রংপুরের পীরগঞ্জে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পুরোনো একটি ভিডিও নতুন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর হিন্দু পল্লীতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। সোমবার (২৬ অক্টোবর) সন্ধ্যার পর উপজেলার চককরিম গ্রামের হিন্দু পাড়ায় সংঘবদ্ধ একটি উগ্রবাদী দল হিন্দু বাড়িতে হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। হামলার সময় বাড়িগুলোর বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চককরিম গ্রামের বাসিন্দা বিশু চন্দ্রের ছেলে সৌরভ চন্দ্রের বিরুদ্ধে পবিত্র কোরআন নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করার অভিযোগ ওঠে। এ-সংক্রান্ত একটি পুরোনো ভিডিও ফেসবুকে নতুন করে প্রকাশের পর এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তবে অভিযোগে উল্লেখ করা বক্তব্যের সত্যতা কিংবা ধর্ম অবমাননার ঘটনা ঘটেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার মতো কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
অভিযোগ রয়েছে, সোমবার সন্ধ্যার পর ৫০ থেকে ৬০ জনের একটি সংঘবদ্ধ দল লাঠিসোঁটা নিয়ে সৌরভ চন্দ্রের বাড়িতে প্রবেশ করে। পরে সৌরভের বাবা বিশু চন্দ্র, কাকা জগদীশ চন্দ্র এবং সৌরভের বাড়িসহ মোট তিনটি বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, হামলার আগে অথবা লুটপাটের সময় বাড়িগুলোর বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর ঘরের টেলিভিশন, আলমারিসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র ও মালামাল ভাঙচুর করা হয় এবং মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায় হামলাকারীরা। ভুক্তভোগীরা হামলাকারীদের থামাতে হাত-পা ধরে অনুরোধ করলেও তারা কর্ণপাত করেননি বলে অভিযোগ করেছেন। হামলাকারীদের মধ্যে অনেকে বাইরের এলাকা থেকে এসেছিলেন বলেও দাবি করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
ঘটনার পর থেকে সৌরভ চন্দ্র আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে। অন্যদিকে, এলাকায় আবারও হামলার আশঙ্কায় হিন্দু পরিবারগুলোর মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। নিজেদের বাড়িঘর ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত দীনেশ চন্দ্র মহন্ত জানান, সন্ধ্যায় একদল লোক এসে তাঁদের বাড়িঘরে হামলা চালায় এবং কিছু আসবাবপত্র লুট করে নিয়ে যায়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন রংপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক, পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল্লাহ আল বাকিউল বারী এবং স্থানীয় বিএনপির নেতারা। এলাকায় শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। হামলা ও লুটপাটে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
ধর্ম অবমাননার মতো স্পর্শকাতর অভিযোগকে কেন্দ্র করে এ ধরনের হামলার ঘটনা নতুন করে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ উঠলে তার সত্যতা যাচাই করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগেই সংঘবদ্ধভাবে বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো আইনের শাসন ও নাগরিকের নিরাপত্তার জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।
পীরগঞ্জের চককরিম গ্রামের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, লুট হওয়া মালামাল উদ্ধারে উদ্যোগ নেওয়া এবং হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
মতামত