ইব্রাহিমের ২২ বছরের কারাবাস: ৫ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়ে হিন্দু মহাজোটের রিট, হাইকোর্টের রুল
খালাসের আদেশ পাওয়ার পরও দীর্ঘ প্রায় আট বছর কারাগারে আটক থাকা খুলনার বটিয়াঘাটার ইব্রাহিম আলী শেখের পাশে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট। তাঁর দীর্ঘ কারাবাসের জন্য পাঁচ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ, পূর্ণ পুনর্বাসন, বাসস্থান ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার দাবিতে জনস্বার্থে হাইকোর্টে রিট করেছে সংগঠনটি। সেই রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে ইব্রাহিমকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি শেখ তাহসিন আলীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে এ রুল জারি করেন।বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের পক্ষে রিটটি দায়ের করেন সংগঠনটির মহাসচিব ও আইনজীবী গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক। রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মুহাম্মদ হাসান শহীদ কামরুজ্জামান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ইমাম হোসেন তারেক।খালাসের পরও আট বছর কারাগারেরিটের তথ্য অনুযায়ী, খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার ইব্রাহিম আলী শেখ পেশায় একজন নৈশপ্রহরী ছিলেন। ২০০৩ সালে রাতের পাহারা শেষে সকালে বাড়ি ফেরার পথে হত্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে।আর্থিকভাবে অসচ্ছল হওয়ায় নিজের পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ করার সামর্থ্যও তাঁর ছিল না। পরবর্তীতে একটি মামলায় বিচারিক আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড এবং অন্য একটি মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ২০১৭ সালের ২০ জুলাই হাইকোর্ট বিভাগ ইব্রাহিম আলী শেখকে মৃত্যুদণ্ডের মামলা থেকে খালাস দেন। একই সঙ্গে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত অন্য মামলাতেও তাঁকে খালাস দেওয়া হয়।কিন্তু হাইকোর্টের খালাসের আদেশ যথাসময়ে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছায়নি। ফলে আদালতের আদেশে খালাস পাওয়ার পরও তাঁকে প্রায় আরও আট বছর কারাগারে থাকতে হয়।ইব্রাহিমের দুর্দশা গণমাধ্যমে প্রকাশের পর পাশে দাঁড়ায় হিন্দু মহাজোটদীর্ঘ ২২ বছর কারাবন্দি থাকার সময়ে ইব্রাহিম আলী শেখ হারিয়েছেন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়। কারাগারে থাকাকালীন তাঁর মা মারা যান। তাঁর স্ত্রীও পরবর্তীতে অন্যত্র চলে যান। দীর্ঘ কারাবাসের প্রভাবে তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে রিটে উল্লেখ করা হয়েছে।কারাগার থেকে মুক্তির পরও চরম দারিদ্র্য ও আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে তাঁর চিকিৎসা ও পুনর্বাসন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।ইব্রাহিম আলী শেখের এই করুণ পরিস্থিতির বিষয়টি দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত হলে বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট বিষয়টি মানবিক ও জনস্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয়। এরপর তাঁর অধিকার ও ন্যায়সংগত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার দাবিতে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয় সংগঠনটি।গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিকের উদ্যোগে জনস্বার্থে রিটইব্রাহিমের দুর্ভোগের বিষয়টি আদালতের নজরে আনতে বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের পক্ষে গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক জনস্বার্থে রিট আবেদন করেন।রিটে অভিযোগ করা হয়েছে, হাইকোর্টের খালাসের আদেশের কপি কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছাতে এবং তা কার্যকর করতে প্রায় আট বছর সময় লাগা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গুরুতর অবহেলার ঘটনা। এর ফলে ইব্রাহিমকে তাঁর আইনগত মুক্তির অধিকার থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকতে হয়েছে।গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিকের করা রিটে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এই ব্যর্থতাকে বেআইনি ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করার আবেদন জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে সংবিধানের ২৭, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদের অধীনে ইব্রাহিমের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে কি না, তা নির্ধারণের জন্যও আদালতের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে।পাঁচ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দাবিরিটে বলা হয়েছে, দীর্ঘায়িত আটকাদেশের কারণে ইব্রাহিম আলী শেখ তাঁর স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত মর্যাদা ও জীবিকার যে ক্ষতির শিকার হয়েছেন, তার জন্য তাঁকে পাঁচ কোটি টাকা অথবা আদালত উপযুক্ত মনে করেন এমন দৃষ্টান্তমূলক পরিমাণ অর্থ ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না—তা জানতে চাওয়া হয়েছে।এ ছাড়া ইব্রাহিমের পূর্ণ পুনর্বাসন, স্থায়ী বাসস্থানের ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার দাবিও জানানো হয়েছে।হাইকোর্টের রুলপ্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট জানতে চেয়েছেন, আদালতের খালাসের আদেশ কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়ে ইব্রাহিম আলী শেখকে দীর্ঘ সময় কারাগারে রাখার ঘটনাকে কেন বেআইনি ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না এবং তাঁর মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের জন্য কেন ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না।এ ঘটনায় পাঁচ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের দাবির পাশাপাশি বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের করা জনস্বার্থের রিটটি এখন আইনি প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে।উল্লেখ্য, হাইকোর্টের রুল জারি করা চূড়ান্ত ক্ষতিপূরণের আদেশ নয়। রুলের জবাব ও পরবর্তী শুনানির পর আদালত এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন।