কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে উদযাপিত শ্যামাপূজা ও কালীপূজা মূলত একই সনাতন ধর্মীয় আদিশক্তির পরম আরাধনা, যার পেছনে রয়েছে গভীর আধ্যাত্মিক ও শাস্ত্রীয় তাৎপর্য। বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অত্যন্ত ভক্তি, উৎসবমুখর পরিবেশ এবং ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে এই পবিত্র উৎসব পালিত হয়। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে এটি বছরের অন্যতম প্রধান ও মর্যাদাপূর্ণ একটি ধর্মীয় উৎসব, যা সমাজের প্রতিটি স্তরে আলো ও কল্যাণের বার্তা ছড়িয়ে দেয়।
শ্যামা এবং কালী—উভয় নামেই পূজিত হন সনাতন ধর্মের সেই পরম আদিশক্তি দেবী মহাকালী। বৈদিক ও শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই দুই নামের পেছনে রয়েছে সুন্দর ও তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাখ্যা। সংস্কৃত ভাষার 'কাল' শব্দ থেকে 'কালী' নামের উৎপত্তি, যার অর্থ সময় বা অন্ধকার। যিনি মহাকাল বা স্বয়ং সময়কে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করেন, তিনিই দেবী কালী। অন্যদিকে, 'শ্যামা' শব্দের অর্থ হলো শ্যামবর্ণা বা গাঢ় নীল-কালো রঙের অধিকারী। দেবীর শরীর বা কান্তি ঘোর নীল কিংবা শ্যামবর্ণের হওয়ায় ভক্তরা তাঁকে সস্নেহে 'শ্যামা' নামে ডেকে থাকেন। নামের এই ভিন্নতা সত্ত্বেও মূল আরাধনা এবং উপাসনার উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ এক ও অভিন্ন।
কার্তিক মাসের দীপান্বিতা অমাবস্যা তিথিতে যখন এই পূজার আয়োজন করা হয়, তখন একই সাথে উদযাপিত হয় বিশ্বজুড়ে সমাদৃত আলোকময় উৎসব দীপাবলি। এই উৎসব অঞ্চলভেদে দীপান্বিতা, দীপালিকা, সুখরাত্রি, সুখসুপ্তিকা ও যক্ষরাত্রি নামেও পরিচিত। ভারতের কিছু অঞ্চলে দীপাবলির দিনে দেবী লক্ষ্মীর পূজার প্রচলন থাকলেও, বাঙালি, অসমীয়া ও ওড়িয়া সম্প্রদায়ের মানুষ এদিন দেবী কালীর চরণে নিজেদের ভক্তি নিবেদন করেন। বাংলাদেশসহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জনপদে ঘরে ঘরে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন, আলোকসজ্জা এবং বিশেষ পূজা-আর্চনার মাধ্যমে এই রাতটিকে বরণ করে নেওয়া হয়। News copied from- 'হিন্দুস নিউজ' সর্বজীবে সমদর্শী সনাতনী সংস্কৃতি ও মানবাধিকারের মূল সুর ধারণ করে এই উৎসব সমাজের সকল বৈষম্য ভুলে মানুষকে এক সুতোয় বাঁধতে শেখায়।
শুধু কার্তিক মাসের দীপান্বিতা অমাবস্যাই নয়, সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বছরের অন্যান্য সময়েও বিশেষ তিথিতে দেবী কালীর আরাধনা করে থাকেন। এর মধ্যে মাঘ মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথিতে অনুষ্ঠিত রটন্তী কালীপূজা এবং জ্যৈষ্ঠ মাসের অমাবস্যা তিথিতে আয়োজিত ফলহারিণী কালীপূজা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই বিশেষ পূজাগুলোর মাধ্যমে ভক্তরা নিজেদের আত্মশুদ্ধি এবং জগতের কল্যাণ কামনা করেন। সনাতনীদের প্রাচীন ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং মানবাধিকারের সার্বজনীন বার্তা ধারণ করে শ্যামাপূজা ও কালীপূজা যুগে যুগে মানবসমাজে আলো, শান্তি ও সম্প্রীতির চিরন্তন দীক্ষা দিয়ে আসছে।
মতামত