বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর নির্যাতন, নিপীড়ন, হামলা ও বৈষম্যের অভিযোগ যখন বারবার সামনে আসে, তখন শুধু উৎসবের সময় নিরাপত্তার চাদর বিছিয়ে দিয়ে আমাদের বাস্তবতাকে আড়াল করার চেষ্টা কোনো সমাধান হতে পারে না।
আমরা নিরাপত্তা চাই—কিন্তু এমন নিরাপত্তা চাই না, যার দৃশ্য দেখে মনে হবে আমরা স্বাধীনভাবে উৎসব করছি না, বরং নিরাপত্তাবেষ্টিত কোনো প্রদর্শনীর অংশ!
আমাদের উৎসব খোলামেলা হবে, স্বাভাবিক হবে, মর্যাদাপূর্ণ হবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব হলো নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সেই নিরাপত্তা যেন এমন প্রচারে পরিণত না হয় যে, “হিন্দুরা বাংলাদেশে ভালোই আছে”—অথচ উৎসবের বাইরে তাদের বাস্তব জীবন, নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
এবার শারদীয় দুর্গাপূজায় নতুন বার্তা দিতে হবে
হিন্দুদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে এবার আমাদের আত্মসমালোচনা করা প্রয়োজন।
আমরা অপ্রয়োজনীয় আড়ম্বর কমাব।
ধর্মীয় রীতি ও শাস্ত্রীয় বিধানকে প্রাধান্য দেব।
প্রয়োজনে ক্ষুদ্র পরিসরে পূজা করব।
সম্ভব হলে কোথাও কোথাও ঘটপূজার মতো সরল আয়োজনের কথাও বিবেচনা করব।
কারণ, আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাস কোনো প্রদর্শনীর বিষয় নয় এবং আমাদের ধর্মীয় উৎসব কারও প্রচারণার মঞ্চও নয়।
আর একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন—ধর্মীয় অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অতিথি করে এনে কোনো রাজনৈতিক প্রচারণার সুযোগ সৃষ্টি করার প্রয়োজন নেই।
আমরা অন্য ধর্মাবলম্বী ভাই-বোনদের সম্মান করব, তাঁদের আপ্যায়ন করব এবং সম্প্রীতি বজায় রাখব। কিন্তু আমাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক অতিথি হিসেবে তাঁদের আমন্ত্রণ জানানো বাধ্যতামূলক নয়।
আমাদের অনুষ্ঠানে আমাদের এলাকার জ্যেষ্ঠ, সম্মানিত ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিরাই সম্মানের আসনে থাকবেন।
ধর্মীয় আবেগের ব্যবসা বন্ধ হোক
জন্মাষ্টমী ও জগন্নাথদেবের রথযাত্রার মতো বৃহৎ ধর্মীয় আয়োজন নিয়েও হিন্দু সমাজকে প্রশ্ন করতে হবে।
কোনো ধর্মীয় আয়োজন যদি মানুষের বিশ্বাস ও আবেগকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়, তাহলে সেখানে অর্থের স্বচ্ছতা, সরকারি সুযোগ-সুবিধার ব্যবহার এবং আয়োজকদের জবাবদিহি অবশ্যই থাকতে হবে।
কোনো কমিটি, সংগঠন বা ব্যক্তি যদি ধর্মীয় আয়োজনকে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে থাকে—তাহলে তার জবাবদিহি চাই।
ধর্মের নামে সুবিধা নেওয়া যাবে না।
ভক্তির নামে ব্যবসা করা যাবে না।
হিন্দুদের আবেগকে পুঁজি করে ব্যক্তিগত বা সাংগঠনিক স্বার্থ হাসিল করা যাবে না।
আমরা কারও বিরুদ্ধে অযাচিত অভিযোগ করতে চাই না; কিন্তু অভিযোগ উঠলে তার স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহি চাই। কারণ ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে মানুষের আস্থা জড়িত।
আর ব্যবহার হতে চাই না
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আমাদের নিজেদের কাছেই—
আমরা কি শুধু ব্যবহার হওয়ার জন্য?
কেউ আমাদের ধর্মীয় আবেগ ব্যবহার করবে, কেউ আমাদের উৎসব ব্যবহার করবে, কেউ আমাদের সংখ্যাকে ব্যবহার করবে, কেউ আমাদের নাম ব্যবহার করে সুবিধা নেবে—আর আমরা নীরবে তা মেনে যাব?
না। এবার সচেতন হতে হবে।
আমাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান হবে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী।
আমাদের উৎসব হবে আত্মমর্যাদার সঙ্গে।
আমাদের সম্প্রীতি থাকবে—কিন্তু আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে নয়।
আমরা সবাইকে সম্মান করব—কিন্তু নিজেদেরও সম্মান করতে শিখব।
হিন্দু সমাজকে আর কারও হাতিয়ার হতে দেওয়া যাবে না।
আমাদের উৎসব কারও রাজনৈতিক প্রচারণার মঞ্চ নয়।
আমাদের ধর্ম কারও ব্যক্তিগত স্বার্থের সম্পদ নয়।
আমাদের আবেগ কারও ব্যবসার পুঁজি নয়।
এবার সিদ্ধান্ত আমাদের
আমরা চাই না শুধু উৎসবের দিনগুলোতে আমাদের নিরাপত্তা দেখিয়ে বিশ্বের সামনে বাংলাদেশের হিন্দুদের একটি সুন্দর ছবি তুলে ধরা হোক।
আমরা চাই—সারা বছর হিন্দুরা নিরাপদ থাকুক।
আমরা চাই—মন্দির নিরাপদ থাকুক।
আমরা চাই—ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত হোক।
আমরা চাই—অপরাধের বিচার হোক।
আমরা চাই—নাগরিক হিসেবে সমান অধিকার নিশ্চিত হোক।
উৎসবের নিরাপত্তা নয়—সারা জীবনের নিরাপত্তা চাই।
দেখানো সম্প্রীতি নয়—বাস্তব নিরাপত্তা ও সমঅধিকার চাই।
ব্যবহার নয়—সম্মান চাই।
নীরবতা নয়—জবাবদিহি চাই।
এবার হিন্দু সমাজকে জাগতে হবে।
নিজেদের ধর্ম, অধিকার, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ নিজেদের হাতেই রক্ষা করতে হবে।
মতামত