খাগড়াছড়ির লক্ষ্মীছড়ি বাজারে ছোট্ট একটি চায়ের দোকান চালিয়ে কোনোমতে সংসার চালাতেন দুই সন্তানের মা সীমা রানী দে। সামান্য আয় দিয়ে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেওয়াই ছিল তাঁর প্রতিদিনের সংগ্রাম। অথচ মাত্র ৫০ হাজার টাকা ঋণ নেওয়ার অভিযোগ থেকে ১৫ লাখ টাকার চেকসংক্রান্ত মামলায় আদালতের রায়ের পর আজ চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন এই অসহায় নারী। তাঁর দুর্দশা ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ ও সহানুভূতি।
স্থানীয় সূত্রে অভিযোগ উঠেছে, লক্ষ্মীছড়ি বাজারের কাপড় ব্যবসায়ী দীপক ধরের কাছ থেকে সীমা রানী ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। আর্থিক সংকটের মধ্যেও ওই ঋণের বিপরীতে এক লাখ টাকা পর্যন্ত পরিশোধ করতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়নি বলে দাবি করা হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে ১৫ লাখ টাকার চেকসংক্রান্ত মামলায় জড়িয়ে পড়েন সীমা রানী।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, একটি জীর্ণশীর্ণ দোকানে চা ও নাস্তা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করা নারীর সঙ্গে ১৫ লাখ টাকার লেনদেনের দাবি কীভাবে তৈরি হলো? প্রকৃতপক্ষে এত বড় অঙ্কের টাকা দেওয়া হয়ে থাকলে তার ব্যাংক লেনদেন, লিখিত চুক্তি কিংবা অন্য কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ রয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগ রয়েছে, পাওনাদারের একটি কুপ্রস্তাবে সীমা রানী রাজি না হওয়ায় তাঁদের মধ্যে বিরোধ আরও জটিল হয়ে ওঠে। তবে ওই প্রস্তাবের প্রকৃতি এবং অভিযোগটির সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
স্থানীয়ভাবে একাধিকবার বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করা হলেও কোনো সমাধান হয়নি বলে জানা গেছে। শেষ পর্যন্ত মামলাটি আদালতে গড়ায় এবং সীমা রানীর বিরুদ্ধে রায় আসে বলে স্থানীয় সূত্রে দাবি করা হচ্ছে। তবে রায়ের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ, মামলার ধারা ও সংশ্লিষ্ট নথি এখনো যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বর্তমানে সীমা রানীর আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত করুণ বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। একসময় যে দোকানের সামান্য আয় দিয়ে সংসার চালাতেন, সেই জীবিকার পথও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। একটি ভাঙাচোরা ঘর ছাড়া তাঁর আর তেমন কোনো সম্বল নেই বলে দাবি করা হচ্ছে।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, সীমা রানীর দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ। মায়ের জীবনে নেমে আসা এই সংকটের প্রভাব পড়ছে সন্তানদের জীবনেও। তাদের খাবার, পড়াশোনা, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা নিয়ে উদ্বিগ্ন স্থানীয়রা।
আদালতের রায়ের পর সীমা রানীর কারাগারে যাওয়ার আশঙ্কার কথাও সামনে এসেছে। তবে তাঁর বর্তমান আইনি অবস্থান এবং সাজা পরোয়ানার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সম্প্রতি স্থানীয় সংবাদভিত্তিক ফেসবুক পেজ ‘Green Shadow Lakshmichari’-তে প্রকাশিত একটি ভিডিও প্রতিবেদনে সীমা রানীর অসহায় জীবনযাপনের চিত্র তুলে ধরা হয়। এরপর বিষয়টি স্থানীয়ভাবে আলোচনায় আসে।
সচেতন মহলের দাবি, একজন দরিদ্র নারী আর্থিকভাবে অসচ্ছল হলেই তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা মিথ্যা প্রমাণিত হয় না। তবে এত বড় অঙ্কের আর্থিক দাবির পেছনে প্রকৃত লেনদেনের হিসাব, চেক প্রদানের পরিস্থিতি এবং প্রাসঙ্গিক নথিপত্র যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে। সীমা রানীর পক্ষ থেকে উত্থাপিত অভিযোগগুলোও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় পরীক্ষা করা জরুরি।
স্থানীয়দের মতে, সীমা রানীর আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে যেন তিনি প্রয়োজনীয় আইনগত সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হন। আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বা অন্য কোনো আইনগত প্রতিকারের সুযোগ থাকলে তা গ্রহণে তাঁকে সহায়তা করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে দুই সন্তানের ভরণপোষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন, সমাজসেবা বিভাগ এবং মানবিক সংগঠনগুলোর এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কাপড় ব্যবসায়ী দীপক ধরের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁর বক্তব্য ও মামলার নথি যাচাই করা হলে অভিযোগের বিষয়ে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।
একজন অসহায় মায়ের জীবনের এই সংকট এখন কেবল অর্থের হিসাবেই সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দুটি শিশুর ভবিষ্যৎ, একটি পরিবারের বেঁচে থাকার সংগ্রাম এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রত্যাশা।
লক্ষ্মীছড়ির সচেতন মহলের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টির প্রতি মানবিক দৃষ্টিতে নজর দেবে। সীমা রানীর বিরুদ্ধে দাবিকৃত অর্থের প্রকৃত ভিত্তি যাচাইয়ের পাশাপাশি তাঁর আইনগত অধিকার এবং সন্তানদের প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।
Hindus News — Voice of Hinduism
মতামত