হিন্দুস নিউজ

মতামত

 দুর্গাপূজা:ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারায় শুদ্ধতার প্রত্যয়।

দুর্গাপূজা:ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারায় শুদ্ধতার প্রত্যয়।

শারদীয় দুর্গোৎসব বাঙালির ধর্মীয় বিশ্বাস, লোকঐতিহ্য, শিল্প-সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য সম্মিলন। দেবী দুর্গার মহিষাসুরবধের পৌরাণিক আখ্যানের মধ্য দিয়ে অশুভের ওপর শুভের বিজয়ের যে বার্তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে দুর্গাপূজা আজ কেবল ধর্মীয় আচারেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি পরিণত হয়েছে মানুষের মিলন, সংস্কৃতিচর্চা, সৃজনশীলতা ও সামাজিক অংশগ্রহণের বৃহৎ উৎসবে। বাংলার দুর্গোৎসবকে ধর্মীয় আচার, সামাজিক অনুশীলন, উৎসব ও পরিবেশনশিল্পের সমন্বিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবেও স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।বাংলার দুর্গাপূজার ঐতিহ্য বহু শতাব্দীপ্রাচীন। একসময় জমিদার ও বনেদি পরিবারকেন্দ্রিক পূজার প্রচলন থাকলেও ক্রমে তা সর্বজনীন রূপ লাভ করে। আজ শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম—বিভিন্ন অঞ্চলে সর্বজনীন দুর্গোৎসব মানুষের অংশগ্রহণে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি এ উৎসব হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক বিনিময় ও সম্প্রীতির অন্যতম মাধ্যম।দুর্গোৎসবের প্রতিটি পর্বের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নিজস্ব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য। মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের আবাহন, ষষ্ঠীর বোধন, সপ্তমীর নবপত্রিকা, অষ্টমীর অঞ্জলি ও সন্ধিপূজা, নবমীর হোম-যজ্ঞ এবং দশমীর বিসর্জন—সব মিলিয়ে গড়ে উঠেছে একটি সুসংবদ্ধ আচারপরম্পরা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এসব আচার বাঙালির ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে।ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিল্প ও সংস্কৃতিদুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি বাংলার শিল্প-সংস্কৃতিরও বড় একটি ক্ষেত্র। মৃৎশিল্পীর হাতে খড়, মাটি, বাঁশ ও রঙের সমন্বয়ে প্রতিমা নির্মাণ থেকে শুরু করে মণ্ডপসজ্জা, আলোকসজ্জা, ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি, আরতি, ধুনুচি নৃত্য, প্রসাদ বিতরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—সবকিছু মিলেই পূর্ণতা পায় শারদীয় উৎসব।প্রতিমা নির্মাণ ও মণ্ডপসজ্জার সঙ্গে যুক্ত থাকেন অসংখ্য শিল্পী ও কারিগর। পাশাপাশি পরিবহন, আলোকসজ্জা, সাজসজ্জা, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও বিভিন্ন সেবামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দুর্গোৎসব স্থানীয় অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলে। ফলে দুর্গাপূজা একদিকে যেমন ধর্মীয় উৎসব, অন্যদিকে তেমনি শিল্প, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবিকার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।সময়ের সঙ্গে বদলেছে পূজার রূপসময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে দুর্গাপূজার আয়োজনেও এসেছে নানা পরিবর্তন। ঐতিহ্যবাহী পূজার পাশাপাশি এখন দেখা যায় থিমভিত্তিক মণ্ডপ, নান্দনিক আলোকসজ্জা, পরিবেশবান্ধব প্রতিমা, ডিজিটাল প্রচার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার এবং বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক আয়োজন।আধুনিক প্রযুক্তি ও নতুন চিন্তাধারা পূজাকে আরও বিস্তৃত মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। তবে আধুনিকতার এই অগ্রযাত্রার সঙ্গে ঐতিহ্য, ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও সামাজিক দায়িত্ববোধের ভারসাম্য রক্ষা করাও জরুরি।পূজামণ্ডপ যেন কেবল বিনোদনের কেন্দ্র হয়ে না ওঠে; সেখানে ভক্তি, শালীনতা, নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধও সমানভাবে বজায় থাকতে হবে।‘মদ্যপান করে  মাতলামি’—উৎসবের সংস্কৃতি হতে পারে না ? দুর্গাপূজা আনন্দের উৎসব, কিন্তু সেই আনন্দ কখনোই উচ্ছৃঙ্খলতার পর্যায়ে যেতে পারে না। পূজামণ্ডপে মদ্যপান, মাতলামি, অশালীন আচরণ, মারামারি কিংবা উচ্চস্বরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি শারদীয় উৎসবের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক চেতনার সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।পূজামণ্ডপে একই সঙ্গে নারী, শিশু, প্রবীণ, ভক্ত ও বিভিন্ন বয়সী দর্শনার্থীর উপস্থিতি থাকে। সেখানে মদ্যপ অবস্থায় কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে শুধু পূজার পরিবেশই নষ্ট হয় না, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাও বিঘ্নিত হতে পারে। তাই পূজামণ্ডপকে মাদক ও মদ্যপানমুক্ত রাখা এবং শালীন ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।আনন্দ প্রকাশেরও একটি সংস্কৃতি রয়েছে। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি, আরতি, ধুনুচি নৃত্য, ভক্তিগীতি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও পারস্পরিক শুভেচ্ছা—এসবই হতে পারে উৎসবের নির্মল আনন্দের মাধ্যম। কিন্তু মদ্যপান করে মাতলামি, অশালীনতা কিংবা অন্যকে বিরক্ত করা কোনোভাবেই সেই আনন্দের অংশ হতে পারে না।নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব।দুর্গাপূজার মতো বৃহৎ উৎসবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি পূজা উদযাপন কমিটি, স্বেচ্ছাসেবক এবং সাধারণ দর্শনার্থীদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হয়।পূজামণ্ডপে পর্যাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক রাখা, প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ নিরাপদ রাখা, শিশু ও নারীদের নিরাপত্তায় বিশেষ নজর দেওয়া, অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা রাখা, বিদ্যুৎ সংযোগে সতর্কতা অবলম্বন এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন।একই সঙ্গে শব্দদূষণ, অশালীন সাংস্কৃতিক আয়োজন, মাদক ও মদ্যপান, জুয়া কিংবা যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধে পূজা কমিটিগুলোকে কঠোর ও দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে।নিরাপদ পূজা নিশ্চিত করা কেবল প্রশাসনের দায়িত্ব নয়। পূজা কমিটি, স্বেচ্ছাসেবক, ভক্ত, দর্শনার্থী এবং স্থানীয় জনগণ—সবার সম্মিলিত দায়িত্বেই একটি সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ দুর্গোৎসব সম্ভব।পূজার মূল চেতনা ফিরে আসুক।দুর্গাপূজার প্রকৃত সৌন্দর্য শুধু প্রতিমার উচ্চতা, মণ্ডপের চাকচিক্য কিংবা আলোকসজ্জার জৌলুসে নয়। এর প্রকৃত শক্তি নিহিত ভক্তি, মানবিকতা, সম্প্রীতি, সৌন্দর্যবোধ এবং অশুভের বিরুদ্ধে শুভবোধ জাগ্রত করার মধ্যে।দেবী দুর্গার আরাধনার মূল শিক্ষা—অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির জয়। তাই পূজার আয়োজনেও সেই আদর্শের প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন। নিজের ভেতরের হিংসা, অহংকার, লোভ, অসহিষ্ণুতা ও অন্যায়কে পরাজিত করার মধ্য দিয়েই দুর্গোৎসবের প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করা সম্ভব।তাই পূজামণ্ডপ হোক প্রার্থনার স্থান, সংস্কৃতিচর্চার স্থান ও সামাজিক সম্প্রীতির স্থান। মদ্যপান ও মাতলামির পরিবর্তে থাকুক ঢাকের বাদ্য; অশালীনতার পরিবর্তে থাকুক শালীন সাংস্কৃতিক আয়োজন; বিশৃঙ্খলার পরিবর্তে থাকুক শৃঙ্খলা; বিভেদের পরিবর্তে থাকুক সম্প্রীতি।দুর্গাপূজা হোক শুধু দেবীর আরাধনা নয়—নিজের ভেতরের অসুরকে পরাজিত করারও অঙ্গীকার।সনাতন ঐতিহ্য রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সবার।পূজামণ্ডপ হোক পবিত্র, উৎসব হোক নিরাপদ, সমাজ হোক সম্প্রীতির।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর:এক মানুষ,এক মহাজাগরণ।

একটি শিশুর হাতে যখন প্রথমবারের মতো ‘অ’ অক্ষরটি ধরা পড়ে, তখন সে হয়তো জানে না—এই অক্ষরের পথ ধরেই একদিন তার সামনে খুলে যাবে জ্ঞানের বিশাল পৃথিবী। বাংলা ভাষাভাষী অসংখ্য মানুষের শিক্ষাজীবনের সেই প্রথম সিঁড়ির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে একটি নাম—ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।তাঁকে শুধু ‘বর্ণপরিচয়’-এর রচয়িতা হিসেবে দেখলে তাঁর বিশাল কর্মযজ্ঞের প্রতি অবিচার করা হবে। তিনি ছিলেন শিক্ষাবিদ, ভাষাসংস্কারক, লেখক, সমাজসংস্কারক এবং জনহিতৈষী। উনিশ শতকের বাংলায় যখন সমাজ একদিকে ঔপনিবেশিক পরিবর্তনের অভিঘাত এবং অন্যদিকে বহু পুরোনো সামাজিক রীতিনীতির টানাপোড়েনে দাঁড়িয়ে, তখন বিদ্যাসাগর শিক্ষা ও যুক্তির আলো হাতে নিয়ে সামনে এগিয়ে এসেছিলেন। তাঁর কর্মজীবনের নানা সংস্কার বাংলা শিক্ষাব্যবস্থা ও সমাজচিন্তায় দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।দারিদ্র্যতা তাঁকে থামাতে পারেনি১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেই তাঁর শৈশব কেটেছে। পাঁচ বছর বয়সে গ্রামের পাঠশালায় শিক্ষার সূচনা; পরে কলকাতায় এসে ১৮২৯ সালে সংস্কৃত কলেজে ভর্তি হন।অসাধারণ মেধা, অধ্যবসায় ও জ্ঞানপিপাসার কারণে তিনি দ্রুতই সহপাঠী ও শিক্ষকদের মধ্যে স্বতন্ত্র হয়ে ওঠেন। ১৮৩৯ সালের মধ্যেই তিনি ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি অর্জন করেন। পরবর্তীকালে শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে তাঁর যে অসামান্য উত্থান, তার ভিত গড়ে উঠেছিল এই কঠোর সাধনা ও আত্মনির্মাণের মধ্য দিয়েই।শিক্ষা শুধু মুখস্থবিদ্যা নয়,সমাজ বদলের শক্তিবিদ্যাসাগরের শিক্ষা-ভাবনা ছিল তাঁর সময়ের তুলনায় অত্যন্ত অগ্রসর। তিনি শুধু বিদ্যাচর্চার বিস্তার চাননি; চেয়েছিলেন শিক্ষাব্যবস্থাকে বাস্তবসম্মত, সহজলভ্য ও আধুনিক করে তুলতে।সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে তিনি পাঠ্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনেন। শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ, বাংলা ভাষার মাধ্যমে ব্যাকরণ শিক্ষা, ইংরেজি শিক্ষার গুরুত্ব বৃদ্ধি এবং আধুনিক জ্ঞানচর্চার প্রতি জোর—এসব পদক্ষেপ তাঁর শিক্ষাচিন্তার বৈশিষ্ট্য বহন করে। তিনি শিক্ষাকে একটি বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে দেখেছিলেন।‘বর্ণপরিচয়’: বাংলা শিশুশিক্ষার ঐতিহাসিক অধ্যায়:১৮৫১ সালে প্রকাশিত ‘বর্ণপরিচয়’ বাংলা প্রাথমিক শিক্ষার ইতিহাসে এক মাইলফলক। এর আগে শিশুদের জন্য এমন সুসংবদ্ধ ও কার্যকর আদর্শ পাঠ্যপুস্তকের অভাব ছিল। সহজ উপস্থাপন, বর্ণ থেকে শব্দ এবং শব্দ থেকে বাক্যে অগ্রসর হওয়ার পদ্ধতি—সব মিলিয়ে বইটি দীর্ঘদিন বাংলা শিশুশিক্ষার অন্যতম প্রধান পাঠ্য হয়ে ছিল।তবে বিদ্যাসাগরের পাঠ্যপুস্তক রচনার উদ্দেশ্য ছিল আরও বিস্তৃত। তাঁর বোধোদয়, কথামালা, চরিতাবলী, জীবনচরিত প্রভৃতি গ্রন্থে জ্ঞান, নৈতিকতা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও বৃহত্তর বিশ্বের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল। অর্থাৎ তিনি শুধু শিশুকে পড়তে শেখাতে চাননি; তিনি চেয়েছিলেন শিশুর চিন্তার জগতও বড় হোক।বাংলা গদ্যে এক নতুন যুগ:বাংলা ভাষার ইতিহাসেও বিদ্যাসাগরের অবদান গভীর। তাঁর আগে বাংলা গদ্যে সংস্কৃতঘেঁষা ও অপেক্ষাকৃত আড়ষ্ট রীতির প্রভাব ছিল প্রবল। বিদ্যাসাগর বাক্যগঠন, শব্দের ব্যবহার ও ভাষার সৌন্দর্যকে নতুন মাত্রা দেন। বেতাল পঞ্চবিংশতি, শকুন্তলা, সীতার বনবাস প্রভৃতি রচনার মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা গদ্যকে আরও সাবলীল, সুসংগঠিত ও সাহিত্যোপযোগী করে তোলেন।তাঁর ভাষা শুধু পড়ার জন্য সহজ ছিল না; তার মধ্যে ছিল যুক্তির শৃঙ্খলা, আবেগের সংযম এবং বক্তব্য প্রকাশের শক্তি। ফলে বাংলা গদ্যের বিকাশে তাঁর ভূমিকা একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় হয়ে আছে।নারীশিক্ষা: অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর সংগ্রাম:যে সমাজে মেয়েদের শিক্ষার বিরোধিতা ছিল প্রবল, সেই সমাজেই বিদ্যাসাগর নারীশিক্ষার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেন। ১৮৫৫ সালে স্কুল পরিদর্শকের দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি গ্রামীণ অঞ্চলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেন। বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৮৫৭ সালের শেষ দিক থেকে ১৮৫৮ সালের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে তিনি বহু বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন।নারীকে শিক্ষার বাইরে রেখে সমাজের পূর্ণাঙ্গ উন্নয়ন সম্ভব নয়—তাঁর কর্মকাণ্ডে এই উপলব্ধিই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।বিধবা বিবাহ: মানবিকতার পক্ষে এক ঐতিহাসিক লড়াই:বিদ্যাসাগরের সমাজসংস্কার আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি ছিল বিধবা বিবাহ প্রচলনের আন্দোলন। তৎকালীন সমাজে বিধবাদের জীবন ছিল কঠোর সামাজিক বিধিনিষেধে আবদ্ধ। বিদ্যাসাগর শাস্ত্রীয় যুক্তি, সামাজিক বাস্তবতা ও মানবিকতার ভিত্তিতে বিধবা বিবাহের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে উদ্যোগী হন।১৮৫৫ সালে তিনি এ বিষয়ে গ্রন্থ প্রকাশ করেন এবং সরকারের কাছে আবেদন জানান। বিরোধীদের প্রবল প্রতিরোধ সত্ত্বেও তাঁর আন্দোলন ক্রমে সামাজিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব সৃষ্টি করে। ১৮৫৬ সালের ১৯ জুলাই বিধবা বিবাহ আইন পাস হয়। একই বছরের ডিসেম্বর মাসে তাঁর উদ্যোগ ও সহযোগিতায় একটি বিধবা বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়।এই অধ্যায় প্রমাণ করে—সমাজসংস্কার শুধু বক্তৃতায় হয় না,এর জন্য প্রয়োজন যুক্তি, অধ্যবসায় এবং প্রতিকূলতার সামনে দাঁড়ানোর সাহস।বিদ্যাসাগর:পদে বড় নন,হৃদয়ে বড়: তাঁর জীবনের সবচেয়ে গভীর পরিচয় সম্ভবত তাঁর মানবিকতা। বিদ্যাসাগর দানশীলতার জন্য ‘করুণাসাগর’ নামেও পরিচিত ছিলেন। তাঁর কাছে শিক্ষা ও সমাজসংস্কার কখনো নিছক তাত্ত্বিক বিষয় ছিল না; মানুষের বাস্তব দুঃখ-দুর্দশার সঙ্গে তার সরাসরি সম্পর্ক ছিল।নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী দরিদ্র, অসহায় ও শিক্ষার্থীদের সাহায্য করেছেন তিনি। উচ্চপদে থেকেও তাঁর জীবনযাপন ছিল সাদাসিধে। মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর যে মানসিকতা তাঁর মধ্যে ছিল, সেটিই তাঁকে কেবল একজন পণ্ডিতের আসন থেকে তুলে এনে মানুষের হৃদয়ে স্থান দিয়েছিল।বিদ্যাসাগরকে কেন আজও প্রয়োজন?প্রশ্নটি আজ আরও গুরুত্বপূর্ণ—দুই শতাব্দীর কাছাকাছি সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও কেন বিদ্যাসাগর আমাদের আলোচনায় ফিরে আসেন?কারণ সময় বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, শিক্ষার পদ্ধতি বদলেছে; কিন্তু সমাজে শিক্ষা, যুক্তিবোধ, নারীসম্মান, মানবিকতা ও সামাজিক ন্যায়ের প্রয়োজন শেষ হয়নি।আজ শিক্ষার সুযোগ বেড়েছে, কিন্তু শিক্ষার সঙ্গে মানবিকতার সম্পর্ক কতটা দৃঢ়—সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। তথ্যের বিস্ফোরণ ঘটেছে, কিন্তু যুক্তিবোধ কি একই গতিতে বেড়েছে? নারী শিক্ষায় অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু নারীর মর্যাদা ও সমঅধিকারের প্রশ্ন কি সম্পূর্ণ সমাধান হয়েছে?এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড়ালে বিদ্যাসাগরের জীবন নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।জন্মদিনের শ্রদ্ধা হোক আদর্শে:ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্মদিন কেবল ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর দিন নয়। এটি আত্মসমালোচনারও দিন। আমরা তাঁর ‘বর্ণপরিচয়’ স্মরণ করব, কিন্তু তাঁর শিক্ষার উদ্দেশ্যও মনে রাখব। তাঁর বিধবা বিবাহ আন্দোলনের কথা বলব, কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহসটিও ধারণ করতে হবে। তাঁর মানবিকতার কথা বলব, কিন্তু অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্বও নিতে হবে।কারণ বিদ্যাসাগরকে সত্যিকার অর্থে শ্রদ্ধা করার সবচেয়ে বড় উপায় তাঁর মূর্তিতে মালা দেওয়া নয়—তাঁর আদর্শকে জীবনের আচরণে পরিণত করা।ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর একটি সময়ের সন্তান হয়েও সময়কে অতিক্রম করেছেন। তাঁর হাতে ছিল বই, সামনে ছিল অন্ধকার; তিনি বেছে নিয়েছিলেন আলোর পথ। তাঁর অস্ত্র ছিল যুক্তি, তাঁর শক্তি ছিল জ্ঞান, আর তাঁর হৃদয়ের কেন্দ্র ছিল মানুষ।তাই বিদ্যাসাগর শুধু বর্ণপরিচয়ের পাতায় আটকে থাকা একটি নাম নন। তিনি বাংলা শিক্ষার ইতিহাসে এক মাইলফলক, সমাজসংস্কারের ইতিহাসে এক সাহসী অধ্যায় এবং মানবতার ইতিহাসে এক উজ্জ্বল প্রতীক।আজ তাঁর জন্মদিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক—অক্ষর শিখব, কিন্তু অক্ষরের অর্থও বুঝব;জ্ঞান অর্জন করব,কিন্তু সেই জ্ঞান মানুষের কাজে লাগাব।আর বিদ্যাসাগরকে স্মরণ করব শুধু কথায় নয়—মানবিকতায়, যুক্তিতে ও কর্মে।ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বেঁচে থাকুন আমাদের শিক্ষা, বিবেক ও মানবিকতার চর্চায়।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর:এক মানুষ,এক মহাজাগরণ।

এত মহাপুরুষের আবির্ভাবের পরও হিন্দু সমাজ বিলুপ্তির দিকে কেন?

বাংলায় একাধিক ধর্মীয় মহাপুরুষের আবির্ভাব এবং তাঁদের বিপুলসংখ্যক ভক্ত-অনুসারী থাকা সত্ত্বেও হিন্দু সমাজ কেন বিলুপ্তির দিকে ধাবমান—এমন প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব অ্যাডভোকেট গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক।সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি পূর্ণব্রহ্ম হরিচাঁদ ঠাকুর, শিবাবতার গুরুচাঁদ ঠাকুর, জগদ্বন্ধু সুন্দর, অনুকূল ঠাকুর, বালক ব্রহ্মচারী, রাম ঠাকুর, লবচন্দ্র পাল, লোকনাথ ব্রহ্মচারী ও স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের নাম উল্লেখ করেন।পোস্টে গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক প্রশ্ন তোলেন, এসব মহাপুরুষের আবির্ভাব এবং তাঁদের লক্ষ লক্ষ ভক্ত-অনুসারী সক্রিয় থাকার পরও কেন হিন্দু সমাজ বিলুপ্তির দিকে ধাবমান। হিন্দু সমাজ যদি বিলুপ্ত হয়ে যায়, তাহলে এসব অবতার ও মহাপুরুষের আরাধনার প্রয়োজনীয়তা কী—সেই প্রশ্নও তিনি সামনে আনেন।পোস্টের শেষাংশে তিনি লেখেন, “যাদের জানা আছে, একটু জানান তো।”তাঁর এ প্রশ্নকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হিন্দু সমাজের বর্তমান পরিস্থিতি, ধর্মীয় চর্চা, সামাজিক ঐক্য এবং মহাপুরুষদের আদর্শ অনুসরণের বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা চলছে।

এত মহাপুরুষের আবির্ভাবের পরও হিন্দু সমাজ বিলুপ্তির দিকে কেন?

গণতন্ত্রের আধুনিক রাষ্ট্রে মুসলমানদের বিচারপতি অমুসলমান হলে সমস্যা কোথায়?

জনসংখ্যাগত সংখ্যাগরিষ্ঠতা একটি বাস্তবতা; রাষ্ট্রব্যবস্থা একটি সাংবিধানিক-আইনি কাঠামো। এই দুটো এক নয়। বাংলাদেশের মতো একটি দেশে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও দেশের আইনি কাঠামো মূলত ঔপনিবেশিক ও পশ্চিমা সাংবিধানিক ধারার উত্তরাধিকার বহন করে। যাঁরা মনে করেন একটি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতির রাজনৈতিক পরিচয় শুধু জনমিতিক নয়, বরং তার আইন ও বিচারব্যবস্থার প্রকৃতির মধ্যেও প্রতিফলিত হওয়া উচিত, তাঁদের কাছে এই ফারাকটাই মূল আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে।রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রশ্নে আসল সিদ্ধান্তটা তাই বিচারপতির ধর্ম নিয়ে নয়; সিদ্ধান্তটা হলো, রাষ্ট্র কোন আইনি কর্তৃত্বের অধীনে চলবে। বাংলাদেশ যদি বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোয় থাকে, তাহলে বিচারপতির ধর্ম প্রশ্ন তোলার আইনি ভিত্তি নেই। কিন্তু যাঁরা মনে করেন একটি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রের উচিত তার আইনি সার্বভৌমত্বকে শরিয়াহর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে পুনর্গঠন করা, তাঁদের যুক্তি হলো এই পুনর্গঠনের একটি স্বাভাবিক অংশ হবে বিচার বিভাগের জন্য ইসলামী যোগ্যতার শর্ত পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। অর্থাৎ সমস্যাটা “একজন অমুসলিম ব্যক্তি” নয় সমস্যাটা একটি কাঠামোগত প্রশ্ন: কোন আইন, কার কর্তৃত্বে চলবে। আর সেই প্রশ্নের সমাধান বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যে ছোট সংশোধনী দিয়ে হয় না। এর জন্য দরকার একটি সচেতন, সাংগঠনিক পরিবর্তনের প্রক্রিয়া, যেখানে বিচার বিভাগ সহ রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো নতুন ভিত্তির ওপর পুনর্বিন্যস্ত হয়।অমুসলিমদের অধিকার নিয়ে দুশ্চিন্তার জবাবশরিয়াহভিত্তিক রাষ্ট্রের কথা শুনলে অনেকেই আশঙ্কা করেন যে এতে অমুসলিমরা বঞ্চিত হবেন। এই আশঙ্কা দূর করা জরুরি। ইসলামী ইতিহাসে অমুসলিম নাগরিকদের (আহলে জিম্মা) জান, মাল, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্পত্তি রক্ষার নির্দিষ্ট বিধান বরাবরই ছিল। খলিফা ওমর (রাঃ)-এর শাসনামল থেকে উসমানীয় খিলাফত পর্যন্ত বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিলে অমুসলিমদের উপাসনালয় সুরক্ষা, বিচার পাওয়ার অধিকার ও ধর্মীয় স্বায়ত্তশাসনের নজির পাওয়া যায়। শরিয়াহভিত্তিক ব্যবস্থায় মুসলিম বিচারপতির শর্ত থাকার অর্থ এই নয় যে অমুসলিমদের নিজস্ব বিষয়ে (যেমন পারিবারিক আইন) তাঁদের নিজস্ব বিধান অনুযায়ী বিচার পাওয়ার সুযোগ থাকবে না বরং ইতিহাসে এমন ব্যবস্থাও দেখা গেছে যেখানে অমুসলিমরা নিজেদের সম্প্রদায়গত বিষয়ে নিজস্ব বিচারকের মাধ্যমেই নিষ্পত্তি পেতেন। তাই এই রূপান্তরকে “অমুসলিমদের বিরুদ্ধে” হিসেবে না দেখে, একটি ন্যায়ভিত্তিক কাঠামো হিসেবে দেখা উচিত, যেখানে প্রতিটি সম্প্রদায়ের জন্য উপযুক্ত সুরক্ষা নিশ্চিত থাকে, কিন্তু রাষ্ট্রের চূড়ান্ত সার্বভৌম বিধান থাকে আল্লাহর আইন।সারকথামুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া আর শরিয়াহভিত্তিক রাষ্ট্র হওয়া এক জিনিস নয় এই ফারাকটাই আমাদের বুঝতে হবে। জনসংখ্যাগত সংখ্যাগরিষ্ঠতা কোনো রাষ্ট্রকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইসলামী করে না; সেজন্য দরকার সচেতন, সাংগঠনিক পরিবর্তন, আইন, বিচারব্যবস্থা ও শাসনকাঠামোর পুনর্গঠন। “অমুসলিম বিচারপতি সমস্যা কি না” প্রশ্নটি তাই আসলে একটি বৃহত্তর প্রশ্নের দরজা খুলে দেয়: আমরা কি বর্তমান ঔপনিবেশিক-উত্তরাধিকারী সাংবিধানিক কাঠামোতেই থাকব, নাকি আল্লাহর বিধানকে চূড়ান্ত কর্তৃত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করব? মুসলমানদের জন্য এই প্রশ্নের উত্তরই হওয়া উচিত রূপান্তরের সূচনাবিন্দু।

গণতন্ত্রের আধুনিক রাষ্ট্রে মুসলমানদের বিচারপতি অমুসলমান হলে সমস্যা কোথায়?

আমাদের শিশুকালে দুর্গাপূজা

বাঙালির কাছে শরৎকাল এবং দুর্গাপূজা অনেকটাই আজ সমার্থক শব্দ হয়ে গেছে। মেঘমুক্ত শরতের আকাশের দিকে তাকালে  অন্যরকমের একটা ঘোর চলে আসে মনে। কিছু সময়ের জন্যে মন আনমনে হয়ে যায়। শরৎ মানেই স্বচ্ছ নীল আকাশে শুভ্র মেঘের ভেলা। স্বপ্নগুলো সেই শুভ্র মেঘের ভেলার মত অসীম মহাকাশে ভেসে ভেসে অজানা গন্তব্যে যায়। ক্ষণে ক্ষণে রূপ বদলায় শরতের আকাশ।ঋতু পরিক্রমার গ্রীষ্ম, বর্ষা ঋতুর পরেই তৃতীয় ঋতু হিসেবে আমাদের কাছে আসে শরৎকাল।বাংলা ভাদ্র মাস এবং আশ্বিন এ দুইমাসকে শরৎকাল বলে। ইংরেজি মধ্য আগস্ট থেকে মধ্য অক্টোবর মাস পর্যন্ত শরৎ ঋতুর পথচলা ছয়টি ঋতুর মধ্যে, এক স্নিগ্ধ শুভ্র মায়াবী ঋতু হল শরৎকাল। সারা মাঠ জুড়ে, নদীর পাড়ে থোকা থোকা ফুটে থাকে সাদা কাশফুল।স্নিগ্ধ জ্যোৎস্না, আলোছায়ার দিনভর  খেলা- এই নিয়েই শরৎকাল। কাচের মতো স্বচ্ছ নীল আকাশে, তুলার মত ভেসে যায় শরতের সাদা মেঘমালা।আকাশের দিকে তাকালে মন উদাস হয়ে যায়। সাদা বক উড়ে যায় আকাশে।শরৎকালে মাঠে মাঠে সবুজ ধানের ওপর সোনালি আলোর ঝলমলানি স্বপ্নে আশায় বুক বাঁধে কৃষক। শরতের গোধূলিলগ্নে সোনারঙে রঙিন হয়ে উঠে, এক অন্যরকমের আচ্ছন্নতা তৈরি করে আকাশ। শরৎকালের সৌন্দর্য নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জীবনানন্দ দাশ সহ অসংখ্য কবিরা কবিতা লিখেছেন। এর মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'শরৎ' কবিতাটি অন্যতম। "আজি কি তোমার মধুর মূরতিহেরিনু শারদ প্রভাতে!হে মাত বঙ্গ, শ্যামল অঙ্গঝলিছে অমল শোভাতে। পারে না বহিতে নদী জলধার,মাঠে মাঠে ধান ধরে নাকো আর--ডাকিছে দোয়েল গাহিছে কোয়েলতোমার কাননসভাতে!মাঝখানে তুমি দাঁড়ায়ে জননী,  শরৎকালের প্রভাতে।"সকালে গাছ থেকেই ঝরে পরে শিউলি ফুল। অত্যন্ত সুন্দর একটি ঘ্রাণ শিউলি ফুলের। হালকা শীত শীত অনুভব হয় শরতের সকালে। ফুলের সাজিতে গাছ থেকে ঝরে পরা শিউলি ফুল পূর্ণ করতাম। মনে পড়ে শিউলি ফুলের নিচের অংশে যে হলদে গেরুয়া রঙের অংশটি আছে। তা দিয়ে আমরা ছবি আঁকতাম, দেয়ালের বিভিন্ন স্থানে নাম লিখতাম। হয়ত এই প্রাকৃতিক রং দিয়েই প্রাচীন ভারতবর্ষে শিল্পীরা ছবি আঁকতেন। আমাদের উঠানের চারপাশে চারটি স্থলপদ্মের গাছ ছিল। সাদা এবং গোলাপি দুইধরণের ফুল ফুটতো গাছে। দুইতিনটি ফুলেই হাত পূর্ণ হয়ে যেত। পদ্মফুলগুলো হাতে নিলে, মায়ের স্মিত সহাস্য  মুখ মনে ভেসে উঠত। আজও প্রচণ্ড টানে আমাকে শরৎকাল। ছোটবেলায় পূজার ঠিক মাসখানেক আগে আমাদের বাড়ির পার্শ্ববর্তী কালীবাড়িতে প্রতিমা বানাতে শিল্পীরা আসত, আমরা তখন অবাক বিস্ময়ে নিয়ে প্রতিমা বানানো দেখতাম। একটু একটু করে তৈরি হত মায়ের দেহসৌষ্ঠব। স্কুলে যাওয়ার পথে এবং স্কুল থেকে ফেরার পথে প্রতিবারই দেখে যেতাম; যে কতখানি তৈরি হয়েছে দুর্গাপ্রতিমা। ভেতরে যে কতটা আবেগ এবং আনন্দ কাজ করত, তা আজ বলে বোঝাতে পারব না। সর্বদা মনে হত, কবে শেষ হবে প্রতিমাটি; কবে রং করা হবে ; কবে চোখ আঁকা হবে ইত্যাদি। খড়কুটার উপরে একটু একটু করে মাটির প্রলেপ পরে এগিয়ে চলে মায়ের প্রতিমা। আমাদের শিশুমন অবাক বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতাম। জানিনা আমাদের সময়ের সে আবেগ বর্তমান প্রজন্মের ছোটছোট বাচ্চাদের আছে কিনা। যদি না থাকে তবে তাদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। আমরা নগরায়ণ এবং যান্ত্রিকতাবাদের ফাঁদে পরে কিভাবে বর্তমানের শিশুদের থেকে তাদের শিশুকাল ছিনিয়ে নিচ্ছি, তা হয়ত একবারও ভেবে দেখেছি না। যে বয়সে আনন্দে তাদের শেখার সময়, তখন আমরা তাদের কাঁধে চাপিয়ে দিচ্ছি একব্যাগ বই। ব্যাগের ভারে ঘাড় সহ দেহমনও অনেক সময় নুইয়ে যায় শিশুদের। অবশ্য শিশুদের স্কুলব্যাগের যা ভার, তাতে এ ব্যাগগুলোকে ব্যাগ না বলে বস্তা বলাই ভাল। মোবাইল এবং কম্পিউটারের আসক্তি কেড়ে নিচ্ছে সেই পূর্বের শিশুতোষ সারল্য। এখনকার ঠাকুমাও আর নাতিপুতিদের পড়ে শোনায় না, 'ঠাকুমার ঝুলি'র রাক্ষস খোক্কসের গল্প। কারণ আমরা এখন তথাকথিত আধুনিক এবং উচ্চশিক্ষিত। আমাদের অনেকের দৃষ্টিতে ঠাকুমার ঝুলি পড়বে গ্রামের অশিক্ষিত কৃষকের ছেলেমেয়ে। কিন্তু আমাদের ছেলেরা পড়বে 'হ্যারিপটার' সহ বিদেশি গল্প। আমাদের অনেকের মানসিকতা যে, স্বপ্নটাও দেখতে হবে বিদেশি। বিদেশি সাম্রাজ্যবাদীরা এ দেশ থেকে চলেও রেখে গেছে তাদের অনেক মানসিক দাসদের। বিদেশিদের অন্ধ অনুকরণ করতে গিয়ে, আজও আমরা দেখি ; আমাদের অনেক সাহেব বাবুরা চৈত্রমাসের গরমের মধ্যেও ভারি কোর্ট পরে অফিসে বসে থাকে। এটা একবারের জন্যেও উপলব্ধি করে না, যারা কোর্টটাই সারাবছর পরে থাকে তারা শীতপ্রধান অঞ্চলের মানুষ। শীতের আধিক্যের কারণে, এ পোশাকটি তাদের সারাবছরের পোশাক হতে পারে, কিন্তু ছয়টি ঋতু বৈচিত্রের দেশ বাংলায় কখনই সারাবছর পরিধান করা যায় না। অন্ততপক্ষে চৈত্র-জৈষ্ঠ্যমাসে মাসে নয়ই। কিন্তু কে বোঝাবে কাকে?কালীমন্দিরে যিনি দুর্গাপ্রতিমা বানাতেন, সেই কাকার নাম ছিল অতুল মণ্ডল। কিন্তু সবাই তাকে অতুল পাল বলেই ডাকত। একটু একটু করে তার হাতের ছোঁয়ায়  দেবী যখন ধীরেধীরে মূর্তিমতী হয়ে উঠত; তখন আমাদেরও শিশু  হৃদয়ে আনন্দ দোল খেত। একদিন মনে হল, আমিও চাইলে প্রতিমা বানাতে পারি। যেই বলা সেই কাজ। আমি খড়কুটার ব্যানা যেহেতু বাঁধতে পারি না, আমি শুধু মাটি দিয়েই বানিয়ে ফেললাম কয়েকটি প্রতিমার মুখ। সাথে বানালাম শিব এবং লোকনাথ ব্রহ্মচারীর আবক্ষ মূর্তি। প্রথম বানানো হিসেবে মূর্তিগুলো ভালই ছিল বলে পরিবারের সবাই মতামত দিয়েছিল। আমার বাবা সচরাচর সব আগ্রহী হয় না; তিনি মূর্তিগুলো দেখে কিছু কৌটা রঙের ব্যবস্থা করে দিলেন। সবাই আমার তৈরিকৃত প্রতিমা দেখে, আমার নামই দিয়ে দিল অতুল পাল। শিল্পী সত্ত্বাটা শিশুকাল থেকেই ছিল, হয়ত এর যথাযথ প্রয়োগ সর্বদা করতে পারিনি। ছবি আঁকতে পারতাম, টুকটাক মূর্তি বানাতে পারতাম, রবীন্দ্রনাথের গান খুব প্রিয় ছিল। জীবনে অনেক কিছুই হতে চেয়েছিলাম, করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু জীবন জীবনের মত তার গন্তব্যে আমাকে নিয়ে এসেছে। জীবনে সবকিছু একসাথে করতে গেলে, কিছুই বোধহয়  ঠিকমত করা যায় না। বিভিন্ন প্রিয় ইচ্ছা বা শখের মধ্যে দুইএকটাকে নির্দিষ্ট করে বেঁছে নিতে হয়। তবেই ইচ্ছা গন্তব্যে অভিমুখে যায়।ফোর কি ফাইবে পড়ি তখন, ক্লাসের বইতে কবি কাজী কাদের নেওয়াজের 'শিক্ষকের মর্যাদা' কবিতায় একটি লাইন ছিল, "পুলকিত হৃদে আনত-নয়নে।" এ লাইনটিকে অবলম্বন করে দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে একটি কবিতা লিখলাম সেই ছোট্ট বয়সে। স্কুলের অনেক বন্ধু সহ অনেকেই প্রশংসা  করেছিল কবিতাটির। ছোট্ট বয়সের কবিতা, এখন কথাগুলো  মনে পড়লে নিজের অজান্তেই হাসি পায়। কবিতাটির প্রথম প্যারাটি ছিল:"দেখতে দেখতে এল যে মায়ের পূজা আনন্দে একূল থেকে ওকূল যাই,সকালবেলা শিউলি ফুল কুড়াইফুল কুড়িয়ে, দিব ফুল মায়ের চরণেপুলকিত হৃদে আনত-নয়নে।"ছোট্টবয়সে এরকম অনেক কবিতা লিখেছিলাম পূজাকে নিয়ে। যার অনেক কবিতাই সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে গেছে। আজ কষ্ট লাগে যখন ছোট ছোট বাচ্চাদের তাদের বইয়ের একটি কবিতা বলতে বলি। অধিকাংশই বলতে পারে না। বুঝতে পারি যে, শিক্ষা ব্যবস্থায় একটা আমূল পরিবর্তন এসেছে। এতে ছেলেমেয়েরা আগের থেকে অনেক কিছুই বেশী পড়ছে। কিন্তু সেই পঠিত বিদ্যাকে আত্মস্থ করতে পারছে না। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার সবকিছুই মিনিপ্যাকে এবং মাল্টিপল কোশ্চেন আকারে চলে এসেছে। ফলে ছাত্রছাত্রীরা কোন বিষয়ের গভীরে ডুব দিয়ে অমূল্যসম্পদ নিয়ে আসতে পারছে না। যা জানছে যা পড়ছে সকলই ভাসাভাসা। কোন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলে বলে, কয়েকটি অপশন দিন উত্তরটি বলে দিচ্ছি। সময়টা অনেকটাই বুঝি পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। প্রতিবেশী যে ছেলেটা আমার সাথে বসে আমার মত অবাক বিস্ময়ে মন্দিরে প্রতিমা বানানো দেখত; পূজার সন্ধ্যাকালে প্রত্যেকদিন আরতি প্রতিযোগিতা হত, সেই প্রতিযোগিতায় যে অংশগ্রহণ করত; সেই ছেলেটাই আজ যখন মূর্তিপূজা নিয়ে, হিন্দু সম্প্রদায় নিয়ে ফেসবুকে বিভিন্ন নোংরা কটূক্তি করে পোস্ট করে তখন বুঝতে পারি, সময়টা ধীরেধীরে পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। সেই সুন্দর দিনগুলো হয়ত আর ফিরে আসবে না। এই যে সম্প্রদায়গত মনজগতের পরিবর্তন, এটা তীব্র হয় নব্বইদশকের শুরু থেকে।এর আগে যাপিত জীবনের আশেপাশে হিন্দু মুসলিম মেরুকরণ এতটা ছিল না। সারা বাংলার কথা বলতে না পারলেও, অন্ততপক্ষে আমাদের এলাকায় ধর্মীয় মেরুকরণ ছিল না এটা নির্দ্বিধায় বলতে পারি। জাতিধর্মনির্বিশেষে অত্যন্ত সম্প্রীতি ছিল পাড়া প্রতিবেশী সকলের মধ্যে।আমাদের বাড়ি ভর্তি ছিল নারিকেল গাছ। প্রচুর নারিকেল হত গাছগুলোতে। পূজার আগে এগুলো দিয়ে প্রচুর পরিমাণে নারিকেলের নাড়ু তৈরি করা হত। ছাতুর মোয়া, চিড়ার মোয়া,মুড়ির মোয়া, খইয়ের মোয়া সহ বিভিন্ন প্রকারের মোয়া তৈরি করা হত। ঢ্যাপের খইয়ের মোয়া তো আজ বিরল হয়ে গেছে। নারিকেল এবং ক্ষীর দিয়ে তৈরি করা হত, অপূর্ব স্বাদের টাটখিসসা নাড়ু। বিভিন্ন আকৃতির মাটির সাঁচের ছাপ দিয়ে তৈরি হত সুদৃশ্য বাহারী নাড়ু।এ খাবারের ঐতিহ্যগুলো যেভাবে হারিয়ে যাচ্ছে, আগামী প্রজন্ম হয়ত উপলব্ধিই করতে পারবে না বা জানতেই পারবে না ঐতিহ্যবাহী আমাদের এ বাঙালি খাবারগুলোর কথা। আমাদের আশেপাশে অধিকাংশ পরিবারই মুসলিম পরিবার। তাদের সাথে আমাদের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ। তারা আসত এবং অত্যন্ত আগ্রহে একরকম কাড়াকাড়ি করে এ নাড়ু, মোয়া খেত। অনেকেই এই নাড়ু, মোয়া রাখার টিনের বড় বড় কৌটাগুলো কোথায় রাখা আছে তাও জানত।কিন্তু আজ দুঃখ লাগে যখন দেখি, গত এক দুইদশকে চারিপাশটা অনেকটাই বদলে গেছে। যারা আগে প্রচণ্ড আগ্রহ ভালবাসা নিয়ে আমাদের বাসাতে পূজায় নাড়ু, মোয়া খেতে আসতো; তাদের অনেকেই আজ দেখি হিন্দুদের বাড়িতে খায়না। হতবাক হই কয়েক দশকের মধ্যে আশেপাশের পরিচিত মানুষদের পরিবর্তনে। এখনো সম্প্রীতির সেই পুরাতন স্মৃতিগুলো চোখে ভাসে।পূজার মাসখানেক আগে থেকে শুরু করে, প্রতিদিন দিন গুনতাম পূজার আর কতদিন বাকি। আগে থেকেই পরিকল্পনা থাকত, পূজায় কোন কোন পোশাক পড়ব, কোথায় যাব ইত্যাদি। শিশুকালে পূজাতে একটা জামা একটা প্যান্টে যে মনের আনন্দ ছিল, তা আজ শতশত জামা প্যান্টও যদি একসাথে পাই, তবে সেরকম আনন্দ আর হবে না। আনন্দগুলো এভাবে নিজদের অজান্তেই হারিয়ে গেছে। একদিন টের পেলাম পুরনো সেই আনন্দগুলো আর পূর্বের মত সজীব নেই। অবশ্য  সম্পূর্ণ বিষয়টিই হয়ত মানসিক এবং সমকালীন। দুর্গাপূজার দিন গণনা আপাতত শেষ হত মহালয়ার দিনে। মহালয়ার দিনে মনে হত, পূজা শুরু হয়ে গেছে। অবচেতন মনে ঢাকের কাঠির বোল শুনতে পেতাম। মনে হত সর্বদা কে যেন মায়ের জয়ঢাক কানের কাছে বাজাচ্ছে এবং মা স্মিতহাসিতে সন্তানের সেই বাদ্যধ্বনি শুনছেন। মহালয়ার দিনে ভোররাত্রে উঠে রেডিও ছেড়ে বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে মহালয়া অনুষ্ঠানের চণ্ডীপাঠে এক স্বর্গীয় আনন্দের স্পর্শ পেতাম। মন হিল্লোলিত হত।বর্তমানে ইউটিউবে যদিও সেই মহালয়ার  'মহিষাসুরমর্দিনী' অনুষ্ঠানটি শুনি; কিন্তু সেই ছোটবেলায় ধরে রাখা স্মৃতির মত আনন্দ আর পাই না। “আশ্বিনের শারদপ্রাতে,বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জীর,ধরণীর বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা,প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিতজ্যোতির্ময়ী জগতমাতার আগমনবার্তা।আনন্দময়ী মহামায়ার পদধ্বনি অসীম ছন্দে বেজে উঠে রূপলোক ও রসলোকে আনে নবভাব মাধুরীর সঞ্জীবন।তাই আনন্দিতা শ্যামলী মাতৃকারচিন্ময়ীকে মৃন্ময়ীতে আবাহন।"১৯৩১ সালে, পরাধীন ভারতে প্রথম বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রেকে দিয়ে 'মহিষাসুরমর্দিনী' নামক প্রোগ্রামটি আয়োজিত হয় অল ইন্ডিয়া রেডিওতে। বৈচিত্র্য আনতে ১৯৭৬ সালে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের স্থানে নায়ক  উত্তমকুমারকে দিয়ে পাঠ করানো হয়েছিল। কিন্তু শ্রোতারা তা পছন্দ করেনি। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সাথে মহিষাসুরমর্দিনী অনুষ্ঠানটির সাথে যুক্ত ছিল, সে সময়ের সংস্কৃতি জগতের সকল প্রখ্যাত ব্যক্তিরা। সুরকার ছিলেন প্রবাদপ্রতীম শিল্পী পঙ্কজ মল্লিক। চিত্রনাট্য লিখেছেন, সে সময়য়ের বিখ্যাত চিত্রনাট্যকার বাণী কুমার। গান করেছেন দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, আরতী মুখোপাধ্যায়, সুপ্রীতি ঘোষ, বিমল ভূষণ, উৎপলা সেন, তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়, কৃষ্ণা দাশগুপ্ত, সুমিত্রা সেন, অসীমা ভট্টাচার্য, শিপ্রা বসু ও পঙ্কজ মল্লিক প্রমুখ। প্রথমে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে লাইভ পাঠ করা হত মহিষাসুরমর্দিনী অনুষ্ঠানটি। পরবর্তীকালে ১৯৬৬ সালে রেকর্ডিং করা হয়। এ রেকডিং করা অনুষ্ঠানটিই আজ আমরা শুনছি।বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র যখন চণ্ডীপাঠ করতেন, দেবী দুর্গার অসুরবধের দৃশ্য বর্ণনা করতেন, পাঠ করতে করতে দু’চোখ বেয়ে নামত দেবীর প্রতি সমর্পিত  নিবেদিত অশ্রুধারা। রেডিওর রেডিয়েশনের মধ্যেও ভেসে আসত তাঁর অস্ফুটস্বরে কান্নার ধ্বনি।আমাদের রুচিবোধ অনেক পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে, আমরা অন্যদের দৃষ্টিতে নিজদের দেখা শুরু করেছি।মূর্তিপরিকল্পনায় দেবী দুর্গার মত এত ঐশ্বর্যময়ী দেবী বোধহয় সম্পূর্ণ পৃথিবীতেই আর নেই। দেবীর যখন চোখ আঁকা হত। খুবই বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখতাম। প্রতিবছর দেখতে পেতাম না, সাধারণত প্রতিমাতে এ নিখুঁত কাজগুলো রাত্রে নিরিবিলিতে করা হত। আগের সাবেকি প্রতিমার মুখশ্রীতে যে একটা মাতৃত্বের ভাব ছিল, সে ভাবগুলো দিনে দিনে কমে যাচ্ছে। বিষয়টি অত্যন্ত  দুঃখজনক। আধুনিকতার নামে, থিম প্রতিমার নামে অনেক দৃষ্টিকটু প্রতিমাও তৈরি করে ফেলছি। তবে আধুনিক নামে, থিম নামেই সব নেগেটিভ নয়; সম্পূর্ণ বিষয়টি দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রয়োগের উপরে নির্ভর করে।অবসরে পুরনো স্মৃতিতে হাতড়ে বেড়ানো মানুষের সহজাত স্বভাব। ঘরে একা যখন মানুষ  বসে থাকে, তখন কখন যেন নিজের অজান্তেই পেছনে ফেলে আসা জীবনের স্মৃতিগুলো মনের আকাশে খণ্ড খণ্ড মেঘ হয়ে ভেসে উঠে। স্মৃতিসমুদ্রতে ডুবে মানুষ অনুভব করে, আহারে যদি পূর্বের সেই সোনালী দিনগুলোতে ফিরে যেতে পারতাম! এ অনুভূতিকেই বলে 'নস্টালজিয়া।' প্রত্যেক মানুষের জীবনে নস্টালজিয়া নামক সুখকর স্মৃতিটি বারেবারে ঘুরেফিরে আসে। স্মৃতিগুলো প্রতিনিয়ত ডাকে, কেউ সে ডাক শুনতে পায়, কেউ বা পায়না। বর্নি‌ল অতীত সবসময়ই মায়াজালে জড়িয়ে রাখে। মানুষ সেই অতীতকে আজীবন রোমন্থন করে। এ অতীতের রোমন্থনের  মাঝে সুখের দুঃখের সকল স্মৃতিই থাকে। তবে মানুষ নস্টালজিক হয়ে শুধু সুখের স্মৃতিই রোমন্থন করে বা করতে চায়। কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে দুঃখের স্মৃতিও মনজগতে চলে আসে। আমাদের ছোটবেলার দুর্গাপূজার স্মৃতি হল, নব্বইদশকের কিছু আমৃত্যু  আনন্দের স্মৃতি। বাস্তবে হয়ত সে আনন্দকে আর পাব কিনা জানি না, কিন্তু স্মৃতির মণিপুরে সে মণিদীপা হয়ে নিরন্তর বসতি করবে।  

আমাদের শিশুকালে দুর্গাপূজা

'একাত্ম মানববাদ' দর্শনের বৈদিক পরম্পরা

পৃথিবীর রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে একটি অবিসংবাদিত নাম পণ্ডিত দীন দয়াল উপাধ্যায় (২৫.০৯.১৯১৬- ১১.০২.১৯৬৮)। তিনি বিশ্বব্যাপী প্রচলিত রাজনৈতিক চিন্তার বিপরীতে ভারতবর্ষের শাশ্বত রাজনৈতিক চিন্তা কাঠামোকে দৃঢ়ভাবে তাঁর মতাদর্শে প্রতিস্থাপন করেন। তাঁর সেই আদর্শ এবং দর্শন যে গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে সে গ্রন্থের নাম 'একাত্ম মানববাদ'। পণ্ডিত দীন দয়াল উপাধ্যায় 'একাত্ম মানববাদ' গ্রন্থে অত্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ ভারতবর্ষ থেকে চলে গিয়েছে। কিন্তু আজও ব্রিটিশদের চিন্তাকাঠামো ভারতবর্ষের মানুষের মাঝে রয়ে গেছে। ভারতবর্ষের মানুষ জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে সেই বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী আদর্শকে এখনো প্রতিনিয়ত অনুবর্তন করছে (দীনদয়াল ২০০৪: ১৫)। অথচ বিদেশি রাজনৈতিক কাঠামো ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা লাভের সাথে সাথেই, পরিত্যক্ত হওয়া উচিত ছিলো। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য, সেই বিদেশি চিন্তা কাঠামোর আজও প্রতিনিয়ত চর্চা হচ্ছে ভারতবর্ষে।ইংল্যান্ডের কোন ওষুধ ভারতবর্ষে কিছুকিছু ক্ষেত্রে কার্যকর হলেও সর্বক্ষেত্রে কার্যকর হয় না। কারণ রোগের সম্পর্ক জলবায়ু, আচার-ব্যবহার, খাদ্যাভ্যাস এবং বংশ পরম্পরার সাথে যুক্ত। তাই আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে বলা হয়েছে, যে প্রাণী যে অঞ্চলের তার বিভিন্ন রোগব্যাধির জন্যে তৈরি ওষুধও সেই সেই অঞ্চলের সাথে সম্পর্কিত হতে হবে। তবেই রোগের উপশম হবে (দীনদয়াল ২০০৪:২৩)। বৈদেশিক কোন ওষুধে যেমন রোগের কিছুকিছু ক্ষেত্রে উপশম হলেও, সর্বক্ষেত্রে উপশম হয় না। ঠিক তেমনি দেশ পরিচালনার মতাদর্শও নিজস্ব সংস্কৃতি এবং সভ্যতার সাথে সম্পর্ক যুক্ত হতে হয়। তবেই সে মতাদর্শ কার্যকরী এবং ফলদায়ী হয়।পণ্ডিত দীন দয়াল উপাধ্যায় দেশের ভবিষ্যত কল্যাণকর লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য নিয়ে যারা চিন্তা করেন ভারতবর্ষের সেই সকল বুদ্ধিজীবীদের দুই প্রকার চিন্তাধারার অনুসারী বলে বর্ণনা করেছেন: প্রথমত স্বদেশপন্থী এবং দ্বিতীয়ত স্বদেশীয় পশ্চিমা চিন্তাপন্থী (দীনদয়াল ২০০৪: ২১-২২)।পণ্ডিতজী বলেছেন, পুরাতনকে সাথে নিয়েই ভারতবর্ষকে এগিয়ে যেতে হবে। বিদেশি বিচার ব্যবস্থা সর্বজনীন নয়। কারণ সেই ব্যবস্থার সাথে পশ্চিমা রাষ্ট্রদর্শন, প্রকৃতি পরিবেশ এবং সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য সুগভীর ছাপ রয়েছে। মার্কসবাদ যা নিজেকে একটি বৈশ্বিক মতবাদ হিসেবে প্রচার করে; সেই মার্কসবাদী দার্শনিক সিদ্ধান্তও বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক কাঠামোয় পরিবর্তিত হয় (দীনদয়াল ২০০৪: ২২-২৩)। বিষয়টির সত্যতা কিউবা, রাশিয়া, চিনের এ সকল সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দিকে দৃষ্টি দিলে সহজেই বোঝা যায়।এ সকল দেশ মোটাদাগে মার্কসবাদী চিন্তাধারার অনুসারী হলেও, তাদের সকলের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং কর্মপন্থা এক নয়। অধিকাংশই ভিন্ন, কয়েকটি দেশের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণই ভিন্ন। তাই নিজেদের দেশ, নিজেদের সংস্কৃতি, নিজেদের পরিবেশ পরিস্থিতিকে মাথায় রেখে সে অনুসারে দেশ পরিচালনার রূপরেখা তৈরি করে নিতে হবে। তবেই সে রূপরেখা ফলপ্রসূ হবে। প্রত্যেক দেশেরই নিজস্ব ঐতিহাসিক, সামাজিক এবং আর্থিক পরম্পরাগত চিন্তাকে সামনে রেখে তবেই এগিয়ে যেতে হবে। এক্ষেত্রে জগতের জ্ঞানচর্চায় অগ্রগামী ভূমিকা নিতে হবে ভারতবর্ষকে। কারণ ভারতবর্ষের পবিত্র ভূখণ্ডের বনভবন থেকেই জ্ঞানের প্রথম উদয় হয়েছে। প্রাচীন সেই তপবন বনভবনের চিরকল্যাণকর জ্ঞানই আজ দেশ-বিদেশে বিতরিত হয়ে জগত ধন্য হচ্ছে। বিষয়টি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখাতে বিখ্যাত 'গীতবিতান' গ্রন্থের স্বদেশ পর্যায়ের একটি গানে (স্বদেশ :২৩) পাওয়া যায়।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতমাতা এবং জগন্মাতাকে একাকার করে একটি বিখ্যাত সংগীতে বলেন, এ ভারতবর্ষ থেকেই জ্ঞানের প্রথম উদয় হয়েছে জগতে, যে জ্ঞানের সুধা পান করে জগত ধন্য হচ্ছে।"প্রথম প্রভাত উদয় তব গগনে,প্রথম সামরব তব তপোবনে,প্রথম প্রচারিত তব বনভবনেজ্ঞানধর্ম কত কাব্যকাহিনী।চিরকল্যাণময়ী তুমি ধন্য,দেশবিদেশে বিতরিছ অন্ন-জাহ্নবীযমুনা বিগলিত করুণাপুণ্যপীষুষস্তন্যবাহিনী॥"পণ্ডিত দীন দয়াল উপাধ্যায় বলেন, দেশকে পরিচালিত করতে হবে নিজেদের পরম্পরাগত শাশ্বত ভাবাদর্শে। তবেই সেই ভাবাদর্শ মানুষের মাঝে কার্যকর হয়ে, মানুষের কল্যাণ করতে পারবে। বিদেশি চিন্তা সার্বজনীন নয়। কারণ সেই ব্যবস্থায় সাথে পশ্চিমা ইউরোপীয় রাষ্ট্রদর্শন, প্রকৃতি পরিবেশ এবং সংস্কৃতির গভীর ছাপ রয়েছে। প্রয়োজনে পশ্চিমাদের বৈজ্ঞানিক গবেষণা লব্ধ জ্ঞান গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু পশ্চিমাদের আচার, ব্যবহার, সংস্কৃতি ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য নয়। আধুনিক বিজ্ঞানে পশ্চিমারা উন্নতি করলেও, পশ্চিমাদের সংস্কৃতি ভারতবর্ষের সংস্কৃতি থেকে উন্নততর নয়।পৃথিবী বৈচিত্র্যময়। তাই বিশ্বব্যাপী আদর্শের সংঘর্ষ থাকবেই। কিন্তু এর পরেও স্বরাজ্য এবং স্বসংস্কৃতিকে সাথে নিয়ে এক বৈশ্বিক একাত্বতার পথে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। স্বরাজ্যের প্রেরণা স্বসংস্কৃতি থেকেই আসে। ভারতীয় সংস্কৃতির বিশেষত্ব হল, এ সংস্কৃতি একাত্ববাদী। বৈচিত্র্যময়তার মধ্যেই এখানে সর্বত্র ঐক্যের অনুসন্ধান করা হয়েছে (দীনদয়াল ২০০৪: ২৫)। পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায়ের এ চিন্তা প্রাচীনকাল থেকেই ধ্বনিত হয়েছে বেদে। বেদ ভারতবর্ষ তো বটে সমগ্র পৃথিবীর প্রাচীনতম গ্রন্থ । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অসংখ্য কবিতা, সংগীত এবং প্রবন্ধে এই সমদর্শী একাত্মবাদীতা প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর বিশ্বখ্যাত গীতবিতান গ্রন্থের পূজা পর্যায়ে (গান:৩৬৩) একটি গানে কবি বলেছেন, সবার যেখানে আপন হে প্রিয়, সেখানে তুমি আমারও আপন। সবার দিকে যখন বাহু প্রসারিত করে ধরবো, তখনই হৃদয়ে সত্যিকারের প্রেম প্রকাশিত হবে।"বিশ্বসাথে যোগে যেথায় বিহারোসেইখানে যোগ তোমার সাথে আমারও।। নয়কো বনে, নয় বিজনে নয়কো আমার আপন মনে-সবার যেথায় আপন তুমি, হে প্রিয়, সেথায় আপন আমারো।।সবার পানে যেথায় বাহু পসারো,সেইখানেতেই প্রেম জাগিবে আমারও।"ধর্ম ঈশ্বর প্রবর্তিত সর্বাঙ্গসুন্দর একটি শাশ্বত সত্ত্বা। সমাজ ঠিক উল্টা। মানুষ তার ইচ্ছামত, সুবিধামত সমাজকে বিনির্মাণ করে। স্বার্থান্বেষী মানুষের কারণে বিভিন্ন সময়ে অনেক অসঙ্গতি সমাজে যুক্ত হয়। যা ধর্মের নাম প্রচলিত হলেও; প্রকৃতপক্ষে তা ধর্মের সাথে মোটেই সম্পর্ক যুক্ত নয়। এ বিভিন্ন অসঙ্গতি ঘনীভূত হয়েই নানাপ্রকার সামাজিক অসন্তোষ দানা বাঁধে। মানুষের মাঝে ঐক্যহীনতা দেখা দেয়। অথচ সৃষ্টির শুরুতেই ঋগ্বেদ সংহিতার সংজ্ঞানসূক্তে জগতের প্রচলিত জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানবের যে ঐক্যবদ্ধ সাম্যবাদী প্রেরণা দেয়া হয়েছে। তা মানব ইতিহাসে এক বিরল অনুপম দৃষ্টান্ত। বৈদিক এ সাম্যবাদী একাত্মবাদী তত্ত্বের বর্তমান কালের একটি ফলিত দৃষ্টান্ত হলো, পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায়ের একাত্ম মানববাদ দর্শন। বৈদিক সংজ্ঞান সূক্তে 'সমান' শব্দটি বারবার অনুপ্রাস অলঙ্কার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছেন। সেই সূক্তে একই সাথে চলা, বলা ঈশ্বরের উপাসনা, খাদ্যপানীয় সহ সকল ক্ষেত্রেই জগতের সকল মানবকে সমান হতে বলা হয়েছে। জগতে এর থেকে বড় সাম্যবাদের কি হতে পারে? কার্ল হাইনরিশ মার্ক্স (৫ই মে, ১৮১৮ –১৪ই মার্চ, ১৮৮৩) সহ জগতের অন্যান্য সাম্যবাদীরা এ বৈদিক সাম্যবাদের বাইরে কোন নতুন কথা বলেননি।সাম্যবাদ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হল communism. শ্রেণীহীন, শোষণহীন, ব্যক্তি মালিকানাহীন এমন একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভাবাদর্শ যেখানে ব্যক্তিগত মালিকানার স্থলে উৎপাদনের সকল মাধ্যম এবং প্রাকৃতিক সম্পদ (ভূমি, খনি, কারখানা) রাষ্ট্রের মালিকানাধীন এবং নিয়ন্ত্রণাধীন থাকে। সাম্যবাদ হল সমাজতন্ত্রের একটি উন্নত এবং অগ্রসর রূপ, তবে এদের মধ্যেকার পার্থক্য নিয়ে বহুকাল ধরে বিতর্ক চলে আসছে।উভয়েরই মূল লক্ষ্য হল ব্যক্তিমালিকানা এবং শ্রমিক শ্রেণীর উপর শোষণের হাতিয়ার পুঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থার অবসান ঘটানো।কার্ল মার্কস যে মতাদর্শ উপস্থাপন করেছিলেন সেই মতে সাম্যবাদ হল সমাজের সেই চূড়ান্ত শিখর, যেখানে পৌঁছাতে হলে বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজে অর্থনৈতিক সাম্য স্থাপন করতে হবে। সেই ক্রান্তিকালে উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে, সমাজে সামগ্রী ও সেবার অতিপ্রাচুর্য সৃষ্টি হবে। সাম্যবাদী দর্শনানুসারে, কোনো দেশে সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠিত থাকলে সে স্থানে ধনী-গরীবের ব্যবধান থাকবে না। নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার দ্বায়িত্ব গ্রহণ করবে সাম্যবাদী সরকার।সাম্যবাদের প্রধান লক্ষ্য হল অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক সাম্যতা। কিন্তু সুপ্রাচীন বৈদিক সাম্যবাদ আরও গভীর, আরও সুস্পষ্ট এবং বহু ক্ষেত্রে প্রসারিত। এ বৈদিক পথরেখাতেই এগিয়ে গিয়েছে পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায়ের সাম্যবাদী একাত্মবাদী চিন্তা।সং গচ্ছধ্বং সং বধ্বং সং বাে মনাংসি জানতাম্। দেবা ভাগং যথা পূর্বে সঞ্জানানা উপাসতে॥সমানাে মন্ত্রঃ সমিতিঃ সমানী সমানং মনঃ সহ চিত্তমেষাম্।সমানং মন্ত্রমভিমন্ত্রয়ে বঃ সমানেন বাে হবিষা জুহােমি॥সমানী ব আকুতিঃ সমানা হৃদয়ানি বঃ।সমানমন্ত বাে মনাে যথা বঃ সুসহাসতি॥(ঋগ্বেদ ১০.১৯১.২-৪)"হে মানব, তােমরা একসঙ্গে চল, একসঙ্গে মিলে একই ঐক্যের কথা বলো, তােমাদের মন উত্তম সংস্কারযুক্ত হােক। পূর্বকালীন জ্ঞানী ব্যক্তিরা যেমন করে কর্তব্য কর্ম এবং উপাসনা করেছে, তােমরাও তেমন করে আমার পথে চল।তােমাদের সকলের মিলনের মন্ত্র এক হােক,মিলনভূমি এক হােক এবং মনসহ চিত্ত এক হােক। তােমরা একতার মন্ত্রে উদীপ্ত হয়ে অগ্রগামী হও। তােমাদেরকে দেয়া খাদ্য-পানীয় ঐক্যবদ্ধভাবে সুষম বণ্টন করে গ্রহণ কর।তােমাদের সকলের লক্ষ্য এক হােক, হৃদয় এক হােক এবং মন এক হােক। তােমরা সর্বাংশে সম্পূর্ণরূপে ঐক্যবদ্ধ হও এবং ঐক্যবদ্ধ হয়েই বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হও।""সং গচ্ছধ্বং": জগতে বর্তমানে মানুষ দিনেদিনে অসহিষ্ণু হয়ে যাচ্ছে, স্বার্থান্ধ হয়ে যাচ্ছে। সকলেই নিজ নিজ মত-পথের ভিন্নতা নিয়েই আপন পরিমণ্ডলে পরিভ্রমণ করছে। কিন্তু বৈদিক সাম্যবাদ ব্যক্তিগত সংকীর্ণতা পরিত্যাগ করে বিশ্বের সকল মানবকে একসঙ্গে চলতে নির্দেশনা দিয়েছে। বৈশ্বিকভাবে সকল জাতিগোষ্ঠী যেন সকলেই সকলের কাছাকাছি আসতে পারে এই শাশ্বত প্রেরণা দেয়া হয়েছে। বৈদিক মন্ত্রে উক্ত "সং গচ্ছধ্বং" ভাবটি গত শতাব্দীতে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায়। নিজ নিজ কূপে থেকে কূপমণ্ডূক না হয়ে আমাদের উচিত যথাসম্ভব সমানতার ভাবকে মাথায় নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে চলা। পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায়ের একাত্ম দর্শনেরও মূলকথা এটি।সংঘর্ষ প্রকৃতি বা সংস্কৃতির দ্যোতক নয়; বিকৃতির দ্যোতক। মাৎস্যন্যায় বা জীবন সংঘর্ষ সকল কিছুই নয়। মাৎস্যন্যায়ের দার্শনিক চিন্তাটি ভারতবর্ষের জন্যে কোন নতুন চিন্তা নয়। এই জ্ঞান প্রাচীনকাল থেকেই ভারতবর্ষের মানুষের মধ্যে ছিল (দীনদয়াল ২০০৪ :২৭)।ভারতীয় দর্শন কামক্রোধ আদি ষড়রিপুকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু এগুলো কখনই ভারতীয় সংস্কৃতি বা শুদ্ধ ব্যবহারের আধার হয়ে উঠেনি। সমাজে সকল প্রকার মানবই থাকবে। সেখানে সাধুসন্ত যেমন থাকবে, তেমনি চোর ডাকাতও থাকবে। সবাইকে নিয়েই চলতে হবে (দীনদয়াল ২০০৪: ২৭)। জগতের সকল জীবের মধ্যেই ঈশ্বরের উপস্থিতি রয়েছে। এ বিষয়টি শুক্ল যজুর্বেদীয় রুদ্রসূক্তের মধ্যেও পাওয়া যায়।"সং বধ্বং"; জগতের সকল জাতিই বৈশ্বিকভাবে একই কথা বলবে না।এ কথা যেমন সত্য, ঠিক তেমনি অবিসংবাদিত সত্য হল, মৌলিক অধিকার, প্রকৃতি পরিবেশ রক্ষা সহ বেশ কিছু ক্ষেত্রে জগতের সকল মানবকেই ঐক্যবদ্ধ হয়ে একই সাম্যবাদী কথা বলা প্রয়োজন। মানুষের বিশ্বাস, চিন্তা এবং বাক্যে ভিন্নতা থাকবে।কিন্তু সেই ভিন্নতা মনুষ্যত্ব বোধকে কখনোই ভূলন্ঠিত করতে পারবে না।"দেবা ভাগং যথা পূর্বে সঞ্জানানা উপাসতে": জগতের সকল মানবকে ঐক্যবদ্ধভাবে কর্তব্য কর্ম এবং ঐশ্বরিক উপাসনা করতে হবে। এ উপাসনায় কোন বিভেদ কাম্য নয়।এক অদ্বিতীয়, পরমেশ্বরই এ বিশ্বসংসার এবং সনাতন ধর্মের প্রবর্তক। তিনি সৎ, চিৎ এবং আনন্দময়স্বরূপ। তিনি চিন্তার অতীত, সর্বশক্তিমান, সর্বব্যাপক, সর্বান্তর্যামী, সর্বজ্ঞ, অভয়, কৃপাময় এবং সৃষ্টি, পালন ও লয়কর্তা। জীবের চিন্তার অতীত এক অদ্বিতীয় ব্রহ্মেরই ভিন্ন ভিন্ন গুণ ও শক্তির প্রতীকী প্রকাশ হলেন দেবতাগণ। ধর্মে অনাদি অনন্ত ব্রহ্মের উপাসনা পঞ্চমতে ও পথে বিভজিত যথা- শাক্ত, শৈব, সৌর, গাণপত্য এবং বৈষ্ণব। এ পঞ্চমতের সকল সম্প্রদায়ের প্রতি সমান শ্রদ্ধা পোষণ করে সকল মতকেই সত্য বলে জেনে ঐক্যবদ্ধভাবে ঈশ্বরের উপাসনা কিরতে হবে।"সমানাে মন্ত্রঃ": এ বাক্যে ঈশ্বর নির্দেশ দিয়েছেন সকলের মন্ত্র যেন এক হয়। বেদ,রামায়ণ মহাভারত সহ যে মন্ত্রটি সর্বক্ষেত্রে ব্যবহৃত, তা হল ওঙ্কার(ॐ)। এ পবিত্র ওঙ্কার মন্ত্রই গায়ত্রী মন্ত্রের সাথে সংযুক্ত করে গায়ত্রীসন্ধ্যায় নিত্য জপ করতে হয় । যে যে মত-পথের সম্প্রদায়ভূক্ত হোক না কেন, সকলেরই বৈদিক ওঙ্কার এবং গায়ত্রী মন্ত্রের অধিকার রয়েছে।"সমিতিঃ": ভাবতে প্রচণ্ড আবাক হতে হয় যে, সংগঠনবাচক 'সমিতি' শব্দটি বেদেই উক্ত হয়েছে। আজ সমিতি শব্দটি সর্বক্ষেত্রে ব্যবহৃত হলেও, অধিকাংশ মানুষই এ শব্দটির উৎস যে বেদ, এ তথ্যটি জানি না। সত্যযুগে প্রয়োজনীয় না হলেও বর্তমান কলিযুগে ঐক্যবদ্ধতার জন্যে সমিতিবদ্ধতার প্রয়োজন অনস্বীকার্য।"সমানী সমানং মনঃ সহ চিত্তমেষাম্": জগতের সকলের মন সহ চিত্ত এক হওয়া প্রয়োজন। তবেই জগতের মানুষ একে অন্যের দুঃখ বেদনা উপলব্ধি করতে পারবে এবং সমদর্শী হতে পারবে। সমদর্শী হতে পারলে জগতের সকলের মাঝেই নিজেকে এবং নিজের মাঝেই সকলকে দেখতে পাবে। এ প্রসঙ্গে পণ্ডিত দীন দয়াল উপাধ্যায় বলেন, পশ্চিমা সংস্কৃতি জীবনকে খণ্ডিত দৃষ্টিতে দেখে। তাই সে সকল দেশের দর্শন কখনও ভারতবর্ষে জন্যে কল্যাণকর নয়। ভারতবর্ষের রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি সহ বিজ্ঞান সাধনা একটি একাত্মবাদী কল্যাণকর দার্শনিক চিন্তার উপরে প্রতিষ্ঠিত। জগতে একত্বচিন্তা নিয়ে, বিভিন্ন বৈচিত্র্যময় রূপকে সাথে নিয়ে বিকাশ বা সংস্কার করাকেই সংস্কৃতি বলে (দীনদয়াল ২০০৪:২৭)।"সমানং মন্ত্রমভিমন্ত্রয়ে বঃ":একতার মন্ত্রে উদীপ্ত হয়ে জগতের মানুষকে অভি বা অগ্রগামী হতে হবে।জগতের পরিবেশ প্রকৃতি এবং মানবের মাঝে সমদর্শী না হলে, সর্বভূতে যে এক পরমেশ্বরই বিরাজ করছেন -সেই উপলব্ধি কখনোই সকলের মাঝে আসবে না। বেদ জগতের মানবকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাওয়ার শিক্ষা দেয়। কিন্তু বর্তমানে জগতের মানুষ নিজেদের তৈরি শতসহস্র শৃঙ্খল পায়ে পড়ে নিজেরাই নিজেদের চলার গতিপথকে রুদ্ধ করে দিচ্ছে। কিছু মানুষ ঈশ্বরের নামে অহেতুক অমানবিক যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি করছে। আবার কেউ জাতপাতের নামে মনুষ্যত্বকে ভূলন্ঠিত করছি। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। তাই জগতের সকল মানবের উচিত বিভেদের জালকে ছিন্ন করে ঐক্যবদ্ধ হয়ে জগতের কল্যাণ করা। নিজে আগে অগ্রগামী হয়ে শুদ্ধ প্রজ্জ্বলিত প্রদীপ হয়ে; পরবর্তীতে সেই প্রদীপ থেকে অনন্ত প্রদীপকে প্রজ্জ্বলিত করা। এ বিষয়টি পণ্ডিত দীন দয়াল উপাধ্যায়ের একাত্মদর্শনেরও মূল লক্ষ্য।"সমানেন বাে হবিষা জুহােমি": এ জগতের প্রেরয়িতা পুরুষ ঈশ্বর। জগতের সকল খাদ্যপানীয়ও ঈশ্বরের। তাউ প্রত্যেকেই উচিত যথাসম্ভব খাদ্য-পানীয় ঐক্যবদ্ধভাবে সুষম বণ্টন করেই তবে গ্রহণ করা। কেউ শুধুই খেয়ে যাবে, বিপরীতে কেউ খাদ্যের অভাবে উপবাস করবে বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং পরিতাপের। ঈশ্বর অন্নকে ভাগ করে খেতে বলেছেন। এ কারণেই সনাতন ধর্মে পঞ্চমহাযজ্ঞের প্রবর্তন করা হয়েছে। বৈদিক পঞ্চমহাযজ্ঞ মতে প্রত্যেকদিনই মানুষকে অন্নদান করতে হয়। অন্নদান করে খাদ্যগ্রহণ করাকে বলে 'নৃযজ্ঞ'। মানুষের সাথে সাথে প্রত্যেকদিনই প্রাণীকুলকে অন্নদান করতে হয়ে, সেই প্রাণীকুলকে অন্নদানকে বৈদিক পরিভাষায় বলে 'ভূতযজ্ঞ'। শাস্ত্রে কাউকে অন্নদান না করে, খাদ্য গ্রহণ করা হতভাগ্য ব্যক্তিকে চোর বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তাই ক্ষুধার্ত এবং দারিদ্রকে অন্নসহ বিবিধ প্রকারের দানকে প্রশংসিত করে একাধিক মন্ত্র ঋগ্বেদ সহ বেদের বিভিন্ন স্থানে দৃষ্ট হয়।এদেশীয় সাম্যবাদী একাত্মবাদী বিশ্বাসের ভাব বিদেশী পণ্ডিতেরা অধিকাংশ মানুষই বুঝতে পারেনি।বেদ সহ শ্রীমদ্ভগবদগীতা বলছে, সমত্ববুদ্ধি অবলম্বন করে সর্বভূতে ভেদজ্ঞান পরিত্যাগ করে প্রত্যেকটি জীবের মধ্যে, প্রত্যেকটি বস্তুর মধ্যে পরমাত্মাকে দর্শন এবং উপলব্ধি করে তাঁর ভজনা করতে। তাই শাস্ত্রে বারবার প্রত্যেকটি জীবের প্রতি সমদর্শী হতে বলা হয়েছে।সর্বভূতস্থমাত্মানং সর্বভূতানি চাত্মনি ৷ঈক্ষতে যোগযুক্তাত্মা সর্বত্র সমদর্শনঃ ॥যো মাং পশ্যতি সর্বত্র সর্বং চ ময়ি পশ্যতি।তস্যাহং ন প্রণশ্যামি স চ মে ন প্রণশ্যতি।।সর্বভূতস্থিতং যো মাং ভজত্যেকত্বমাস্থিতঃ ৷সর্বথা বর্তমানোঽপি স যোগী ময়ি বর্ততে ॥(গীতা:৬. ২৯-৩১)"প্রকৃত যোগী সমদর্শী হয়ে সর্বভূতে আত্মাকে দর্শন করেন এবং নিজ আত্মাতেই সর্বভূতকে দর্শন করেন ৷যিনি আমাকে সর্বভূতে অবস্থিত দেখেন এবং আমাতে সর্বভূতের অবস্থিত দেখেন, আমি তাঁর অদৃশ্য হই না এবং তিনিও আমার অদৃশ্য হন না।যে যোগী সমত্ববুদ্ধি অবলম্বন করে সর্বভূতে ভেদজ্ঞান পরিত্যাগ করে সর্বভূতস্থিত পরমাত্মারূপে আমাকে জেনে আমার ভজনা করেন, তিনি সর্ব অবস্থাতে আমাতেই অবস্থান করেন"সনাতন ধর্মে সমদর্শী হয়ে জগতের সকল জীবকে ভালোবাসতে বলা হয়েছে। সনাতন ধর্ম হল বিশ্বের ব্যক্তিকেন্দ্রিক সাংগঠনিক মতগুলোর বিরুদ্ধে টিকে থাকা, একমাত্র প্রকৃতি উপাসক, Pagan (মূর্তিপূজক), Animist (সর্বপ্রাণবাদী), Polytheistic , (বহু ঈশ্বরবাদী) মতের প্রতিনিধি। Pagan, Animist, Polytheistic -এ সংজ্ঞাগুলো অবশ্য পশ্চিমাদের দেয়া। শব্দগুলো অনেক সময়ে নিন্দার্থে তারা ব্যবহার করলেও, ভারতবর্ষের মানুষের এ নিয়ে মাথাব্যথা নেই। বেদে বলা আছে 'একমেবাদ্বিতীয়্।' ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয়, ঈশ্বরের কোন প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। জগতের ভাল মন্দ সকল ভাবই তাঁর থেকে উদ্ভূত।সনাতন ধর্ম একেশ্বরবাদী, বহু ঈশ্বরবাদী, প্রকৃতিপূজারী, সর্বপ্রাণবাদী, মূর্তিপূজারী ; অর্থাৎ জগতের সকল ভাব এ ধর্মে আছে। এ ধর্ম কোন ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রবর্তিত এককেন্দ্রিক সাংগঠনিক ধর্ম নয়। যে প্রবর্তক ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে দিলে, ধর্ম অস্তিত্বের সংকটে পড়ে যায়।পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায় বলেন, মনুষ্য মন, বুদ্ধি, আত্মা, শরীর এই চার প্রকারের একটি সমন্বিত রূপ। তাই মনুষ্যকে খণ্ডিত করে বিচার করা উচিত নয়। পশ্চিমাদের সমস্যার মূলে তার মনুষ্যের জীবনের সকল বিষয়কেই তারা খণ্ডিতদৃষ্টিতে চিন্তা করছে (দীনদয়াল ২০০৪: ৩১)। মানবের প্রগতির কারণ: শরীর, মন, বুদ্ধি, আত্মা এই চারের প্রগতি। অনেকে বলেন ভারতীয় সংস্কৃতি কেবল আত্মা নিয়েই আলোচিত। বিষয়টি সত্য নয়। পশ্চিমারা কেবল শরীর নিয়েই ব্যস্ত। এ কারণেই আত্মার বিচার ভারতবর্ষের দর্শনের চিন্তার অনন্য বিশেষত্ব হয়ে গেছে (দীনদয়াল ২০০৪: ৩৩)।ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, সাম্যবাদ, ব্যক্তিবাদ, পুঁজিবাদ সকলই পরিত্যাগ করে একাত্ম মানববাদ গ্রহণ করতে হবে। একাত্মমানববাদে জাতি, ধর্ম, রঙের ভেদাভেদ থাকে না। জড় চেতন সকলের সাথেই সম্পর্ক তৈরি করে একাত্মতা স্থাপন করে। মানবের সাথে বিচ্ছিন্ন নয়, সম্পূর্ণভাবে একাত্মতার শিক্ষা দেয়।প্রকৃতির সাথে বিছিন্ন নয়, একাত্ম হওয়া শিক্ষা দেয়। বেদে জগতের সকল জীবকে মিত্রের দৃষ্টিতে দেখতে বলা হয়েছে। সকল জীবের মাঝে ঈশ্বরকে দর্শন এবং অনুভব করতে বলা হয়েছে।দৃতে দৃংহ মা মিত্রস্য মা চক্ষুষাসর্বাণি ভূতানি সমীক্ষন্তাম্।মিত্রস্যাহং চক্ষুষা সর্বাণি ভূতানি সমীক্ষে।মিত্রস্য চক্ষুষা সমীক্ষামহে।।(শুক্ল যজুর্বেদ সংহিতা: ৩৬.১৮)"হে দুঃখনাশক পরমাত্মন্ ! আমাকে সুখের সহিত বর্দ্ধন কর। সকল প্রাণী যেন আমাকে বন্ধুর দৃষ্টিতে দেখে, আমি যেন জগতের সকল প্রাণীকে সর্বদা বন্ধুর দৃষ্টিতে দেখি। আমরা সকলেই যেন পরস্পর পরস্পরকে বন্ধুর দৃষ্টিতে দেখি।"যস্তু সর্বাণি ভূতান্যাত্মন্নেবানু পশ্যতি।সর্বভূতেষু চাত্মানং ততো ন বিচিকিৎসতি।।(শুক্ল যজুর্বেদ সংহিতা: ৪০.৬)"যে ব্যক্তি সমস্ত জীবেই ঈশ্বরে অবস্থিত- এরূপ দর্শন করেন, অনুভব করেন এবং সমস্ত জীবের মধ্যে ঈশ্বরের বাস দেখেন তখন তিনি কারও প্রতি বিদ্বেষ করেন না।"পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায় বলেন, ইন্দ্রিয় দমন মনুষ্য জীবনের একটি অনন্য আধার।কিন্তু ক্রোধ আধার নয়, সর্বদা বর্জনীয়(দীনদয়াল ২০০৪: ২৯)।মানব জীবনকে স্থির রাখতে, মানব জীবনকে সুন্দর করে ধারণ করে কল্যাণ এবং ঋদ্ধির পথে পরিচালিত করাকেই ধর্ম বলে। ধর্মের সম্পর্ক সবার সাথে। তাই ধর্মের সম্পূর্ণ স্বরূপ নিয়েই জীবনে বিচার করতে হবে(দীনদয়াল ২০০৪: ৩০)।ধর্মের সংজ্ঞা প্রসঙ্গে পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায়ের চিন্তাটি কোন নতুন চিন্তা নয়। বিষয়টি মহাভারতের কর্ণপর্বেই রয়েছে। জগতে ধর্ম কি?এই প্রশ্নের উত্তরে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে ধর্মের স্বরূপ সম্পর্কে বলেন, সমাজ এবং জনসাধারণকে যা সমৃদ্ধি এবং কল্যাণের পথে ধারণ করে রাখে, তাকেই বলে ধর্ম।ধারণাদ্ধর্মমিত্যাহু ধর্মো ধারয়তে প্রজাঃ।যৎস্যাদ্ধারণ সংযুক্তং স ধর্ম ইতি নিশ্চয়ঃ।।(মহাভারত : কর্ণপর্ব, ৬৯. ৫৮)"সমাজকে, জনসাধারণকে যা ধারণ করে রাখে, তাই ধর্ম। তাই কিসে জনসাধারণের, সমাজের সমৃদ্ধি এবং কল্যাণ হয়, তার সাথে যুক্ত হওয়াই ধর্ম ; এ কথা নিশ্চিতরূপে জানবে।"ধর্মের গতি নিগূঢ়তম, তাই অনেকেই সবসময়ে ধর্মকে সম্যক বুঝতে পারেন না। মানবতা মনুষ্যত্বের প্রয়োজনে ধর্মের রূপ পরিবর্তিত হতে পারে। যে বিষয়টিতে আপাতদৃষ্টিতে ধর্ম মনে হয়ে, তখন দেখা যায় সেটি করলেই অধর্ম হয়।ব্যক্তির সুখ কিভাবে? ব্যক্তির একাত্ম বিচার প্রয়োজন। বৈদিক সাম্যবাদ যা পরম্পরাগত এসেছে পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায়ের একাত্ম মানববাদে। সেই একাত্ম সাম্যবাদী দর্শনের লক্ষ্য হল, সমন্বিতভাবে জগতের সকলের কল্যাণ। এ সর্বজনীন কল্যাণমূলক কাজে সকলের অংশগ্রহণ। কাউকে ছোট-বড় দৃষ্টিতে বিবেচনা না করে সাম্যবাদী দৃষ্টিতে দেখা। বৈদিক সাম্যবাদ প্রয়োগের বিষয়টির দৃষ্টান্ত আমরা রামায়ণের মধ্যেও দেখতে পাই।ভগবান শ্রীরামচন্দ্র ঈশ্বরের অবতার হয়েও রাবন বধ করে সীতা উদ্ধারের কল্যাণকর কাজের জন্যে তিনি সামান্য বানরসেনাদের ঐক্যবদ্ধ করে নিযুক্ত করেছিলেন। সামান্য বানরসেনারা ভগবানের নির্দেশনায় সমুদ্রের মাঝে সেতু নির্মাণের কাজে অংশগ্রহণ করে গৌরবান্বিত হয়েছিলেন। তাই নল, সুগ্রীব, হনুমান সহ সকল বানরসেনাদের শ্রদ্ধার সাথে আজও স্মরণ করা হয়। জগতের প্রত্যেকটি মানুষের চিন্তা, ভাব, দর্শন এবং বিশ্বাস আলাদা। জগতের মানুষ আলাদা আলাদা বৈচিত্র্যময় হলেও যদি তাদের সকলের সত্ত্বার মাঝে একটি মানবিক একত্বের বন্ধন থাকে, তবে জগতের অধিকাংশ বৈরীতা হিংসা-বিদ্বেষের ভাব এমনিতেই দূরীভূত হয়ে যাবে। সকলের হৃদয়ের আকুতি মিলিত হলেই মানুষ ঐক্যবদ্ধ হবে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হবে। সাম্যবাদী একাত্মবাদী চেতনায় ঐক্যবদ্ধতা ছাড়া কল্যাণকর আর কোন পথ নেই।সহায়ক গ্রন্থাবলি:১.দীনদয়াল উপাধ্যায়, একাত্ম মানববাদ, জাগৃতি প্রকাশন, নয়ডা: নবম সংস্করণ, ২০০৪২. রমেশচন্দ্র দত্ত, ঋগ্বেদ সংহিতা, হরফ প্রকাশনী, কলিকাতা: দ্বিতীয় প্রকাশ,১৯৮৭৩. দুর্গাদাস লাহিড়ী, শুক্ল যজুর্বেদ সংহিতা, অক্ষয় লাইব্রেরী, কলিকাতা : ২০১৩৪.হরিদাসসিদ্ধান্তনাগীশ, মহাভারত, বিশ্ববাণী প্রকাশনী, কলিকাতা: দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৩৮৩ বঙ্গাব্দ৫. জগদীশ চন্দ্র ঘোষ (সম্পাদিত), শ্রীগীতা, প্রেসিডেন্সী লাইব্রেরী, কলিকাতা: ৩৩ সংস্করণ, ২০০৬৬. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গীতবিতান, প্রতীক প্রকাশনা সংস্থা, ঢাকা: ২০০৮৭. কার্লমার্কস, পুঁজি, ইতিহাস প্রকাশন, ঢাকা: প্রথম প্রকাশ, ২০১৬

'একাত্ম মানববাদ' দর্শনের বৈদিক পরম্পরা

আর নয় ব্যবহার—এবার চাই সচেতনতা, আত্মমর্যাদা ও জবাবদিহি

বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর নির্যাতন, নিপীড়ন, হামলা ও বৈষম্যের অভিযোগ যখন বারবার সামনে আসে, তখন শুধু উৎসবের সময় নিরাপত্তার চাদর বিছিয়ে দিয়ে আমাদের বাস্তবতাকে আড়াল করার চেষ্টা কোনো সমাধান হতে পারে না।আমরা নিরাপত্তা চাই—কিন্তু এমন নিরাপত্তা চাই না, যার দৃশ্য দেখে মনে হবে আমরা স্বাধীনভাবে উৎসব করছি না, বরং নিরাপত্তাবেষ্টিত কোনো প্রদর্শনীর অংশ!আমাদের উৎসব খোলামেলা হবে, স্বাভাবিক হবে, মর্যাদাপূর্ণ হবে।আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব হলো নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সেই নিরাপত্তা যেন এমন প্রচারে পরিণত না হয় যে, “হিন্দুরা বাংলাদেশে ভালোই আছে”—অথচ উৎসবের বাইরে তাদের বাস্তব জীবন, নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।এবার শারদীয় দুর্গাপূজায় নতুন বার্তা দিতে হবেহিন্দুদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে এবার আমাদের আত্মসমালোচনা করা প্রয়োজন।আমরা অপ্রয়োজনীয় আড়ম্বর কমাব।ধর্মীয় রীতি ও শাস্ত্রীয় বিধানকে প্রাধান্য দেব।প্রয়োজনে ক্ষুদ্র পরিসরে পূজা করব।সম্ভব হলে কোথাও কোথাও ঘটপূজার মতো সরল আয়োজনের কথাও বিবেচনা করব।কারণ, আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাস কোনো প্রদর্শনীর বিষয় নয় এবং আমাদের ধর্মীয় উৎসব কারও প্রচারণার মঞ্চও নয়।আর একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন—ধর্মীয় অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অতিথি করে এনে কোনো রাজনৈতিক প্রচারণার সুযোগ সৃষ্টি করার প্রয়োজন নেই।আমরা অন্য ধর্মাবলম্বী ভাই-বোনদের সম্মান করব, তাঁদের আপ্যায়ন করব এবং সম্প্রীতি বজায় রাখব। কিন্তু আমাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক অতিথি হিসেবে তাঁদের আমন্ত্রণ জানানো বাধ্যতামূলক নয়।আমাদের অনুষ্ঠানে আমাদের এলাকার জ্যেষ্ঠ, সম্মানিত ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিরাই সম্মানের আসনে থাকবেন।ধর্মীয় আবেগের ব্যবসা বন্ধ হোকজন্মাষ্টমী ও জগন্নাথদেবের রথযাত্রার মতো বৃহৎ ধর্মীয় আয়োজন নিয়েও হিন্দু সমাজকে প্রশ্ন করতে হবে।কোনো ধর্মীয় আয়োজন যদি মানুষের বিশ্বাস ও আবেগকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়, তাহলে সেখানে অর্থের স্বচ্ছতা, সরকারি সুযোগ-সুবিধার ব্যবহার এবং আয়োজকদের জবাবদিহি অবশ্যই থাকতে হবে।কোনো কমিটি, সংগঠন বা ব্যক্তি যদি ধর্মীয় আয়োজনকে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে থাকে—তাহলে তার জবাবদিহি চাই।ধর্মের নামে সুবিধা নেওয়া যাবে না।ভক্তির নামে ব্যবসা করা যাবে না।হিন্দুদের আবেগকে পুঁজি করে ব্যক্তিগত বা সাংগঠনিক স্বার্থ হাসিল করা যাবে না।আমরা কারও বিরুদ্ধে অযাচিত অভিযোগ করতে চাই না; কিন্তু অভিযোগ উঠলে তার স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহি চাই। কারণ ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে মানুষের আস্থা জড়িত।আর ব্যবহার হতে চাই নাসবচেয়ে বড় প্রশ্ন আমাদের নিজেদের কাছেই—আমরা কি শুধু ব্যবহার হওয়ার জন্য?কেউ আমাদের ধর্মীয় আবেগ ব্যবহার করবে, কেউ আমাদের উৎসব ব্যবহার করবে, কেউ আমাদের সংখ্যাকে ব্যবহার করবে, কেউ আমাদের নাম ব্যবহার করে সুবিধা নেবে—আর আমরা নীরবে তা মেনে যাব?না। এবার সচেতন হতে হবে।আমাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান হবে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী।আমাদের উৎসব হবে আত্মমর্যাদার সঙ্গে।আমাদের সম্প্রীতি থাকবে—কিন্তু আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে নয়।আমরা সবাইকে সম্মান করব—কিন্তু নিজেদেরও সম্মান করতে শিখব।হিন্দু সমাজকে আর কারও হাতিয়ার হতে দেওয়া যাবে না।আমাদের উৎসব কারও রাজনৈতিক প্রচারণার মঞ্চ নয়।আমাদের ধর্ম কারও ব্যক্তিগত স্বার্থের সম্পদ নয়।আমাদের আবেগ কারও ব্যবসার পুঁজি নয়।এবার সিদ্ধান্ত আমাদেরআমরা চাই না শুধু উৎসবের দিনগুলোতে আমাদের নিরাপত্তা দেখিয়ে বিশ্বের সামনে বাংলাদেশের হিন্দুদের একটি সুন্দর ছবি তুলে ধরা হোক।আমরা চাই—সারা বছর হিন্দুরা নিরাপদ থাকুক।আমরা চাই—মন্দির নিরাপদ থাকুক।আমরা চাই—ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত হোক।আমরা চাই—অপরাধের বিচার হোক।আমরা চাই—নাগরিক হিসেবে সমান অধিকার নিশ্চিত হোক।উৎসবের নিরাপত্তা নয়—সারা জীবনের নিরাপত্তা চাই।দেখানো সম্প্রীতি নয়—বাস্তব নিরাপত্তা ও সমঅধিকার চাই।ব্যবহার নয়—সম্মান চাই।নীরবতা নয়—জবাবদিহি চাই।এবার হিন্দু সমাজকে জাগতে হবে।নিজেদের ধর্ম, অধিকার, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ নিজেদের হাতেই রক্ষা করতে হবে।

আর নয় ব্যবহার—এবার চাই সচেতনতা, আত্মমর্যাদা ও জবাবদিহি

রংপুরে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ চারজনের হত্যা: পুলিশের ‘ইয়াবা তত্ত্ব’ ঘিরে উঠছে একের পর এক প্রশ্ন

রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী এবং দুই সন্তানকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় পুলিশ যে গল্প হাজির করেছে, সেটি শুনলে মনে হয় তদন্তের চেয়ে চিত্রনাট্য লেখার কাজটাই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। পুলিশের দাবি, পাশের বাড়ির ছাদ দিয়ে দুই তরুণ গণপতির বাড়িতে ঢুকে ইয়াবা সেবন করছিল। গণপতি বাধা দেওয়ায় তাকে হত্যা করা হয়। এরপর পরিচয় ফাঁস হওয়ার আশঙ্কায় তার স্ত্রী, মেয়ে এবং ঘুমন্ত ছেলেকেও একে একে হত্যা করা হয়। চারটি হত্যাকাণ্ড শেষ করে তারা নাকি গোসল করেছে, খেজুর ও শসা খেয়েছে, আবার ইয়াবা সেবন করেছে, স্বর্ণালংকার পরীক্ষা করেছে, মোবাইল ফোন পানিতে ডুবিয়েছে এবং পরদিন জুমার নামাজের সময় নিশ্চিন্তে বেরিয়ে গেছে। প্রশ্ন হলো, এটি কি সত্যিই ঘটনাস্থলের আলামতনির্ভর তদন্তের ফল, নাকি একটি ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের গভীরতর কারণকে চাপা দেওয়ার জন্য অতিদ্রুত তৈরি করা সুবিধাজনক ব্যাখ্যা? সবচেয়ে বড় অসংগতি পুলিশের নিজের বক্তব্যেই। মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশ ও অপরাধ তদন্ত বিভাগের প্রাথমিক ধারণা ছিল, এটি পরিকল্পিত ডাকাতি। বাড়ির আলমারি ভাঙা, আসবাব তছনছ, স্বর্ণালংকারের বাক্স ছড়িয়ে থাকা এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার তথ্য সামনে এনে পুলিশ বলেছিল, ডাকাতি করতে গিয়ে চারজনকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই বক্তব্য পাল্টে বলা হলো, ডাকাতির দৃশ্য সাজানো হয়েছিল। অথচ একই সঙ্গে পুলিশ আবার বলছে, বাড়ি থেকে স্বর্ণালংকার নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং আটক ব্যক্তিদের দেখানো স্থান থেকে সেগুলো উদ্ধার করা হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, স্বর্ণালংকার সত্যিই চুরি হয়ে থাকলে ডাকাতির ঘটনাকে নিছক সাজানো নাটক বলা হচ্ছে কেন? আর যদি ডাকাতি প্রকৃত উদ্দেশ্য না-ই হয়, তাহলে খুনিরা স্বর্ণালংকার নিয়ে পালাল কেন? পুলিশের প্রথম বক্তব্য ভুল ছিল, নাকি পরের বক্তব্য অসম্পূর্ণ? আরেকটি প্রশ্ন, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করল কে, কখন এবং কেন? দুই তরুণ যদি হঠাৎ ইয়াবা সেবনের সময় ধরা পড়ে আকস্মিক উত্তেজনায় চারজনকে হত্যা করে থাকে, তাহলে পুরো বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার প্রয়োজন হলো কেন? এটি কি আগে থেকে নেওয়া কোনো প্রস্তুতি? বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল হত্যার আগে, নাকি পরে? এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থার রেকর্ড, বাড়ির প্রধান সুইচ, বৈদ্যুতিক সংযোগ এবং সম্ভাব্য সিসিটিভির কার্যক্রম পরীক্ষা করা হয়েছে কি? একটি আকস্মিক মাদকসেবনকেন্দ্রিক ঝগড়ার সঙ্গে পরিকল্পিতভাবে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করার ঘটনাটি কীভাবে মেলে?মোবাইল ফোন নিয়েও প্রশ্ন কম নয়। নিহত পরিবারের স্বজন বলেছেন, চারজনের চারটি ফোনেই যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছিল এবং প্রতিটি ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। কিন্তু পুলিশ সংবাদ সম্মেলনে বলছে, দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয়েছিল। তাহলে বাকি দুটি ফোন কোথায়? চারটি ফোন কখন বন্ধ হলো? ফোনগুলোর সর্বশেষ কল, বার্তা, অবস্থান এবং তথ্য মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছে কি? যদি কোনো হুমকি, চাঁদার দাবি, আর্থিক বিরোধ বা পূর্বপরিকল্পনার তথ্য ফোনে থেকে থাকে, তাহলে সেই তথ্য উদ্ধার না করেই ইয়াবাকে হত্যার একমাত্র কারণ হিসেবে ঘোষণা করার এত তাড়া কেন?সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও গুরুতর একটি অভিযোগ ঘুরছে। কয়েকটি প্রকাশ্য পোস্টে দাবি করা হয়েছে, গণপতি চক্রবর্তীর কাছে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদা দাবি করা হচ্ছিল এবং তিনি সেই চাপের মুখে ছিলেন। এই অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি, তাই এটিকে প্রতিষ্ঠিত সত্য বলা যাচ্ছে না। কিন্তু অভিযোগটি যদি তদন্তযোগ্য হয়, তাহলে পুলিশ কি নিহত ব্যক্তির স্বজন, সহকর্মী, প্রতিবেশী ও বাড়ির নির্মাণশ্রমিকদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছে? বাড়ি নির্মাণ নিয়ে কোনো বিরোধ ছিল কি? স্থানীয় কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠী অর্থ দাবি করেছিল কি? থানায় কোনো সাধারণ ডায়েরি, অভিযোগ বা মৌখিকভাবে নিরাপত্তা চাওয়ার রেকর্ড আছে কি? চাঁদাবাজির অভিযোগ সত্য হলে তা গোপন করা অপরাধের বিচারকে বাধাগ্রস্ত করবে, আর মিথ্যা হলে প্রমাণসহ সেটি খণ্ডন করাও পুলিশের দায়িত্ব। পুলিশ বলছে, অভিযুক্ত দুই তরুণ নিহত পরিবারের পরিচিত। তাহলে প্রশ্ন, তারা যদি পরিচিতই হয়, একটি ছাদে ইয়াবা সেবনের ঘটনা ফাঁস হওয়ার ভয়েই কেন একটি পুরো পরিবার নিশ্চিহ্ন করতে হবে? একজনকে হত্যা করার পর পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল না? স্ত্রী ও মেয়ে যখন পর্যায়ক্রমে সিঁড়ি বেয়ে উঠছিলেন, তখন কি কেউ চিৎকার করেননি? আশপাশের বাড়ির লোকজন কিছু শুনলেন না? আর ঘুমন্ত শিশুকে হত্যা করার প্রয়োজন কেন হলো, যদি সে কোনো ঘটনাই দেখে না থাকে? পরিচয় গোপন করার যুক্তিতে ঘুমন্ত শিশুকে হত্যার ব্যাখ্যা কোথায়? এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে শুধু “পরিচয় ফাঁস হওয়ার ভয়” বললেই কি চারটি হত্যার উদ্দেশ্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়?অভিযুক্তরা নাকি হত্যার পরও দীর্ঘ সময় বাড়িতে অবস্থান করেছে। গোসল করেছে, খাবার খেয়েছে, ইয়াবা সেবন করেছে এবং পরদিন দুপুরে বেরিয়ে গেছে। তাহলে এত সময়ের মধ্যে বাড়ির বাইরে তাদের উপস্থিতি, প্রবেশ বা বের হওয়ার কোনো ভিডিও ফুটেজ আছে? প্রতিবেশী কেউ তাদের দেখেছেন? বাড়ির মূল ফটক বাইরে থেকে বন্ধ বা তালাবদ্ধ অবস্থায় পাওয়া গেলে তারা কীভাবে বের হলো এবং কে তালা লাগাল? চাবি কোথা থেকে এল? পাশের বাড়ির ছাদ দিয়ে ঢুকলে বের হওয়ার পথ কি একই ছিল, নাকি প্রধান ফটক ব্যবহার করা হয়েছে? আর যদি তারা সত্যিই আলামত নষ্ট করতে সচেতন হয়ে ফোন ডিটারজেন্টে ডুবিয়ে রাখে, তাহলে খেজুরের বিচি, মাদকসেবনের সরঞ্জাম ও অন্যান্য সম্ভাব্য নমুনা ফেলে রেখে গেল কেন?এখানেই তদন্তের সবচেয়ে জরুরি জায়গা, ফরেনসিক প্রমাণ। খেজুরের বিচি ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে বলে পুলিশ নিজেই জানিয়েছে। অর্থাৎ পরীক্ষার ফল তখনও আসেনি। আঙুলের ছাপ, ডিএনএ, মৃত্যুর সময়, নিহতদের নখের নিচের নমুনা, অভিযুক্তদের শরীরে প্রতিরোধের চিহ্ন, গামছা বা রশিতে পাওয়া জৈব আলামত এবং ফোনের তথ্য বিশ্লেষণ শেষ হওয়ার আগেই পুরো ঘটনার এত নিখুঁত বর্ণনা পুলিশ পেল কীভাবে? শুধুই আটক দুজনের কথিত স্বীকারোক্তি থেকে? যদি তাই হয়, তাহলে সেই স্বীকারোক্তি কি ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে দেওয়া হয়েছে, নাকি পুলিশ হেফাজতে? বাংলাদেশের সাক্ষ্য আইনের ২৫ ধারায় পুলিশ কর্মকর্তার কাছে দেওয়া স্বীকারোক্তি সাধারণভাবে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। তাহলে বিচারিকভাবে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ আসার আগেই সংবাদ সম্মেলনে চূড়ান্ত ঘটনার মতো করে সব ঘোষণা করার উদ্দেশ্য কী? এই হত্যাকাণ্ডকে সাম্প্রদায়িক, অসাম্প্রদায়িক, মাদকসংক্রান্ত বা ডাকাতি বলে আগেভাগেই একটি খোপে বন্দী করার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সত্য বের করা। নিহত ও অভিযুক্তদের ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে উদ্দেশ্য প্রমাণ হয় না। আবার ধর্মীয় পরিচয় দেখিয়ে সব প্রশ্ন বন্ধও করা যায় না। তদন্তকে অনুসরণ করতে হবে আলামত, অর্থের গতিপথ, ফোনের তথ্য, পূর্ববিরোধ, সম্ভাব্য চাঁদাবাজি, সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধ এবং অপরাধের প্রকৃত পরিকল্পনা।চারটি প্রাণহীন দেহের সামনে দাঁড়িয়ে পুলিশের কাছে জনগণের প্রশ্ন একটাই, আপনারা কি সত্যিই হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটন করছেন, নাকি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে একটি সহজ গল্প দাঁড় করিয়ে কঠিন প্রশ্নগুলোকে কবর দিচ্ছেন? যদি আপনাদের বক্তব্য সত্য হয়, তাহলে ফরেনসিক প্রতিবেদন প্রকাশ করুন, স্বর্ণালংকার উদ্ধারের নথি দেখান, ফোনের তথ্য উদ্ধার করুন, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নের রহস্য ব্যাখ্যা করুন, সম্ভাব্য চাঁদাবাজির অভিযোগ যাচাই করুন এবং আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করুন। আর যদি এসব প্রশ্নের উত্তর না থাকে, তাহলে “ইয়াবা সেবনে বাধা” কোনো চূড়ান্ত সত্য নয়। এটি কেবল পুলিশের একটি দাবি, যার ভেতরে এখনো অসংখ্য ফাঁক, অসংখ্য সন্দেহ এবং আড়ালে থাকা সম্ভাব্য সত্যের দীর্ঘ ছায়া।সূত্র : সুশান্ত দাসগুপ্তের ফেসবুক পোস্ট থেকে সংগৃহীত https://www.facebook.com/share/1DZdZ7EcR4/

রংপুরে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ চারজনের হত্যা: পুলিশের ‘ইয়াবা তত্ত্ব’ ঘিরে উঠছে একের পর এক প্রশ্ন

প্রবীণরা অবহেলার পাত্র নন, অভিজ্ঞতার আধার: লেফট্যানেন্ট কর্নেল (অব.) তপন মিত্র চৌধুরী

প্রবীণরা সমাজের বোঝা নন; তারা জাতির অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার। তাঁদের মেধা, শ্রম, ত্যাগ ও প্রজ্ঞার ওপর দাঁড়িয়েই আজকের সমাজ ও সভ্যতা গড়ে উঠেছে। তাই তাঁদের প্রতি সম্মান, ভালোবাসা ও সেবা প্রদান আমাদের নৈতিক এবং সামাজিক দায়িত্ব। আজকের নবীনই আগামী দিনের প্রবীণ—এই চিরন্তন সত্যকে মনে রেখেই প্রবীণদের অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।​জন্ম ও মৃত্যুর মতোই মানুষের জীবনচক্রে রয়েছে কয়েকটি স্বাভাবিক ধাপ—শৈশব, কৈশোর, যৌবন এবং বার্ধক্য। যারা দীর্ঘজীবন লাভ করে বার্ধক্যে উপনীত হন, তাদের অধিকাংশেরই একই স্বপ্ন থাকে—জীবনের শেষ দিনগুলো পরিবার পরিজনদের সাথে শান্তিপূর্ণভাবে কাটিয়ে একদিন এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়া। কিন্তু বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন। বাংলাদেশে সাধারণত ৬০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সীদের প্রবীণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির ফলে দেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশের বেশি।​বার্ধক্যে পৌঁছানোর সাথে সাথে মানুষের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন, একাকীত্ব, আয় অভাব, পরনির্ভরতা এবং সামাজিক অবহেলার মতো নানামুখী সমস্যা প্রকট হয়ে ওঠে। শৈশবে যেমন সন্তানদের সার্বক্ষণিক যত্ন নিতে হয়, বার্ধক্যে এসে অনেক প্রবীণ প্রবীণদেরও ঠিক তেমনই যত্নের প্রয়োজন হয়। যৌথ পরিবার ভাঙনের ফলে এবং আধুনিক একক পরিবারের প্রসারে প্রবীণরা ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সংকট হলো একাকীত্ব। সন্তানরা কাজ কিংবা পড়াশোনার সুবাদে বাইরে বা বিদেশে থাকায় প্রবীণদের দীর্ঘ সময় একা কাটাতে হয়, যা তাঁদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে।​স্বাস্থ্যসেবার দিক থেকেও প্রবীণরা নানা জটিলতায় ভোগেন। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, ক্যান্সার, বাত, দৃষ্টিশক্তি হ্রাস ও হৃদরোগের প্রকোপ বাড়ে। কিন্তু বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা এখনো শহরকেন্দ্রিক এবং চিকিৎসা ব্যয় অধিকাংশ প্রবীণদের নাগালের বাইরে। আর্থিক অনিশ্চয়তা প্রবীণদের জীবনকে আরও কঠিন করে তোলে। সরকারি চাকরিজীবীরা পেনশন পেলেও অধিকাংশ বয়স্ক ব্যক্তির জন্য বর্তমানে যে বয়স্ক ভাতা প্রদান করা হয় (প্রতি মাসে ৬৫০ টাকা), তা বর্তমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে অত্যন্ত অপ্রতুল। (News copied from- 'হিন্দুস নিউজ')​প্রবীণদের এই সংকট কেবল অর্থনৈতিক বা শারীরিক নয়, এটি মানবিক ও মানবাধিকারের বিষয়। মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে পরিবারে ও সমাজে প্রবীণ নির্যাতনের ঘটনাও বাড়ছে। এছাড়া ডিজিটাল প্রযুক্তির বৈষম্য ও প্রবীণবান্ধব অবকাঠামোর অভাবে হাঁটাচলা ও চলাফেরায় তাঁরা প্রতিনিয়ত বিপাকের মুখে পড়ছেন। প্রবীণদের সমস্যা দূর করতে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে স্বল্পমূল্যে জেরিওট্রিক চিকিৎসা, জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে প্রবীণ কর্নার চালু এবং প্রবীণবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ করা এখন সময়ের দাবি।​একটি সভ্য সমাজের মানদণ্ড নির্ধারিত হয় সে সমাজ তার প্রবীণ নাগরিকদের কতটা সম্মান, নিরাপত্তা ও মর্যাদা দেয়—তার ওপর। প্রবীণদের মানবাধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পরিবার, স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে যৌথভাবে এগিয়ে আসতে হবে, তবেই গড়ে উঠবে একটি প্রকৃত প্রবীণবান্ধব বাংলাদেশ।

প্রবীণরা অবহেলার পাত্র নন, অভিজ্ঞতার আধার: লেফট্যানেন্ট কর্নেল (অব.) তপন মিত্র চৌধুরী

মহাভারতের শিখণ্ডী-ভীষ্ম রূপক: আন্দোলন, ক্ষমতা ও রাজনৈতিক কৌশলের এক চিরন্তন পাঠ

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পিতামহ ভীষ্ম ছিলেন অপরাজেয়। কিন্তু তাঁর একটি কঠিন প্রতিজ্ঞা ছিল—তিনি কোনো নারী বা যিনি পূর্বে নারী ছিলেন (যেমন শিখণ্ডী), তাঁর বিরুদ্ধে কখনো অস্ত্র ধরবেন না। অর্জুন এবং শ্রীকৃষ্ণ ভীষ্মের এই নীতিগত দুর্বলতাকে চমৎকারভাবে কাজে লাগালেন। তারা শিখণ্ডীকে রথের সামনে দাঁড় করিয়ে দিলেন।​ভীষ্ম তাঁর নৈতিক অবস্থানের কারণে অস্ত্র নামিয়ে নিলেন, আর সেই সুযোগে পিছন থেকে অর্জুন অবিরাম তীর ছুঁড়ে পিতামহ ভীষ্মকে পরাস্ত করলেন।​এখানে শিখণ্ডী কিন্তু যুদ্ধ জয়ের মূল নায়ক ছিলেন না, তিনি ছিলেন কেবল একটি "নৈতিক ঢাল"। আসল লক্ষ্যভেদ করেছিলেন অর্জুন, আর এর যাবতীয় রাজনৈতিক সুবিধা ভোগ করেছিল পাণ্ডব পক্ষ।​১. মানবিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিক: যখন আদর্শ মুখোমুখি হয় ব্যবহারিক রাজনীতির​যখন একজন সাধারণ মানুষ বা নিবেদিতপ্রাণ আন্দোলনকারী নিজেকে এই রূপকের জায়গায় দাঁড় করান, তখন বিষয়টি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও নির্মম হয়ে ওঠে:​আদর্শ বনাম ক্ষমতার রাজনীতি:আপনি বা আপনার মতো সাধারণ মানুষ যখন কোনো অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নামেন, তখন আপনাদের সামনে থাকে নিঃস্বার্থ আবেগ, ন্যায়ের তাগিদ এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন। কিন্তু যখন বুঝতে পারেন যে, এই পবিত্র আবেগকে ক্ষমতার অলিন্দে থাকা কেউ নিজেদের স্বার্থে "ঢাল" হিসেবে ব্যবহার করছে, তখন তীব্র একাকীত্ব ও প্রতারণার এক গভীর ক্ষত তৈরি হয়। ইতিহাস সাক্ষী, যেকোনো বড় সংকটে সরলমনা ও অধিকারবঞ্চিত মানুষগুলোই বুক চিতিয়ে সবার সামনে লড়াই করে। কিন্তু পর্দার আড়ালের চালকেরা যখন সেই ত্যাগকে সিঁড়ি বানিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করে ফেলে, তখন সামনের সারির প্রকৃত যোদ্ধারা কেবলই একটা সংখ্যা বা দাবার ঘুঁটিতে পরিণত হন।​মূল সত্য: ক্ষমতার লড়াইয়ে নীতি যেখানে গৌণ, সেখানে আদর্শবাদী মানুষেরা প্রায়শই "শিখণ্ডী"র মতো ব্যবহৃত হন। তাঁদের আত্মত্যাগকে সামনে রেখে লাভবান হয় তৃতীয় কোনো পক্ষ, আর মূল যোদ্ধারা দিনশেষে রয়ে যান উপেক্ষিত।

মহাভারতের শিখণ্ডী-ভীষ্ম রূপক: আন্দোলন, ক্ষমতা ও রাজনৈতিক কৌশলের এক চিরন্তন পাঠ

গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে রামমন্দির নির্মাণ ঘিরে বিতর্ক: ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন

বাংলাদেশে কয়েক লক্ষ মসজিদ রয়েছে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়মিত নতুন মসজিদ নির্মিত হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে নির্মাণাধীন একটি রামমন্দির ও রামের মূর্তি স্থাপনকে কেন্দ্র করে আপত্তি, হুমকি ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ঘটনা নতুন করে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।লেখিকা তসলিমা নাসরিন তার এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, যদি ধর্মীয় স্বাধীনতা সত্যিই সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয়, তবে তা কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর জন্য সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেও একইভাবে কার্যকর হতে হবে। কারও ব্যক্তিগত পছন্দ বা অপছন্দের কারণে অন্যের উপাসনালয় নির্মাণে বাধা দেওয়া কিংবা তা ভেঙে ফেলার হুমকি দেওয়ার কোনো নৈতিক বা আইনি ভিত্তি নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।পলাশবাড়ীতে রামমন্দির নির্মাণের বিরোধিতাকে উদ্বেগজনক আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত কোনো রাষ্ট্রে ধর্মীয় মতভেদ বা বিরোধের সমাধান সহিংসতা, উসকানি কিংবা বর্বরতার মাধ্যমে হতে পারে না। রাষ্ট্রের আইন ও বিচারব্যবস্থার মাধ্যমেই যেকোনো বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়া উচিত।তিনি আরও স্মরণ করিয়ে দেন যে, পলাশবাড়ী অঞ্চলে অতীতেও হিন্দু মন্দিরে হামলা ও প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। ফলে স্থানীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হওয়াকে অস্বাভাবিক বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের উদাহরণ তুলে ধরে তসলিমা নাসরিন বলেন, ইন্দোনেশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও ওমানের মতো দেশে বড় বড় হিন্দু মন্দির রয়েছে এবং সেসব দেশে মন্দিরের অস্তিত্ব রাষ্ট্রের জন্য কোনো হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয় না। তাই বাংলাদেশে একটি মন্দির নির্মাণকে কেন্দ্র করে কেন এত বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে, সেই প্রশ্নও তিনি উত্থাপন করেন।তিনি মনে করেন, হিন্দুবিদ্বেষ, মুসলিমবিদ্বেষ, ইহুদিবিদ্বেষ কিংবা খ্রিস্টানবিদ্বেষ—যে কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষই একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য ক্ষতিকর। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা প্রদান করা এবং যারা সহিংসতা বা ভাঙচুরের হুমকি দেয় তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা।একটি গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে যেমন মসজিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তেমনি মন্দির, গির্জা ও বৌদ্ধবিহারের নিরাপত্তাও সমানভাবে নিশ্চিত করতে হবে। আইনের শাসন ও সাংবিধানিক সমঅধিকারের মৌলিক দাবি এখানেই নিহিত রয়েছে।

গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে রামমন্দির নির্মাণ ঘিরে বিতর্ক: ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন

মূল্যবান সুযোগের সদ্ব্যবহারই প্রকৃত প্রতিনিধিত্বের পরিচয়

কোনো নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে কিংবা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের মঞ্চে কথা বলার সুযোগ পাওয়া নিঃসন্দেহে একটি বিরল ও মূল্যবান বিষয়। বিশেষ করে একজন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি যখন সেই সুযোগ লাভ করেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাঁর বক্তব্য ঘিরে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি হয়। তাঁরা আশা করেন, দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, নিরাপত্তাহীনতা ও বৈষম্যের বিষয়গুলো যথাযথভাবে তুলে ধরা হবে এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে তাদের ন্যায্য দাবিগুলোর প্রতিফলন ঘটবে।সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ধর্মীয় স্বাধীনতা, সম্পত্তির সুরক্ষা, আইনি নিরাপত্তা, সহিংসতার বিচার এবং সমঅধিকারের মতো বিষয়গুলো আজও গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। ফলে যে প্রতিনিধি তাঁদের হয়ে কথা বলার সুযোগ পান, তাঁর কাছে এসব বিষয় অগ্রাধিকার পাবে—এটাই জনগণের প্রত্যাশা।কিন্তু যদি সেই মূল্যবান সুযোগ এমন কোনো বিষয়ে ব্যয় হয়, যার বাস্তব প্রয়োজনীয়তা সীমিত কিংবা যা জনগণের মৌলিক সমস্যা ও দৈনন্দিন সংকটের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়, তাহলে অনেকের কাছেই সেটি দূরদর্শিতার অভাব হিসেবে প্রতীয়মান হতে পারে। এতে প্রশ্ন উঠতে পারে, প্রতিনিধিত্বের সেই সুযোগটি জনগণের প্রকৃত স্বার্থে কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ কেবল ব্যক্তিগত উপস্থিতি জানান দেওয়ার ক্ষেত্র নয়; এটি নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তার এবং অবহেলিত মানুষের কণ্ঠস্বর তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সেই সুযোগ যদি জনস্বার্থের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তা এক ধরনের "হারানো সুযোগ" হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। একজন প্রতিনিধি তাঁর ব্যক্তিগত মতামতের পাশাপাশি একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর আকাঙ্ক্ষা, উদ্বেগ ও প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটান। ফলে তাঁর বক্তব্যের বিষয়বস্তু এবং অগ্রাধিকার নির্ধারণ ভবিষ্যতে সেই সম্প্রদায়ের দাবি-দাওয়া কতটা গুরুত্ব পাবে, তার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।সামাজিক ক্ষেত্রেও এর প্রভাব কম নয়। যখন সাধারণ মানুষ দেখেন যে তাঁদের দীর্ঘদিনের বাস্তব সমস্যাগুলো আলোচনায় স্থান পাচ্ছে না, তখন তাঁদের মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে। তাঁরা মনে করতে পারেন, তাঁদের কণ্ঠস্বর যথাযথভাবে উপস্থাপিত হয়নি। এর ফলে প্রতিনিধিত্বের প্রতি আস্থার সংকটও সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।ধর্মীয় ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রেক্ষাপটে এই বিষয়টি আরও বেশি সংবেদনশীল। কারণ এই জনগোষ্ঠীগুলো অনেক ক্ষেত্রেই নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে থাকে। তাই তাঁদের প্রতিনিধিদের প্রতি প্রত্যাশাও তুলনামূলক বেশি থাকে। সেই প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে নিরাপত্তা, অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং মর্যাদাপূর্ণ নাগরিক জীবন নিশ্চিত করার প্রশ্ন।সবশেষে বলা যায়, শুধু কথা বলার সুযোগ পাওয়াই কোনো প্রতিনিধির সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড নয়। বরং সেই সুযোগকে কতটা প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা, দায়িত্ববোধ এবং জনগণের কল্যাণে ব্যবহার করা হলো, সেটিই প্রকৃত প্রতিনিধিত্বের পরিচয় বহন করে। একজন প্রকৃত প্রতিনিধি সেই ব্যক্তিই, যিনি ব্যক্তিগত পছন্দ বা সীমিত বিষয়ে নয়, বরং জনগণের বাস্তব চাহিদা ও ভবিষ্যৎ স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তাঁর বক্তব্য উপস্থাপন করেন।লেখক: এডভোকেট সুশান্ত অধিকারী

মূল্যবান সুযোগের সদ্ব্যবহারই প্রকৃত প্রতিনিধিত্বের পরিচয়

বরগুনা জেলা পরিষদ ডাকবাংলোতে স্মৃতি রাণী (ইতি) ও তাঁর দুই কন্যার মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় বিশ্ব হিন্দু মহাসভা, বাংলাদেশ গভীর শোক ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

বরগুনা জেলা পরিষদ ডাকবাংলোতে স্মৃতি রাণী (ইতি) ও তাঁর দুই কন্যার মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় বিশ্ব হিন্দু মহাসভা, বাংলাদেশ গভীর শোক ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ঘটনাটির প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার লক্ষ্যে দ্রুত, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।এ প্রসঙ্গে বিশ্ব হিন্দু মহাসভা, বাংলাদেশ-এর দেশ প্রধান মৃদুল মন্ডল বলেন, “এই মর্মান্তিক ঘটনায় আমরা গভীরভাবে শোকাহত। ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। কোনো নিরপরাধ পরিবার যেন ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হয় এবং প্রকৃত অপরাধীরা যেন বিচারের মুখোমুখি হয়, সেটিই আমাদের প্রত্যাশা।”

বরগুনা জেলা পরিষদ ডাকবাংলোতে স্মৃতি রাণী (ইতি) ও তাঁর দুই কন্যার মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় বিশ্ব হিন্দু মহাসভা, বাংলাদেশ গভীর শোক ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

সংসদ ভবনে ডেপুটি স্পীকারের সঙ্গে ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের সাক্ষাৎ: পুরোহিত ভাতা ও মন্দির সংস্কারের দাবি

বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পীকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, এমপি’র সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন তাঁর নির্বাচনী এলাকার ব্রাহ্মণ পুরোহিত সম্প্রদায়ের একটি প্রতিনিধিদল। আজ বুধবার সংসদ ভবনে ডেপুটি স্পীকারের কার্যালয়ে ১২ সদস্যবিশিষ্ট এই প্রতিনিধিদলটি সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হন। কুশল বিনিময়কালে ডেপুটি স্পীকার পুরোহিতদের খোঁজখবর নেন এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে এলাকার উন্নয়নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।​সাক্ষাৎকার চলাকালীন পুরোহিত প্রতিনিধিদলটি ডেপুটি স্পীকারের কাছে তাঁদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও অবহেলার কথা তুলে ধরেন। তাঁরা উল্লেখ করেন যে, হিন্দু সম্প্রদায় হিসেবে অনেক সময় তাঁরা প্রান্তিক অবস্থানে থাকলেও বর্তমান ডেপুটি স্পীকারের আন্তরিকতায় তাঁরা দুর্গাপুরের উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে আগ্রহী। প্রতিনিধিদলের সদস্যরা ডেপুটি স্পীকারকে অত্যন্ত শ্রদ্ধাভরে ‘রাজা’ সম্বোধন করেন এবং তাঁর মঙ্গল কামনায় পবিত্র শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা পাঠ করে আশীর্বাদ প্রদান করেন। এসময় তাঁরা ডেপুটি স্পীকারকে একটি বিশেষ ‘উত্তরণী’ উপহার দেন এবং মন্দিরের সংস্কার, পুরোহিত ভাতা চালুসহ ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের জন্য তাঁকে সাদর আমন্ত্রণ জানান।​ডেপুটি স্পীকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল পুরোহিতদের কথা অত্যন্ত ধৈর্য সহকারে শোনেন এবং তাঁদের সার্বিক কল্যাণে কাজ করার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে, এলাকার মন্দিরের জন্য বরাদ্দ প্রদানে কোনো প্রকার অবহেলা বা বৈষম্য করা হবে না। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে মসজিদ, মন্দির ও গির্জার জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের তথ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উন্মুক্ত রাখা হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। অতীতে রাষ্ট্রীয় সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে দলীয় সংকীর্ণতা দেখা গেলেও তিনি সকল ভেদাভেদ ভুলে দলমত নির্বিশেষে সবার পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন।​সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর গুরুত্বারোপ করে ডেপুটি স্পীকার বলেন যে, মানুষের পরিচয় ধর্ম দিয়ে নয়, বরং মানবতা দিয়ে। সবার রক্ত লাল এবং সবাই আমরা বাংলাদেশি—এই চেতনাকে ধারণ করেই কাজ করতে হবে। তিনি তাঁর নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন ধর্ম ও পেশার মানুষকে পর্যায়ক্রমে সংসদ ভবন পরিদর্শনের সুযোগ করে দিচ্ছেন যাতে সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রীয় কাজ সম্পর্কে সরাসরি ধারণা লাভ করতে পারেন। ইতিপূর্বে খ্রিষ্টান, ইমাম, হাজং সম্প্রদায়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও এই সুযোগ পেয়েছেন।​সাক্ষাৎকালে উপস্থিত ছিলেন বীরেশ্বর চক্রবর্তী, মিন্টু ভাদুরী, অপরেশ চক্রবর্তী, গৌতম চক্রবর্তী, বিমল চৌধুরী, উৎপল শর্মা, রতন শর্মা, সুজয় শর্মা, মানিক চক্রবর্তী, কেশব লাল চক্রবর্তী, সজয় চক্রবর্তী এবং সমরেশ চক্রবর্তী। প্রতিনিধিদলের সদস্যরা দুর্গাপুরের সন্তান হিসেবে ব্যারিস্টার কায়সার কামালকে গুরুত্বপূর্ণ এই সাংবিধানিক পদে পাওয়ায় তাঁর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। সবশেষে ডেপুটি স্পীকার তরুণ প্রজন্মকে মাদকের গ্রাস থেকে রক্ষা করতে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা ও নিজস্ব সংস্কৃতিচর্চায় মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দেন।

সংসদ ভবনে ডেপুটি স্পীকারের সঙ্গে ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের সাক্ষাৎ: পুরোহিত ভাতা ও মন্দির সংস্কারের দাবি

সংখ্যালঘু নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ: সনাতনী সম্প্রদায়ের ওপর ধারাবাহিক হামলা, প্রশাসনের নীরবতা কেন?

বাংলাদেশ বহুদিন ধরেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েক মাসে সনাতনী (হিন্দু) সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর ধারাবাহিক হামলা ও হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। বাস্তবতার এই নির্মম চিত্র আমাদের ভাবিয়ে তুলছে—রাষ্ট্র কি তার সকল নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে?দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ব্যবসায়ী, শ্রমিক, যুবক থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত—কেউই এই সহিংসতার বাইরে থাকছেন না। এসব ঘটনা আর বিচ্ছিন্ন বলে মনে হয় না; বরং একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তু বানানোর প্রবণতা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত কয়েকটি নির্মম ঘটনার মধ্যে রয়েছে ময়মনসিংহের ভালুকায় দীপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ড, শরীয়তপুরের খোকন চন্দ্র দাসের মর্মান্তিক মৃত্যু, নরসিংদীর মনি চক্রবর্তী, চঞ্চল ভৌমিকের আগুনে পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগসহ একাধিক সহিংস ঘটনা। পাশাপাশি অল্প সময়ের ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন জেলায় একাধিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকেই ইঙ্গিত করে।এর ধারাবাহিকতায় কক্সবাজারের খুরুশকুলে পুরোহিত নয়ন সাধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ড এবং সাম্প্রতিক সময়ে এক কাস্টমস কর্মকর্তার হত্যার ঘটনাও নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এসব ঘটনা কেবল ব্যক্তিগত বা বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়—এগুলো আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই সামনে এনে দেয়।ধর্মের ভিত্তিতে একজন মানুষকে হত্যা করা শুধু একটি অপরাধ নয়—এটি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, সংবিধানের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন এবং রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার চরম অবক্ষয়ের বহিঃপ্রকাশ। প্রশ্ন হচ্ছে—কেন বারবার এমন ঘটনা ঘটছে? কেন অপরাধীরা দ্রুত আইনের আওতায় আসছে না?বাংলাদেশের সংবিধান সকল নাগরিকের সমান অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলে। কিন্তু বাস্তবতা যদি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে, তবে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। কোথায় সেই কঠোর পদক্ষেপ? কোথায় দৃশ্যমান বিচারপ্রক্রিয়া?মানবাধিকার সংস্থা ও বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও সহিংসতা গত কয়েক বছরে উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে গুজব, ধর্মীয় উসকানি কিংবা পরিকল্পিত বিদ্বেষমূলক কর্মকাণ্ড এই সহিংসতার পেছনে কাজ করছে। ফলে ভুক্তভোগী সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয়, অনিরাপত্তা ও অনিশ্চয়তা দিন দিন বাড়ছে।আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই—এই দেশ কোনো একটি ধর্মের নয়; এটি সকল মানুষের। এখানে কোনো নাগরিক তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নির্যাতিত হবে—এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।এই মুহূর্তে প্রয়োজন—১। দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত২। অপরাধীদের চিহ্নিত করে দ্রুত বিচার ট্রাইবুনাল গঠন করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।৩। সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা জোরদার৪। রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে ঘৃণার রাজনীতি বন্ধ করা।আমরা সহিংসতা চাই না, প্রতিশোধ চাই না—আমরা চাই ন্যায়বিচার। রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালন করুক। বাংলাদেশ কোনো একটি ধর্মের নয়—এটি সকল মানুষের। ধর্ম নয়, মানুষই হোক সর্বাগ্রে।লেখক: এডভোকেট সুশান্ত অধিকারী

সংখ্যালঘু নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ: সনাতনী সম্প্রদায়ের ওপর ধারাবাহিক হামলা, প্রশাসনের নীরবতা কেন?

বৈশাখের ঝড়ে উড়ে যাক সব অশুভ শক্তি

বৈশাখের বর্ষবরণ বাংলাদেশের জাতীয় উৎসব। এই একটি মাত্র উৎসবে পুরো দেশ একযোগে মিলতে পারে। আমাদের বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায় ও জাতিগোষ্ঠীর নানা রকম উৎসব রয়েছে। ঈদ, দুর্গাপূজা, বুদ্ধপূর্ণিমা, বড়দিন সবই একেকটি ধর্ম সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য। কিন্তু পহেলা বৈশাখের উৎসবটি সর্বজনীন। এখানে সব ধর্ম-বর্ণ, জাতিগোষ্ঠী, পাহাড় ও সমতল, বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী, নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ সকলে মিলে আনন্দ করতে পারে।ভাবতে অবাক লাগে, এমন একটি উৎসবেরও বিরোধিতা হয়! পহেলা বৈশাখ এলেই দেশের একশ্রেণির মৌলবাদী মানুষের অশুভ বক্তব্য চোখে পড়ে। পহেলা বৈশাখকে ধর্মীয় অনুভূতির বিপরীতে দাঁড় করানোর অপচেষ্টা লক্ষণীয় হয়ে ওঠে, যা আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির পরিপন্থী।বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে বর্ষবরণের রীতি প্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত। চীনে প্রতি বছর চায়নিজ নিউ ইয়ার বা স্প্রিং ফেস্টিভালে ৫৬টি জাতিগোষ্ঠীর সকলেই অংশ নেয়। চীনের মুসলিমরাও নববর্ষ উদযাপন করেন। প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব নববর্ষ উৎসবও রয়েছে এবং তারা তা যথাযথভাবে পালন করেন।ইরানের মানুষ নওরোজ উদযাপন করেন। মোগল আমলে ভারতেও নওরোজ উদযাপিত হতো। দিল্লির প্রাসাদ প্রাঙ্গণে এক নওরোজের উৎসবেই যুবরাজ সেলিম ও নূরজাহানের দেখা হয়েছিল।প্রাচীনকাল থেকেই বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণসহ ১২ মাস বাঙালির একান্ত নিজস্ব ছিল। বাংলাসহ ভারতীয় উপমহাদেশে শকাব্দ, লক্ষ্মণাব্দ ইত্যাদি বর্ষপঞ্জিতে এই মাসগুলোই ব্যবহৃত হতো। প্রতিটি মাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুরাণ ও কাব্যকাহিনি। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন বর্ষপঞ্জি প্রচলিত ছিল এবং সেগুলো অনুসারে নববর্ষ পালনের রীতি ছিল। পহেলা বৈশাখে মূলত খাজনা পরিশোধ করা হতো। ব্যবসায়ীরা নতুন হিসাবের খাতা খুলতেন। এছাড়াও এই দিনকে ঘিরে নানা উৎসব-অনুষ্ঠান হতো।প্রাচীনকালে নববর্ষ ছিল মূলত ঋতুধর্মী উৎসব। গৌড়েশ্বর শশাঙ্কের সময়েও নববর্ষ পালিত হতো। পাল ও সেন আমলেও এই প্রথা ছিল। মুঘল আমলে কৃষকরা চৈত্র মাসের শেষ দিন পর্যন্ত ভূস্বামীদের খাজনা শোধ করতেন। শুধু খাজনা শোধ ও হালখাতা নয়, সঙ্গে মিষ্টিমুখ করা হতো। নবান্ন উৎসব হতো অগ্রহায়ণ মাসে, যাকে কখনো কখনো বর্ষবরণও বলা হতো।মুঘল সম্রাট আকবরের সময় একটি সমন্বিত বর্ষপঞ্জির প্রয়োজনে নতুন সন প্রচলিত হয়। বাংলা সনের জন্ম ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে, এ কথা অধিকাংশ পঞ্জিকাবিদ মেনে নিয়েছেন। তবে গণনা শুরু হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের বছর ১৫৫৬ থেকে। এই নতুন সনকে প্রথমে ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বলা হয়।সময়ের প্রয়োজনে বাংলা বর্ষপঞ্জি বেশ কয়েকবার সংস্কার হয়েছে। এর মূল সংস্কার করে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে গঠিত কমিটি। বর্তমান সরকারি বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রণেতা ভাষাসংগ্রামী আ জ ম তকীয়ূল্লাহ। তার প্রস্তাব অনুসারে বর্তমান বর্ষপঞ্জিতে খ্রিস্টীয় সাল ও বঙ্গাব্দের মাসগুলোর তারিখ স্থির রয়েছে। ফলে প্রতি বছর ১৪ এপ্রিলই পহেলা বৈশাখ হয়।আবহমান কাল থেকে বিভিন্ন লোকাচারের মাধ্যমে বাংলায় নববর্ষ পালনের রীতি চলে আসছে। চৈত্র সংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে মেলা বসত, চড়ক পূজা হতো। বৈশাখেও মেলা ও স্নানের রীতি ছিল। ক্রমে এই দিনকে ঘিরে নানা অনুষ্ঠান শুরু হয়। নৌকাবাইচ, বলীখেলা, মোরগ লড়াই, ষাঁড়ের লড়াই ইত্যাদি দিনটিকে উৎসবময় করে তুলত। নতুন বছরে পিঠা-পায়েস খাওয়া, অতিথি আপ্যায়ন চলত। অনেক অঞ্চলে নববর্ষের আগের রাতে স্নানের প্রচলন ছিল। এখনও দেশের বিভিন্ন জায়গায় মেলা বসে। অষ্টধাতু ভেজানো পানি ছিটানো, ঘরদুয়ার পরিষ্কার, গরু-বাছুর স্নান করানো, ব্যাঙের বিয়ে, মেঘরাজার গান, শিবের গাজন ইত্যাদি লোকাচার এখনও অনেক অঞ্চলে প্রচলিত আছে।পহেলা বৈশাখে ব্যবসায়ীরা নতুন হিসাবের খাতা খোলেন। এই উপলক্ষে দোকান সাজানো হয় এবং ক্রেতাদের মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। এই অনুষ্ঠানকে বলা হয় হালখাতা।পহেলা বৈশাখের আগে জমিদার বা নবাবকে সারা বছরের খাজনা পরিশোধের রীতি ছিল। জমিদারবাড়িতে সাধারণ প্রজাদের নিমন্ত্রণ করে সুখাদ্যে আপ্যায়ন করা হতো এবং মঙ্গল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। একে বলা হতো পুণ্যাহ। এখন এই রীতি আর নেই।ইংরেজ আমলে কলকাতায় সাহেবিয়ানার প্রভাবে নববর্ষ পালন কিছুটা কমে গেলেও, পূর্ববাংলার গ্রামে গ্রামে চড়ক ও বৈশাখী মেলা ঠিকই চলতে থাকে। বাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও জাতীয় বোধকে পুনর্জাগরিত করার লক্ষ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে নতুনভাবে পহেলা বৈশাখ পালনের ধারা শুরু করেন।পাকিস্তান আমলে বাঙালি সংস্কৃতির ওপর চলে নির্যাতন ও দমন। তার প্রতিবাদেই ঢাকায় ষাটের দশকের শেষের দিকে নতুন করে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের রীতি শুরু হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে ধীরে ধীরে পহেলা বৈশাখ দেশের প্রধান জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় শহুরে মেলা, শোভাযাত্রা ও নানা অনুষ্ঠান।পাহাড়ি জনগোষ্ঠী নিজস্ব ঐতিহ্য অনুসারে এই নববর্ষ পালন করেন। বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু ইত্যাদি উৎসবের মাধ্যমে তারা নববর্ষ বরণ করেন।পহেলা বৈশাখের বিরোধিতাকারীরা মূলত শহরের উৎসবের বিরোধিতা করেন, কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হিসেবে অথবা ধর্মীয় গোঁড়ামি থেকে। কিন্তু তারা কি গ্রামের মেলা ও লোকাচারের ঐতিহ্যকে অস্বীকার করতে পারবেন?১৯৮৯ সালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে চারুকলা ইনস্টিটিউটের ছাত্র-শিক্ষকদের উদ্যোগে মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরু হয়। এখন এটি আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। এই শোভাযাত্রা কোনো বিশেষ ধর্মের পরিচয় বহন করে না, বরং বাঙালির সামগ্রিক জাতীয় ঐতিহ্যকে ধারণ করে। ইউনেসকোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের মঙ্গল শোভাযাত্রা।আনন্দ শোভাযাত্রা বা বৈশাখী শোভাযাত্রা—নাম যেটাই দেওয়া হোক, সেখানে মূলত কী থাকে? এই শোভাযাত্রায় থাকে আমাদের চিরন্তন মোটিফ বা নকশায় তৈরি মুখোশ। গঙ্গাহৃদি, পুণ্ড্রবর্ধন, রাঢ়, গৌড়, বঙ্গ, সমতট, হরিকেলসহ প্রাচীন জনপদগুলোর লোক-ঐতিহ্যের ধারক মোটিফগুলোই এখানে ফুটে ওঠে। প্রাচীন বাংলার পোড়ামাটির ফলক ও মাটির টেপা পুতুলে আমরা যে ছবিগুলো দেখি প্যাঁচা, বাঘ, পাখি, হাতি, পুতুলগুলোই শোভাযাত্রায় উঠে আসে।শোভাযাত্রা তুলে ধরে আবহমান বাঙালির প্রিয় প্রতীকগুলো, যা এদেশের চিরন্তন লোকজ ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করে। ধর্মের দোহাই দিয়ে কেন এর বিরোধিতা? মঙ্গল শোভাযাত্রার সঙ্গে কোনো ধর্মের সম্পর্ক নেই। এর সম্পর্ক শুধু সুপ্রাচীন বাঙালির লোকজ ঐতিহ্যের সঙ্গে। ‘মঙ্গল’ শব্দের অর্থই কল্যাণ ও শুভ। নতুন বছরের শুভকামনা। তাহলে এত বিরোধিতা কেন?মৌলবাদী অপশক্তি বাংলাদেশের নিজস্ব ঐতিহ্যকে ভালোবাসে না। তারা ধর্মের নামে এই উৎসবকে খারিজ করতে চায়। ধর্মপ্রাণ মানুষের আবেগকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে সকল লোকজ ঐতিহ্যকে অস্বীকার করতে চায়। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, ধর্মের সঙ্গে এই উৎসবের কোনো বিরোধ নেই।চর্যাপদের কালে নিশ্চিত জানতাম যে আমরা বাঙালি। চর্যাপদের কবি ভুসুকু নিজেকে ‘বঙ্গাল’ বা বাঙালি বলতে দ্বিধা করেননি। পাল, সেন ও সুলতানি আমলেও ধর্ম যাই হোক, বাঙালির পালা-পার্বণে কারও আপত্তি ছিল না। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ সবাই একসঙ্গে চড়কের মেলা, বারুণীর স্নানযাত্রা, রথের মেলা, মহরমের মেলায় যেতেন। মোগল আমলে ফসলি সন, খাজনা আদায়, পুণ্যাহ পালনের পাশাপাশি বৈশাখের মেলা ও আনন্দ উৎসবে সবাই অংশ নিতেন।ব্রিটিশ আমলে ‘আমরা বাঙালি নাকি মুসলমান’ এই দ্বন্দ্বের মধ্যে আমাদের অনেক সময় চলে গেছে। এই দোলাচলের মধ্যেই দ্বিজাতিতত্ত্বের মতো একটি ভ্রান্ত ধারণার ভিত্তিতে আমরা বাংলাকে ভাগ করে ফেলি। ১৯৪৭ সালে পাই পাকিস্তান নামের একটি জোড়াতালি দেওয়া রাষ্ট্র। সেই রাষ্ট্র বারবার বলেছে, তুমি বাঙালি নও, তোমাকে হতে হবে ‘সাচ্চা মুসলমান’, ‘পাকি মুসলমান’।সাচ্চা মুসলমান হতে হলে প্রথমেই ভুলতে হবে যে তুমি বাঙালি। তোমার পোশাক, ভাষা, রীতিনীতি সবকিছুতেই ‘হিন্দুয়ানি’ গন্ধ। বাংলা ছেড়ে উর্দু ধরতে হবে। বাংলা লিখতে হবে আরবি অক্ষরে। বাংলায় আরবি-ফারসি শব্দ ঢুকিয়ে ভাষাকে বদলে ফেলতে হবে। স্বাভাবিক নিয়মে যা গৃহীত হয়েছে, তার বাইরেও জবরদস্তি করে হলেও এইসব নতুন নতুন পাকি শব্দ তোমাকে ব্যবহার করতে হবে।আর বাঙালির রীতি-রেওয়াজ? সর্বনাশ! ওগুলো তো আরও বেশি নাপাক। গায়ে হলুদ, পহেলা বৈশাখ, পহেলা ফাল্গুন এগুলো বর্জন কর যত দ্রুত সম্ভব। এই চিন্তাধারার বর্তমান উত্তরসূরিরাই আজ পহেলা বৈশাখের বিরোধিতা করছে।পহেলা বৈশাখ আমাদের প্রাণের উৎসব। এটি জীর্ণ পুরাতন ও অমঙ্গলকে দূরে সরিয়ে নতুন আলোয় চোখ মেলবার দিন। পহেলা বৈশাখকে সফল করতে এবং সকল অপশক্তির মূল উৎপাটন করতে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আসুন, দলে দলে উৎসবে শামিল হই। আমাদের সম্মিলিত শক্তির কাছে অশুভ শক্তি হার মানতে বাধ্য।আসুন, আমরা বৈশাখী ঝড় হয়ে উঠি। সেই ঝড়ের শক্তিতে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ আর বিভেদ সৃষ্টিকারী সব আবর্জনাকে উড়িয়ে দিই। দূর করি সকল মৌলবাদী ও জঙ্গিবাদী অপশক্তিকে।‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা/ অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’আমাদের সম্মিলিত বৈশাখী ঝড় দূর করে দিক সব অশুভকে। পহেলা বৈশাখ আমাদের ঐতিহ্যের উৎসব, যার অবস্থান ধর্মপরিচয়ের ঊর্ধ্বে। এই উৎসবের বিরুদ্ধে যে কোনো ষড়যন্ত্র বাংলাদেশ সর্বশক্তিতে প্রতিরোধ করবে।১৪৩৩ বঙ্গাব্দ হোক শুভ, সুন্দর ও কল্যাণে উদ্ভাসিত। নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ সকলের মঙ্গল হোক। শুভ নববর্ষ!

বৈশাখের ঝড়ে উড়ে যাক সব অশুভ শক্তি