'একাত্ম মানববাদ' দর্শনের বৈদিক পরম্পরা
পৃথিবীর রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে একটি অবিসংবাদিত নাম পণ্ডিত দীন দয়াল উপাধ্যায় (২৫.০৯.১৯১৬- ১১.০২.১৯৬৮)। তিনি বিশ্বব্যাপী প্রচলিত রাজনৈতিক চিন্তার বিপরীতে ভারতবর্ষের শাশ্বত রাজনৈতিক চিন্তা কাঠামোকে দৃঢ়ভাবে তাঁর মতাদর্শে প্রতিস্থাপন করেন। তাঁর সেই আদর্শ এবং দর্শন যে গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে সে গ্রন্থের নাম 'একাত্ম মানববাদ'। পণ্ডিত দীন দয়াল উপাধ্যায় 'একাত্ম মানববাদ' গ্রন্থে অত্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ ভারতবর্ষ থেকে চলে গিয়েছে। কিন্তু আজও ব্রিটিশদের চিন্তাকাঠামো ভারতবর্ষের মানুষের মাঝে রয়ে গেছে। ভারতবর্ষের মানুষ জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে সেই বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী আদর্শকে এখনো প্রতিনিয়ত অনুবর্তন করছে (দীনদয়াল ২০০৪: ১৫)। অথচ বিদেশি রাজনৈতিক কাঠামো ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা লাভের সাথে সাথেই, পরিত্যক্ত হওয়া উচিত ছিলো। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য, সেই বিদেশি চিন্তা কাঠামোর আজও প্রতিনিয়ত চর্চা হচ্ছে ভারতবর্ষে।ইংল্যান্ডের কোন ওষুধ ভারতবর্ষে কিছুকিছু ক্ষেত্রে কার্যকর হলেও সর্বক্ষেত্রে কার্যকর হয় না। কারণ রোগের সম্পর্ক জলবায়ু, আচার-ব্যবহার, খাদ্যাভ্যাস এবং বংশ পরম্পরার সাথে যুক্ত। তাই আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে বলা হয়েছে, যে প্রাণী যে অঞ্চলের তার বিভিন্ন রোগব্যাধির জন্যে তৈরি ওষুধও সেই সেই অঞ্চলের সাথে সম্পর্কিত হতে হবে। তবেই রোগের উপশম হবে (দীনদয়াল ২০০৪:২৩)। বৈদেশিক কোন ওষুধে যেমন রোগের কিছুকিছু ক্ষেত্রে উপশম হলেও, সর্বক্ষেত্রে উপশম হয় না। ঠিক তেমনি দেশ পরিচালনার মতাদর্শও নিজস্ব সংস্কৃতি এবং সভ্যতার সাথে সম্পর্ক যুক্ত হতে হয়। তবেই সে মতাদর্শ কার্যকরী এবং ফলদায়ী হয়।পণ্ডিত দীন দয়াল উপাধ্যায় দেশের ভবিষ্যত কল্যাণকর লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য নিয়ে যারা চিন্তা করেন ভারতবর্ষের সেই সকল বুদ্ধিজীবীদের দুই প্রকার চিন্তাধারার অনুসারী বলে বর্ণনা করেছেন: প্রথমত স্বদেশপন্থী এবং দ্বিতীয়ত স্বদেশীয় পশ্চিমা চিন্তাপন্থী (দীনদয়াল ২০০৪: ২১-২২)।পণ্ডিতজী বলেছেন, পুরাতনকে সাথে নিয়েই ভারতবর্ষকে এগিয়ে যেতে হবে। বিদেশি বিচার ব্যবস্থা সর্বজনীন নয়। কারণ সেই ব্যবস্থার সাথে পশ্চিমা রাষ্ট্রদর্শন, প্রকৃতি পরিবেশ এবং সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য সুগভীর ছাপ রয়েছে। মার্কসবাদ যা নিজেকে একটি বৈশ্বিক মতবাদ হিসেবে প্রচার করে; সেই মার্কসবাদী দার্শনিক সিদ্ধান্তও বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক কাঠামোয় পরিবর্তিত হয় (দীনদয়াল ২০০৪: ২২-২৩)। বিষয়টির সত্যতা কিউবা, রাশিয়া, চিনের এ সকল সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দিকে দৃষ্টি দিলে সহজেই বোঝা যায়।এ সকল দেশ মোটাদাগে মার্কসবাদী চিন্তাধারার অনুসারী হলেও, তাদের সকলের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং কর্মপন্থা এক নয়। অধিকাংশই ভিন্ন, কয়েকটি দেশের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণই ভিন্ন। তাই নিজেদের দেশ, নিজেদের সংস্কৃতি, নিজেদের পরিবেশ পরিস্থিতিকে মাথায় রেখে সে অনুসারে দেশ পরিচালনার রূপরেখা তৈরি করে নিতে হবে। তবেই সে রূপরেখা ফলপ্রসূ হবে। প্রত্যেক দেশেরই নিজস্ব ঐতিহাসিক, সামাজিক এবং আর্থিক পরম্পরাগত চিন্তাকে সামনে রেখে তবেই এগিয়ে যেতে হবে। এক্ষেত্রে জগতের জ্ঞানচর্চায় অগ্রগামী ভূমিকা নিতে হবে ভারতবর্ষকে। কারণ ভারতবর্ষের পবিত্র ভূখণ্ডের বনভবন থেকেই জ্ঞানের প্রথম উদয় হয়েছে। প্রাচীন সেই তপবন বনভবনের চিরকল্যাণকর জ্ঞানই আজ দেশ-বিদেশে বিতরিত হয়ে জগত ধন্য হচ্ছে। বিষয়টি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখাতে বিখ্যাত 'গীতবিতান' গ্রন্থের স্বদেশ পর্যায়ের একটি গানে (স্বদেশ :২৩) পাওয়া যায়।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতমাতা এবং জগন্মাতাকে একাকার করে একটি বিখ্যাত সংগীতে বলেন, এ ভারতবর্ষ থেকেই জ্ঞানের প্রথম উদয় হয়েছে জগতে, যে জ্ঞানের সুধা পান করে জগত ধন্য হচ্ছে।"প্রথম প্রভাত উদয় তব গগনে,প্রথম সামরব তব তপোবনে,প্রথম প্রচারিত তব বনভবনেজ্ঞানধর্ম কত কাব্যকাহিনী।চিরকল্যাণময়ী তুমি ধন্য,দেশবিদেশে বিতরিছ অন্ন-জাহ্নবীযমুনা বিগলিত করুণাপুণ্যপীষুষস্তন্যবাহিনী॥"পণ্ডিত দীন দয়াল উপাধ্যায় বলেন, দেশকে পরিচালিত করতে হবে নিজেদের পরম্পরাগত শাশ্বত ভাবাদর্শে। তবেই সেই ভাবাদর্শ মানুষের মাঝে কার্যকর হয়ে, মানুষের কল্যাণ করতে পারবে। বিদেশি চিন্তা সার্বজনীন নয়। কারণ সেই ব্যবস্থায় সাথে পশ্চিমা ইউরোপীয় রাষ্ট্রদর্শন, প্রকৃতি পরিবেশ এবং সংস্কৃতির গভীর ছাপ রয়েছে। প্রয়োজনে পশ্চিমাদের বৈজ্ঞানিক গবেষণা লব্ধ জ্ঞান গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু পশ্চিমাদের আচার, ব্যবহার, সংস্কৃতি ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য নয়। আধুনিক বিজ্ঞানে পশ্চিমারা উন্নতি করলেও, পশ্চিমাদের সংস্কৃতি ভারতবর্ষের সংস্কৃতি থেকে উন্নততর নয়।পৃথিবী বৈচিত্র্যময়। তাই বিশ্বব্যাপী আদর্শের সংঘর্ষ থাকবেই। কিন্তু এর পরেও স্বরাজ্য এবং স্বসংস্কৃতিকে সাথে নিয়ে এক বৈশ্বিক একাত্বতার পথে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। স্বরাজ্যের প্রেরণা স্বসংস্কৃতি থেকেই আসে। ভারতীয় সংস্কৃতির বিশেষত্ব হল, এ সংস্কৃতি একাত্ববাদী। বৈচিত্র্যময়তার মধ্যেই এখানে সর্বত্র ঐক্যের অনুসন্ধান করা হয়েছে (দীনদয়াল ২০০৪: ২৫)। পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায়ের এ চিন্তা প্রাচীনকাল থেকেই ধ্বনিত হয়েছে বেদে। বেদ ভারতবর্ষ তো বটে সমগ্র পৃথিবীর প্রাচীনতম গ্রন্থ । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অসংখ্য কবিতা, সংগীত এবং প্রবন্ধে এই সমদর্শী একাত্মবাদীতা প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর বিশ্বখ্যাত গীতবিতান গ্রন্থের পূজা পর্যায়ে (গান:৩৬৩) একটি গানে কবি বলেছেন, সবার যেখানে আপন হে প্রিয়, সেখানে তুমি আমারও আপন। সবার দিকে যখন বাহু প্রসারিত করে ধরবো, তখনই হৃদয়ে সত্যিকারের প্রেম প্রকাশিত হবে।"বিশ্বসাথে যোগে যেথায় বিহারোসেইখানে যোগ তোমার সাথে আমারও।। নয়কো বনে, নয় বিজনে নয়কো আমার আপন মনে-সবার যেথায় আপন তুমি, হে প্রিয়, সেথায় আপন আমারো।।সবার পানে যেথায় বাহু পসারো,সেইখানেতেই প্রেম জাগিবে আমারও।"ধর্ম ঈশ্বর প্রবর্তিত সর্বাঙ্গসুন্দর একটি শাশ্বত সত্ত্বা। সমাজ ঠিক উল্টা। মানুষ তার ইচ্ছামত, সুবিধামত সমাজকে বিনির্মাণ করে। স্বার্থান্বেষী মানুষের কারণে বিভিন্ন সময়ে অনেক অসঙ্গতি সমাজে যুক্ত হয়। যা ধর্মের নাম প্রচলিত হলেও; প্রকৃতপক্ষে তা ধর্মের সাথে মোটেই সম্পর্ক যুক্ত নয়। এ বিভিন্ন অসঙ্গতি ঘনীভূত হয়েই নানাপ্রকার সামাজিক অসন্তোষ দানা বাঁধে। মানুষের মাঝে ঐক্যহীনতা দেখা দেয়। অথচ সৃষ্টির শুরুতেই ঋগ্বেদ সংহিতার সংজ্ঞানসূক্তে জগতের প্রচলিত জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানবের যে ঐক্যবদ্ধ সাম্যবাদী প্রেরণা দেয়া হয়েছে। তা মানব ইতিহাসে এক বিরল অনুপম দৃষ্টান্ত। বৈদিক এ সাম্যবাদী একাত্মবাদী তত্ত্বের বর্তমান কালের একটি ফলিত দৃষ্টান্ত হলো, পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায়ের একাত্ম মানববাদ দর্শন। বৈদিক সংজ্ঞান সূক্তে 'সমান' শব্দটি বারবার অনুপ্রাস অলঙ্কার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছেন। সেই সূক্তে একই সাথে চলা, বলা ঈশ্বরের উপাসনা, খাদ্যপানীয় সহ সকল ক্ষেত্রেই জগতের সকল মানবকে সমান হতে বলা হয়েছে। জগতে এর থেকে বড় সাম্যবাদের কি হতে পারে? কার্ল হাইনরিশ মার্ক্স (৫ই মে, ১৮১৮ –১৪ই মার্চ, ১৮৮৩) সহ জগতের অন্যান্য সাম্যবাদীরা এ বৈদিক সাম্যবাদের বাইরে কোন নতুন কথা বলেননি।সাম্যবাদ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হল communism. শ্রেণীহীন, শোষণহীন, ব্যক্তি মালিকানাহীন এমন একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভাবাদর্শ যেখানে ব্যক্তিগত মালিকানার স্থলে উৎপাদনের সকল মাধ্যম এবং প্রাকৃতিক সম্পদ (ভূমি, খনি, কারখানা) রাষ্ট্রের মালিকানাধীন এবং নিয়ন্ত্রণাধীন থাকে। সাম্যবাদ হল সমাজতন্ত্রের একটি উন্নত এবং অগ্রসর রূপ, তবে এদের মধ্যেকার পার্থক্য নিয়ে বহুকাল ধরে বিতর্ক চলে আসছে।উভয়েরই মূল লক্ষ্য হল ব্যক্তিমালিকানা এবং শ্রমিক শ্রেণীর উপর শোষণের হাতিয়ার পুঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থার অবসান ঘটানো।কার্ল মার্কস যে মতাদর্শ উপস্থাপন করেছিলেন সেই মতে সাম্যবাদ হল সমাজের সেই চূড়ান্ত শিখর, যেখানে পৌঁছাতে হলে বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজে অর্থনৈতিক সাম্য স্থাপন করতে হবে। সেই ক্রান্তিকালে উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে, সমাজে সামগ্রী ও সেবার অতিপ্রাচুর্য সৃষ্টি হবে। সাম্যবাদী দর্শনানুসারে, কোনো দেশে সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠিত থাকলে সে স্থানে ধনী-গরীবের ব্যবধান থাকবে না। নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার দ্বায়িত্ব গ্রহণ করবে সাম্যবাদী সরকার।সাম্যবাদের প্রধান লক্ষ্য হল অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক সাম্যতা। কিন্তু সুপ্রাচীন বৈদিক সাম্যবাদ আরও গভীর, আরও সুস্পষ্ট এবং বহু ক্ষেত্রে প্রসারিত। এ বৈদিক পথরেখাতেই এগিয়ে গিয়েছে পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায়ের সাম্যবাদী একাত্মবাদী চিন্তা।সং গচ্ছধ্বং সং বধ্বং সং বাে মনাংসি জানতাম্। দেবা ভাগং যথা পূর্বে সঞ্জানানা উপাসতে॥সমানাে মন্ত্রঃ সমিতিঃ সমানী সমানং মনঃ সহ চিত্তমেষাম্।সমানং মন্ত্রমভিমন্ত্রয়ে বঃ সমানেন বাে হবিষা জুহােমি॥সমানী ব আকুতিঃ সমানা হৃদয়ানি বঃ।সমানমন্ত বাে মনাে যথা বঃ সুসহাসতি॥(ঋগ্বেদ ১০.১৯১.২-৪)"হে মানব, তােমরা একসঙ্গে চল, একসঙ্গে মিলে একই ঐক্যের কথা বলো, তােমাদের মন উত্তম সংস্কারযুক্ত হােক। পূর্বকালীন জ্ঞানী ব্যক্তিরা যেমন করে কর্তব্য কর্ম এবং উপাসনা করেছে, তােমরাও তেমন করে আমার পথে চল।তােমাদের সকলের মিলনের মন্ত্র এক হােক,মিলনভূমি এক হােক এবং মনসহ চিত্ত এক হােক। তােমরা একতার মন্ত্রে উদীপ্ত হয়ে অগ্রগামী হও। তােমাদেরকে দেয়া খাদ্য-পানীয় ঐক্যবদ্ধভাবে সুষম বণ্টন করে গ্রহণ কর।তােমাদের সকলের লক্ষ্য এক হােক, হৃদয় এক হােক এবং মন এক হােক। তােমরা সর্বাংশে সম্পূর্ণরূপে ঐক্যবদ্ধ হও এবং ঐক্যবদ্ধ হয়েই বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হও।""সং গচ্ছধ্বং": জগতে বর্তমানে মানুষ দিনেদিনে অসহিষ্ণু হয়ে যাচ্ছে, স্বার্থান্ধ হয়ে যাচ্ছে। সকলেই নিজ নিজ মত-পথের ভিন্নতা নিয়েই আপন পরিমণ্ডলে পরিভ্রমণ করছে। কিন্তু বৈদিক সাম্যবাদ ব্যক্তিগত সংকীর্ণতা পরিত্যাগ করে বিশ্বের সকল মানবকে একসঙ্গে চলতে নির্দেশনা দিয়েছে। বৈশ্বিকভাবে সকল জাতিগোষ্ঠী যেন সকলেই সকলের কাছাকাছি আসতে পারে এই শাশ্বত প্রেরণা দেয়া হয়েছে। বৈদিক মন্ত্রে উক্ত "সং গচ্ছধ্বং" ভাবটি গত শতাব্দীতে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায়। নিজ নিজ কূপে থেকে কূপমণ্ডূক না হয়ে আমাদের উচিত যথাসম্ভব সমানতার ভাবকে মাথায় নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে চলা। পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায়ের একাত্ম দর্শনেরও মূলকথা এটি।সংঘর্ষ প্রকৃতি বা সংস্কৃতির দ্যোতক নয়; বিকৃতির দ্যোতক। মাৎস্যন্যায় বা জীবন সংঘর্ষ সকল কিছুই নয়। মাৎস্যন্যায়ের দার্শনিক চিন্তাটি ভারতবর্ষের জন্যে কোন নতুন চিন্তা নয়। এই জ্ঞান প্রাচীনকাল থেকেই ভারতবর্ষের মানুষের মধ্যে ছিল (দীনদয়াল ২০০৪ :২৭)।ভারতীয় দর্শন কামক্রোধ আদি ষড়রিপুকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু এগুলো কখনই ভারতীয় সংস্কৃতি বা শুদ্ধ ব্যবহারের আধার হয়ে উঠেনি। সমাজে সকল প্রকার মানবই থাকবে। সেখানে সাধুসন্ত যেমন থাকবে, তেমনি চোর ডাকাতও থাকবে। সবাইকে নিয়েই চলতে হবে (দীনদয়াল ২০০৪: ২৭)। জগতের সকল জীবের মধ্যেই ঈশ্বরের উপস্থিতি রয়েছে। এ বিষয়টি শুক্ল যজুর্বেদীয় রুদ্রসূক্তের মধ্যেও পাওয়া যায়।"সং বধ্বং"; জগতের সকল জাতিই বৈশ্বিকভাবে একই কথা বলবে না।এ কথা যেমন সত্য, ঠিক তেমনি অবিসংবাদিত সত্য হল, মৌলিক অধিকার, প্রকৃতি পরিবেশ রক্ষা সহ বেশ কিছু ক্ষেত্রে জগতের সকল মানবকেই ঐক্যবদ্ধ হয়ে একই সাম্যবাদী কথা বলা প্রয়োজন। মানুষের বিশ্বাস, চিন্তা এবং বাক্যে ভিন্নতা থাকবে।কিন্তু সেই ভিন্নতা মনুষ্যত্ব বোধকে কখনোই ভূলন্ঠিত করতে পারবে না।"দেবা ভাগং যথা পূর্বে সঞ্জানানা উপাসতে": জগতের সকল মানবকে ঐক্যবদ্ধভাবে কর্তব্য কর্ম এবং ঐশ্বরিক উপাসনা করতে হবে। এ উপাসনায় কোন বিভেদ কাম্য নয়।এক অদ্বিতীয়, পরমেশ্বরই এ বিশ্বসংসার এবং সনাতন ধর্মের প্রবর্তক। তিনি সৎ, চিৎ এবং আনন্দময়স্বরূপ। তিনি চিন্তার অতীত, সর্বশক্তিমান, সর্বব্যাপক, সর্বান্তর্যামী, সর্বজ্ঞ, অভয়, কৃপাময় এবং সৃষ্টি, পালন ও লয়কর্তা। জীবের চিন্তার অতীত এক অদ্বিতীয় ব্রহ্মেরই ভিন্ন ভিন্ন গুণ ও শক্তির প্রতীকী প্রকাশ হলেন দেবতাগণ। ধর্মে অনাদি অনন্ত ব্রহ্মের উপাসনা পঞ্চমতে ও পথে বিভজিত যথা- শাক্ত, শৈব, সৌর, গাণপত্য এবং বৈষ্ণব। এ পঞ্চমতের সকল সম্প্রদায়ের প্রতি সমান শ্রদ্ধা পোষণ করে সকল মতকেই সত্য বলে জেনে ঐক্যবদ্ধভাবে ঈশ্বরের উপাসনা কিরতে হবে।"সমানাে মন্ত্রঃ": এ বাক্যে ঈশ্বর নির্দেশ দিয়েছেন সকলের মন্ত্র যেন এক হয়। বেদ,রামায়ণ মহাভারত সহ যে মন্ত্রটি সর্বক্ষেত্রে ব্যবহৃত, তা হল ওঙ্কার(ॐ)। এ পবিত্র ওঙ্কার মন্ত্রই গায়ত্রী মন্ত্রের সাথে সংযুক্ত করে গায়ত্রীসন্ধ্যায় নিত্য জপ করতে হয় । যে যে মত-পথের সম্প্রদায়ভূক্ত হোক না কেন, সকলেরই বৈদিক ওঙ্কার এবং গায়ত্রী মন্ত্রের অধিকার রয়েছে।"সমিতিঃ": ভাবতে প্রচণ্ড আবাক হতে হয় যে, সংগঠনবাচক 'সমিতি' শব্দটি বেদেই উক্ত হয়েছে। আজ সমিতি শব্দটি সর্বক্ষেত্রে ব্যবহৃত হলেও, অধিকাংশ মানুষই এ শব্দটির উৎস যে বেদ, এ তথ্যটি জানি না। সত্যযুগে প্রয়োজনীয় না হলেও বর্তমান কলিযুগে ঐক্যবদ্ধতার জন্যে সমিতিবদ্ধতার প্রয়োজন অনস্বীকার্য।"সমানী সমানং মনঃ সহ চিত্তমেষাম্": জগতের সকলের মন সহ চিত্ত এক হওয়া প্রয়োজন। তবেই জগতের মানুষ একে অন্যের দুঃখ বেদনা উপলব্ধি করতে পারবে এবং সমদর্শী হতে পারবে। সমদর্শী হতে পারলে জগতের সকলের মাঝেই নিজেকে এবং নিজের মাঝেই সকলকে দেখতে পাবে। এ প্রসঙ্গে পণ্ডিত দীন দয়াল উপাধ্যায় বলেন, পশ্চিমা সংস্কৃতি জীবনকে খণ্ডিত দৃষ্টিতে দেখে। তাই সে সকল দেশের দর্শন কখনও ভারতবর্ষে জন্যে কল্যাণকর নয়। ভারতবর্ষের রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি সহ বিজ্ঞান সাধনা একটি একাত্মবাদী কল্যাণকর দার্শনিক চিন্তার উপরে প্রতিষ্ঠিত। জগতে একত্বচিন্তা নিয়ে, বিভিন্ন বৈচিত্র্যময় রূপকে সাথে নিয়ে বিকাশ বা সংস্কার করাকেই সংস্কৃতি বলে (দীনদয়াল ২০০৪:২৭)।"সমানং মন্ত্রমভিমন্ত্রয়ে বঃ":একতার মন্ত্রে উদীপ্ত হয়ে জগতের মানুষকে অভি বা অগ্রগামী হতে হবে।জগতের পরিবেশ প্রকৃতি এবং মানবের মাঝে সমদর্শী না হলে, সর্বভূতে যে এক পরমেশ্বরই বিরাজ করছেন -সেই উপলব্ধি কখনোই সকলের মাঝে আসবে না। বেদ জগতের মানবকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাওয়ার শিক্ষা দেয়। কিন্তু বর্তমানে জগতের মানুষ নিজেদের তৈরি শতসহস্র শৃঙ্খল পায়ে পড়ে নিজেরাই নিজেদের চলার গতিপথকে রুদ্ধ করে দিচ্ছে। কিছু মানুষ ঈশ্বরের নামে অহেতুক অমানবিক যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি করছে। আবার কেউ জাতপাতের নামে মনুষ্যত্বকে ভূলন্ঠিত করছি। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। তাই জগতের সকল মানবের উচিত বিভেদের জালকে ছিন্ন করে ঐক্যবদ্ধ হয়ে জগতের কল্যাণ করা। নিজে আগে অগ্রগামী হয়ে শুদ্ধ প্রজ্জ্বলিত প্রদীপ হয়ে; পরবর্তীতে সেই প্রদীপ থেকে অনন্ত প্রদীপকে প্রজ্জ্বলিত করা। এ বিষয়টি পণ্ডিত দীন দয়াল উপাধ্যায়ের একাত্মদর্শনেরও মূল লক্ষ্য।"সমানেন বাে হবিষা জুহােমি": এ জগতের প্রেরয়িতা পুরুষ ঈশ্বর। জগতের সকল খাদ্যপানীয়ও ঈশ্বরের। তাউ প্রত্যেকেই উচিত যথাসম্ভব খাদ্য-পানীয় ঐক্যবদ্ধভাবে সুষম বণ্টন করেই তবে গ্রহণ করা। কেউ শুধুই খেয়ে যাবে, বিপরীতে কেউ খাদ্যের অভাবে উপবাস করবে বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং পরিতাপের। ঈশ্বর অন্নকে ভাগ করে খেতে বলেছেন। এ কারণেই সনাতন ধর্মে পঞ্চমহাযজ্ঞের প্রবর্তন করা হয়েছে। বৈদিক পঞ্চমহাযজ্ঞ মতে প্রত্যেকদিনই মানুষকে অন্নদান করতে হয়। অন্নদান করে খাদ্যগ্রহণ করাকে বলে 'নৃযজ্ঞ'। মানুষের সাথে সাথে প্রত্যেকদিনই প্রাণীকুলকে অন্নদান করতে হয়ে, সেই প্রাণীকুলকে অন্নদানকে বৈদিক পরিভাষায় বলে 'ভূতযজ্ঞ'। শাস্ত্রে কাউকে অন্নদান না করে, খাদ্য গ্রহণ করা হতভাগ্য ব্যক্তিকে চোর বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তাই ক্ষুধার্ত এবং দারিদ্রকে অন্নসহ বিবিধ প্রকারের দানকে প্রশংসিত করে একাধিক মন্ত্র ঋগ্বেদ সহ বেদের বিভিন্ন স্থানে দৃষ্ট হয়।এদেশীয় সাম্যবাদী একাত্মবাদী বিশ্বাসের ভাব বিদেশী পণ্ডিতেরা অধিকাংশ মানুষই বুঝতে পারেনি।বেদ সহ শ্রীমদ্ভগবদগীতা বলছে, সমত্ববুদ্ধি অবলম্বন করে সর্বভূতে ভেদজ্ঞান পরিত্যাগ করে প্রত্যেকটি জীবের মধ্যে, প্রত্যেকটি বস্তুর মধ্যে পরমাত্মাকে দর্শন এবং উপলব্ধি করে তাঁর ভজনা করতে। তাই শাস্ত্রে বারবার প্রত্যেকটি জীবের প্রতি সমদর্শী হতে বলা হয়েছে।সর্বভূতস্থমাত্মানং সর্বভূতানি চাত্মনি ৷ঈক্ষতে যোগযুক্তাত্মা সর্বত্র সমদর্শনঃ ॥যো মাং পশ্যতি সর্বত্র সর্বং চ ময়ি পশ্যতি।তস্যাহং ন প্রণশ্যামি স চ মে ন প্রণশ্যতি।।সর্বভূতস্থিতং যো মাং ভজত্যেকত্বমাস্থিতঃ ৷সর্বথা বর্তমানোঽপি স যোগী ময়ি বর্ততে ॥(গীতা:৬. ২৯-৩১)"প্রকৃত যোগী সমদর্শী হয়ে সর্বভূতে আত্মাকে দর্শন করেন এবং নিজ আত্মাতেই সর্বভূতকে দর্শন করেন ৷যিনি আমাকে সর্বভূতে অবস্থিত দেখেন এবং আমাতে সর্বভূতের অবস্থিত দেখেন, আমি তাঁর অদৃশ্য হই না এবং তিনিও আমার অদৃশ্য হন না।যে যোগী সমত্ববুদ্ধি অবলম্বন করে সর্বভূতে ভেদজ্ঞান পরিত্যাগ করে সর্বভূতস্থিত পরমাত্মারূপে আমাকে জেনে আমার ভজনা করেন, তিনি সর্ব অবস্থাতে আমাতেই অবস্থান করেন"সনাতন ধর্মে সমদর্শী হয়ে জগতের সকল জীবকে ভালোবাসতে বলা হয়েছে। সনাতন ধর্ম হল বিশ্বের ব্যক্তিকেন্দ্রিক সাংগঠনিক মতগুলোর বিরুদ্ধে টিকে থাকা, একমাত্র প্রকৃতি উপাসক, Pagan (মূর্তিপূজক), Animist (সর্বপ্রাণবাদী), Polytheistic , (বহু ঈশ্বরবাদী) মতের প্রতিনিধি। Pagan, Animist, Polytheistic -এ সংজ্ঞাগুলো অবশ্য পশ্চিমাদের দেয়া। শব্দগুলো অনেক সময়ে নিন্দার্থে তারা ব্যবহার করলেও, ভারতবর্ষের মানুষের এ নিয়ে মাথাব্যথা নেই। বেদে বলা আছে 'একমেবাদ্বিতীয়্।' ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয়, ঈশ্বরের কোন প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। জগতের ভাল মন্দ সকল ভাবই তাঁর থেকে উদ্ভূত।সনাতন ধর্ম একেশ্বরবাদী, বহু ঈশ্বরবাদী, প্রকৃতিপূজারী, সর্বপ্রাণবাদী, মূর্তিপূজারী ; অর্থাৎ জগতের সকল ভাব এ ধর্মে আছে। এ ধর্ম কোন ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রবর্তিত এককেন্দ্রিক সাংগঠনিক ধর্ম নয়। যে প্রবর্তক ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে দিলে, ধর্ম অস্তিত্বের সংকটে পড়ে যায়।পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায় বলেন, মনুষ্য মন, বুদ্ধি, আত্মা, শরীর এই চার প্রকারের একটি সমন্বিত রূপ। তাই মনুষ্যকে খণ্ডিত করে বিচার করা উচিত নয়। পশ্চিমাদের সমস্যার মূলে তার মনুষ্যের জীবনের সকল বিষয়কেই তারা খণ্ডিতদৃষ্টিতে চিন্তা করছে (দীনদয়াল ২০০৪: ৩১)। মানবের প্রগতির কারণ: শরীর, মন, বুদ্ধি, আত্মা এই চারের প্রগতি। অনেকে বলেন ভারতীয় সংস্কৃতি কেবল আত্মা নিয়েই আলোচিত। বিষয়টি সত্য নয়। পশ্চিমারা কেবল শরীর নিয়েই ব্যস্ত। এ কারণেই আত্মার বিচার ভারতবর্ষের দর্শনের চিন্তার অনন্য বিশেষত্ব হয়ে গেছে (দীনদয়াল ২০০৪: ৩৩)।ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, সাম্যবাদ, ব্যক্তিবাদ, পুঁজিবাদ সকলই পরিত্যাগ করে একাত্ম মানববাদ গ্রহণ করতে হবে। একাত্মমানববাদে জাতি, ধর্ম, রঙের ভেদাভেদ থাকে না। জড় চেতন সকলের সাথেই সম্পর্ক তৈরি করে একাত্মতা স্থাপন করে। মানবের সাথে বিচ্ছিন্ন নয়, সম্পূর্ণভাবে একাত্মতার শিক্ষা দেয়।প্রকৃতির সাথে বিছিন্ন নয়, একাত্ম হওয়া শিক্ষা দেয়। বেদে জগতের সকল জীবকে মিত্রের দৃষ্টিতে দেখতে বলা হয়েছে। সকল জীবের মাঝে ঈশ্বরকে দর্শন এবং অনুভব করতে বলা হয়েছে।দৃতে দৃংহ মা মিত্রস্য মা চক্ষুষাসর্বাণি ভূতানি সমীক্ষন্তাম্।মিত্রস্যাহং চক্ষুষা সর্বাণি ভূতানি সমীক্ষে।মিত্রস্য চক্ষুষা সমীক্ষামহে।।(শুক্ল যজুর্বেদ সংহিতা: ৩৬.১৮)"হে দুঃখনাশক পরমাত্মন্ ! আমাকে সুখের সহিত বর্দ্ধন কর। সকল প্রাণী যেন আমাকে বন্ধুর দৃষ্টিতে দেখে, আমি যেন জগতের সকল প্রাণীকে সর্বদা বন্ধুর দৃষ্টিতে দেখি। আমরা সকলেই যেন পরস্পর পরস্পরকে বন্ধুর দৃষ্টিতে দেখি।"যস্তু সর্বাণি ভূতান্যাত্মন্নেবানু পশ্যতি।সর্বভূতেষু চাত্মানং ততো ন বিচিকিৎসতি।।(শুক্ল যজুর্বেদ সংহিতা: ৪০.৬)"যে ব্যক্তি সমস্ত জীবেই ঈশ্বরে অবস্থিত- এরূপ দর্শন করেন, অনুভব করেন এবং সমস্ত জীবের মধ্যে ঈশ্বরের বাস দেখেন তখন তিনি কারও প্রতি বিদ্বেষ করেন না।"পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায় বলেন, ইন্দ্রিয় দমন মনুষ্য জীবনের একটি অনন্য আধার।কিন্তু ক্রোধ আধার নয়, সর্বদা বর্জনীয়(দীনদয়াল ২০০৪: ২৯)।মানব জীবনকে স্থির রাখতে, মানব জীবনকে সুন্দর করে ধারণ করে কল্যাণ এবং ঋদ্ধির পথে পরিচালিত করাকেই ধর্ম বলে। ধর্মের সম্পর্ক সবার সাথে। তাই ধর্মের সম্পূর্ণ স্বরূপ নিয়েই জীবনে বিচার করতে হবে(দীনদয়াল ২০০৪: ৩০)।ধর্মের সংজ্ঞা প্রসঙ্গে পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায়ের চিন্তাটি কোন নতুন চিন্তা নয়। বিষয়টি মহাভারতের কর্ণপর্বেই রয়েছে। জগতে ধর্ম কি?এই প্রশ্নের উত্তরে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে ধর্মের স্বরূপ সম্পর্কে বলেন, সমাজ এবং জনসাধারণকে যা সমৃদ্ধি এবং কল্যাণের পথে ধারণ করে রাখে, তাকেই বলে ধর্ম।ধারণাদ্ধর্মমিত্যাহু ধর্মো ধারয়তে প্রজাঃ।যৎস্যাদ্ধারণ সংযুক্তং স ধর্ম ইতি নিশ্চয়ঃ।।(মহাভারত : কর্ণপর্ব, ৬৯. ৫৮)"সমাজকে, জনসাধারণকে যা ধারণ করে রাখে, তাই ধর্ম। তাই কিসে জনসাধারণের, সমাজের সমৃদ্ধি এবং কল্যাণ হয়, তার সাথে যুক্ত হওয়াই ধর্ম ; এ কথা নিশ্চিতরূপে জানবে।"ধর্মের গতি নিগূঢ়তম, তাই অনেকেই সবসময়ে ধর্মকে সম্যক বুঝতে পারেন না। মানবতা মনুষ্যত্বের প্রয়োজনে ধর্মের রূপ পরিবর্তিত হতে পারে। যে বিষয়টিতে আপাতদৃষ্টিতে ধর্ম মনে হয়ে, তখন দেখা যায় সেটি করলেই অধর্ম হয়।ব্যক্তির সুখ কিভাবে? ব্যক্তির একাত্ম বিচার প্রয়োজন। বৈদিক সাম্যবাদ যা পরম্পরাগত এসেছে পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায়ের একাত্ম মানববাদে। সেই একাত্ম সাম্যবাদী দর্শনের লক্ষ্য হল, সমন্বিতভাবে জগতের সকলের কল্যাণ। এ সর্বজনীন কল্যাণমূলক কাজে সকলের অংশগ্রহণ। কাউকে ছোট-বড় দৃষ্টিতে বিবেচনা না করে সাম্যবাদী দৃষ্টিতে দেখা। বৈদিক সাম্যবাদ প্রয়োগের বিষয়টির দৃষ্টান্ত আমরা রামায়ণের মধ্যেও দেখতে পাই।ভগবান শ্রীরামচন্দ্র ঈশ্বরের অবতার হয়েও রাবন বধ করে সীতা উদ্ধারের কল্যাণকর কাজের জন্যে তিনি সামান্য বানরসেনাদের ঐক্যবদ্ধ করে নিযুক্ত করেছিলেন। সামান্য বানরসেনারা ভগবানের নির্দেশনায় সমুদ্রের মাঝে সেতু নির্মাণের কাজে অংশগ্রহণ করে গৌরবান্বিত হয়েছিলেন। তাই নল, সুগ্রীব, হনুমান সহ সকল বানরসেনাদের শ্রদ্ধার সাথে আজও স্মরণ করা হয়। জগতের প্রত্যেকটি মানুষের চিন্তা, ভাব, দর্শন এবং বিশ্বাস আলাদা। জগতের মানুষ আলাদা আলাদা বৈচিত্র্যময় হলেও যদি তাদের সকলের সত্ত্বার মাঝে একটি মানবিক একত্বের বন্ধন থাকে, তবে জগতের অধিকাংশ বৈরীতা হিংসা-বিদ্বেষের ভাব এমনিতেই দূরীভূত হয়ে যাবে। সকলের হৃদয়ের আকুতি মিলিত হলেই মানুষ ঐক্যবদ্ধ হবে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হবে। সাম্যবাদী একাত্মবাদী চেতনায় ঐক্যবদ্ধতা ছাড়া কল্যাণকর আর কোন পথ নেই।সহায়ক গ্রন্থাবলি:১.দীনদয়াল উপাধ্যায়, একাত্ম মানববাদ, জাগৃতি প্রকাশন, নয়ডা: নবম সংস্করণ, ২০০৪২. রমেশচন্দ্র দত্ত, ঋগ্বেদ সংহিতা, হরফ প্রকাশনী, কলিকাতা: দ্বিতীয় প্রকাশ,১৯৮৭৩. দুর্গাদাস লাহিড়ী, শুক্ল যজুর্বেদ সংহিতা, অক্ষয় লাইব্রেরী, কলিকাতা : ২০১৩৪.হরিদাসসিদ্ধান্তনাগীশ, মহাভারত, বিশ্ববাণী প্রকাশনী, কলিকাতা: দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৩৮৩ বঙ্গাব্দ৫. জগদীশ চন্দ্র ঘোষ (সম্পাদিত), শ্রীগীতা, প্রেসিডেন্সী লাইব্রেরী, কলিকাতা: ৩৩ সংস্করণ, ২০০৬৬. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গীতবিতান, প্রতীক প্রকাশনা সংস্থা, ঢাকা: ২০০৮৭. কার্লমার্কস, পুঁজি, ইতিহাস প্রকাশন, ঢাকা: প্রথম প্রকাশ, ২০১৬