ণবের অন্যান্য ধারায় কৃষ্ণকে বিষ্ণুর অবতার হিসেবে বিশেষভাবে আরাধনা করা হয়।এখানেই কৃষ্ণতত্ত্বের বিশেষ বৈচিত্র্য—তিনি একই সঙ্গে পরম ঈশ্বর, প্রেমের আশ্রয় এবং ভক্তের অন্তরঙ্গ সঙ্গী হিসেবে উপাসিত।শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবের কাহিনিতে মথুরার কারাগারের একটি গভীর প্রতীকী ব্যাখ্যাও রয়েছে।কারাগার এখানে শুধু একটি ঐতিহাসিক বা পৌরাণিক স্থান নয়; ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় এটি অজ্ঞানতা, ভয়, অত্যাচার ও বন্ধনের প্রতীক হিসেবেও দেখা যায়।কংসের অত্যাচারে মথুরা যখন ভীত ও অন্ধকারাচ্ছন্ন, তখন সেই অন্ধকার কারাগারেই কৃষ্ণের আবির্ভাব। অর্থাৎ—অন্ধকারের মধ্যেই আলোর প্রকাশ,অধর্মের মধ্যেই ধর্মের আবির্ভাব,ভয়ের মধ্যেই অভয়ের প্রকাশ।এই কারণেই জন্মাষ্টমীর মধ্যরাত্রি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।কৃষ্ণের জন্মকাহিনিতে কংস কেবল একজন অত্যাচারী রাজা নন; ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় তিনি অহংকার, ক্ষমতার অপব্যবহার, ভয় ও অধর্মের প্রতীক।কংস জানতেন যে তাঁর পতন অবশ্যম্ভাবী। সেই ভয় থেকেই তিনি নিষ্ঠুরতার আশ্রয় নেন। কিন্তু ধর্মতত্ত্বের শিক্ষা হলো—অধর্ম যত শক্তিশালী মনে হোক, তার পতন অনিবার্য।কৃষ্ণের আবির্ভাব তাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের চিরন্তন বিজয়ের প্রতীক।দেবকী ও বসুদেব কৃষ্ণের জন্মকাহিনির কেন্দ্রীয় চরিত্র। তাঁরা ঈশ্বরের আবির্ভাবের বাহক।ধর্মীয় ব্যাখ্যায় তাঁদের চরিত্রের মধ্যে রয়েছে বিশ্বাস, ত্যাগ, ধৈর্য ও ঈশ্বরনির্ভরতা। দীর্ঘ বন্দিত্ব, সন্তান হারানোর বেদনা এবং কংসের ভয়াবহ অত্যাচারের মধ্যেও তাঁদের ঈশ্বরবিশ্বাস অটুট থাকে।তাঁদের জীবনের মাধ্যমে একটি শিক্ষা পাওয়া যায়—পরিস্থিতি যত কঠিন হোক, ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস ও ধর্মের প্রতি অবিচলতা মানুষকে আধ্যাত্মিকভাবে শক্তিশালী করে।মথুরায় দেবকীর সন্তান হলেও গোকুলে কৃষ্ণ যশোদার স্নেহে বেড়ে ওঠেন। এখানেই কৃষ্ণতত্ত্বের একটি অসাধারণ দিক প্রকাশিত হয়।পরমেশ্বর হয়েও কৃষ্ণ ভক্তের কাছে হয়ে ওঠেন সন্তান।যশোদা তাঁকে শাসন করেন, কোলে নেন, আদর করেন। এই সম্পর্ককে বৈষ্ণব ধর্মতত্ত্বে বাৎসল্যভাব বলা হয়।অর্থাৎ ঈশ্বরকে শুধু দূরের সর্বশক্তিমান সত্তা হিসেবে নয়, নিজের আপনজন হিসেবেও ভালোবাসা যায়।বৃন্দাবনে কৃষ্ণের লীলাকে বৈষ্ণব ধর্মতত্ত্বে অত্যন্ত গভীরভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। গোপ-গোপী, রাধা এবং বৃন্দাবনের লীলার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় প্রেমভক্তির তত্ত্ব।গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমকে জাগতিক প্রেমের সঙ্গে এক করে দেখা হয় না। এটি আত্মার সঙ্গে পরমাত্মার প্রেমময় সম্পর্কের প্রতীকী ও আধ্যাত্মিক প্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যাত।এখানে ভক্ত নিজের স্বার্থ ভুলে ঈশ্বরের প্রতি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করে।বৈষ্ণব ভাবধারায় কৃষ্ণের বাঁশির একটি গভীর প্রতীকী তাৎপর্য রয়েছে। বাঁশি নিজে কোনো শব্দ সৃষ্টি করে না; কৃষ্ণের নিঃশ্বাসে তার সুর প্রকাশিত হয়।ভক্তিমূলক ব্যাখ্যায় মানুষের আত্মাকেও অনেকটা বাঁশির সঙ্গে তুলনা করা হয়। যখন অহংকার, কামনা ও স্বার্থপরতা দূর হয়ে যায় এবং মানুষ নিজেকে ঈশ্বরের কাছে সমর্পণ করে, তখন তার জীবনেও ঈশ্বরীয় সুর প্রকাশিত হতে পারে।কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জুন যখন আত্মীয়-স্বজন ও প্রিয়জনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে দ্বিধাগ্রস্ত হন, তখন কৃষ্ণ তাঁকে যে উপদেশ দেন, তা পরবর্তীকালে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা নামে পরিচিত হয়।গীতায় কৃষ্ণ শুধু যুদ্ধের কথা বলেননি; তিনি আত্মা, কর্ম, জ্ঞান, ভক্তি, কর্তব্য, ঈশ্বর এবং মুক্তির গভীর দর্শন তুলে ধরেছেন।গীতার অন্যতম মৌলিক শিক্ষা হলো—মানুষের অধিকার কর্মে, কিন্তু কর্মের ফলের প্রতি আসক্ত হওয়া উচিত নয়।এই দর্শন কর্মযোগ নামে পরিচিত।কৃষ্ণের ধর্মতত্ত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আত্মার অমরত্ব।দেহ পরিবর্তনশীল; কিন্তু আত্মা নিত্য। মানুষ যেমন পুরোনো পোশাক ত্যাগ করে নতুন পোশাক গ্রহণ করে, তেমনি আত্মা এক দেহ ত্যাগ করে অন্য দেহ গ্রহণ করে—গীতায় এই ধারণা ব্যাখ্যা করা হয়েছে।এর মাধ্যমে কৃষ্ণ মানুষকে দেহকেন্দ্রিক ভয় ও শোকের ঊর্ধ্বে উঠে আত্মার প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধির শিক্ষা দেন।কৃষ্ণতত্ত্বের অন্যতম প্রধান শিক্ষা হলো ভক্তি।জ্ঞান, তপস্যা ও কঠিন সাধনার পাশাপাশি ভক্তির মাধ্যমে ঈশ্বরকে উপলব্ধির পথ হিন্দু ধর্মে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে বৈষ্ণব ধর্মে নামসংকীর্তন, ভজন, স্মরণ, শ্রবণ, কীর্তন ও ঈশ্বরের প্রতি আত্মসমর্পণকে মুক্তির গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে দেখা হয়।এই কারণেই জন্মাষ্টমীর রাতে মন্দির ও আশ্রমে হরিনাম সংকীর্তন ও ভজনের আয়োজন করা হয়।কৃষ্ণের আবির্ভাবের অন্যতম প্রধান ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা হলো ধর্মের পুনঃপ্রতিষ্ঠা।গীতায় কৃষ্ণ ঘোষণা করেন—“পরিত্রাণায় সাধূনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্,ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে।”অর্থাৎ সাধুদের রক্ষা, দুষ্কৃতকারীদের বিনাশ এবং ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি যুগে যুগে আবির্ভূত হন।এই শ্লোক জন্মাষ্টমীর মূল দর্শনকে গভীরভাবে প্রকাশ করে।শ্রীকৃষ্ণের ধর্মতত্ত্বের বিশেষত্ব হলো—তিনি একই সঙ্গে পরম ও অন্তরঙ্গ।তিনি বিশ্বজগতের নিয়ন্তা, আবার যশোদার সন্তান। তিনি মহাভারতের কূটনৈতিক ও দার্শনিক কৃষ্ণ, আবার বৃন্দাবনের বাঁশিওয়ালা রাখাল। তিনি অর্জুনের সারথি, আবার ভক্তের পরম আরাধ্য।এই বহুমাত্রিক রূপ কৃষ্ণতত্ত্বকে হিন্দু ধর্মের অন্যতম সমৃদ্ধ আধ্যাত্মিক ধারায় পরিণত করেছেজন্মাষ্টমী মানুষের কাছে কয়েকটি মৌলিক শিক্ষা তুলে ধরেঅন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে।ধর্ম ও সত্যের পথে থাকতে হবে।কর্ম করতে হবে নিষ্ঠার সঙ্গে।কর্মের ফলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত হওয়া যাবে না।অহংকার ত্যাগ করে ঈশ্বরের প্রতি আত্মসমর্পণ করতে হবে।ভক্তি ও ভালোবাসার মাধ্যমে ঈশ্বরকে উপলব্ধির চেষ্টা করতে হবে।সুতরাং কৃষ্ণ জন্মাষ্টমী কেবল একটি জন্মোৎসব নয়। এটি মানুষের অন্তরে ধর্ম, সত্য, প্রেম, কর্তব্য ও আত্মজাগরণের আলো প্রজ্বলনের একটি আধ্যাত্মিক আহ্বান।মথুরার কারাগারের মধ্যরাতে কৃষ্ণের আবির্ভাবের কাহিনি তাই আজও প্রতীকী অর্থে প্রাসঙ্গিক। মানুষের অন্তরে যখন ভয়, হিংসা, অহংকার, লোভ ও অজ্ঞতার অন্ধকার ঘনীভূত হয়, তখন কৃষ্ণতত্ত্ব তাকে সত্য ও ধর্মের পথে ফিরে আসার আহ্বান জানায়।জন্মাষ্টমীর প্রকৃত তাৎপর্য তাই কেবল বাহ্যিক উৎসবের মধ্যে নয়—নিজের অন্তরে কৃষ্ণের আদর্শ ও চেতনার জন্ম দেওয়ার মধ্যেই এর গভীরতম ধর্মতাত্ত্বিক অর্থ নিহিত।

কৃষ্ণ জন্মাষ্টমীর ধর্মতত্ত্ব: অবতারতত্ত্ব, ধর্মসংস্থাপন ও পরম সত্যের সন্ধান

ভাই-বোনের ভালোবাসা ও অটুট বন্ধনের উৎসব ‘রাখি বন্ধন’ আজ

ভাই-বোনের পারস্পরিক ভালোবাসা, স্নেহ, শ্রদ্ধা ও আজীবন পাশে থাকার অঙ্গীকারের প্রতীক পবিত্র রাখি বন্ধন উৎসব। প্রতি বছর ধর্মীয় ও সামাজিক নানা আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এ উৎসব পালিত হয়। রাখি বন্ধনকে ঘিরে ভাই-বোনের মধ্যে তৈরি হয় আনন্দ, আবেগ ও ভালোবাসার এক বিশেষ আবহ।রাখি বন্ধনের দিনে বোনেরা ভাইয়ের হাতে পবিত্র রাখি পরিয়ে দেন এবং ভাইয়ের দীর্ঘায়ু, সুস্বাস্থ্য, সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করেন। অন্যদিকে ভাইয়েরা বোনকে ভালোবাসা ও সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেন। অনেক পরিবারে এদিন বিশেষ পূজা, প্রার্থনা ও মিষ্টিমুখের আয়োজন করা হয়। নতুন পোশাক পরা, উপহার বিনিময় এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়াও উৎসবের অন্যতম অনুষঙ্গ।সনাতন ঐতিহ্যে রাখি বন্ধনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নানা পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক কাহিনি। মহাভারতের কাহিনিতে শ্রীকৃষ্ণ ও দ্রৌপদীর সম্পর্কের ঘটনাটি রাখি বন্ধনের সঙ্গে বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়। প্রচলিত বিশ্বাস ও লোকাচারে রাখিকে ভালোবাসা, মঙ্গলকামনা এবং পারস্পরিক দায়িত্ববোধের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।তবে আধুনিক সময়ে রাখি বন্ধনের তাৎপর্য শুধু ভাই-বোনের সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও ভালোবাসা বৃদ্ধির পাশাপাশি সমাজে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বার্তাও বহন করে এই উৎসব।রাখি বন্ধন উপলক্ষে বিভিন্ন এলাকায় মন্দির, সামাজিক ও পারিবারিক পর্যায়ে নানা আয়োজন করা হয়। বাজার ও দোকানগুলোতে দেখা যায় রঙিন রাখি, মিষ্টি ও উপহারের সমাহার। দূরে থাকা ভাই-বোনেরাও ফোন, ভিডিও কল কিংবা অনলাইনে শুভেচ্ছা বিনিময়ের মাধ্যমে এই বিশেষ দিনটির আনন্দ ভাগ করে নেন।রাখির পবিত্র সুতো যেন শুধু হাতে নয়, হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয়ের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে—এই প্রত্যাশাই থাকে উৎসবের মূলকথায়।ভাই-বোনের ভালোবাসা, বিশ্বাস ও মমতার এই পবিত্র বন্ধন চিরকাল অটুট থাকুক—এই শুভকামনায় সবাইকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা।

ভাই-বোনের ভালোবাসা ও অটুট বন্ধনের উৎসব ‘রাখি বন্ধন’ আজ

আজ থেকে শুরু রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের উৎসব ঝুলন যাত্রা

রাধা-কৃষ্ণের চিরন্তন প্রেমলীলা, ভক্তি ও আধ্যাত্মিকতার অনন্য আবহে বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎসব ঝুলনযাত্রা পালিত হচ্ছে। এ উপলক্ষে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার দক্ষিণ সাবেক রাঙ্গুনিয়ার সমভাব আদিত্য ধাম ও রাধারমন সেবাশ্রমে চলছে নানা ধর্মীয় ও ভক্তিমূলক আয়োজন।শ্রাবণ মাসের এই ঐতিহ্যবাহী উৎসবকে ঘিরে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান দুটির প্রাঙ্গণে বিরাজ করছে ভক্তিময় পরিবেশ। রাধা-কৃষ্ণের যুগলবিগ্রহ সুসজ্জিত দোলনায় স্থাপন করে পূজা-অর্চনা, নামসংকীর্তন, ভজন ও কীর্তনের মধ্য দিয়ে উৎসব পালন করছেন ভক্তরা। ফুল, পাতা ও বিভিন্ন উপকরণে সাজানো হয়েছে ঝুলন ও আশ্রম প্রাঙ্গণ।‘ঝুলন’ শব্দের সঙ্গে দোলনা বা দোল খাওয়ার বিষয়টি জড়িত। বৈষ্ণবীয় ভাবধারায় ঝুলনযাত্রা রাধা-কৃষ্ণের বৃন্দাবনলীলা ও তাঁদের চিরন্তন প্রেমের স্মরণে অনুষ্ঠিত হয়। ভক্তরা বিশ্বাস করেন, রাধা-কৃষ্ণের এই প্রেমলীলা জাগতিক প্রেমের ঊর্ধ্বে এক আধ্যাত্মিক প্রেম ও ভক্তির প্রতীক।ঝুলনে রাধা-কৃষ্ণের যুগলবিগ্রহ স্থাপন করার মধ্য দিয়ে ভক্তরা তাঁদের লীলাকে স্মরণ করেন। দোলনা দোলানোর সময় ভক্তদের কীর্তন, হরিনাম ও ভজনের মাধ্যমে মন্দির-আশ্রম প্রাঙ্গণে সৃষ্টি হয় গভীর আধ্যাত্মিক আবহ।হিন্দু ধর্মীয় শাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণের বিভিন্ন যাত্রা ও লীলার উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রচলিত যাত্রাগুলোর মধ্যে রথযাত্রা, রাসযাত্রা, দোলযাত্রা, স্নানযাত্রা ও ঝুলনযাত্রা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।বৈষ্ণব সমাজে ঝুলনযাত্রা শুধু একটি উৎসব নয়; এটি ভক্ত ও ভগবানের সম্পর্ককে আরও গভীর করার একটি আধ্যাত্মিক উপলক্ষ। রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা স্মরণের মাধ্যমে ভক্তরা ঈশ্বরের প্রতি প্রেম, শ্রদ্ধা ও আত্মসমর্পণের অনুভূতি জাগ্রত করেন।শাস্ত্রজ্ঞদের মতে, দ্বাপরযুগে বৃন্দাবনে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা ও আনন্দময় ক্রীড়াকে কেন্দ্র করে ঝুলন উৎসবের ঐতিহ্যের বিকাশ ঘটে। পরবর্তীতে বৈষ্ণব সংস্কৃতির বিস্তারের সঙ্গে এ উৎসব বাংলাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।মথুরা-বৃন্দাবনের পাশাপাশি বাংলার বিভিন্ন মঠ-মন্দির, আশ্রম ও বনেদি বাড়িতে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলন উৎসব পালিত হয়ে আসছে। ফলে এটি ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।এ আয়োজনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে শিশুদের সৃজনশীলতা ও পারস্পরিক সহযোগিতারও বিকাশ ঘটে।ঝুলনযাত্রা উপলক্ষে রাধা-কৃষ্ণের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ধরনের ফল, মিষ্টান্ন ও ভোগ-নৈবেদ্য নিবেদন করা হয়। বিভিন্ন মঠ-মন্দির ও আশ্রমে লুচি, সুজি, ফলসহ নানা প্রসাদ প্রস্তুত করে ভক্তদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।পাশাপাশি কোথাও কোথাও অনুষ্ঠিত হয় মহানাম সংকীর্তন, ভজন ও কীর্তন। নামসংকীর্তনের মাধ্যমে ভক্তরা ঈশ্বরের নাম স্মরণ ও শ্রবণের মাধ্যমে নিজেদের আধ্যাত্মিক সাধনায় যুক্ত করেন।ঝুলনযাত্রার তাৎপর্য শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি সামাজিক সম্প্রীতি, পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণেও ভূমিকা রাখে। উৎসব উপলক্ষে বিভিন্ন বয়সী মানুষ একত্রিত হন, একসঙ্গে পূজা ও কীর্তনে অংশ নেন এবং প্রসাদ গ্রহণ করেন।রাঙ্গুনিয়ার দক্ষিণ সাবেক রাঙ্গুনিয়ার সমভাব আদিত্য ধাম ও রাধারমন সেবাশ্রমেও ঝুলন উৎসবকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ভক্তদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। ভক্তরা রাধা-কৃষ্ণের দর্শন, পূজা, নামসংকীর্তন ও ভক্তিমূলক আয়োজনে অংশ নিচ্ছেন।রাধা-কৃষ্ণের ঝুলনযাত্রার মূল শিক্ষা হলো—ভক্তির সঙ্গে প্রেম, আত্মসমর্পণ ও ঈশ্বরস্মরণ। বৈষ্ণবীয় দর্শনে রাধার প্রেমকে পরম ভক্তির প্রতীক এবং কৃষ্ণকে পরম আরাধ্য হিসেবে দেখা হয়। তাই ঝুলন উৎসব ভক্তদের কাছে রাধা-কৃষ্ণের চিরন্তন প্রেমের স্মরণ এবং নিজের হৃদয়ে ভক্তি জাগ্রত করার এক বিশেষ উপলক্ষ।ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, কীর্তন, পূজা-অর্চনা ও ভক্তদের অংশগ্রহণে রাঙ্গুনিয়ার দুই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে পালিত হচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী ঝুলন উৎসব। ভক্তদের প্রত্যাশা, রাধা-কৃষ্ণের প্রেম ও ভক্তির এই উৎসব মানুষের জীবনে শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবিকতার বার্তা ছড়িয়ে দেবে।

আজ থেকে শুরু রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের উৎসব ঝুলন যাত্রা

বৃথা প্রাণীহিংসা বনাম বৈধ বলিদান: বৈদিক ধর্মে মাংসাহারের প্রকৃত বিধান ও আধ্যাত্মিক সত্য

সনাতন ধর্মে পরম ধর্ম হিসেবে করুণা ও অহিংসাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও সামাজিক জীবন ও মানব স্বভাবের বাস্তবতায় খাদ্যরীতি নিয়ে বিশদ শাস্ত্রীয় পথনির্দেশ রয়েছে। সাধনজীবনের জন্য মাংসাহার কখনোই বিধেয় নয় এবং সনাতন ধর্মে বৃথা প্রাণীহিংসা বা কেবল জিহ্বার স্বাদের জন্য পশুবধ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। তবে মহাকাব্য মহাভারত, মনুসংহিতা, মহানির্বাণতন্ত্র ও শ্রীমদ্ভাগবতের মতো ধর্মে প্রামাণ্য গ্রন্থসমূহে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে যে, যজ্ঞে বা দেবোদ্দেশে সমর্পণ করে প্রস্তুতকৃত আহার গ্রহণ করলে তা পাপে পরিণত হয় না। বৈদিক নীতিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে যবচূর্ণ, খিচুড়ি, পায়স, পিঠা কিংবা মাংসের মতো সুস্বাদু ও উপাদেয় খাদ্য বস্তু কখনোই কেবল নিজের ভোগের জন্য প্রস্তুত বা একা ভক্ষণ করা উচিত নয়; বরং সর্বপ্রথমে তা দেবতায় নিবেদন ও সর্বজনের মধ্যে বণ্টনপূর্বক গ্রহণ করাই শাস্ত্রসম্মত মূল বিধান।​মহাভারতের অনুশাসন পর্বে এ প্রসঙ্গে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, তিলতণ্ডুলসিদ্ধ অন্ন, কৃশর, পায়স কিংবা মাংস—কোনোটিই কেবল নিজের শারীরিক তৃপ্তির জন্য প্রস্তুত করা যাবে না, বরং ঐ সমস্ত বস্তু দেবোদ্দেশে প্রস্তুত করতে হবে। মহাভারতের এই সিদ্ধান্তের অনুরূপ বিধান পাওয়া যায় মনুসংহিতাতেও। সেখানে অসংস্কৃত পশুমাংস অর্থাৎ যে পশুকে যজ্ঞে দেবোদ্দেশে সমর্পণ করা হয়নি, সেই পশুর মাংস ভোজন করতে স্পষ্ট নিষেধ করা হয়েছে। শাস্ত্রের বিভিন্ন স্থানে বর্ণিত প্রথাগত বলিকৃত পশু সকল বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে সদ্গতি প্রাপ্ত হয়। পশুবলির প্রথা মূলত প্রতীকী অর্থে মানুষের শরীরস্থ ষড়রিপু অর্থাৎ কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসয্যের বিনাশের বার্তা বহন করে। পশুত্ব থেকে মনুষ্যত্ব এবং পরিশেষে দেবত্বে পৌঁছানোর প্রক্রিয়ায় দেবোদ্দেশে বলিদানকে শাস্ত্রে ‘অহিংসা’ বলা হয়েছে। যজ্ঞের পুষ্টি ও বিধানের নিমিত্ত স্বয়ং প্রজাপতি পশু সৃষ্টি করেছেন; ফলে প্রথাগত যজ্ঞে যে পশুবধ, তা হিংসা বা পাপ নয়, বরং দেব সন্তুষ্টির জন্য আয়োজিত বৈধ কর্ম। ​(News copied from- 'হিন্দুস নিউজ')​শাস্ত্রীয় বিধানে আরও উল্লেখ রয়েছে যে, মহানির্বাণতন্ত্রে দেবোদ্দেশে উৎসর্গীকৃত বলিক্রিয়াকে 'বৈধ হিংসা' বলা হয়েছে, যা মানুষকে পাপে লিপ্ত করে না। তবে এই বিশেষ দৈব উদ্দেশ্য ব্যতিরেকে অন্য কোনো স্থলে প্রাণীহিংসা করা সম্পূর্ণ বর্জনীয়। অথর্ববেদ ও শ্রীমদ্ভাগবতে মানুষের স্বভাবজাত বৃত্তির বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছে, মানব সমাজ স্বাভাবিকভাবেই সুরা, মাংস ও কায়িক ভোগের প্রতি আকৃষ্ট হয়। শাস্ত্রের মূল অভীষ্ট বিধিনিষেধের মাধ্যমে মানুষের এই উচ্ছৃঙ্খল প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ ও সংযমিত করে আধ্যাত্মিক নিবৃত্তিমার্গে পরিচালিত করা। শ্রীমদ্ভাগবতের একাদশ স্কন্ধে স্পষ্ট বলা হয়েছে, যজ্ঞে পশু উৎসর্গ বা 'আলভন' মূলত আধ্যাত্মিক সংযমের একটি রূপ, বৃথা প্রাণী হত্যা নয়। কিন্তু শাস্ত্রীয় চেতনাহীন ও অহংকারী ব্যক্তিরা অনর্থক পশুবধ করে পাপের ভাগী হয়, যাদের জন্য পরকালে কঠোর পরিণতির কথা বলা হয়েছে।​ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে কেবল উদ্ভিজ্জ খাদ্যের ওপর নির্ভর করে জীবনধারণ করা অনেকের জন্যই কঠিন। বৈদিক সাহিত্য অনুযায়ী, সাধনার উচ্চ মার্গে অবস্থানকারীদের জন্য প্রাণীজ আহার সম্পূর্ণ বর্জন করাই সর্বোত্তম পন্থা। তবে যারা সাধারণ সাংসারিক জীবনে প্রতিনিয়ত মাংস ভোজন করছেন, তাদের জন্য কসাইখানা থেকে কেনা অপ্রাপ্ত ও সংস্কারহীন মাংস পরিহার করে দেবতায় অর্পিত দৈব বিধিতে প্রস্তুত মাংস ভোজন করাই শ্রেয়। বিশেষ করে বঙ্গদেশের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, সাধারণ মাংসের দোকানগুলোর প্রায় সবই ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের দ্বারা পরিচালিত, যারা নিজেদের ধর্মীয় বিধিতে পশু হত্যা করে থাকে। ফলে সনাতন ধর্মে বিশ্বাসীদের জন্য কসাইখানার সেই মাংসের পরিবর্তে দেবোদ্দেশে নিবেদিত ও দৈব বিধিতে সুসংস্কৃত মাংস ভক্ষণই আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় দিক থেকে পরম সঙ্গত ও উত্তম।

বৃথা প্রাণীহিংসা বনাম বৈধ বলিদান: বৈদিক ধর্মে মাংসাহারের প্রকৃত বিধান ও আধ্যাত্মিক সত্য

ধর্মের জয়, অধর্মের পরাজয়: মানবতার পথপ্রদর্শক শ্রীকৃষ্ণ

বিশ্বজুড়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শ্রীকৃষ্ণ জন্মাষ্টমী।২০২৬ সালে ভক্তরা গভীর শ্রদ্ধা, ভক্তি ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পালন করবেন এই পবিত্র তিথি। প্রচলিত হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস ও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গণনা অনুযায়ী, ভগবান প্রায় ৩২২৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে দ্বাপর যুগে আবির্ভূত হন।সেই হিসেবে ২০২৬ সালের জন্মাষ্টমীকে প্রায় ৫২৫৪ তম শ্রীকৃষ্ণ জন্মাষ্টমী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।ধর্মগ্রন্থ অনুসারে, ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে মথুরার কারাগারে অত্যাচারী রাজা কংসের বন্দিশালায় দেবকী ও বসুদেবের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন শ্রীকৃষ্ণ। তাঁর জন্মের পূর্বেই ভবিষ্যদ্বাণী হয়েছিল যে দেবকীর অষ্টম সন্তানই কংসের অত্যাচার ও অন্যায়ের অবসান ঘটাবেন। সেই ভবিষ্যদ্বাণীকে ভয় পেয়েই কংস একে একে দেবকীর সন্তানদের হত্যা করলেও অষ্টম সন্তান শ্রীকৃষ্ণ অলৌকিকভাবে গোকুলে নন্দ ও যশোদার ঘরে লালিত-পালিত হন।শৈশব থেকেই শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন অন্যায় ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক। তিনি পুতনা, অঘাসুর, বকাসুর, তৃণাবর্তসহ বহু অসুরকে পরাজিত করে মানুষের জীবন থেকে ভয় ও অশান্তি দূর করেন। পরবর্তীতে তিনি অত্যাচারী কংসকে বধ করে মথুরার জনগণকে মুক্তি প্রদান করেন এবং ন্যায় ও সুবিচারের পথ সুগম করেন।তবে শ্রীকৃষ্ণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক ভূমিকা পরিলক্ষিত হয় -এর কাহিনিতে। কুরুক্ষেত্রের মহাযুদ্ধে তিনি অস্ত্র ধারণ না করলেও ছিলেন ন্যায় ও ধর্মের পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী নেতৃত্বের প্রতীক। তিনি পাণ্ডবদের বন্ধু, উপদেষ্টা, কূটনীতিক এবং অর্জুনের রথের সারথি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।যুদ্ধের প্রাক্কালে অর্জুন যখন আত্মীয়-স্বজন, গুরুজন ও আপনজনদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েন, তখন শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে কর্ম, কর্তব্য, আত্মা, ধর্ম ও ন্যায়ের দর্শন সম্পর্কে যে অমর বাণী প্রদান করেন, তা পরবর্তীতে নামে বিশ্বসভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।গীতায় শ্রীকৃষ্ণ ঘোষণা করেছিলেন—"যখনই ধর্মের অবক্ষয় এবং অধর্মের উত্থান ঘটে, তখনই আমি আবির্ভূত হই; সাধুদের রক্ষা, দুষ্টদের বিনাশ এবং ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য যুগে যুগে আমি অবতার গ্রহণ করি।"এই বাণী শুধু ধর্মীয় উপদেশ নয়, বরং মানবসমাজে ন্যায়, সত্য ও নৈতিকতার প্রতিষ্ঠার এক চিরন্তন অঙ্গীকার।কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ মূলত দুই রাজবংশের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ছিল না; এটি ছিল ধর্ম ও অধর্ম, সত্য ও মিথ্যা, ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যকার এক মহাসংগ্রাম। শ্রীকৃষ্ণের দূরদর্শিতা, প্রজ্ঞা, কৌশল এবং নৈতিক নেতৃত্বের ফলেই শেষ পর্যন্ত পাণ্ডবদের বিজয় এবং কৌরবদের পরাজয় ঘটে। এর মধ্য দিয়েই প্রতিষ্ঠিত হয় ধর্মের জয় এবং অধর্মের পরাজয়ের চিরন্তন সত্য।আজকের সমাজেও শ্রীকৃষ্ণের জীবন ও আদর্শ সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। অন্যায়, দুর্নীতি, হিংসা, বিভেদ ও অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার শিক্ষা দেয় তাঁর জীবনদর্শন।শ্রীকৃষ্ণ জন্মাষ্টমী তাই শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি ন্যায়, দায়িত্ব, মানবকল্যাণ ও নৈতিকতার এক অনন্ত আহ্বান। যুগে যুগে, কালে কালে ধর্ম প্রতিষ্ঠা ও অধর্ম বিনাশের যে চিরন্তন বার্তা শ্রীকৃষ্ণ মানবজাতিকে দিয়ে গেছেন, তা আজও বিশ্বমানবতার জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে রয়েছে।

ধর্মের জয়, অধর্মের পরাজয়: মানবতার পথপ্রদর্শক শ্রীকৃষ্ণ

জগন্নাথদেবের স্নানযাত্রায় খুলবে ভাগ্যের দুয়ার: জানুন পুণ্য তিথি ও অলৌকিক সুখ-সমৃদ্ধির শাস্ত্রীয় নিয়মাবলী

সনাতন ধর্মের অন্যতম মহাসমাবেশ ও আধ্যাত্মিক চেতনার প্রতীক শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের পরম পবিত্র স্নানযাত্রা উৎসব সমাগত। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি সনাতন ধর্মাবলম্বী ও মানবতাবাদী মানুষের কাছে জগন্নাথ সংস্কৃতি কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং এটি সাম্য, অহিংসা ও সর্বজনীন মানবাধিকারের এক শাশ্বত বার্তা বহন করে। পুরুষোত্তম ধাম পুরী থেকে শুরু করে বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে, ভারতের হুগলির মাহেশ কিংবা আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের (ইসকন) প্রতিটি মন্দিরে এই মহোৎসবকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে এক অভূতপূর্ব আনন্দঘন পরিবেশ। সনাতনী শাস্ত্রীয় ঐতিহ্য অনুসারে, মহা রথযাত্রার পূর্বে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীজগন্নাথ, অগ্রজ বলরাম এবং ভগিনী সুভদ্রা দেবীকে ১০৮ ঘড়া সুবাসিত জল দিয়ে মহাস্নান করানোর বিধান রয়েছে, যা অত্যন্ত নিষ্ঠা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়।​সনাতনী বিশ্বাস মতে, এই পরম পবিত্র তিথিতে শাস্ত্রীয় নিয়ম ও শুদ্ধাচার মেনে চললে ভক্তের জীবনে পরম কল্যাণ সাধিত হয় এবং ঘোর কলিযুগেও রাতারাতি ভাগ্যের চাকা ঘুরে গিয়ে পরিবারে নেমে আসে সুখ, শান্তি ও অনাবিল সমৃদ্ধি। স্নানযাত্রার এই পুণ্যলগ্নে ভক্তদের অত্যন্ত ভোরে শয্যা ত্যাগ করে সম্ভব হলে গঙ্গাস্নান অথবা স্থানীয় কোনো পবিত্র জলাশয়ে স্নান সমাপনপূর্বক শুদ্ধ বস্ত্র পরিধান করতে হয়। এরপর উদীয়মান সূর্যদেবকে প্রণাম জানিয়ে মন্দিরে বা গৃহবিগ্রহের চরণে পূজানিবেদন করার নিয়ম রয়েছে। তবে এই বিশেষ পূজার পূর্বে শ্রীবিগ্রহগণকে গঙ্গাজল, কাঁচা দুধ, আতর, চন্দন ও কর্পূর মিশ্রিত সুবাসিত জল দিয়ে স্নান করানো হয় এবং স্নানান্তে মহাপ্রভুর চরণে ১০৮টি তুলসী পত্র অর্পণ করা আবশ্যক। (News copied from- 'হিন্দুস নিউজ') পূজার নৈবেদ্য হিসেবে পাঁচ রকমের ফল ও মিষ্টান্ন নিবেদন করে গোলাপ ফুলের অর্ঘ্য সাজিয়ে আরতি সমাপন করতে হয় এবং এই বিশেষ দিনে ব্রাহ্মণ ভোজন করালে পরম আশীর্বাদ লাভ সম্ভব হয় বলে শাস্ত্রে উল্লেখ আছে।​বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকার গণনা অনুযায়ী, এ বছর পরম পবিত্র পূর্ণিমা তিথিটি শুরু হয়েছে রবিবার রাত ৩:০৮ মিনিটে এবং এই তিথির সমাপ্তি ঘটবে সোমবার ভোর ৫:২৭ মিনিটে, যার ফলে ২৯ জুন সোমবারই জগন্নাথদেবের মহাস্নানযাত্রা উদযাপনের সবচেয়ে মাহেন্দ্রক্ষণ ও সর্বোত্তম সময়। এই মহাস্নানযাত্রার পর আগামী ১৬ জুলাই ২০২৬, বৃহস্পতিবার দেশজুড়ে সাড়ম্বরে উদযাপিত হবে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা উৎসব, যার দ্বিতীয়া তিথি শুরু হচ্ছে ১৫ জুলাই দুপুর ১:৪৬ মিনিটে এবং শেষ হবে ১৬ জুলাই সকাল ১১:৪৪ মিনিটে। পরবর্তীতে আগামী ২৪ জুলাই ২০২৬, শুক্রবার ভক্তকূলের পরম আনন্দের মধ্য দিয়ে উল্টোরথ যাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। মানবাধিকার ও বিশ্বজনীন সৌভ্রাতৃত্বের বাণী ছড়িয়ে দিতে এবং সনাতনী ঐতিহ্য রক্ষার্থে এই রথযাত্রা ও স্নানযাত্রা উৎসব প্রতিটি মানুষের জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল শান্তি ও আধ্যাত্মিক মুক্তি, এটাই এই পুণ্যলগ্নের মূল প্রার্থনা।

জগন্নাথদেবের স্নানযাত্রায় খুলবে ভাগ্যের দুয়ার: জানুন পুণ্য তিথি ও অলৌকিক সুখ-সমৃদ্ধির শাস্ত্রীয় নিয়মাবলী

২২ জুন শুরু অম্বুবাচী: ধরিত্রী মাতার ঋতুচক্রকে ঘিরে বিশেষ ধর্মীয় আচার

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক আচার অম্বুবাচী আগামী ২২ জুন রাত ৯টা ১০ মিনিটে শুরু হবে এবং ২৬ জুন সকাল ৯টা ৩৩ মিনিটে নিবৃত্তি ঘটবে। ধরিত্রী মাতার বার্ষিক ঋতুচক্রকে কেন্দ্র করে পালিত এই উৎসব উপলক্ষে দেশ-বিদেশের মন্দির, আশ্রম ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে নানা আচার-অনুষ্ঠান পালনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, পৃথিবী বা ধরিত্রী মা দেবী কামাখ্যারই এক রূপ। প্রতি বছর আষাঢ় মাসে পৃথিবী মাতার ঋতুচক্র সংঘটিত হয় বলে বিশ্বাস করা হয়। এই সময়কে ‘অম্বুবাচী’ নামে অভিহিত করা হয়। প্রকৃতি, সৃষ্টিশক্তি ও নারীত্বের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদনের এক অনন্য উপলক্ষ হিসেবে এই আচার যুগ যুগ ধরে পালিত হয়ে আসছে।‘অম্বু’ শব্দের অর্থ জল এবং ‘বাচী’ শব্দের অর্থ প্রকাশ বা স্ফুরণ। বর্ষাকালের সূচনালগ্নে যখন বৃষ্টির স্পর্শে মাটিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার ঘটে, তখনই অম্বুবাচী পালিত হয়। ধর্মীয় ব্যাখ্যায় বলা হয়, এই সময়ে ধরিত্রী মা নতুন সৃষ্টির শক্তি ধারণ করেন। তাই তাঁকে বিশ্রাম দেওয়ার প্রতীকী প্রকাশ হিসেবে বিভিন্ন বিধি-নিষেধ পালন করা হয়।অম্বুবাচীর সবচেয়ে বড় আয়োজন অনুষ্ঠিত হয় ভারতের আসামের নীলাচল পাহাড়ে অবস্থিত ঐতিহাসিক কামাখ্যা মন্দির-এ। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, অম্বুবাচীর তিন দিন দেবী কামাখ্যা ঋতুমতী থাকেন। এ কারণে মন্দিরের গর্ভগৃহ বন্ধ রাখা হয় এবং নিয়মিত পূজা-অর্চনা স্থগিত থাকে। পরবর্তীতে বিশেষ স্নান, পূজা ও ধর্মীয় আচার সম্পন্ন করে মন্দিরের দ্বার পুনরায় ভক্তদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।অম্বুবাচী উপলক্ষে লক্ষাধিক ভক্ত, সাধু-সন্ন্যাসী ও তীর্থযাত্রী কামাখ্যা মন্দিরে সমবেত হন। এই সময়কে শাক্ত সম্প্রদায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় পর্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়।ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী, অম্বুবাচী চলাকালীন সময়ে মাটি খোঁড়া, হালচাষ, কোদাল চালানো কিংবা কৃষিকাজ থেকে বিরত থাকার প্রচলন রয়েছে। কারণ এই সময় ধরিত্রী মাতাকে ঋতুমতী অবস্থায় বিশ্রামরত বলে মনে করা হয়। অনেক পরিবারে রান্নাবান্না সীমিত রাখা হয় এবং ফলমূল, দুধ বা নিরামিষ খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে ব্রত পালন করা হয়।এ সময় অনেক মন্দিরে নিত্যপূজা সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলেও ভক্তরা জপ, ধ্যান, নামসংকীর্তন ও ধর্মীয় সাধনায় অংশগ্রহণ করেন। সাধু-সন্ন্যাসীরাও বিশেষ তপস্যা ও আধ্যাত্মিক অনুশীলনে নিমগ্ন থাকেন।অম্বুবাচী নিবৃত্তির পর ভক্তদের মধ্যে দেবীর আশীর্বাদস্বরূপ লাল বা রক্তবর্ণের কাপড় বিতরণ করা হয়, যা ‘রক্তবস্ত্র’ নামে পরিচিত। ভক্তদের বিশ্বাস, এই রক্তবস্ত্র সৌভাগ্য, মঙ্গল এবং দেবীশক্তির আশীর্বাদের প্রতীক।সনাতন ধর্মীয় দর্শনে অম্বুবাচী শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং প্রকৃতি, নারীত্ব ও সৃষ্টিশক্তির প্রতি শ্রদ্ধা, সম্মান এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এক অনন্য উৎসব। প্রতিবছরের মতো এবারও ভক্তরা ব্রত, প্রার্থনা ও ধর্মীয় অনুশীলনের মধ্য দিয়ে এই পবিত্র সময় পালন করবেন।

২২ জুন শুরু অম্বুবাচী: ধরিত্রী মাতার ঋতুচক্রকে ঘিরে বিশেষ ধর্মীয় আচার

মহাভারতের পাতায় শ্রীরামের জন্ম ও গৌরবময় জীবনগাথা রামায়ণ ও মহাভারতের মহাকাব্যিক

সনাতন ধর্মের দুই মহাকাব্য— রামায়ণ ও মহাভারত—ভারতীয় সভ্যতা, সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিক দর্শনের অমূল্য সম্পদ। সাধারণভাবে ভগবান শ্রীরামের পূর্ণাঙ্গ জীবনকাহিনি বাল্মীকি রচিত রামায়ণ গ্রন্থেই পাওয়া যায়। তবে অনেকেরই অজানা যে, মহর্ষি ব্যাসদেব রচিত মহাভারত-এর মধ্যেও শ্রীরামের জন্ম, তাঁর আদর্শ চরিত্র এবং বীরত্বগাঁথার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবরণ সংরক্ষিত রয়েছে। মহাভারতের বনপর্বে বর্ণিত এই অংশটি ‘রামোপাখ্যান’ নামে পরিচিত।মহাভারতের বনপর্বে দেখা যায়, পাশা খেলায় রাজ্য হারিয়ে পাণ্ডবরা যখন বনবাসে দিন কাটাচ্ছিলেন, তখন নানা দুঃখ-কষ্ট ও অপমানের ভারে জর্জরিত হয়ে যুধিষ্ঠির মহর্ষি মার্কণ্ডেয়ের কাছে জানতে চান, তাঁর মতো দুর্ভাগা রাজা পৃথিবীতে আর কেউ ছিলেন কি না।যুধিষ্ঠিরের প্রশ্নের উত্তরে তাঁকে ধৈর্য, ধর্মনিষ্ঠা ও সহিষ্ণুতার শিক্ষা দিতে মহর্ষি মার্কণ্ডেয় শ্রীরামচন্দ্রের জীবনকাহিনি বর্ণনা করেন। মহাভারতের এই পর্বই পরবর্তীতে ‘রামোপাখ্যান’ নামে খ্যাতি লাভ করে।অলৌকিক জন্ম ও ইক্ষ্বাকু বংশের গৌরবমহাভারতের বর্ণনা অনুযায়ী, অযোধ্যার ইক্ষ্বাকু বংশীয় রাজা দশরথ দীর্ঘদিন নিঃসন্তান ছিলেন। উত্তরাধিকার লাভের আশায় তিনি ঋষ্যশৃঙ্গ মুনির পরিচালনায় পুত্রেষ্টি যজ্ঞ সম্পন্ন করেন।যজ্ঞের ফলস্বরূপ দেবতাদের প্রার্থনায় ভগবান বিষ্ণু স্বয়ং মানব রূপে অবতীর্ণ হন। অধর্মের বিনাশ এবং রাক্ষসরাজ রাবণের অত্যাচার থেকে পৃথিবীকে রক্ষার জন্য তিনি রাজা দশরথের জ্যেষ্ঠ পুত্র হিসেবে জন্মগ্রহণ করেন।রাজমাতা কৌশল্যার গর্ভে জন্ম নেন শ্রীরাম। অপরদিকে কৈকেয়ীর গর্ভে ভরত এবং সুমিত্রার গর্ভে লক্ষ্মণ ও শত্রুঘ্নের জন্ম হয়। মহাভারতে শ্রীরামকে অসীম শক্তির অধিকারী, সত্যপরায়ণ ও সর্বগুণে গুণান্বিত মহাপুরুষ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।বনবাস, সীতাহরণ ও রাবণবধ‘রামোপাখ্যান’-এ রামায়ণের প্রধান ঘটনাগুলো সংক্ষিপ্ত অথচ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।বিমাতা কৈকেয়ীর বরে এবং পিতা রাজা দশরথের সত্যরক্ষার জন্য শ্রীরাম স্বেচ্ছায় ১৪ বছরের বনবাস গ্রহণ করেন। তাঁর সঙ্গে বনবাসে যান অনুজ লক্ষ্মণ ও পত্নী সীতা।বনবাসের এক পর্যায়ে লঙ্কার রাজা রাবণ কৌশলে সীতাকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। এরপর শ্রীরাম বানররাজ সুগ্রীব, মহাবীর হনুমান এবং বানরসেনার সহযোগিতায় সমুদ্রের ওপর সেতুবন্ধন করে লঙ্কায় অভিযান পরিচালনা করেন।মহাভারতে রাম-রাবণের সেই ঐতিহাসিক যুদ্ধের বর্ণনা রয়েছে, যেখানে ধর্ম ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে শ্রীরাম রাবণকে বধ করেন এবং সীতাকে উদ্ধার করেন।মহাভারতের দৃষ্টিতে শ্রীরাম: আদর্শ মানবের প্রতিচ্ছবিমহাভারতে শ্রীরামকে শুধু একজন রাজা বা বীর যোদ্ধা হিসেবেই নয়, বরং ‘মর্যাদা পুরুষোত্তম’—আদর্শ মানব হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।জীবনের প্রতিটি কঠিন পরিস্থিতিতেও শ্রীরাম ধর্ম ও সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত হননি। যুধিষ্ঠিরকে তাঁর উদাহরণ দিয়েই বোঝানো হয়েছিল যে, ধর্মের পথে চললে শেষ পর্যন্ত জয় নিশ্চিত।আদর্শ ভ্রাতৃত্ব ও মানবিকতা:ভাইদের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসা, ভরতের প্রতি আস্থা এবং লক্ষ্মণের প্রতি স্নেহ মহাভারতে বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে। একইসঙ্গে শরণাগত বিভীষণের প্রতি তাঁর করুণা ও গ্রহণযোগ্যতা তাঁর মহত্ত্বের পরিচায়ক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।ধর্মের জয়ই চূড়ান্ত বার্তামহাভারতের পাতায় সংরক্ষিত শ্রীরামের এই জীবনগাথা প্রমাণ করে যে, যুগে যুগে অবতারের রূপ ভিন্ন হলেও ধর্মের মূল শিক্ষা একই। ধর্ম, ন্যায় ও সত্যের প্রতি অবিচল থাকার মধ্যেই নিহিত রয়েছে প্রকৃত বিজয়।যুধিষ্ঠির যেমন শ্রীরামের জীবন থেকে ধৈর্য, সহিষ্ণুতা ও ধর্মনিষ্ঠার শিক্ষা পেয়েছিলেন, তেমনি আজও তাঁর জীবনাদর্শ কোটি ভক্তের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।সনাতন ধর্মের এই দুই মহাকাব্য যেন একই সুরে উচ্চারণ করে— “যতো ধর্মস্ততো জয়ঃ”; অর্থাৎ যেখানে ধর্ম, সেখানেই জয়।

মহাভারতের পাতায় শ্রীরামের জন্ম ও গৌরবময় জীবনগাথা রামায়ণ ও মহাভারতের মহাকাব্যিক

জামাইষষ্ঠী: ঐতিহ্য, পারিবারিক বন্ধন ও এক চিরন্তন পৌরাণিক কাহিনী

বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম ঐতিহ্যবাহী উৎসব জামাইষষ্ঠী আজও সমান গুরুত্ব ও আনন্দের সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে। প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে এ উৎসব উদযাপিত হয়। এদিন শাশুড়িরা জামাইকে বরণ করে নেন, আশীর্বাদ করেন এবং নানা ধরনের সুস্বাদু খাবারের আয়োজন করেন। অন্যদিকে, জামাইরাও রীতি অনুযায়ী শ্বশুরবাড়িতে উপহার নিয়ে যান।সামাজিকভাবে এ উৎসবের মূল উদ্দেশ্য হলো শ্বশুরবাড়ি ও বাপের বাড়ির মধ্যে পারিবারিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় ও মধুর করে তোলা। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে উৎসবের আয়োজনের ধরনে পরিবর্তন এলেও এর ঐতিহ্য ও আবেগ আজও অটুট রয়েছে।তবে জামাইষষ্ঠী পালনের পেছনে রয়েছে একটি প্রাচীন পৌরাণিক কাহিনি। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এক পরিবারে দুই পুত্রবধূ ছিল। তাদের মধ্যে ছোট বউটি ছিল অত্যন্ত লোভী। বাড়িতে ভালো কোনো খাবার রান্না হলে সে সবার অগোচরে তা খেয়ে ফেলত এবং পরে কালো বিড়ালের ওপর দোষ চাপাত। অথচ সেই বিড়ালকে মা ষষ্ঠীর বাহন হিসেবে মনে করা হয়।বারবার নিজের বাহনের নামে মিথ্যা অপবাদ দেওয়ায় মা ষষ্ঠী ক্রুদ্ধ হন এবং অভিশাপ দেন। এর ফলে ছোট বউয়ের জন্ম নেওয়া প্রতিটি সন্তান অল্প সময়ের মধ্যেই মারা যেতে থাকে। এভাবে তার সাত পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের মৃত্যু হয়।সন্তান হারানোর শোকে একদিন ছোট বউ বনে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে। তখন মা ষষ্ঠী বৃদ্ধার ছদ্মবেশে তার সামনে উপস্থিত হন এবং তার দুঃখের কারণ জানতে চান। ছোট বউ নিজের সব ভুল স্বীকার করে মা ষষ্ঠীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে।পরে মা ষষ্ঠী নিজের প্রকৃত রূপ ধারণ করে তাকে ক্ষমা করেন এবং জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে ভক্তিভরে তাঁর পূজা করার নির্দেশ দেন। ছোট বউ সেই নির্দেশ মেনে পূজা করলে আশীর্বাদস্বরূপ তার মৃত সন্তানরা পুনরায় জীবন ফিরে পায়।জনশ্রুতি রয়েছে, সেই সময় থেকেই ষষ্ঠী পূজার মাহাত্ম্য মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরবর্তীতে তা জামাইষষ্ঠী উৎসবের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বাঙালি সংস্কৃতির এক অনন্য পারিবারিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়।

জামাইষষ্ঠী: ঐতিহ্য, পারিবারিক বন্ধন ও এক চিরন্তন পৌরাণিক কাহিনী

আদ্যাশক্তি কালীই কামাখ্যা: সনাতন দর্শনের সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক রহস্য ও মহামায়ার অমোঘ মহিমা

সনাতন ধর্মের মূল ভিত্তি এবং শাক্ত দর্শনের সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক রহস্য উন্মোচিত হয়েছে আদ্যাশক্তি মহামায়া কালী ও দেবী কামাখ্যার অভেদ তত্ত্বের মাধ্যমে। শাস্ত্রমতে, যিনি সৃষ্টির আদি উৎস আদ্যাশক্তি কালিকা, তিনিই নীলকূটের কামরূপিণী কামাখ্যা। মহাজাগতিক এই পরম সত্যকে পাশ কাটিয়ে কোনো সাধকের পক্ষেই পূর্ণতা লাভ করা সম্ভব নয়। দেবী কামাখ্যার মহিমাময় আরাধনা ব্যতীত দেবীর সকল বিদ্যার সুসাধকও পদে পদে বিঘ্নের সম্মুখীন হন। ফলস্বরূপ, শাক্ত, বৈষ্ণব, শৈব, সৌর ও গাণপত্য—এই পঞ্চ মতের সকল অনুসারীকেই মহামায়ার চরণে শরণাগত হতে হয়। জগতের স্থাবর-অস্থাবর, জড়-চেতন যা কিছু বিদ্যমান, সবই তাঁর অচিন্ত্য মায়াশক্তি দ্বারা আবৃত। কামাখ্যাতন্ত্রের দ্বিতীয় পটলে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, সর্ববিদ্যার সাধককে অবশ্যই দেবী কামাখ্যার আরাধনা করতে হবে, অন্যথায় সিদ্ধিহানি নিশ্চিত। সমস্ত জীবজগৎ মহামায়ার মায়াজালে এমনভাবে আবদ্ধ, যেমন তৈলযন্ত্রে বৃষ বা ঘানির বলদ আবদ্ধ থাকে।​কামাখ্যাতন্ত্রের প্রথম পটলের বর্ণনা অনুযায়ী, দেবী কামাখ্যা হলেন নিত্যা, বরদাত্রী এবং সাধকের মহাবিভব ও আনন্দ বর্ধনকারিণী। তিনি ত্রিভুবনের সকল জীবের জননী ও পরম ত্রাণকর্ত্রী। ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব এবং চন্দ্রসহ সকল দেবগণ সর্বদা তাঁর সেবা করে থাকেন এবং দেবতাদের মূল দেবত্ব শক্তিই হলেন এই কামরূপিণী কামাখ্যা। তন্ত্রশাস্ত্রে লক্ষ-কোটি মহাবিদ্যার কথা বলা হলেও, সর্বশ্রেষ্ঠ ষোড়শী বিদ্যার মূল কারণও হলেন জগদম্বিকা কালিকা। চন্দ্রের কান্তি যেভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে পুনরায় উদিত হয়, ঠিক তেমনি এই মহাবিশ্বের সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় দেবী কামাখ্যার ইচ্ছাতেই সম্পন্ন হয়। তিনি ছাড়া এই ত্রিভুবনে দ্বিতীয় কোনো সত্ত্বার অস্তিত্ব নেই। যে মানব এই পরম তত্ত্বের প্রতি বিমুখ হয়, সে সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডে নিন্দিত ও গতিহীন হয়ে পড়ে। দেবী কামাখ্যাই সাধকের ধর্ম, অর্থ, কাম এবং মোক্ষ প্রদান করেন। তিনিই জীবের সালোক্য ও সারূপ্য মুক্তির একমাত্র পরম গতি। ​(News copied from- 'হিন্দুস নিউজ')​পবিত্র কালিকাপুরাণের ৬২ তম অধ্যায়ে স্বয়ং ভগবান শিব দেবী কামাখ্যার এই অলৌকিক মাহাত্ম্য ও স্বরূপ প্রকাশ করেছেন। মহাদেব বলেছেন, দেবী মহামায়া তাঁর সাথে পরম আনন্দলীলা অনুভবের নিমিত্ত নীলকূটের নির্জন পর্বত প্রদেশে আবির্ভূত হয়েছিলেন বলেই তিনি ‘কামাখ্যা’ নামে খ্যাত। তিনি জগতের সৃষ্টি স্থায়িত্বের মূল প্রকৃতিরূপা এবং সৃষ্টি রহস্যের প্রতীক স্বরূপ যোনিচিহ্নে পূজিতা। ভগবান বিষ্ণু যখন মধু ও কৈটভ নামক অসুরদ্বয়কে বধ করার জন্য যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন, তখন এই মহামায়াই মহাজাগতিক মোহ বিস্তার করে অসুরদের বিভ্রান্ত করেছিলেন। তিনি একাধারে কামদা, কামিনী, কান্তা এবং কামাঙ্গনাশিনী। সমগ্র সৃষ্টিকে নিয়োজিত ও পরিচালিত করাই এই আদিপ্রকৃতির মূল লীলা।​কামাখ্যাতন্ত্রের দশম পটল অনুযায়ী, কৃষ্ণবর্ণা জগদ্ধাত্রী কালিকা ও দেবী কামাখ্যার মাঝে কোনো ভেদ নেই। যিনিই কালিকা মাতা, তিনিই কামাখ্যা এবং তিনিই পরম ব্রহ্ম। নিখিল বেদ এবং অখিল তন্ত্রশাস্ত্রের এটাই একমাত্র চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। তিনি অপরিমেয় বীর্যের অধিকারী এবং করুণার মহাসমুদ্র। যজ্ঞ শেষে দক্ষিণা প্রদান করলে যেভাবে কর্মের পূর্ণ ফল লাভ হয়, ঠিক তেমনি দেবী কালিকা জীবের সকল কর্মের ফল এবং পরম মুক্তি প্রদান করেন বলেই তাঁকে ‘দক্ষিণা কালী’ নামে অভিহিত করা হয়। ড. কুশল বরণ চক্রবর্ত্তী কর্তৃক আলোচিত সনাতন শাস্ত্রের এই অমোঘ বাণী আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জগতের একমাত্র অবিনশ্বর সত্য হলেন আদ্যাশক্তি মহামায়া, যিনি সকল ভেদাভেদ ভুলে সমগ্র মানবজাতি ও জীবের পরম কল্যাণ ও অধিকার রক্ষা করে চলেছেন।

আদ্যাশক্তি কালীই কামাখ্যা: সনাতন দর্শনের সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক রহস্য ও মহামায়ার অমোঘ মহিমা

রণে-বনে, জলা-জঙ্গলে যখনই বিপদে পড়িবে আমাকে স্মরণ করিবে: আজ লোকনাথ ব্রহ্মচারী'র ১৩৬ তম তিরোধান তিথি

আজ পরমপূজ্য শ্রীশ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী মহারাজের ১৩৬ তম তিরোধান তিথি। এই পুণ্য মহালগ্নে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি সনাতন ধর্মাবলম্বী পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করছেন এই মহান যুগাবতারকে। প্রতিকূল সময়ে সনাতনী জাতিকে দিশা দেখাতে এবং যেকোনো সংকটে মানবজাতির সুরক্ষায় তিনি যে পরম অভয়বাণী দিয়ে গেছেন, তা আজও প্রতিটি সনাতনীর অন্তরে আলোকবর্তিকা হিসেবে জ্বলছে। লোকনাথ বাবার আধ্যাত্মিক দর্শন এবং তাঁর ভক্ত ও শিষ্যদের প্রতি দিকনির্দেশনা সনাতন সংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ। বিশেষ করে তাঁর মুখ নিঃসৃত জগৎখ্যাত বাণী "রণে, বনে, জলে, জঙ্গলে যেখানেই বিপদে পড়িবে আমাকে স্মরণ করিবে, আমিই রক্ষা করিবো"— শাশ্বত সনাতন ধর্মের সেই পরম ঘোষণা 'মা শুচঃ' বা 'ভয় পেও না'-রই এক আধুনিক মূর্ত রূপ। তবে লোকনাথ বাবার এই পরম আশ্বাসের ঐতিহাসিক সত্যতা ও প্রেক্ষাপট সম্পর্কে বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই সম্পূর্ণ অবগত নন, যা মহাকালের অতল গহ্বরে হারিয়ে যেতে বসেছিল।​ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, লোকনাথ ব্রহ্মচারী মহাশয় তাঁর পরম স্নেহের শিষ্যদের আধ্যাত্মিক ও জাগতিক মার্গের পথ দেখাতে নিয়মিত পত্র লিখতেন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, তৎকালীন উপযুক্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাব এবং ভক্তদের অসচেতনতার কারণে সেই অমূল্য পত্রাবলীর সিংহভাগই কালের করাল গ্রাসে বিলীন হয়ে গেছে। সামান্য যে কয়েকটি ঐতিহাসিক চিঠি এখনো টিকে রয়েছে, তা সনাতনী গবেষক হরিপদ ভৌমিকের নিখুঁত সম্পাদনায় 'শ্রীশ্রীলোকনাথ ব্রহ্মচারীর অপ্রকাশিত পত্রাবলী ও বাণী' গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। আর এই অবিনশ্বর চিঠিগুলোর বুকেই অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেছে লোকনাথ বাবার সেই অতি পরিচিত ও অলৌকিক বাণীটি। মূলত এটি কোনো আকস্মিক উক্তি ছিল না, বরং বিপন্ন সনাতনী সন্তানকে ঘোর সংকটের মাঝে মহাশক্তি ও সাহস জোগাতে এক পরম গুরুর অমৃতহস্তলিপি ছিল।​ঐতিহাসিক তথ্যসূত্র অনুযায়ী, এই কালজয়ী বাণীটির উৎসভূমি তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার নারায়ণগঞ্জের বিখ্যাত জমিদার আনন্দকান্ত নাগের প্রতি লেখা একটি চিঠির মধ্যে নিহিত। আনন্দকান্ত নাগ ছিলেন লোকনাথ বাবার অত্যন্ত অনুগত ও প্রধান শিষ্যদের একজন। এক বিশেষ সন্ধিক্ষণে আনন্দকান্ত নাগ তাঁর কাকার সাথে পৈত্রিক বিষয়-সম্পত্তি ও জমিদারি ভাগাভাগি করতে বাধ্য হন। অত্যন্ত সজ্জন ও ধর্মানুরাগী হওয়ার কারণে আনন্দকান্ত কখনোই চাননি যে পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে কোনো প্রকার মনকষাকষি, বিবাদ বা ছলচাতুরীর সৃষ্টি হোক। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাঁকে সম্পত্তির অধিকার রক্ষার এক কঠিন লড়াইয়ে তথা আইনি ও সামাজিক 'রণে' নামতে হয়। চতুর্দিকের কুटिलতা ও আপনজনদের প্রতারণায় সম্পূর্ণ দিশেহারা হয়ে জমিদার আনন্দকান্ত নাগ পরমগুরু লোকনাথ বাবার শ্রীচরণে পত্র মারফত তাঁর মার্গদর্শন এবং আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন। শিষ্যের এমন চরম সংকটকালে এবং মানসিক ব্যাকুলতায় পরম করুণাময় গুরু লোকনাথ বাবা উত্তরপত্রে লিখলেন— "রণে বনে জলে জঙ্গলে, আমাকে স্মরণ করিবা"। উদ্ধারকৃত মূল চিঠির বাকি অংশগুলো অস্পষ্ট এবং পোকায় কাটা হলেও, গবেষকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে অন্য আরেকটি সমসাময়িক পত্রে ঠিক একই বাক্যের পূর্ণাঙ্গ রূপটি খুঁজে পাওয়া গেছে, যেখানে লেখা ছিল— "রণে বনে জলে জঙ্গলে, আমাকে স্মরণ করিবা, কোন বিঘ্ন হইবেক না"।​পরবর্তীতে নারায়ণগঞ্জের জমিদারের উদ্দেশ্যে লেখা এই পবিত্র বাণীটিই সামান্য পরিবর্তিত ও পরিমার্জিত হয়ে "আমিই রক্ষা করিবো" রূপে সমগ্র বিশ্ব চরাচরে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। আজ শুধু বাংলাদেশ বা ভারতবর্ষই নয়, বরং পৃথিবীর যেখানেই সনাতনী বাঙালি তথা মানবজাতি বসবাস করছে, সেখানেই এই বাণী সংকটে বুক বাঁধার একমাত্র অবলম্বন হয়ে উঠেছে। গুরুদেবের নির্দেশ পেয়ে আনন্দকান্ত নাগ যখন সম্পত্তি বণ্টনের জটিলতাগুলো মোকাবেলা করছিলেন, তখন তিনি গুরুর শ্রীচরণে কৃতজ্ঞতা ও ভেতরের সমস্ত যাতনা প্রকাশ করে আরেকটি চিঠি লেখেন। ১২৭৭ বঙ্গাব্দের ২৯ আশ্বিন (ইংরেজি ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দ) তারিখে লেখা সেই চিঠিতে আনন্দকান্ত নাগের নিজস্ব কাকার ছলনা, প্রতারণা এবং যৌথ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার করুণ আর্তি ফুটে ওঠে। তিনি অত্যন্ত বিনীতভাবে লিখেছিলেন যে, কাকার কুटिल বিত্ত ক্রয়ের কারণে একান্নভুক্ত থাকা তাঁর জন্য চরম ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাই তিনি পৃথক অন্ন হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছেন। একই সাথে নিজের ভালো-মন্দ গুরুর চরণে সঁপে দিয়ে লিখেছিলেন, গুরুর মহান জ্ঞানই তাঁর একমাত্র পথপ্রদর্শক, কারণ গুরুদেব অঘটন ঘটাতে সক্ষম।​এই ঐতিহাসিক পত্রবিনিময়ের সময়কাল বিশ্লেষণ করলে আমরা এক সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি। যদিও লোকনাথ বাবার অধিকাংশ চিঠিতে পূর্ণাঙ্গ সন-তারিখের উল্লেখ পাওয়া যায় না, তবে আনন্দকান্ত নাগের একটি চিঠিতে সুস্পষ্টভাবে ১২৭৭ বঙ্গাব্দের ২৯ আশ্বিন তারিখটি উৎকীর্ণ রয়েছে। অন্যান্য চিঠিতে কার্তিক বা শ্রাবণ মাসের উল্লেখ এবং বাবার চিঠিতে পৌষ কিংবা মাঘ মাসের উল্লেখ পাওয়া যায়। এই সমস্ত যোগসূত্র থেকে নির্দ্বিধায় প্রমাণিত হয় যে, এই পত্রবিনিময়গুলো ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দের আশ্বিন মাস বা তার ঠিক পূর্ববর্তী সময়ে সংঘটিত হয়েছিল। অর্থাৎ, লোকনাথ বাবার এই বিশ্ববিখ্যাত অভয়বাণীর বয়স প্রায় দেড়শত বছরেরও বেশি এবং এটি ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দেই মানবজাতিকে ধন্য করেছিল। একই সাথে লোকনাথ বাবার মূল চিঠিগুলো থেকে আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র বিষয় পরিলক্ষিত হয়— তিনি প্রতিটি চিঠির প্রারম্ভেই পরমেশ্বরের সর্বোত্তম ও আদি নাম পবিত্র 'ওঁ' কার লিখে শুরু করতেন। অতএব, বর্তমান কলিযুগের সমস্ত সনাতনী ভক্ত ও অধিকারকামী জাতির পরম কর্তব্য হলো গুরুর এই আদর্শ অনুসরণ করে তাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি শুভ কাজ ও লিপির সূচনাতে 'ওঁ' ব্যবহার করা। এই চেতনা ধারণ করেই সনাতনী সমাজ আজ তার অধিকার, অস্তিত্ব এবং ধর্মীয় গৌরব অক্ষুণ্ন রাখতে ঐক্যবদ্ধ হবে— এটাই আজকের পুণ্য তিথির পরম শিক্ষা।

রণে-বনে, জলা-জঙ্গলে যখনই বিপদে পড়িবে আমাকে স্মরণ করিবে: আজ লোকনাথ ব্রহ্মচারী'র ১৩৬ তম তিরোধান তিথি

ব্রহ্মপুত্রের জল কেন রক্তবর্ণ? দেবী কামাখ্যার অলৌকিক ঋতুস্রাব ও অম্বুবাচীর শিহরণ জাগানো রহস্য!

সনাতন ধর্মের সুপ্রাচীন ঐতিহ্য, আধ্যাত্মিক গভীরতা এবং অলৌকিক মহিমার এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে প্রতি বছর আষাঢ় মাসে উদযাপিত হয় পুণ্যময় অম্বুবাচী ব্রত। পূর্ব ভারতের অন্যতম প্রধান ও জাগ্রত সতীপীঠ আসামের কামাখ্যা মন্দিরে এই সময় দেবীর বার্ষিক ঋতুকালীন অবস্থাকে কেন্দ্র করে এক অভূতপূর্ব ও রহস্যময় আধ্যাত্মিক আবহ সৃষ্টি হয়। শাস্ত্রীয় বিশ্বাস ও সনাতনী পরম্পরা অনুযায়ী, এই বিশেষ তিথিতে দেবী কামাখ্যার যোনিসদৃশ শিলাখণ্ড থেকে এক অলৌকিক লাল তরল নির্গত হতে দেখা যায়, যার প্রভাবে পবিত্র ব্রহ্মপুত্র নদের জলও সম্পূর্ণ রক্তিম বর্ণ ধারণ করে। জাগতিক বিজ্ঞানের যুক্তি যেখানে থমকে দাঁড়ায়, সেখানে আদি পরাশক্তির এই ঐশ্বরিক লীলা যুগ যুগ ধরে কোটি কোটি সনাতন ধর্মাবলম্বীর মনে গভীর ভক্তি ও বিশ্বাসের সঞ্চার করে আসছে। অম্বুবাচীর এই তিন দিন মন্দিরের গর্ভগৃহে সাধারণ মানুষের প্রবেশ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ থাকে এবং লোকচক্ষুর অন্তরালে তান্ত্রিক ও সাধকগণ গভীর গুপ্ত সাধনায় মগ্ন হন, যা এই উৎসবকে আরও বেশি রহস্যময় ও অলৌকিক করে তোলে।​তন্ত্রপীঠের এই বার্ষিক মহা-আয়োজনকে ঘিরে কামাখ্যা ধামে সাধু, সন্ন্যাসী ও অগণিত ভক্তের মহাসমাগম ঘটলেও এই সময় মূল মন্দিরের দরজা অলৌকিকভাবেই বন্ধ থাকে এবং কোনো প্রকার মূর্তি দর্শন বা শাস্ত্রীয় মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে পূজার্চনা করা যায় না। ভক্তরা অম্বুবাচী শুরু হওয়ার আগে মায়ের গর্ভগৃহের বিশেষ স্থানে পবিত্র সাদা কাপড় নিবেদন করেন এবং তিন দিন পর যখন মন্দিরের দ্বার পুনরায় উন্মোচিত হয়, তখন সেই সাদা কাপড় অলৌকিক লাল তরলে সম্পূর্ণ সিক্ত ও রক্তিম অবস্থায় ভক্তদের কাছে ফেরত আসে। এই পবিত্র বস্ত্রখণ্ডকে ‘অঙ্গবস্ত্র’ বলা হয় এবং বিশ্বাস করা হয় যে, এই অলৌকিক বস্ত্র ও মন্দিরের ঝরনার পবিত্র জল বা ‘অঙ্গোদক’ বাড়িতে রাখলে মানুষের যাবতীয় দুঃখ-কষ্ট, রোগ-বালাই এবং জাগতিক দুর্ভোগ চিরতরে কেটে যায়। গবেষকদের মতে, পঞ্চরথ স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এই ভূগর্ভস্থ গুহাটি কোনো মানব-নির্মিত সাধারণ মন্দির নয়, বরং এটি একটি আদিম প্রাকৃতিক রহস্য যেখানে কোনো কৃত্রিম প্রতিমা ছাড়াই কেবল একটি শিলাখণ্ডের পূজা করা হয়, যা অম্বুবাচীর দিনগুলোতে মাতৃশক্তির জীবন্ত উপস্থিতির প্রমাণ দেয়।​এই পবিত্র তিথিতে সনাতনী সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত আচার-অনুষ্ঠান অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালিত হয়, যেখানে অম্বুবাচীর তিন দিন সমস্ত ধরনের শুভ কাজ, মন্ত্র পাঠ এবং এমনকি কৃষিকাজ ও ভূমি খননও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকে। সনাতন শাস্ত্রে ঋতুকালে নারীদের যেভাবে বিশ্রামের মাধ্যমে পবিত্র রাখা হয়, ঠিক তেমনি এই সময়ে সমগ্র ধরিত্রী দেবীও ঋতুশ্রী লাভ করেন এবং অশুচি থাকেন বলে মনে করা হয়, যা প্রকৃতির প্রতি সনাতন ধর্মের অসামান্য সম্মান ও নারীশক্তির এক পরম বন্দনা। বিভিন্ন পরিবারের প্রবীণ ও বিধবা মায়েরা অত্যন্ত কঠোর নিয়ম মেনে এই তিন দিন অম্বুবাচী ব্রত পালন করেন এবং ব্রত শেষে সমস্ত ঘর-দুয়ার, বস্ত্র ও নিজেদের পবিত্র করে দেবী প্রতিমার ওপর থেকে আবরণ সরিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। অম্বুবাচীর এই মহালগ্নে দেশজুড়ে সনাতনীদের ঠাকুরঘরে থাকা মা কালী, দুর্গা, জগদ্ধাত্রীসহ সকল মাতৃশক্তির প্রতিমা বা ছবি কাপড়ে ঢেকে রাখা হয় এবং উৎসবের সমাপ্তিতে মায়ের উদ্দেশ্যে পরম ভক্তিতে আম ও দুধ নিবেদন করা হয়, যা বিশ্ব চরাচরের সকল সনাতনী হৃদয়ে এক পরম আত্মিক শান্তি ও ধর্মীয় জাগরণের বার্তা বয়ে আনে।

ব্রহ্মপুত্রের জল কেন রক্তবর্ণ? দেবী কামাখ্যার অলৌকিক ঋতুস্রাব ও অম্বুবাচীর শিহরণ জাগানো রহস্য!

নীলমণির রাজপ্রাসাদ থেকে কাঠের সিংহাসন: শ্রীজগন্নাথের অসম্পূর্ণ রূপের আড়ালে লুকিয়ে থাকা আদি সনাতন সত্য

সনাতন ধর্মের সুপ্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথে মিশে আছে অগ্নিকুণ্ডের মতো প্রজ্জ্বলিত নানা অলৌকিক উপাখ্যান। আজ বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি সনাতনী পরম শ্রদ্ধায় যাঁকে পুরুষোত্তম ক্ষেত্রের বা পুরী ধামের শ্রীজগন্নাথ দেব হিসেবে পূজা করেন, তিনি আদিতে এই রূপে ছিলেন না। স্কন্দ পুরাণের উৎকল খণ্ড এবং ব্রহ্ম পুরাণের প্রাচীন ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কলিযুগের এই পরম আরাধ্য দেবতা একসময় উড়িষ্যার ঘন জঙ্গলের গভীরে নীলকান্ত মণির তৈরি এক পরম সুন্দর চতুর্ভুজ মূর্তি রূপে পূজিত হতেন, যাঁর নাম ছিল 'নীলমাধব'। উড়িষ্যার জঙ্গলমহলের আদিবাসী শবর রাজ বিশ্বাবসু পরম গোপনে পরমেশ্বর বিষ্ণুর এই নীলমাধব রূপের আরাধনা করতেন। আবহমান কাল ধরে চলে আসা আদিবাসী সমাজের এই গোপন উপাসনাই কীভাবে আজকের বিশ্ববিখ্যাত জগন্নাথ মন্দিরের রূপ নিল এবং কেনই বা নীলমণির সেই অপরূপ মূর্তি ছেড়ে ভগবান কাঠের এক অদ্ভুত ও অসম্পূর্ণ রূপ ধারণ করলেন, তা সনাতন ইতিহাসের অন্যতম এক রহস্যময় অধ্যায়।​ইতিহাসের পাতা ওল্টালে জানা যায়, মালব দেশের পরম বিষ্ণুভক্ত রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন পৃথিবীতে ভগবানের এমন এক অনন্য রূপের প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন যা পূর্বে কেউ কখনো দেখেনি। ভগবানের অন্বেষণে তিনি তাঁর পুরোহিত বিদ্যাপতিকে উৎকল অঞ্চলে পাঠান। চতুর বিদ্যাপতি আদিবাসী রাজা বিশ্বাবসুর কন্যা ললিতাকে বিবাহ করে শ্বশুরের চোখ বেঁধে সেই গোপন গুহায় পৌঁছান এবং চতুরতার সাথে রাস্তায় শর্ষের বীজ ফেলে আসেন। পরবর্তীতে শর্ষে গাছ গজালে সেই পথ ধরে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন যখন বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে নীলমাধবকে উদ্ধার করতে এলেন, তখন ভক্তের গোপনতা রক্ষার্থে ভগবান অন্তর্ধান হয়ে যান। মূর্তি না পেয়ে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন আমরণ অনশনের সিদ্ধান্ত নিলে ভগবান তাঁকে শূন্যবাণীতে জানান যে, তিনি আর নীলকান্ত মণিরূপে পূজা নেবেন না; বরং সমুদ্রের জলে ভেসে আসা একটি বিশেষ অলৌকিক কাঠের গুঁড়ি বা 'দারুব্রহ্ম' দিয়ে যেন তাঁর মূর্তি নির্মাণ করা হয়।​পরবর্তীতে সমুদ্রের তীরে শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্মের চিহ্নযুক্ত এক বিশাল সুগন্ধি কাঠের গুঁড়ি ভেসে এলে রাজার সমস্ত হাতি ও সৈন্য মিলেও তা জল থেকে তুলতে ব্যর্থ হয়। কিন্তু যখন রাজা তাঁর অহংকার ত্যাগ করে আদিবাসী শবর রাজ বিশ্বাবসু এবং পুরোহিত বিদ্যাপতিকে একসাথে যুক্ত করলেন, তখন সেই কাঠ অনায়াসে তীরে উঠে আসে—যা প্রমাণ করে ভগবানের কাছে জাতি-বর্ণের কোনো ভেদ নেই এবং আদিবাসী ও সনাতন সংস্কৃতির মিলনই জগন্নাথ সংস্কৃতির মূল ভিত্তি। এই দারুব্রহ্মে কোনো সাধারণ ছেনি বা কুড়ুল দাগ কাটতে না পারায় স্বয়ং দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে ২১ দিন বন্ধ ঘরে মূর্তি গড়ার শর্তে কাজ শুরু করেন। কিন্তু চতুর্দশ দিনে ঘরের ভেতর থেকে কোনো শব্দ না পেয়ে রানী গুণ্ডিচার ব্যাকুলতায় রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন শর্ত ভেঙে ঘরের দরজা খুলে ফেলেন। দরজা খুলতেই দেখা যায় বৃদ্ধ ভাস্কর অদৃশ্য এবং ভেতরে পড়ে আছে হাত-পা হীন, বড় বড় গোলাকার চোখের তিনটি অসম্পূর্ণ মূর্তি। রাজা ও রানী গভীর শোকে ভেঙে পড়লে ভগবান পুনরায় দর্শন দিয়ে বলেন যে, কলিযুগে তিনি এই অসম্পূর্ণ রূপেই বিরাজ করবেন এবং হাত-পা না থাকলেও ভক্তের দেওয়া সমস্ত ভোগ গ্রহণ করে তাঁর বিশাল চোখ দিয়ে পতিত ও আর্ত ভক্তদের ওপর সবসময় কৃপাদৃষ্টি রাখবেন। এই অলৌকিক ঘটনার মধ্য দিয়েই নীলগিরি পাহাড়ের গোপন 'নীলমাধব' আজ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নাথ 'শ্রীজগন্নাথ' রূপে আত্মপ্রকাশ করেছেন, যা যুগ যুগ ধরে মানবজাতির অধিকার, সাম্য এবং সনাতনী বিশ্বাসের এক পরম প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।

নীলমণির রাজপ্রাসাদ থেকে কাঠের সিংহাসন: শ্রীজগন্নাথের অসম্পূর্ণ রূপের আড়ালে লুকিয়ে থাকা আদি সনাতন সত্য

মায়াপুরের শ্রীমতী রাধারাণীর অলৌকিক রূপের আসল রহস্য কী? যার দর্শনে অশ্রুসজল হয় কোটি ভক্তের চোখ

পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের হ্লাদিনী শক্তি তথা সর্বোচ্চ প্রেমশক্তির মূর্ত প্রকাশ শ্রীমতী রাধারাণী। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের নদীয়া জেলায় অবস্থিত আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের (ইস্কন) মূল কেন্দ্র শ্রীধাম মায়াপুরে অধিষ্ঠিত রাধারাণীর বিগ্রহের দিব্য রূপ ও অনুপম সৌন্দর্য প্রতিনিয়ত বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি সনাতনী ও ভক্তহৃদয়কে আলোড়িত করছে। মায়াপুরের ইস্কন মন্দিরে দর্শনার্থীরা যখন শ্রীমতী রাধারাণীর সম্মুখে উপস্থিত হন, তখন অধিকাংশেরই মনে প্রশ্ন জাগে, এই অলৌকিক সৌন্দর্যের প্রকৃত রহস্য কী। সাধারণ কোনো মৃন্ময় বা পাথরের বিগ্রহে যা কদাচিৎ দেখা যায়, মায়াপুরের এই বিগ্রহের সম্মুখে দাঁড়ালে মনে হয় স্বয়ং গোলোক বৃন্দাবনের মহারানী ভক্তের আকুতি শুনতে জীবন্ত রূপে দাঁড়িয়ে আছেন। ভক্ত সমাজ ও শাস্ত্রীয় গবেষকদের মতে, এই সৌন্দর্যের পেছনে কোনো লৌকিক কারণ নেই, বরং এর মূল রহস্য নিহিত রয়েছে নিঃস্বার্থ ভক্তি, অশ্রু এবং ভালোবাসার পরম সেবার মাঝে। মায়াপুরে শ্রীমতী রাধারাণীকে কেবল বাহ্যিক অলংকারে সাজানো হয় না, বরং পরম যত্নে ও অনুরাগে তাঁর সেবা করা হয়। শাস্ত্রমতে, যিনি স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণের প্রাণের চেয়েও প্রিয়, তাঁকে সর্বোচ্চ রাজকীয় মর্যাদায় সেবা করাই ভক্তদের মূল লক্ষ্য।​মায়াপুর ধামের আধ্যাত্মিক পরিবেশের সঙ্গে শ্রীমতী রাধারাণীর এই রূপের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও অলৌকিক সংযোগ রয়েছে। ভক্তদের দৃঢ় বিশ্বাস, মায়াপুরের রাধারাণীর করুণাময় চোখের দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকলে জাগতিক সমস্ত দুঃখ-কষ্ট ও মানসিক গ্লানি নিমেষেই দূর হয়ে যায়। এই বিগ্রহের নির্মাণ ও নিত্যদিনের পরিচর্যায় কেবল পার্থিব শিল্পকলা কাজ করে না, এর সঙ্গে মিশে আছে প্রতিদিন হাজার হাজার ভক্তের অশ্রুজল ও অকপট প্রেম। ভোর থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত সেবায়েত ও ভক্তরা নিরলসভাবে চিন্তা করেন কীভাবে রাধারাণীকে সন্তুষ্ট করা যায়। কেউ পরম মমতায় মালা গাঁথেন, কেউ অনন্য ডিজাইনের পোশাক তৈরি করেন, আবার কেউ সূক্ষ্ম অলংকার প্রস্তুত করেন। এই সম্মিলিত ভক্তি ও অর্পণের স্পন্দন বিগ্রহটিকে এক জীবন্ত রূপ দান করে, যা প্রতিটি দর্শনার্থীর আত্মাকে স্পর্শ করে।​শ্রীধাম মায়াপুর সনাতন ধর্মে কোনো সাধারণ ভূখণ্ড নয়, এটি স্বয়ং প্রেমাবতার শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পবিত্র আবির্ভাব ভূমি। গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শন অনুযায়ী, দ্বাপর যুগে যিনি কৃষ্ণরূপে লীলা করেছিলেন, তিনিই রাধারাণীর অন্তরের গভীর প্রেম ও ভাব আস্বাদন করার জন্য কলিযুগে রাধা-কৃষ্ণের মিলিত তনু শ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভু রূপে এই মায়াপুরে অবতীর্ণ হন। আর এই কারণেই মায়াপুরের বাতাসে এক অলৌকিক শান্তি ও দিব্য অনুভূতি বিরাজমান, যা মন্দিরে প্রবেশ করা মাত্রই মানুষকে এক অনির্বচনীয় ভাবাবেগে আপ্লুত করে। পৃথিবীর জাগতিক সৌন্দর্য যেখানে মানুষের চোখকে সাময়িকভাবে আকর্ষণ করে, সেখানে মায়াপুরের রাধারাণীর অলৌকিক রূপ মানুষের আত্মাকে পরমাত্মার দিকে টেনে নেয়। তাঁর মুখের মৃদু হাস্যোজ্জ্বল ভঙ্গি প্রতিটি পতিত ও আর্ত জীবকে আশ্বস্ত করে যে, শরণাগত হলে মায়াময় এই সংসারে কেউ একা নয়। মূলত মানুষকে চমকে দেওয়ার জন্য নয়, বরং ভক্তদের হৃদয়ের পরম আশ্রয়, মাতা ও প্রাণের প্রতিচ্ছবি হিসেবেই মায়াপুরে শ্রীমতী রাধারাণী নিত্য সুশোভিত থাকেন, যার এক ঝলক দর্শন লাভ করতে প্রতিদিন দেশ-বিদেশের হাজার হাজার মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন।

মায়াপুরের শ্রীমতী রাধারাণীর অলৌকিক রূপের আসল রহস্য কী? যার দর্শনে অশ্রুসজল হয় কোটি ভক্তের চোখ