এই পৈশাচিকতার চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় একটি নির্দিষ্ট বাড়িতে, যেখানে ১২৬ জন হিন্দুকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে চোখের পলকে গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তানি সেনারা। লাশের ওপর লাশ স্তূপ হয়ে পড়েছিল, আর শাঁখারীবাজারের সংকীর্ণ গলিগুলো নর্দমার পানির বদলে নিরীহ হিন্দুদের রক্তে লাল হয়ে উঠেছিল। বিভিন্ন ঐতিহাসিক নথি ও দলিল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেই বিকেলের নিহতের সংখ্যা ২০০ থেকে শুরু করে ৮,০০০ পর্যন্ত হতে পারে। সংখ্যার এই বিশাল ব্যবধানই প্রমাণ করে যে, সেদিন ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা কতটা ব্যাপক ছিল, যার সঠিক হিসাব রাখা তৎকালীন পরিস্থিতিতে অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
শাঁখারীবাজারের এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড ছিল একটি নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর আত্মপরিচয় মুছে ফেলার সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র। এই অমানবিকতাকে উদ্যাপন করার ধৃষ্টতা দেখিয়ে পরবর্তীতে ঐতিহাসিক এই রাস্তার নাম বদলে রাখা হয়েছিল ‘টিক্কা খান রোড’। ‘বাংলার কসাই’ হিসেবে পরিচিত জেনারেল টিক্কা খানের নামে একটি পবিত্র জনপদের নামকরণ ছিল আর্তমানবতার ক্ষতে নুনের ছিটা দেওয়ার মতো এক চরম ঔদ্ধত্য। মূলত ২৫শে মার্চের রাত থেকেই পাকিস্তানি বাহিনী বেছে বেছে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা এবং হিন্দু বুদ্ধিজীবীদের ওপর আক্রমণ চালায়, যার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল শাঁখারীবাজার। বাঙালির হাজার বছরের হিন্দু ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির শিকড় উপড়ে ফেলাই ছিল এই সাম্প্রদায়িক নির্মূল অভিযানের মূল লক্ষ্য।
এই বীভৎসতার চিত্র আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতেও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। ব্রিটিশ সাংবাদিক সাইমন ড্রিং ‘দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বর্ণনা করেন কীভাবে পাকিস্তানি বাহিনী কামানের গোলা আর মেশিনগান নিয়ে নিরীহ বাসিন্দাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর সাংবাদিক সিডনি শ্যানবার্গ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, পাকিস্তানি সৈন্যরা পরিকল্পিতভাবে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিল। তবে বিশ্বকে সবচেয়ে বেশি নাড়িয়ে দিয়েছিল অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের সেই কালজয়ী প্রতিবেদন ‘Genocide’। ১৩ই জুন ‘দ্য সানডে টাইমস’-এ প্রকাশিত সেই প্রতিবেদনে তিনি সরাসরি পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তাদের বরাতে জানান যে, শাঁখারীবাজারের মতো হিন্দু প্রধান এলাকাগুলো ছিল তাদের ‘ক্লিনিং অপারেশন’-এর প্রধান লক্ষ্যবস্তু, যার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল একটি বিশেষ ধর্মীয় জনগোষ্ঠীকে সমূলে নির্মূল করা।
মতামত