শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩
হিন্দুস নিউজ
Hindus News Voice of Hinduism
আপনার পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিন Hindus News এ।

মতামত

আর নয় ব্যবহার—এবার চাই সচেতনতা, আত্মমর্যাদা ও জবাবদিহি

আর নয় ব্যবহার—এবার চাই সচেতনতা, আত্মমর্যাদা ও জবাবদিহি

বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর নির্যাতন, নিপীড়ন, হামলা ও বৈষম্যের অভিযোগ যখন বারবার সামনে আসে, তখন শুধু উৎসবের সময় নিরাপত্তার চাদর বিছিয়ে দিয়ে আমাদের বাস্তবতাকে আড়াল করার চেষ্টা কোনো সমাধান হতে পারে না।আমরা নিরাপত্তা চাই—কিন্তু এমন নিরাপত্তা চাই না, যার দৃশ্য দেখে মনে হবে আমরা স্বাধীনভাবে উৎসব করছি না, বরং নিরাপত্তাবেষ্টিত কোনো প্রদর্শনীর অংশ!আমাদের উৎসব খোলামেলা হবে, স্বাভাবিক হবে, মর্যাদাপূর্ণ হবে।আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব হলো নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সেই নিরাপত্তা যেন এমন প্রচারে পরিণত না হয় যে, “হিন্দুরা বাংলাদেশে ভালোই আছে”—অথচ উৎসবের বাইরে তাদের বাস্তব জীবন, নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।এবার শারদীয় দুর্গাপূজায় নতুন বার্তা দিতে হবেহিন্দুদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে এবার আমাদের আত্মসমালোচনা করা প্রয়োজন।আমরা অপ্রয়োজনীয় আড়ম্বর কমাব।ধর্মীয় রীতি ও শাস্ত্রীয় বিধানকে প্রাধান্য দেব।প্রয়োজনে ক্ষুদ্র পরিসরে পূজা করব।সম্ভব হলে কোথাও কোথাও ঘটপূজার মতো সরল আয়োজনের কথাও বিবেচনা করব।কারণ, আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাস কোনো প্রদর্শনীর বিষয় নয় এবং আমাদের ধর্মীয় উৎসব কারও প্রচারণার মঞ্চও নয়।আর একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন—ধর্মীয় অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অতিথি করে এনে কোনো রাজনৈতিক প্রচারণার সুযোগ সৃষ্টি করার প্রয়োজন নেই।আমরা অন্য ধর্মাবলম্বী ভাই-বোনদের সম্মান করব, তাঁদের আপ্যায়ন করব এবং সম্প্রীতি বজায় রাখব। কিন্তু আমাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক অতিথি হিসেবে তাঁদের আমন্ত্রণ জানানো বাধ্যতামূলক নয়।আমাদের অনুষ্ঠানে আমাদের এলাকার জ্যেষ্ঠ, সম্মানিত ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিরাই সম্মানের আসনে থাকবেন।ধর্মীয় আবেগের ব্যবসা বন্ধ হোকজন্মাষ্টমী ও জগন্নাথদেবের রথযাত্রার মতো বৃহৎ ধর্মীয় আয়োজন নিয়েও হিন্দু সমাজকে প্রশ্ন করতে হবে।কোনো ধর্মীয় আয়োজন যদি মানুষের বিশ্বাস ও আবেগকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়, তাহলে সেখানে অর্থের স্বচ্ছতা, সরকারি সুযোগ-সুবিধার ব্যবহার এবং আয়োজকদের জবাবদিহি অবশ্যই থাকতে হবে।কোনো কমিটি, সংগঠন বা ব্যক্তি যদি ধর্মীয় আয়োজনকে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে থাকে—তাহলে তার জবাবদিহি চাই।ধর্মের নামে সুবিধা নেওয়া যাবে না।ভক্তির নামে ব্যবসা করা যাবে না।হিন্দুদের আবেগকে পুঁজি করে ব্যক্তিগত বা সাংগঠনিক স্বার্থ হাসিল করা যাবে না।আমরা কারও বিরুদ্ধে অযাচিত অভিযোগ করতে চাই না; কিন্তু অভিযোগ উঠলে তার স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহি চাই। কারণ ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে মানুষের আস্থা জড়িত।আর ব্যবহার হতে চাই নাসবচেয়ে বড় প্রশ্ন আমাদের নিজেদের কাছেই—আমরা কি শুধু ব্যবহার হওয়ার জন্য?কেউ আমাদের ধর্মীয় আবেগ ব্যবহার করবে, কেউ আমাদের উৎসব ব্যবহার করবে, কেউ আমাদের সংখ্যাকে ব্যবহার করবে, কেউ আমাদের নাম ব্যবহার করে সুবিধা নেবে—আর আমরা নীরবে তা মেনে যাব?না। এবার সচেতন হতে হবে।আমাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান হবে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী।আমাদের উৎসব হবে আত্মমর্যাদার সঙ্গে।আমাদের সম্প্রীতি থাকবে—কিন্তু আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে নয়।আমরা সবাইকে সম্মান করব—কিন্তু নিজেদেরও সম্মান করতে শিখব।হিন্দু সমাজকে আর কারও হাতিয়ার হতে দেওয়া যাবে না।আমাদের উৎসব কারও রাজনৈতিক প্রচারণার মঞ্চ নয়।আমাদের ধর্ম কারও ব্যক্তিগত স্বার্থের সম্পদ নয়।আমাদের আবেগ কারও ব্যবসার পুঁজি নয়।এবার সিদ্ধান্ত আমাদেরআমরা চাই না শুধু উৎসবের দিনগুলোতে আমাদের নিরাপত্তা দেখিয়ে বিশ্বের সামনে বাংলাদেশের হিন্দুদের একটি সুন্দর ছবি তুলে ধরা হোক।আমরা চাই—সারা বছর হিন্দুরা নিরাপদ থাকুক।আমরা চাই—মন্দির নিরাপদ থাকুক।আমরা চাই—ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত হোক।আমরা চাই—অপরাধের বিচার হোক।আমরা চাই—নাগরিক হিসেবে সমান অধিকার নিশ্চিত হোক।উৎসবের নিরাপত্তা নয়—সারা জীবনের নিরাপত্তা চাই।দেখানো সম্প্রীতি নয়—বাস্তব নিরাপত্তা ও সমঅধিকার চাই।ব্যবহার নয়—সম্মান চাই।নীরবতা নয়—জবাবদিহি চাই।এবার হিন্দু সমাজকে জাগতে হবে।নিজেদের ধর্ম, অধিকার, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ নিজেদের হাতেই রক্ষা করতে হবে।

রংপুরে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ চারজনের হত্যা: পুলিশের ‘ইয়াবা তত্ত্ব’ ঘিরে উঠছে একের পর এক প্রশ্ন

রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী এবং দুই সন্তানকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় পুলিশ যে গল্প হাজির করেছে, সেটি শুনলে মনে হয় তদন্তের চেয়ে চিত্রনাট্য লেখার কাজটাই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। পুলিশের দাবি, পাশের বাড়ির ছাদ দিয়ে দুই তরুণ গণপতির বাড়িতে ঢুকে ইয়াবা সেবন করছিল। গণপতি বাধা দেওয়ায় তাকে হত্যা করা হয়। এরপর পরিচয় ফাঁস হওয়ার আশঙ্কায় তার স্ত্রী, মেয়ে এবং ঘুমন্ত ছেলেকেও একে একে হত্যা করা হয়। চারটি হত্যাকাণ্ড শেষ করে তারা নাকি গোসল করেছে, খেজুর ও শসা খেয়েছে, আবার ইয়াবা সেবন করেছে, স্বর্ণালংকার পরীক্ষা করেছে, মোবাইল ফোন পানিতে ডুবিয়েছে এবং পরদিন জুমার নামাজের সময় নিশ্চিন্তে বেরিয়ে গেছে। প্রশ্ন হলো, এটি কি সত্যিই ঘটনাস্থলের আলামতনির্ভর তদন্তের ফল, নাকি একটি ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের গভীরতর কারণকে চাপা দেওয়ার জন্য অতিদ্রুত তৈরি করা সুবিধাজনক ব্যাখ্যা? সবচেয়ে বড় অসংগতি পুলিশের নিজের বক্তব্যেই। মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশ ও অপরাধ তদন্ত বিভাগের প্রাথমিক ধারণা ছিল, এটি পরিকল্পিত ডাকাতি। বাড়ির আলমারি ভাঙা, আসবাব তছনছ, স্বর্ণালংকারের বাক্স ছড়িয়ে থাকা এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার তথ্য সামনে এনে পুলিশ বলেছিল, ডাকাতি করতে গিয়ে চারজনকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই বক্তব্য পাল্টে বলা হলো, ডাকাতির দৃশ্য সাজানো হয়েছিল। অথচ একই সঙ্গে পুলিশ আবার বলছে, বাড়ি থেকে স্বর্ণালংকার নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং আটক ব্যক্তিদের দেখানো স্থান থেকে সেগুলো উদ্ধার করা হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, স্বর্ণালংকার সত্যিই চুরি হয়ে থাকলে ডাকাতির ঘটনাকে নিছক সাজানো নাটক বলা হচ্ছে কেন? আর যদি ডাকাতি প্রকৃত উদ্দেশ্য না-ই হয়, তাহলে খুনিরা স্বর্ণালংকার নিয়ে পালাল কেন? পুলিশের প্রথম বক্তব্য ভুল ছিল, নাকি পরের বক্তব্য অসম্পূর্ণ? আরেকটি প্রশ্ন, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করল কে, কখন এবং কেন? দুই তরুণ যদি হঠাৎ ইয়াবা সেবনের সময় ধরা পড়ে আকস্মিক উত্তেজনায় চারজনকে হত্যা করে থাকে, তাহলে পুরো বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার প্রয়োজন হলো কেন? এটি কি আগে থেকে নেওয়া কোনো প্রস্তুতি? বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল হত্যার আগে, নাকি পরে? এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থার রেকর্ড, বাড়ির প্রধান সুইচ, বৈদ্যুতিক সংযোগ এবং সম্ভাব্য সিসিটিভির কার্যক্রম পরীক্ষা করা হয়েছে কি? একটি আকস্মিক মাদকসেবনকেন্দ্রিক ঝগড়ার সঙ্গে পরিকল্পিতভাবে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করার ঘটনাটি কীভাবে মেলে?মোবাইল ফোন নিয়েও প্রশ্ন কম নয়। নিহত পরিবারের স্বজন বলেছেন, চারজনের চারটি ফোনেই যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছিল এবং প্রতিটি ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। কিন্তু পুলিশ সংবাদ সম্মেলনে বলছে, দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয়েছিল। তাহলে বাকি দুটি ফোন কোথায়? চারটি ফোন কখন বন্ধ হলো? ফোনগুলোর সর্বশেষ কল, বার্তা, অবস্থান এবং তথ্য মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছে কি? যদি কোনো হুমকি, চাঁদার দাবি, আর্থিক বিরোধ বা পূর্বপরিকল্পনার তথ্য ফোনে থেকে থাকে, তাহলে সেই তথ্য উদ্ধার না করেই ইয়াবাকে হত্যার একমাত্র কারণ হিসেবে ঘোষণা করার এত তাড়া কেন?সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও গুরুতর একটি অভিযোগ ঘুরছে। কয়েকটি প্রকাশ্য পোস্টে দাবি করা হয়েছে, গণপতি চক্রবর্তীর কাছে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদা দাবি করা হচ্ছিল এবং তিনি সেই চাপের মুখে ছিলেন। এই অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি, তাই এটিকে প্রতিষ্ঠিত সত্য বলা যাচ্ছে না। কিন্তু অভিযোগটি যদি তদন্তযোগ্য হয়, তাহলে পুলিশ কি নিহত ব্যক্তির স্বজন, সহকর্মী, প্রতিবেশী ও বাড়ির নির্মাণশ্রমিকদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছে? বাড়ি নির্মাণ নিয়ে কোনো বিরোধ ছিল কি? স্থানীয় কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠী অর্থ দাবি করেছিল কি? থানায় কোনো সাধারণ ডায়েরি, অভিযোগ বা মৌখিকভাবে নিরাপত্তা চাওয়ার রেকর্ড আছে কি? চাঁদাবাজির অভিযোগ সত্য হলে তা গোপন করা অপরাধের বিচারকে বাধাগ্রস্ত করবে, আর মিথ্যা হলে প্রমাণসহ সেটি খণ্ডন করাও পুলিশের দায়িত্ব। পুলিশ বলছে, অভিযুক্ত দুই তরুণ নিহত পরিবারের পরিচিত। তাহলে প্রশ্ন, তারা যদি পরিচিতই হয়, একটি ছাদে ইয়াবা সেবনের ঘটনা ফাঁস হওয়ার ভয়েই কেন একটি পুরো পরিবার নিশ্চিহ্ন করতে হবে? একজনকে হত্যা করার পর পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল না? স্ত্রী ও মেয়ে যখন পর্যায়ক্রমে সিঁড়ি বেয়ে উঠছিলেন, তখন কি কেউ চিৎকার করেননি? আশপাশের বাড়ির লোকজন কিছু শুনলেন না? আর ঘুমন্ত শিশুকে হত্যা করার প্রয়োজন কেন হলো, যদি সে কোনো ঘটনাই দেখে না থাকে? পরিচয় গোপন করার যুক্তিতে ঘুমন্ত শিশুকে হত্যার ব্যাখ্যা কোথায়? এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে শুধু “পরিচয় ফাঁস হওয়ার ভয়” বললেই কি চারটি হত্যার উদ্দেশ্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়?অভিযুক্তরা নাকি হত্যার পরও দীর্ঘ সময় বাড়িতে অবস্থান করেছে। গোসল করেছে, খাবার খেয়েছে, ইয়াবা সেবন করেছে এবং পরদিন দুপুরে বেরিয়ে গেছে। তাহলে এত সময়ের মধ্যে বাড়ির বাইরে তাদের উপস্থিতি, প্রবেশ বা বের হওয়ার কোনো ভিডিও ফুটেজ আছে? প্রতিবেশী কেউ তাদের দেখেছেন? বাড়ির মূল ফটক বাইরে থেকে বন্ধ বা তালাবদ্ধ অবস্থায় পাওয়া গেলে তারা কীভাবে বের হলো এবং কে তালা লাগাল? চাবি কোথা থেকে এল? পাশের বাড়ির ছাদ দিয়ে ঢুকলে বের হওয়ার পথ কি একই ছিল, নাকি প্রধান ফটক ব্যবহার করা হয়েছে? আর যদি তারা সত্যিই আলামত নষ্ট করতে সচেতন হয়ে ফোন ডিটারজেন্টে ডুবিয়ে রাখে, তাহলে খেজুরের বিচি, মাদকসেবনের সরঞ্জাম ও অন্যান্য সম্ভাব্য নমুনা ফেলে রেখে গেল কেন?এখানেই তদন্তের সবচেয়ে জরুরি জায়গা, ফরেনসিক প্রমাণ। খেজুরের বিচি ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে বলে পুলিশ নিজেই জানিয়েছে। অর্থাৎ পরীক্ষার ফল তখনও আসেনি। আঙুলের ছাপ, ডিএনএ, মৃত্যুর সময়, নিহতদের নখের নিচের নমুনা, অভিযুক্তদের শরীরে প্রতিরোধের চিহ্ন, গামছা বা রশিতে পাওয়া জৈব আলামত এবং ফোনের তথ্য বিশ্লেষণ শেষ হওয়ার আগেই পুরো ঘটনার এত নিখুঁত বর্ণনা পুলিশ পেল কীভাবে? শুধুই আটক দুজনের কথিত স্বীকারোক্তি থেকে? যদি তাই হয়, তাহলে সেই স্বীকারোক্তি কি ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে দেওয়া হয়েছে, নাকি পুলিশ হেফাজতে? বাংলাদেশের সাক্ষ্য আইনের ২৫ ধারায় পুলিশ কর্মকর্তার কাছে দেওয়া স্বীকারোক্তি সাধারণভাবে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। তাহলে বিচারিকভাবে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ আসার আগেই সংবাদ সম্মেলনে চূড়ান্ত ঘটনার মতো করে সব ঘোষণা করার উদ্দেশ্য কী? এই হত্যাকাণ্ডকে সাম্প্রদায়িক, অসাম্প্রদায়িক, মাদকসংক্রান্ত বা ডাকাতি বলে আগেভাগেই একটি খোপে বন্দী করার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সত্য বের করা। নিহত ও অভিযুক্তদের ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে উদ্দেশ্য প্রমাণ হয় না। আবার ধর্মীয় পরিচয় দেখিয়ে সব প্রশ্ন বন্ধও করা যায় না। তদন্তকে অনুসরণ করতে হবে আলামত, অর্থের গতিপথ, ফোনের তথ্য, পূর্ববিরোধ, সম্ভাব্য চাঁদাবাজি, সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধ এবং অপরাধের প্রকৃত পরিকল্পনা।চারটি প্রাণহীন দেহের সামনে দাঁড়িয়ে পুলিশের কাছে জনগণের প্রশ্ন একটাই, আপনারা কি সত্যিই হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটন করছেন, নাকি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে একটি সহজ গল্প দাঁড় করিয়ে কঠিন প্রশ্নগুলোকে কবর দিচ্ছেন? যদি আপনাদের বক্তব্য সত্য হয়, তাহলে ফরেনসিক প্রতিবেদন প্রকাশ করুন, স্বর্ণালংকার উদ্ধারের নথি দেখান, ফোনের তথ্য উদ্ধার করুন, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নের রহস্য ব্যাখ্যা করুন, সম্ভাব্য চাঁদাবাজির অভিযোগ যাচাই করুন এবং আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করুন। আর যদি এসব প্রশ্নের উত্তর না থাকে, তাহলে “ইয়াবা সেবনে বাধা” কোনো চূড়ান্ত সত্য নয়। এটি কেবল পুলিশের একটি দাবি, যার ভেতরে এখনো অসংখ্য ফাঁক, অসংখ্য সন্দেহ এবং আড়ালে থাকা সম্ভাব্য সত্যের দীর্ঘ ছায়া।সূত্র : সুশান্ত দাসগুপ্তের ফেসবুক পোস্ট থেকে সংগৃহীত https://www.facebook.com/share/1DZdZ7EcR4/

রংপুরে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ চারজনের হত্যা: পুলিশের ‘ইয়াবা তত্ত্ব’ ঘিরে উঠছে একের পর এক প্রশ্ন

প্রবীণরা অবহেলার পাত্র নন, অভিজ্ঞতার আধার: লেফট্যানেন্ট কর্নেল (অব.) তপন মিত্র চৌধুরী

প্রবীণরা সমাজের বোঝা নন; তারা জাতির অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার। তাঁদের মেধা, শ্রম, ত্যাগ ও প্রজ্ঞার ওপর দাঁড়িয়েই আজকের সমাজ ও সভ্যতা গড়ে উঠেছে। তাই তাঁদের প্রতি সম্মান, ভালোবাসা ও সেবা প্রদান আমাদের নৈতিক এবং সামাজিক দায়িত্ব। আজকের নবীনই আগামী দিনের প্রবীণ—এই চিরন্তন সত্যকে মনে রেখেই প্রবীণদের অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।​জন্ম ও মৃত্যুর মতোই মানুষের জীবনচক্রে রয়েছে কয়েকটি স্বাভাবিক ধাপ—শৈশব, কৈশোর, যৌবন এবং বার্ধক্য। যারা দীর্ঘজীবন লাভ করে বার্ধক্যে উপনীত হন, তাদের অধিকাংশেরই একই স্বপ্ন থাকে—জীবনের শেষ দিনগুলো পরিবার পরিজনদের সাথে শান্তিপূর্ণভাবে কাটিয়ে একদিন এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়া। কিন্তু বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন। বাংলাদেশে সাধারণত ৬০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সীদের প্রবীণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির ফলে দেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশের বেশি।​বার্ধক্যে পৌঁছানোর সাথে সাথে মানুষের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন, একাকীত্ব, আয় অভাব, পরনির্ভরতা এবং সামাজিক অবহেলার মতো নানামুখী সমস্যা প্রকট হয়ে ওঠে। শৈশবে যেমন সন্তানদের সার্বক্ষণিক যত্ন নিতে হয়, বার্ধক্যে এসে অনেক প্রবীণ প্রবীণদেরও ঠিক তেমনই যত্নের প্রয়োজন হয়। যৌথ পরিবার ভাঙনের ফলে এবং আধুনিক একক পরিবারের প্রসারে প্রবীণরা ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সংকট হলো একাকীত্ব। সন্তানরা কাজ কিংবা পড়াশোনার সুবাদে বাইরে বা বিদেশে থাকায় প্রবীণদের দীর্ঘ সময় একা কাটাতে হয়, যা তাঁদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে।​স্বাস্থ্যসেবার দিক থেকেও প্রবীণরা নানা জটিলতায় ভোগেন। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, ক্যান্সার, বাত, দৃষ্টিশক্তি হ্রাস ও হৃদরোগের প্রকোপ বাড়ে। কিন্তু বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা এখনো শহরকেন্দ্রিক এবং চিকিৎসা ব্যয় অধিকাংশ প্রবীণদের নাগালের বাইরে। আর্থিক অনিশ্চয়তা প্রবীণদের জীবনকে আরও কঠিন করে তোলে। সরকারি চাকরিজীবীরা পেনশন পেলেও অধিকাংশ বয়স্ক ব্যক্তির জন্য বর্তমানে যে বয়স্ক ভাতা প্রদান করা হয় (প্রতি মাসে ৬৫০ টাকা), তা বর্তমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে অত্যন্ত অপ্রতুল। (News copied from- 'হিন্দুস নিউজ')​প্রবীণদের এই সংকট কেবল অর্থনৈতিক বা শারীরিক নয়, এটি মানবিক ও মানবাধিকারের বিষয়। মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে পরিবারে ও সমাজে প্রবীণ নির্যাতনের ঘটনাও বাড়ছে। এছাড়া ডিজিটাল প্রযুক্তির বৈষম্য ও প্রবীণবান্ধব অবকাঠামোর অভাবে হাঁটাচলা ও চলাফেরায় তাঁরা প্রতিনিয়ত বিপাকের মুখে পড়ছেন। প্রবীণদের সমস্যা দূর করতে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে স্বল্পমূল্যে জেরিওট্রিক চিকিৎসা, জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে প্রবীণ কর্নার চালু এবং প্রবীণবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ করা এখন সময়ের দাবি।​একটি সভ্য সমাজের মানদণ্ড নির্ধারিত হয় সে সমাজ তার প্রবীণ নাগরিকদের কতটা সম্মান, নিরাপত্তা ও মর্যাদা দেয়—তার ওপর। প্রবীণদের মানবাধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পরিবার, স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে যৌথভাবে এগিয়ে আসতে হবে, তবেই গড়ে উঠবে একটি প্রকৃত প্রবীণবান্ধব বাংলাদেশ।

প্রবীণরা অবহেলার পাত্র নন, অভিজ্ঞতার আধার: লেফট্যানেন্ট কর্নেল (অব.) তপন মিত্র চৌধুরী

মহাভারতের শিখণ্ডী-ভীষ্ম রূপক: আন্দোলন, ক্ষমতা ও রাজনৈতিক কৌশলের এক চিরন্তন পাঠ

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পিতামহ ভীষ্ম ছিলেন অপরাজেয়। কিন্তু তাঁর একটি কঠিন প্রতিজ্ঞা ছিল—তিনি কোনো নারী বা যিনি পূর্বে নারী ছিলেন (যেমন শিখণ্ডী), তাঁর বিরুদ্ধে কখনো অস্ত্র ধরবেন না। অর্জুন এবং শ্রীকৃষ্ণ ভীষ্মের এই নীতিগত দুর্বলতাকে চমৎকারভাবে কাজে লাগালেন। তারা শিখণ্ডীকে রথের সামনে দাঁড় করিয়ে দিলেন।​ভীষ্ম তাঁর নৈতিক অবস্থানের কারণে অস্ত্র নামিয়ে নিলেন, আর সেই সুযোগে পিছন থেকে অর্জুন অবিরাম তীর ছুঁড়ে পিতামহ ভীষ্মকে পরাস্ত করলেন।​এখানে শিখণ্ডী কিন্তু যুদ্ধ জয়ের মূল নায়ক ছিলেন না, তিনি ছিলেন কেবল একটি "নৈতিক ঢাল"। আসল লক্ষ্যভেদ করেছিলেন অর্জুন, আর এর যাবতীয় রাজনৈতিক সুবিধা ভোগ করেছিল পাণ্ডব পক্ষ।​১. মানবিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিক: যখন আদর্শ মুখোমুখি হয় ব্যবহারিক রাজনীতির​যখন একজন সাধারণ মানুষ বা নিবেদিতপ্রাণ আন্দোলনকারী নিজেকে এই রূপকের জায়গায় দাঁড় করান, তখন বিষয়টি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও নির্মম হয়ে ওঠে:​আদর্শ বনাম ক্ষমতার রাজনীতি:আপনি বা আপনার মতো সাধারণ মানুষ যখন কোনো অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নামেন, তখন আপনাদের সামনে থাকে নিঃস্বার্থ আবেগ, ন্যায়ের তাগিদ এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন। কিন্তু যখন বুঝতে পারেন যে, এই পবিত্র আবেগকে ক্ষমতার অলিন্দে থাকা কেউ নিজেদের স্বার্থে "ঢাল" হিসেবে ব্যবহার করছে, তখন তীব্র একাকীত্ব ও প্রতারণার এক গভীর ক্ষত তৈরি হয়। ইতিহাস সাক্ষী, যেকোনো বড় সংকটে সরলমনা ও অধিকারবঞ্চিত মানুষগুলোই বুক চিতিয়ে সবার সামনে লড়াই করে। কিন্তু পর্দার আড়ালের চালকেরা যখন সেই ত্যাগকে সিঁড়ি বানিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করে ফেলে, তখন সামনের সারির প্রকৃত যোদ্ধারা কেবলই একটা সংখ্যা বা দাবার ঘুঁটিতে পরিণত হন।​মূল সত্য: ক্ষমতার লড়াইয়ে নীতি যেখানে গৌণ, সেখানে আদর্শবাদী মানুষেরা প্রায়শই "শিখণ্ডী"র মতো ব্যবহৃত হন। তাঁদের আত্মত্যাগকে সামনে রেখে লাভবান হয় তৃতীয় কোনো পক্ষ, আর মূল যোদ্ধারা দিনশেষে রয়ে যান উপেক্ষিত।

মহাভারতের শিখণ্ডী-ভীষ্ম রূপক: আন্দোলন, ক্ষমতা ও রাজনৈতিক কৌশলের এক চিরন্তন পাঠ

গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে রামমন্দির নির্মাণ ঘিরে বিতর্ক: ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন

বাংলাদেশে কয়েক লক্ষ মসজিদ রয়েছে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়মিত নতুন মসজিদ নির্মিত হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে নির্মাণাধীন একটি রামমন্দির ও রামের মূর্তি স্থাপনকে কেন্দ্র করে আপত্তি, হুমকি ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ঘটনা নতুন করে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।লেখিকা তসলিমা নাসরিন তার এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, যদি ধর্মীয় স্বাধীনতা সত্যিই সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয়, তবে তা কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর জন্য সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেও একইভাবে কার্যকর হতে হবে। কারও ব্যক্তিগত পছন্দ বা অপছন্দের কারণে অন্যের উপাসনালয় নির্মাণে বাধা দেওয়া কিংবা তা ভেঙে ফেলার হুমকি দেওয়ার কোনো নৈতিক বা আইনি ভিত্তি নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।পলাশবাড়ীতে রামমন্দির নির্মাণের বিরোধিতাকে উদ্বেগজনক আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত কোনো রাষ্ট্রে ধর্মীয় মতভেদ বা বিরোধের সমাধান সহিংসতা, উসকানি কিংবা বর্বরতার মাধ্যমে হতে পারে না। রাষ্ট্রের আইন ও বিচারব্যবস্থার মাধ্যমেই যেকোনো বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়া উচিত।তিনি আরও স্মরণ করিয়ে দেন যে, পলাশবাড়ী অঞ্চলে অতীতেও হিন্দু মন্দিরে হামলা ও প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। ফলে স্থানীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হওয়াকে অস্বাভাবিক বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের উদাহরণ তুলে ধরে তসলিমা নাসরিন বলেন, ইন্দোনেশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও ওমানের মতো দেশে বড় বড় হিন্দু মন্দির রয়েছে এবং সেসব দেশে মন্দিরের অস্তিত্ব রাষ্ট্রের জন্য কোনো হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয় না। তাই বাংলাদেশে একটি মন্দির নির্মাণকে কেন্দ্র করে কেন এত বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে, সেই প্রশ্নও তিনি উত্থাপন করেন।তিনি মনে করেন, হিন্দুবিদ্বেষ, মুসলিমবিদ্বেষ, ইহুদিবিদ্বেষ কিংবা খ্রিস্টানবিদ্বেষ—যে কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষই একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য ক্ষতিকর। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা প্রদান করা এবং যারা সহিংসতা বা ভাঙচুরের হুমকি দেয় তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা।একটি গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে যেমন মসজিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তেমনি মন্দির, গির্জা ও বৌদ্ধবিহারের নিরাপত্তাও সমানভাবে নিশ্চিত করতে হবে। আইনের শাসন ও সাংবিধানিক সমঅধিকারের মৌলিক দাবি এখানেই নিহিত রয়েছে।

গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে রামমন্দির নির্মাণ ঘিরে বিতর্ক: ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন

মূল্যবান সুযোগের সদ্ব্যবহারই প্রকৃত প্রতিনিধিত্বের পরিচয়

কোনো নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে কিংবা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের মঞ্চে কথা বলার সুযোগ পাওয়া নিঃসন্দেহে একটি বিরল ও মূল্যবান বিষয়। বিশেষ করে একজন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি যখন সেই সুযোগ লাভ করেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাঁর বক্তব্য ঘিরে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি হয়। তাঁরা আশা করেন, দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, নিরাপত্তাহীনতা ও বৈষম্যের বিষয়গুলো যথাযথভাবে তুলে ধরা হবে এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে তাদের ন্যায্য দাবিগুলোর প্রতিফলন ঘটবে।সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ধর্মীয় স্বাধীনতা, সম্পত্তির সুরক্ষা, আইনি নিরাপত্তা, সহিংসতার বিচার এবং সমঅধিকারের মতো বিষয়গুলো আজও গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। ফলে যে প্রতিনিধি তাঁদের হয়ে কথা বলার সুযোগ পান, তাঁর কাছে এসব বিষয় অগ্রাধিকার পাবে—এটাই জনগণের প্রত্যাশা।কিন্তু যদি সেই মূল্যবান সুযোগ এমন কোনো বিষয়ে ব্যয় হয়, যার বাস্তব প্রয়োজনীয়তা সীমিত কিংবা যা জনগণের মৌলিক সমস্যা ও দৈনন্দিন সংকটের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়, তাহলে অনেকের কাছেই সেটি দূরদর্শিতার অভাব হিসেবে প্রতীয়মান হতে পারে। এতে প্রশ্ন উঠতে পারে, প্রতিনিধিত্বের সেই সুযোগটি জনগণের প্রকৃত স্বার্থে কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ কেবল ব্যক্তিগত উপস্থিতি জানান দেওয়ার ক্ষেত্র নয়; এটি নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তার এবং অবহেলিত মানুষের কণ্ঠস্বর তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সেই সুযোগ যদি জনস্বার্থের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তা এক ধরনের "হারানো সুযোগ" হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। একজন প্রতিনিধি তাঁর ব্যক্তিগত মতামতের পাশাপাশি একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর আকাঙ্ক্ষা, উদ্বেগ ও প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটান। ফলে তাঁর বক্তব্যের বিষয়বস্তু এবং অগ্রাধিকার নির্ধারণ ভবিষ্যতে সেই সম্প্রদায়ের দাবি-দাওয়া কতটা গুরুত্ব পাবে, তার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।সামাজিক ক্ষেত্রেও এর প্রভাব কম নয়। যখন সাধারণ মানুষ দেখেন যে তাঁদের দীর্ঘদিনের বাস্তব সমস্যাগুলো আলোচনায় স্থান পাচ্ছে না, তখন তাঁদের মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে। তাঁরা মনে করতে পারেন, তাঁদের কণ্ঠস্বর যথাযথভাবে উপস্থাপিত হয়নি। এর ফলে প্রতিনিধিত্বের প্রতি আস্থার সংকটও সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।ধর্মীয় ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রেক্ষাপটে এই বিষয়টি আরও বেশি সংবেদনশীল। কারণ এই জনগোষ্ঠীগুলো অনেক ক্ষেত্রেই নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে থাকে। তাই তাঁদের প্রতিনিধিদের প্রতি প্রত্যাশাও তুলনামূলক বেশি থাকে। সেই প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে নিরাপত্তা, অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং মর্যাদাপূর্ণ নাগরিক জীবন নিশ্চিত করার প্রশ্ন।সবশেষে বলা যায়, শুধু কথা বলার সুযোগ পাওয়াই কোনো প্রতিনিধির সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড নয়। বরং সেই সুযোগকে কতটা প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা, দায়িত্ববোধ এবং জনগণের কল্যাণে ব্যবহার করা হলো, সেটিই প্রকৃত প্রতিনিধিত্বের পরিচয় বহন করে। একজন প্রকৃত প্রতিনিধি সেই ব্যক্তিই, যিনি ব্যক্তিগত পছন্দ বা সীমিত বিষয়ে নয়, বরং জনগণের বাস্তব চাহিদা ও ভবিষ্যৎ স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তাঁর বক্তব্য উপস্থাপন করেন।লেখক: এডভোকেট সুশান্ত অধিকারী

মূল্যবান সুযোগের সদ্ব্যবহারই প্রকৃত প্রতিনিধিত্বের পরিচয়

বরগুনা জেলা পরিষদ ডাকবাংলোতে স্মৃতি রাণী (ইতি) ও তাঁর দুই কন্যার মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় বিশ্ব হিন্দু মহাসভা, বাংলাদেশ গভীর শোক ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

বরগুনা জেলা পরিষদ ডাকবাংলোতে স্মৃতি রাণী (ইতি) ও তাঁর দুই কন্যার মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় বিশ্ব হিন্দু মহাসভা, বাংলাদেশ গভীর শোক ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ঘটনাটির প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার লক্ষ্যে দ্রুত, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।এ প্রসঙ্গে বিশ্ব হিন্দু মহাসভা, বাংলাদেশ-এর দেশ প্রধান মৃদুল মন্ডল বলেন, “এই মর্মান্তিক ঘটনায় আমরা গভীরভাবে শোকাহত। ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। কোনো নিরপরাধ পরিবার যেন ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হয় এবং প্রকৃত অপরাধীরা যেন বিচারের মুখোমুখি হয়, সেটিই আমাদের প্রত্যাশা।”

বরগুনা জেলা পরিষদ ডাকবাংলোতে স্মৃতি রাণী (ইতি) ও তাঁর দুই কন্যার মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় বিশ্ব হিন্দু মহাসভা, বাংলাদেশ গভীর শোক ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

সংসদ ভবনে ডেপুটি স্পীকারের সঙ্গে ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের সাক্ষাৎ: পুরোহিত ভাতা ও মন্দির সংস্কারের দাবি

বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পীকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, এমপি’র সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন তাঁর নির্বাচনী এলাকার ব্রাহ্মণ পুরোহিত সম্প্রদায়ের একটি প্রতিনিধিদল। আজ বুধবার সংসদ ভবনে ডেপুটি স্পীকারের কার্যালয়ে ১২ সদস্যবিশিষ্ট এই প্রতিনিধিদলটি সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হন। কুশল বিনিময়কালে ডেপুটি স্পীকার পুরোহিতদের খোঁজখবর নেন এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে এলাকার উন্নয়নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।​সাক্ষাৎকার চলাকালীন পুরোহিত প্রতিনিধিদলটি ডেপুটি স্পীকারের কাছে তাঁদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও অবহেলার কথা তুলে ধরেন। তাঁরা উল্লেখ করেন যে, হিন্দু সম্প্রদায় হিসেবে অনেক সময় তাঁরা প্রান্তিক অবস্থানে থাকলেও বর্তমান ডেপুটি স্পীকারের আন্তরিকতায় তাঁরা দুর্গাপুরের উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে আগ্রহী। প্রতিনিধিদলের সদস্যরা ডেপুটি স্পীকারকে অত্যন্ত শ্রদ্ধাভরে ‘রাজা’ সম্বোধন করেন এবং তাঁর মঙ্গল কামনায় পবিত্র শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা পাঠ করে আশীর্বাদ প্রদান করেন। এসময় তাঁরা ডেপুটি স্পীকারকে একটি বিশেষ ‘উত্তরণী’ উপহার দেন এবং মন্দিরের সংস্কার, পুরোহিত ভাতা চালুসহ ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের জন্য তাঁকে সাদর আমন্ত্রণ জানান।​ডেপুটি স্পীকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল পুরোহিতদের কথা অত্যন্ত ধৈর্য সহকারে শোনেন এবং তাঁদের সার্বিক কল্যাণে কাজ করার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে, এলাকার মন্দিরের জন্য বরাদ্দ প্রদানে কোনো প্রকার অবহেলা বা বৈষম্য করা হবে না। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে মসজিদ, মন্দির ও গির্জার জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের তথ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উন্মুক্ত রাখা হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। অতীতে রাষ্ট্রীয় সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে দলীয় সংকীর্ণতা দেখা গেলেও তিনি সকল ভেদাভেদ ভুলে দলমত নির্বিশেষে সবার পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন।​সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর গুরুত্বারোপ করে ডেপুটি স্পীকার বলেন যে, মানুষের পরিচয় ধর্ম দিয়ে নয়, বরং মানবতা দিয়ে। সবার রক্ত লাল এবং সবাই আমরা বাংলাদেশি—এই চেতনাকে ধারণ করেই কাজ করতে হবে। তিনি তাঁর নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন ধর্ম ও পেশার মানুষকে পর্যায়ক্রমে সংসদ ভবন পরিদর্শনের সুযোগ করে দিচ্ছেন যাতে সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রীয় কাজ সম্পর্কে সরাসরি ধারণা লাভ করতে পারেন। ইতিপূর্বে খ্রিষ্টান, ইমাম, হাজং সম্প্রদায়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও এই সুযোগ পেয়েছেন।​সাক্ষাৎকালে উপস্থিত ছিলেন বীরেশ্বর চক্রবর্তী, মিন্টু ভাদুরী, অপরেশ চক্রবর্তী, গৌতম চক্রবর্তী, বিমল চৌধুরী, উৎপল শর্মা, রতন শর্মা, সুজয় শর্মা, মানিক চক্রবর্তী, কেশব লাল চক্রবর্তী, সজয় চক্রবর্তী এবং সমরেশ চক্রবর্তী। প্রতিনিধিদলের সদস্যরা দুর্গাপুরের সন্তান হিসেবে ব্যারিস্টার কায়সার কামালকে গুরুত্বপূর্ণ এই সাংবিধানিক পদে পাওয়ায় তাঁর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। সবশেষে ডেপুটি স্পীকার তরুণ প্রজন্মকে মাদকের গ্রাস থেকে রক্ষা করতে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা ও নিজস্ব সংস্কৃতিচর্চায় মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দেন।

সংসদ ভবনে ডেপুটি স্পীকারের সঙ্গে ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের সাক্ষাৎ: পুরোহিত ভাতা ও মন্দির সংস্কারের দাবি

সংখ্যালঘু নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ: সনাতনী সম্প্রদায়ের ওপর ধারাবাহিক হামলা, প্রশাসনের নীরবতা কেন?

বাংলাদেশ বহুদিন ধরেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েক মাসে সনাতনী (হিন্দু) সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর ধারাবাহিক হামলা ও হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। বাস্তবতার এই নির্মম চিত্র আমাদের ভাবিয়ে তুলছে—রাষ্ট্র কি তার সকল নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে?দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ব্যবসায়ী, শ্রমিক, যুবক থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত—কেউই এই সহিংসতার বাইরে থাকছেন না। এসব ঘটনা আর বিচ্ছিন্ন বলে মনে হয় না; বরং একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তু বানানোর প্রবণতা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত কয়েকটি নির্মম ঘটনার মধ্যে রয়েছে ময়মনসিংহের ভালুকায় দীপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ড, শরীয়তপুরের খোকন চন্দ্র দাসের মর্মান্তিক মৃত্যু, নরসিংদীর মনি চক্রবর্তী, চঞ্চল ভৌমিকের আগুনে পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগসহ একাধিক সহিংস ঘটনা। পাশাপাশি অল্প সময়ের ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন জেলায় একাধিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকেই ইঙ্গিত করে।এর ধারাবাহিকতায় কক্সবাজারের খুরুশকুলে পুরোহিত নয়ন সাধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ড এবং সাম্প্রতিক সময়ে এক কাস্টমস কর্মকর্তার হত্যার ঘটনাও নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এসব ঘটনা কেবল ব্যক্তিগত বা বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়—এগুলো আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই সামনে এনে দেয়।ধর্মের ভিত্তিতে একজন মানুষকে হত্যা করা শুধু একটি অপরাধ নয়—এটি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, সংবিধানের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন এবং রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার চরম অবক্ষয়ের বহিঃপ্রকাশ। প্রশ্ন হচ্ছে—কেন বারবার এমন ঘটনা ঘটছে? কেন অপরাধীরা দ্রুত আইনের আওতায় আসছে না?বাংলাদেশের সংবিধান সকল নাগরিকের সমান অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলে। কিন্তু বাস্তবতা যদি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে, তবে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। কোথায় সেই কঠোর পদক্ষেপ? কোথায় দৃশ্যমান বিচারপ্রক্রিয়া?মানবাধিকার সংস্থা ও বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও সহিংসতা গত কয়েক বছরে উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে গুজব, ধর্মীয় উসকানি কিংবা পরিকল্পিত বিদ্বেষমূলক কর্মকাণ্ড এই সহিংসতার পেছনে কাজ করছে। ফলে ভুক্তভোগী সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয়, অনিরাপত্তা ও অনিশ্চয়তা দিন দিন বাড়ছে।আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই—এই দেশ কোনো একটি ধর্মের নয়; এটি সকল মানুষের। এখানে কোনো নাগরিক তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নির্যাতিত হবে—এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।এই মুহূর্তে প্রয়োজন—১। দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত২। অপরাধীদের চিহ্নিত করে দ্রুত বিচার ট্রাইবুনাল গঠন করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।৩। সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা জোরদার৪। রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে ঘৃণার রাজনীতি বন্ধ করা।আমরা সহিংসতা চাই না, প্রতিশোধ চাই না—আমরা চাই ন্যায়বিচার। রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালন করুক। বাংলাদেশ কোনো একটি ধর্মের নয়—এটি সকল মানুষের। ধর্ম নয়, মানুষই হোক সর্বাগ্রে।লেখক: এডভোকেট সুশান্ত অধিকারী

সংখ্যালঘু নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ: সনাতনী সম্প্রদায়ের ওপর ধারাবাহিক হামলা, প্রশাসনের নীরবতা কেন?

বৈশাখের ঝড়ে উড়ে যাক সব অশুভ শক্তি

বৈশাখের বর্ষবরণ বাংলাদেশের জাতীয় উৎসব। এই একটি মাত্র উৎসবে পুরো দেশ একযোগে মিলতে পারে। আমাদের বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায় ও জাতিগোষ্ঠীর নানা রকম উৎসব রয়েছে। ঈদ, দুর্গাপূজা, বুদ্ধপূর্ণিমা, বড়দিন সবই একেকটি ধর্ম সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য। কিন্তু পহেলা বৈশাখের উৎসবটি সর্বজনীন। এখানে সব ধর্ম-বর্ণ, জাতিগোষ্ঠী, পাহাড় ও সমতল, বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী, নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ সকলে মিলে আনন্দ করতে পারে।ভাবতে অবাক লাগে, এমন একটি উৎসবেরও বিরোধিতা হয়! পহেলা বৈশাখ এলেই দেশের একশ্রেণির মৌলবাদী মানুষের অশুভ বক্তব্য চোখে পড়ে। পহেলা বৈশাখকে ধর্মীয় অনুভূতির বিপরীতে দাঁড় করানোর অপচেষ্টা লক্ষণীয় হয়ে ওঠে, যা আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির পরিপন্থী।বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে বর্ষবরণের রীতি প্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত। চীনে প্রতি বছর চায়নিজ নিউ ইয়ার বা স্প্রিং ফেস্টিভালে ৫৬টি জাতিগোষ্ঠীর সকলেই অংশ নেয়। চীনের মুসলিমরাও নববর্ষ উদযাপন করেন। প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব নববর্ষ উৎসবও রয়েছে এবং তারা তা যথাযথভাবে পালন করেন।ইরানের মানুষ নওরোজ উদযাপন করেন। মোগল আমলে ভারতেও নওরোজ উদযাপিত হতো। দিল্লির প্রাসাদ প্রাঙ্গণে এক নওরোজের উৎসবেই যুবরাজ সেলিম ও নূরজাহানের দেখা হয়েছিল।প্রাচীনকাল থেকেই বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণসহ ১২ মাস বাঙালির একান্ত নিজস্ব ছিল। বাংলাসহ ভারতীয় উপমহাদেশে শকাব্দ, লক্ষ্মণাব্দ ইত্যাদি বর্ষপঞ্জিতে এই মাসগুলোই ব্যবহৃত হতো। প্রতিটি মাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুরাণ ও কাব্যকাহিনি। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন বর্ষপঞ্জি প্রচলিত ছিল এবং সেগুলো অনুসারে নববর্ষ পালনের রীতি ছিল। পহেলা বৈশাখে মূলত খাজনা পরিশোধ করা হতো। ব্যবসায়ীরা নতুন হিসাবের খাতা খুলতেন। এছাড়াও এই দিনকে ঘিরে নানা উৎসব-অনুষ্ঠান হতো।প্রাচীনকালে নববর্ষ ছিল মূলত ঋতুধর্মী উৎসব। গৌড়েশ্বর শশাঙ্কের সময়েও নববর্ষ পালিত হতো। পাল ও সেন আমলেও এই প্রথা ছিল। মুঘল আমলে কৃষকরা চৈত্র মাসের শেষ দিন পর্যন্ত ভূস্বামীদের খাজনা শোধ করতেন। শুধু খাজনা শোধ ও হালখাতা নয়, সঙ্গে মিষ্টিমুখ করা হতো। নবান্ন উৎসব হতো অগ্রহায়ণ মাসে, যাকে কখনো কখনো বর্ষবরণও বলা হতো।মুঘল সম্রাট আকবরের সময় একটি সমন্বিত বর্ষপঞ্জির প্রয়োজনে নতুন সন প্রচলিত হয়। বাংলা সনের জন্ম ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে, এ কথা অধিকাংশ পঞ্জিকাবিদ মেনে নিয়েছেন। তবে গণনা শুরু হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের বছর ১৫৫৬ থেকে। এই নতুন সনকে প্রথমে ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বলা হয়।সময়ের প্রয়োজনে বাংলা বর্ষপঞ্জি বেশ কয়েকবার সংস্কার হয়েছে। এর মূল সংস্কার করে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে গঠিত কমিটি। বর্তমান সরকারি বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রণেতা ভাষাসংগ্রামী আ জ ম তকীয়ূল্লাহ। তার প্রস্তাব অনুসারে বর্তমান বর্ষপঞ্জিতে খ্রিস্টীয় সাল ও বঙ্গাব্দের মাসগুলোর তারিখ স্থির রয়েছে। ফলে প্রতি বছর ১৪ এপ্রিলই পহেলা বৈশাখ হয়।আবহমান কাল থেকে বিভিন্ন লোকাচারের মাধ্যমে বাংলায় নববর্ষ পালনের রীতি চলে আসছে। চৈত্র সংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে মেলা বসত, চড়ক পূজা হতো। বৈশাখেও মেলা ও স্নানের রীতি ছিল। ক্রমে এই দিনকে ঘিরে নানা অনুষ্ঠান শুরু হয়। নৌকাবাইচ, বলীখেলা, মোরগ লড়াই, ষাঁড়ের লড়াই ইত্যাদি দিনটিকে উৎসবময় করে তুলত। নতুন বছরে পিঠা-পায়েস খাওয়া, অতিথি আপ্যায়ন চলত। অনেক অঞ্চলে নববর্ষের আগের রাতে স্নানের প্রচলন ছিল। এখনও দেশের বিভিন্ন জায়গায় মেলা বসে। অষ্টধাতু ভেজানো পানি ছিটানো, ঘরদুয়ার পরিষ্কার, গরু-বাছুর স্নান করানো, ব্যাঙের বিয়ে, মেঘরাজার গান, শিবের গাজন ইত্যাদি লোকাচার এখনও অনেক অঞ্চলে প্রচলিত আছে।পহেলা বৈশাখে ব্যবসায়ীরা নতুন হিসাবের খাতা খোলেন। এই উপলক্ষে দোকান সাজানো হয় এবং ক্রেতাদের মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। এই অনুষ্ঠানকে বলা হয় হালখাতা।পহেলা বৈশাখের আগে জমিদার বা নবাবকে সারা বছরের খাজনা পরিশোধের রীতি ছিল। জমিদারবাড়িতে সাধারণ প্রজাদের নিমন্ত্রণ করে সুখাদ্যে আপ্যায়ন করা হতো এবং মঙ্গল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। একে বলা হতো পুণ্যাহ। এখন এই রীতি আর নেই।ইংরেজ আমলে কলকাতায় সাহেবিয়ানার প্রভাবে নববর্ষ পালন কিছুটা কমে গেলেও, পূর্ববাংলার গ্রামে গ্রামে চড়ক ও বৈশাখী মেলা ঠিকই চলতে থাকে। বাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও জাতীয় বোধকে পুনর্জাগরিত করার লক্ষ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে নতুনভাবে পহেলা বৈশাখ পালনের ধারা শুরু করেন।পাকিস্তান আমলে বাঙালি সংস্কৃতির ওপর চলে নির্যাতন ও দমন। তার প্রতিবাদেই ঢাকায় ষাটের দশকের শেষের দিকে নতুন করে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের রীতি শুরু হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে ধীরে ধীরে পহেলা বৈশাখ দেশের প্রধান জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় শহুরে মেলা, শোভাযাত্রা ও নানা অনুষ্ঠান।পাহাড়ি জনগোষ্ঠী নিজস্ব ঐতিহ্য অনুসারে এই নববর্ষ পালন করেন। বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু ইত্যাদি উৎসবের মাধ্যমে তারা নববর্ষ বরণ করেন।পহেলা বৈশাখের বিরোধিতাকারীরা মূলত শহরের উৎসবের বিরোধিতা করেন, কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হিসেবে অথবা ধর্মীয় গোঁড়ামি থেকে। কিন্তু তারা কি গ্রামের মেলা ও লোকাচারের ঐতিহ্যকে অস্বীকার করতে পারবেন?১৯৮৯ সালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে চারুকলা ইনস্টিটিউটের ছাত্র-শিক্ষকদের উদ্যোগে মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরু হয়। এখন এটি আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। এই শোভাযাত্রা কোনো বিশেষ ধর্মের পরিচয় বহন করে না, বরং বাঙালির সামগ্রিক জাতীয় ঐতিহ্যকে ধারণ করে। ইউনেসকোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের মঙ্গল শোভাযাত্রা।আনন্দ শোভাযাত্রা বা বৈশাখী শোভাযাত্রা—নাম যেটাই দেওয়া হোক, সেখানে মূলত কী থাকে? এই শোভাযাত্রায় থাকে আমাদের চিরন্তন মোটিফ বা নকশায় তৈরি মুখোশ। গঙ্গাহৃদি, পুণ্ড্রবর্ধন, রাঢ়, গৌড়, বঙ্গ, সমতট, হরিকেলসহ প্রাচীন জনপদগুলোর লোক-ঐতিহ্যের ধারক মোটিফগুলোই এখানে ফুটে ওঠে। প্রাচীন বাংলার পোড়ামাটির ফলক ও মাটির টেপা পুতুলে আমরা যে ছবিগুলো দেখি প্যাঁচা, বাঘ, পাখি, হাতি, পুতুলগুলোই শোভাযাত্রায় উঠে আসে।শোভাযাত্রা তুলে ধরে আবহমান বাঙালির প্রিয় প্রতীকগুলো, যা এদেশের চিরন্তন লোকজ ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করে। ধর্মের দোহাই দিয়ে কেন এর বিরোধিতা? মঙ্গল শোভাযাত্রার সঙ্গে কোনো ধর্মের সম্পর্ক নেই। এর সম্পর্ক শুধু সুপ্রাচীন বাঙালির লোকজ ঐতিহ্যের সঙ্গে। ‘মঙ্গল’ শব্দের অর্থই কল্যাণ ও শুভ। নতুন বছরের শুভকামনা। তাহলে এত বিরোধিতা কেন?মৌলবাদী অপশক্তি বাংলাদেশের নিজস্ব ঐতিহ্যকে ভালোবাসে না। তারা ধর্মের নামে এই উৎসবকে খারিজ করতে চায়। ধর্মপ্রাণ মানুষের আবেগকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে সকল লোকজ ঐতিহ্যকে অস্বীকার করতে চায়। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, ধর্মের সঙ্গে এই উৎসবের কোনো বিরোধ নেই।চর্যাপদের কালে নিশ্চিত জানতাম যে আমরা বাঙালি। চর্যাপদের কবি ভুসুকু নিজেকে ‘বঙ্গাল’ বা বাঙালি বলতে দ্বিধা করেননি। পাল, সেন ও সুলতানি আমলেও ধর্ম যাই হোক, বাঙালির পালা-পার্বণে কারও আপত্তি ছিল না। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ সবাই একসঙ্গে চড়কের মেলা, বারুণীর স্নানযাত্রা, রথের মেলা, মহরমের মেলায় যেতেন। মোগল আমলে ফসলি সন, খাজনা আদায়, পুণ্যাহ পালনের পাশাপাশি বৈশাখের মেলা ও আনন্দ উৎসবে সবাই অংশ নিতেন।ব্রিটিশ আমলে ‘আমরা বাঙালি নাকি মুসলমান’ এই দ্বন্দ্বের মধ্যে আমাদের অনেক সময় চলে গেছে। এই দোলাচলের মধ্যেই দ্বিজাতিতত্ত্বের মতো একটি ভ্রান্ত ধারণার ভিত্তিতে আমরা বাংলাকে ভাগ করে ফেলি। ১৯৪৭ সালে পাই পাকিস্তান নামের একটি জোড়াতালি দেওয়া রাষ্ট্র। সেই রাষ্ট্র বারবার বলেছে, তুমি বাঙালি নও, তোমাকে হতে হবে ‘সাচ্চা মুসলমান’, ‘পাকি মুসলমান’।সাচ্চা মুসলমান হতে হলে প্রথমেই ভুলতে হবে যে তুমি বাঙালি। তোমার পোশাক, ভাষা, রীতিনীতি সবকিছুতেই ‘হিন্দুয়ানি’ গন্ধ। বাংলা ছেড়ে উর্দু ধরতে হবে। বাংলা লিখতে হবে আরবি অক্ষরে। বাংলায় আরবি-ফারসি শব্দ ঢুকিয়ে ভাষাকে বদলে ফেলতে হবে। স্বাভাবিক নিয়মে যা গৃহীত হয়েছে, তার বাইরেও জবরদস্তি করে হলেও এইসব নতুন নতুন পাকি শব্দ তোমাকে ব্যবহার করতে হবে।আর বাঙালির রীতি-রেওয়াজ? সর্বনাশ! ওগুলো তো আরও বেশি নাপাক। গায়ে হলুদ, পহেলা বৈশাখ, পহেলা ফাল্গুন এগুলো বর্জন কর যত দ্রুত সম্ভব। এই চিন্তাধারার বর্তমান উত্তরসূরিরাই আজ পহেলা বৈশাখের বিরোধিতা করছে।পহেলা বৈশাখ আমাদের প্রাণের উৎসব। এটি জীর্ণ পুরাতন ও অমঙ্গলকে দূরে সরিয়ে নতুন আলোয় চোখ মেলবার দিন। পহেলা বৈশাখকে সফল করতে এবং সকল অপশক্তির মূল উৎপাটন করতে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আসুন, দলে দলে উৎসবে শামিল হই। আমাদের সম্মিলিত শক্তির কাছে অশুভ শক্তি হার মানতে বাধ্য।আসুন, আমরা বৈশাখী ঝড় হয়ে উঠি। সেই ঝড়ের শক্তিতে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ আর বিভেদ সৃষ্টিকারী সব আবর্জনাকে উড়িয়ে দিই। দূর করি সকল মৌলবাদী ও জঙ্গিবাদী অপশক্তিকে।‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা/ অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’আমাদের সম্মিলিত বৈশাখী ঝড় দূর করে দিক সব অশুভকে। পহেলা বৈশাখ আমাদের ঐতিহ্যের উৎসব, যার অবস্থান ধর্মপরিচয়ের ঊর্ধ্বে। এই উৎসবের বিরুদ্ধে যে কোনো ষড়যন্ত্র বাংলাদেশ সর্বশক্তিতে প্রতিরোধ করবে।১৪৩৩ বঙ্গাব্দ হোক শুভ, সুন্দর ও কল্যাণে উদ্ভাসিত। নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ সকলের মঙ্গল হোক। শুভ নববর্ষ!

বৈশাখের ঝড়ে উড়ে যাক সব অশুভ শক্তি

নিজের পশুত্ব নাকি নিরীহ প্রাণ—কাকে বিসর্জন দিলে মিলবে সেই পরম জ্যোতি?

​"স্রষ্টার সন্তুষ্টি সমর্পণে, নিরীহ প্রাণের অর্পণে নয়"—এই শাশ্বত সত্যকে ধারণ করে বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে সনাতন দর্শনের প্রকৃত মহিমা ও জীবে দয়ার আহ্বান ছড়িয়ে পড়ছে সর্বস্তরে। এই সুবিশাল ধরিত্রী আমাদের সকলের এবং এখানে প্রতিটি প্রাণের বেঁচে থাকার অধিকার সমান ও অনস্বীকার্য। সনাতন ধর্মতত্ত্ব অনুযায়ী, তৃণলতা থেকে শুরু করে প্রতিটি প্রাণীই এই বসুন্ধরার আশ্রিত অতিথি এবং প্রত্যেকেই সেই পরম অমৃতের সন্তান। কিন্তু আধুনিক সভ্যতায় মানুষ তার বিবেকবোধকে বিসর্জন দিয়ে বারবার মেতে উঠছে রক্তক্ষয়ী মরণ খেলায়, যা আধ্যাত্মিকতার নামে মূলত এক অন্ধকার কুসংস্কারের প্রতিফলন।​সনাতন দর্শন ও শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একই জীবাত্মা কর্মচক্রের আবর্তে কখনো মনুষ্য, কখনোবা অন্য কোনো প্রাণীর দেহ ধারণ করে। সৃষ্টির বৈচিত্র্যের মাঝে মানুষকে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট দেওয়া হয়েছে তার বুদ্ধি ও বিবেকবোধের কারণে। তান্ড্য ব্রাহ্মণে এই মানবদেহকে দেবতাদের আবাসস্থল হিসেবে মহিমান্বিত করে বলা হয়েছে, "নরাঃ দেবানাং গ্রামঃ"। অথচ পরিতাপের বিষয় এই যে, মানুষ তার আদিম অভিলাষ ও তথাকথিত আধ্যাত্মিক সন্তুষ্টির দোহাই দিয়ে অবলা ও নিরীহ প্রাণীদের জীবন হরণ করছে। এই রক্তবরণ উৎসব আদতে পরমেশ্বরের অভিপ্রায় হতে পারে না, কারণ তিনি স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং সকল সৃষ্টির পরম পিতা।​অধ্যাত্মিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো করুণাময় পিতা যেমন তাঁর সন্তানের প্রাণের বিনিময়ে তুষ্ট হতে পারেন না, তেমনি স্রষ্টাও তাঁর সৃষ্টির বিনাশে আনন্দিত হন না। মূলত এটি মানুষের চরম অজ্ঞানতা ও অন্ধকারাচ্ছন্ন মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। পরমাত্মার প্রকৃত সন্তুষ্টি নিহিত থাকে নিরীহ প্রাণের বিনাশে নয়, বরং সেই প্রাণের প্রতি নিঃস্বার্থ সেবায়। মহাত্মা কৌটিল্য তাঁর চাণক্য নীতিতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, আহার, নিদ্রা, ভয় আর বংশবিস্তার—এই প্রবৃত্তিগুলো মানুষ ও পশুর মধ্যে অভিন্ন। মানুষের প্রকৃত বিশেষত্ব তার জ্ঞানে; আর যে মানুষের এই বোধ বা জ্ঞান নেই, শাস্ত্রমতে সে পশুরই সমান।​বর্তমানে সময়ের দাবি হলো—ভক্তি বা বিশ্বাসের সার্থকতা অন্যের রক্তপাতে নয়, বরং নিজের ভেতরকার পশুত্বের বিসর্জনে খোঁজা। স্রষ্টার কাছে সেই উপচারই শ্রেষ্ঠ, যা প্রেম ও করুণায় সিক্ত। প্রকৃতি ও প্রাণের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই হোক আমাদের পরম আরাধনা। মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব দম্ভে নয়, বরং দয়ায় প্রমাণিত হয়। স্বামী বিবেকানন্দের সেই অমর বাণী আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, যেখানে তিনি বলেছিলেন— "জীবে দয়া করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।" তাই কুসংস্কারের শিকল ভেঙে অবলা প্রাণীর আর্তনাদ থামিয়ে একটি অভয় পৃথিবী গড়ে তোলাই হোক আমাদের মূল লক্ষ্য। সৃষ্টির নিঃস্বার্থ সেবাতেই লুকিয়ে আছে স্রষ্টার প্রকৃত সন্তুষ্টি ও সনাতন ধর্মের মূল নির্যাস।

নিজের পশুত্ব নাকি নিরীহ প্রাণ—কাকে বিসর্জন দিলে মিলবে সেই পরম জ্যোতি?

বরাদ্দ ছিল, পেল না অনেক মন্দির—উঠছে অর্থ গায়েবের প্রশ্ন

হাসিনা সরকার আমলে যখন মডেল মসজিদ প্রকল্প নেওয়া হয়, তখন হিন্দু কল্যাণ ট্রাস্ট ও বাংলাদেশ পূজা উদযাপন কমিটির মাধ্যমে তালিকাভুক্ত মন্দিরগুলোর জন্য প্রতিটি মন্দিরে ১০ লক্ষ টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল—মন্দির নির্মাণ ও সংস্কারের উদ্দেশ্যে।কিন্তু বাস্তবতা হলো, কিছু মন্দির সেই টাকা পেলেও অনেক মন্দির এখনো জানেই না তাদের নামে কোনো বরাদ্দ হয়েছিল। প্রশ্ন হলো—বাকি টাকাগুলো কোথায় গেল?দুঃখজনকভাবে, সংশ্লিষ্ট কিছু কমিটি এই বিষয়টি কখনো স্বীকারও করে না। কারণ স্বীকার করলে হিসাব দিতে হবে।আমাদের নিজেদের ভেতরের সমস্যাগুলো আগে ঠিক করা জরুরি। কাকে নেতা বানাচ্ছি, সেটা ভেবে দেখা উচিত। না হলে এ ধরনের অনিয়ম চলতেই থাকবে।আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে জানি—আমার পরিচিত দুইটি মন্দির এই কমিটিগুলোর মাধ্যমে টাকা পেয়েছে, কিন্তু সেখানেও বিভিন্নভাবে কাটছাঁট করা হয়েছে।পুতুল ঘোষযুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, ঢাকেশ্বরী মাতৃসেবা সংঘ

বরাদ্দ ছিল, পেল না অনেক মন্দির—উঠছে অর্থ গায়েবের প্রশ্ন

ধর্মান্তরকরণ এক নীরব ক্যান্সার: অস্তিত্ব রক্ষায় এখনই জাগতে হবে সনাতনী সমাজকে

বর্তমান সময়ে হিন্দু সমাজের অস্তিত্বের মূলে আঘাত হেনে চলেছে এক অলক্ষ্য ব্যাধি, যা আধুনিক সমাজ বিশ্লেষকদের ভাষায় ‘ধর্মান্তরকরণ নামক এক নীরব ক্যান্সার’। তিলে তিলে এই ব্যাধি আমাদের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও বংশপরম্পরাকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। সম্প্রতি এই ভয়াবহ প্রবণতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অষ্টাঙ্গযোগ একাডেমির উপদেষ্টা কল্যাণী রায়। তিনি মনে করেন, শারীরিক ক্যান্সার যেমন শরীরকে ভেতর থেকে ক্ষয় করে ফেলে, ধর্মান্তরকরণ ঠিক তেমনি আমাদের সামাজিক ও ধর্মীয় অস্তিত্বকে সমূলে বিনষ্ট করছে। এই সংকট উত্তরণে তিনি কৈশোরকাল থেকেই হিন্দু সন্তানদের মাঝে প্রখর ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং শাস্ত্রীয় জ্ঞানচর্চার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। "ধর্মান্তরকরণ -এক নীরব ক্যান্সার " দিনে দিনে ধর্মান্তরকরণ যেনো ক্যান্সারের মতো আমাদের নিঃশেষ করে দিচ্ছে। এই ভয়াবহ প্রবণতা রোধে প্রয়োজন পারিবারিক সচেতনতা, কৈশোরকাল থেকেই ধর্মীয় মুল্যবোধ এবং জ্ঞানচর্চা, এবং ধর্মান্তকরনের প্রকৃত ভয়াবহতা সম্পর্কে বাস্তব ধারণা।এই মুহুর্তে সমাজের প্রতিটি মানুষকে জাগতে হবে -কারন এই দুরারোধ্য ক্যান্সারের একমাত্র নিরাময় হলো সচেতনতা এবং ধর্মীয় শিক্ষার আলোকপ্রাপ্তি।— কল্যাণী রায়, উপদেষ্টা,অষ্টাঙ্গযোগ একাডেমি ​কল্যাণী রায়ের মতে, কেবল আবেগ দিয়ে নয়, বরং ধর্মান্তরকরণের প্রকৃত ভয়াবহতা সম্পর্কে তরুণ প্রজন্মকে বাস্তবসম্মত ধারণা দিতে হবে। পারিবারিক সচেতনতাই হতে পারে এই সামাজিক অবক্ষয় রোধের প্রথম এবং প্রধান দুর্গ। যখন একটি পরিবারে শৈশব থেকেই সনাতন ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব এবং আধ্যাত্মিক দর্শনের সঠিক পাঠ দেওয়া হয়, তখন কোনো বহিঃশক্তির প্রলোভন বা কূটকৌশল তাকে বিভ্রান্ত করতে পারে না। বর্তমান সময়টি হিন্দু সমাজের প্রতিটি মানুষের জন্য এক পরম সন্ধিক্ষণ। এখন ঘুমিয়ে থাকার বা উদাসীন থাকার আর কোনো অবকাশ নেই। সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে আজ একযোগে জাগ্রত হতে হবে। কারণ, এই দুরারোগ্য আধ্যাত্মিক ব্যাধি থেকে মুক্তির একমাত্র মহৌষধ হলো সচেতনতা এবং প্রকৃত ধর্মীয় শিক্ষার আলোকপ্রাপ্তি। তিনি বিশ্বাস করেন, শাস্ত্রীয় শিক্ষার আলোয় যখন অন্তর উদ্ভাসিত হবে, তখনই কেবল এই রূপান্তরকামী শক্তির হাত থেকে সমাজকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

ধর্মান্তরকরণ এক নীরব ক্যান্সার: অস্তিত্ব রক্ষায় এখনই জাগতে হবে সনাতনী সমাজকে

সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি শিমুল সাহার

নিজের এক ফেসবুক পোস্টে বাংলাদেশ যুব ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি শিমুল সাহা বলেছেন, “ভোট দিয়েছে সংখ্যালঘুরা, এখন প্রয়োজন তাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা।”তিনি লিখেছেন, বর্তমান বাংলাদেশকে নৈরাজ্য ও অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে একটি উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা সরকারের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন স্থানে বিভ্রান্তি, ভীতি ও অস্থিরতা সৃষ্টি করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে, যা রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগজনক।তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে জানান, গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে তিনি দেশের ৪৭টি জেলা সফর করেন। এই সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল—ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী যেন নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তাদের সাংবিধানিক ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে এবং এমন জনপ্রতিনিধিকে নির্বাচিত করতে পারে, যিনি নিজ নিজ এলাকায় সকল নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন।তিনি আরও বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ তাদের নাগরিক দায়িত্ব পালন করে ভোট দিলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন স্থানে তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে। এ ধরনের ঘটনা শুধু সংখ্যালঘুদের মধ্যেই নয়, বরং সমগ্র জাতির মধ্যেই অস্বস্তি ও অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান সরকার একটি অসাম্প্রদায়িক, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গঠনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ—এমন বিশ্বাস থেকেই ধর্মীয় উগ্রবাদ, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের শক্তি তার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সহাবস্থান ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধে নিহিত। এই মূল্যবোধ অক্ষুণ্ণ রাখতে হলে সকল নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং উগ্রবাদী অপশক্তির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা জরুরি।শেষে তিনি আশা প্রকাশ করেন, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে এবং দেশের প্রতিটি নাগরিক ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমান নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়ে বসবাস করতে পারবে।

সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি শিমুল সাহার

আত্মা ও মানবজন্মের দর্শন

মানবজীবনের গভীরতম অনুসন্ধান তিনটি প্রশ্নকে ঘিরেই আবর্তিত—আমি কে? আমি কোথা থেকে এসেছি? মৃত্যুর পর আমি কোথায় যাব? সভ্যতার আদিকাল থেকে মানুষ এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে চলেছে। জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন, ধর্ম—সব পথ শেষ পর্যন্ত এসে দাঁড়ায় আত্মা ও সত্তার রহস্যময় অনুসন্ধানে।দেহ ও আত্মার পার্থক্য বোঝা এই অনুসন্ধানের প্রথম ধাপ। দেহ দৃশ্যমান, নশ্বর ও পরিবর্তনশীল; আত্মা অদৃশ্য, চেতনাময় ও অবিনশ্বর—এমনটাই প্রাচীন দর্শনের বক্তব্য। দেহ জন্মায়, বৃদ্ধি পায়, ক্ষয় হয় এবং একদিন বিলীন হয়। কিন্তু আত্মা দেহের সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ নয়। সে কর্মের ধারক, সে অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার। তাই ভাল-মন্দের ফল ভোগ করে আত্মাই।আত্মার নেই আহার, নেই নিদ্রা, নেই বিশ্রাম। দেহে অবস্থানকালই তার “দিন”, আর দেহত্যাগ থেকে পুনর্জন্মের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত সময় তার “রাত্রি”। এই দিন-রাত্রির অনুপাত প্রায় সমান—অর্থাৎ আত্মা যতদিন এক দেহে থাকে, ততদিনই সে পরবর্তী দেহ ধারণের প্রস্তুতিতে অবস্থান করে—যদিও ব্যতিক্রম ঘটে।একটি দেহ ত্যাগ করে অন্য দেহ গ্রহণের সময় আত্মা প্রায় সব স্মৃতি বিস্মৃত হয়। যেমন মানুষ স্বপ্ন দেখে জেগে উঠে তা ভুলে যায়, তেমনি আত্মাও নতুন জন্মে পুরনো স্মৃতি হারায়। তবে কিছু বিরল ক্ষেত্রে কেউ কেউ পূর্বজন্মের স্মৃতি স্মরণ করতে পারে; তাদের “জাতিস্বর” বলা হয়।আত্মা নারী বা পুরুষ নয়। কর্মই নির্ধারণ করে পরবর্তী জন্মে তার লিঙ্গ, পরিবেশ ও পরিস্থিতি। এ ধারণা আমাদের শেখায়—জন্মগত অহংকার বা হীনমন্যতার কোনো ভিত্তি নেই; কর্মই আসল পরিচয়।আরেকটি গভীর দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি হলো—আত্মা ‘আমি’ নই, আত্মা ‘আমার’। আত্মা পরমাত্মার অংশবিশেষ। আমরা আত্মার ধারক, আত্মা আমাদের চেতনার শক্তি। মৃত্যুর সময় দেহের পঞ্চভূত প্রকৃতির পঞ্চভূতের সাথে মিশে যায়—মাটি মাটিতে, জল জলে, বায়ু বায়ুতে, আগুন আগুনে। কিন্তু আত্মা তার যাত্রা অব্যাহত রাখে।শাস্ত্র অনুযায়ী আত্মা ৮৪ লক্ষ যোনি ভ্রমণ করে মানবজন্ম লাভ করে—জলজ, উদ্ভিদ, কীটপতঙ্গ, পাখি, পশু হয়ে বহু অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে অবশেষে মানুষ হয়। এই দীর্ঘ অভিযাত্রার পর মানবজন্মকে তাই মুক্তির সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।কিন্তু মানুষ হয়ে জন্মালেই কি সত্যিকারের মানুষ হওয়া যায়? মানুষের আচরণে যখন হিংসা, লোভ, স্বার্থপরতা দেখা যায়, তখন প্রশ্ন জাগে—আমরা কি পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট হয়ে উঠছি না? মানুষকে আলাদা করে তার বিবেক, তার আত্মচেতনা, তার নৈতিক বোধ।এই কারণেই মানবজন্মের প্রকৃত উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আত্ম-অনুসন্ধান। আমরা কেন এসেছি, আমাদের কর্তব্য কী, মৃত্যুর পর আমাদের গন্তব্য কোথায়—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়েই মানুষ সত্যের দিকে অগ্রসর হয়।স্রষ্টা যেন আমাদের এই সংসার-যাত্রায় “রিটার্ন রিজার্ভেশন” দিয়েই পাঠিয়েছেন। তাই জীবনকে কেবল ভোগের ক্ষেত্র না ভেবে, জ্ঞান, ভক্তি ও নৈতিকতার পথে পরিচালিত করাই শ্রেয়।অতএব, মানুষ হয়ে আমাদের দায়িত্ব শুধু বেঁচে থাকা নয়, সচেতনভাবে বেঁচে থাকা। আত্মার জাগরণই মানবজন্মের সার্থকতা। যে ব্যক্তি নিজেকে প্রশ্ন করতে শেখে—“আমি কে?”—সে-ই প্রকৃত অর্থে মানুষ।

আত্মা ও মানবজন্মের দর্শন

সনাতনীরা যে দলকে ভোট দেয় , সে দল রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেয় সনাতনীরা কখনো রাষ্ট্রের সাথে বেইমানি করে না।

যে সনাতনী (হিন্দু) সম্প্রদায় যারা ভোট দেয়, তারা দেশের প্রতি বিশ্বস্ত থাকে এবং রাষ্ট্রের সাথে কখনো বেইমানি করে না।বাংলাদেশে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষ একসাথে বসবাস করেন। বাংলাদেশ একটি বহুধর্মীয় রাষ্ট্র, যেখানে মুসলিম, হিন্দু (সনাতনী), বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবাই নাগরিক হিসেবে সমান অধিকারভোগী।সংবিধান অনুযায়ী:ভোট দেওয়া নাগরিকের অধিকাররাষ্ট্র পরিচালনা করে নির্বাচিত রাজনৈতিক দলকোনো একটি ধর্মীয় সম্প্রদায় এককভাবে রাষ্ট্রের “ভার নেয়” এমন কাঠামো নেই।এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— নাগরিক হিসেবে দায়িত্ব ও সততা ধর্মনির্ভর নয়। ভালো-মন্দ, বিশ্বস্ততা বা বেইমানি ব্যক্তি ও রাজনৈতিক আচরণের বিষয়। রাষ্ট্র পরিচালনা হয় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়।বাংলাদেশ এর ইতিহাসে সনাতনী (হিন্দু) সম্প্রদায় এই ভূখণ্ডের বহু প্রাচীন বাসিন্দা। তারা সংস্কৃতি, ভাষা, শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। “ভূমিপুত্র” প্রাচীন বাসিন্দা হিসেবে নিজেদের দেখাটা অনেকের কাছে পরিচয় ও গর্বের বিষয়। একই সঙ্গে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোনো সম্প্রদায়কে “ভোট ব্যাংক” হিসেবে ব্যবহার করা— এটা নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। প্রত্যেক নাগরিকের ভোট ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত; কোনো দল বা গোষ্ঠীর মালিকানাধীন নয়।গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো বাংলাদেশ সংবিধান অনুযায়ী সকল নাগরিক সমান অধিকারসম্পন্ন। ভোট দেওয়া ব্যক্তির স্বাধীন সিদ্ধান্ত। কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়কে কেবল নির্বাচনী স্বার্থে ব্যবহার করা উচিত নয়। নাগরিকদের উচিত সচেতনভাবে দাবি তোলা— নিরাপত্তা, সমঅধিকার, উন্নয়ন ও ন্যায্য প্রতিনিধিত্বের জন্য।আলোচনাটা যদি আমরা গঠনমূলকভাবে করি, তাহলে প্রশ্ন হতে পারে:সংখ্যালঘু অধিকার বাস্তবে কতটা সুরক্ষিত?রাজনৈতিক দলগুলো কীভাবে ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে পারে?নাগরিক হিসেবে নিজের দাবি কীভাবে সংগঠিতভাবে তোলা যায়?আমাদের সনাতনীরদের ০৮ (আট) দফা দাবিসমূহ:১) সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিচারের জন্য "নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন” গঠনের মাধ্যমে "দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল” গঠনপূর্বক দোষীদের দ্রুততম সময়ে উপযুক্ত শাস্তি প্রদান, ক্ষতিগ্রস্থদের যথোপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।২) অনতিবিলম্বে "সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন” প্রণয়ন করতে হবে।৩) "সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয়” গঠন করতে হবে।৪) হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টকে "হিন্দু ফাউন্ডেশন” এ উন্নীত করতে হবে। পাশাপাশি বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টকেও ফাউন্ডেশনে উন্নীত করতে হবে।৫) "দেবোত্তর সম্পত্তি পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ আইন” প্রণয়ন এবং "অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন" যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে।৬) সরকারি/বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ও সকল উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংখ্যালঘু শিক্ষার্থীদের জন্য "উপাসনালয় নির্মাণ" এবং প্রতিটি হোস্টেলে "প্রার্থনা কক্ষ” বরাদ্দ করতে হবে।৭) "সংস্কৃত ও পালি শিক্ষা বোর্ড” আধুনিকায়ন করতে হবে।৮) শারদীয় দুর্গাপূজায় "৫ দিন রাষ্ট্রীয় ছুটি” দিতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রধান প্রধান ধর্মীয় উৎসবে প্রয়োজনীয় ছুটি প্রদান করতে হবে।

সনাতনীরা যে দলকে ভোট দেয় , সে দল রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেয় সনাতনীরা কখনো রাষ্ট্রের সাথে বেইমানি করে না।