শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩
হিন্দুস নিউজ
Hindus News Voice of Hinduism
আপনার পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিন Hindus News এ।

শাঁখারীবাজার গণহত্যা: একটি হিন্দু জনপদকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার পৈশাচিক নীল নকশা


| প্রিন্ট সংস্করণ

শাঁখারীবাজার গণহত্যা: একটি হিন্দু জনপদকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার পৈশাচিক নীল নকশা
Hindus News Voice of Hinduism
আপনার পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিন Hindus News এ।
১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ। চৈত্র মাসের তপ্ত দুপুরে যখন ঢাকার আকাশ বারুদের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন, ঠিক তখনই পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী হিন্দু জনপদ শাঁখারীবাজারে নেমে এসেছিল যমদূতের মতো পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। কয়েকশ বছরের প্রাচীন এই জনপদ, যা শাঁখা আর অলঙ্কারের কারুকার্যে মুখরিত থাকার কথা ছিল, তাকে মুহূর্তেই এক নিস্তব্ধ মৃত্যুপুরীতে পরিণত করা হয়। এটি কেবল কোনো সামরিক অভিযান ছিল না, বরং এটি ছিল বাঙালি হিন্দু সংস্কৃতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্রকে সমূলে নির্মূল করার এক সুপরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক ষড়যন্ত্র।


​বিকেল গড়াতেই ভারী বুটের শব্দে কেঁপে ওঠে শাঁখারীবাজারের সরু গলিগুলো। পাকিস্তানি সেনারা প্রতিটি বাড়িতে ঢুকে শুরু করে নারকীয় তাণ্ডব। প্রত্যক্ষদর্শী অমর সুরের বর্ণনা অনুযায়ী, ঘাতক সেনারা সাধারণ মানুষকে আত্মরক্ষার সামান্যতম সুযোগ দেয়নি। প্রতিটি ঘর থেকে বাসিন্দাদের টেনেহিঁচড়ে বের করে আনা হচ্ছিল। প্রাণভয়ে কেউ খাটের নিচে বা আলমারির আড়ালে লুকোলে সেখান থেকেই তাদের ওপর চালানো হচ্ছিল বৃষ্টির মতো ব্রাশফায়ার। অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ এই এলাকার বাড়িগুলো একটির সঙ্গে অন্যটি লাগানো থাকায় ঘাতকরা জানত, আগুন দিলেই পুরো এলাকা ছারখার হয়ে যাবে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী, নির্বিচারে গুলির পাশাপাশি দাহ্য পদার্থ ছিটিয়ে একের পর এক বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়।

​এই পৈশাচিকতার চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় একটি নির্দিষ্ট বাড়িতে, যেখানে ১২৬ জন হিন্দুকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে চোখের পলকে গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তানি সেনারা। লাশের ওপর লাশ স্তূপ হয়ে পড়েছিল, আর শাঁখারীবাজারের সংকীর্ণ গলিগুলো নর্দমার পানির বদলে নিরীহ হিন্দুদের রক্তে লাল হয়ে উঠেছিল। বিভিন্ন ঐতিহাসিক নথি ও দলিল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেই বিকেলের নিহতের সংখ্যা ২০০ থেকে শুরু করে ৮,০০০ পর্যন্ত হতে পারে। সংখ্যার এই বিশাল ব্যবধানই প্রমাণ করে যে, সেদিন ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা কতটা ব্যাপক ছিল, যার সঠিক হিসাব রাখা তৎকালীন পরিস্থিতিতে অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।

​শাঁখারীবাজারের এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড ছিল একটি নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর আত্মপরিচয় মুছে ফেলার সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র। এই অমানবিকতাকে উদ্যাপন করার ধৃষ্টতা দেখিয়ে পরবর্তীতে ঐতিহাসিক এই রাস্তার নাম বদলে রাখা হয়েছিল ‘টিক্কা খান রোড’। ‘বাংলার কসাই’ হিসেবে পরিচিত জেনারেল টিক্কা খানের নামে একটি পবিত্র জনপদের নামকরণ ছিল আর্তমানবতার ক্ষতে নুনের ছিটা দেওয়ার মতো এক চরম ঔদ্ধত্য। মূলত ২৫শে মার্চের রাত থেকেই পাকিস্তানি বাহিনী বেছে বেছে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা এবং হিন্দু বুদ্ধিজীবীদের ওপর আক্রমণ চালায়, যার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল শাঁখারীবাজার। বাঙালির হাজার বছরের হিন্দু ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির শিকড় উপড়ে ফেলাই ছিল এই সাম্প্রদায়িক নির্মূল অভিযানের মূল লক্ষ্য।

Hindus News Voice of Hinduism
আপনার পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিন Hindus News এ।

​এই বীভৎসতার চিত্র আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতেও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। ব্রিটিশ সাংবাদিক সাইমন ড্রিং ‘দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বর্ণনা করেন কীভাবে পাকিস্তানি বাহিনী কামানের গোলা আর মেশিনগান নিয়ে নিরীহ বাসিন্দাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর সাংবাদিক সিডনি শ্যানবার্গ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, পাকিস্তানি সৈন্যরা পরিকল্পিতভাবে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিল। তবে বিশ্বকে সবচেয়ে বেশি নাড়িয়ে দিয়েছিল অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের সেই কালজয়ী প্রতিবেদন ‘Genocide’। ১৩ই জুন ‘দ্য সানডে টাইমস’-এ প্রকাশিত সেই প্রতিবেদনে তিনি সরাসরি পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তাদের বরাতে জানান যে, শাঁখারীবাজারের মতো হিন্দু প্রধান এলাকাগুলো ছিল তাদের ‘ক্লিনিং অপারেশন’-এর প্রধান লক্ষ্যবস্তু, যার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল একটি বিশেষ ধর্মীয় জনগোষ্ঠীকে সমূলে নির্মূল করা।

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

হিন্দুস নিউজ

শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬


শাঁখারীবাজার গণহত্যা: একটি হিন্দু জনপদকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার পৈশাচিক নীল নকশা

প্রকাশের তারিখ : ২৬ মার্চ ২০২৬

featured Image
১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ। চৈত্র মাসের তপ্ত দুপুরে যখন ঢাকার আকাশ বারুদের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন, ঠিক তখনই পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী হিন্দু জনপদ শাঁখারীবাজারে নেমে এসেছিল যমদূতের মতো পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। কয়েকশ বছরের প্রাচীন এই জনপদ, যা শাঁখা আর অলঙ্কারের কারুকার্যে মুখরিত থাকার কথা ছিল, তাকে মুহূর্তেই এক নিস্তব্ধ মৃত্যুপুরীতে পরিণত করা হয়। এটি কেবল কোনো সামরিক অভিযান ছিল না, বরং এটি ছিল বাঙালি হিন্দু সংস্কৃতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্রকে সমূলে নির্মূল করার এক সুপরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক ষড়যন্ত্র।


​বিকেল গড়াতেই ভারী বুটের শব্দে কেঁপে ওঠে শাঁখারীবাজারের সরু গলিগুলো। পাকিস্তানি সেনারা প্রতিটি বাড়িতে ঢুকে শুরু করে নারকীয় তাণ্ডব। প্রত্যক্ষদর্শী অমর সুরের বর্ণনা অনুযায়ী, ঘাতক সেনারা সাধারণ মানুষকে আত্মরক্ষার সামান্যতম সুযোগ দেয়নি। প্রতিটি ঘর থেকে বাসিন্দাদের টেনেহিঁচড়ে বের করে আনা হচ্ছিল। প্রাণভয়ে কেউ খাটের নিচে বা আলমারির আড়ালে লুকোলে সেখান থেকেই তাদের ওপর চালানো হচ্ছিল বৃষ্টির মতো ব্রাশফায়ার। অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ এই এলাকার বাড়িগুলো একটির সঙ্গে অন্যটি লাগানো থাকায় ঘাতকরা জানত, আগুন দিলেই পুরো এলাকা ছারখার হয়ে যাবে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী, নির্বিচারে গুলির পাশাপাশি দাহ্য পদার্থ ছিটিয়ে একের পর এক বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়।

​এই পৈশাচিকতার চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় একটি নির্দিষ্ট বাড়িতে, যেখানে ১২৬ জন হিন্দুকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে চোখের পলকে গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তানি সেনারা। লাশের ওপর লাশ স্তূপ হয়ে পড়েছিল, আর শাঁখারীবাজারের সংকীর্ণ গলিগুলো নর্দমার পানির বদলে নিরীহ হিন্দুদের রক্তে লাল হয়ে উঠেছিল। বিভিন্ন ঐতিহাসিক নথি ও দলিল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেই বিকেলের নিহতের সংখ্যা ২০০ থেকে শুরু করে ৮,০০০ পর্যন্ত হতে পারে। সংখ্যার এই বিশাল ব্যবধানই প্রমাণ করে যে, সেদিন ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা কতটা ব্যাপক ছিল, যার সঠিক হিসাব রাখা তৎকালীন পরিস্থিতিতে অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।

​শাঁখারীবাজারের এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড ছিল একটি নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর আত্মপরিচয় মুছে ফেলার সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র। এই অমানবিকতাকে উদ্যাপন করার ধৃষ্টতা দেখিয়ে পরবর্তীতে ঐতিহাসিক এই রাস্তার নাম বদলে রাখা হয়েছিল ‘টিক্কা খান রোড’। ‘বাংলার কসাই’ হিসেবে পরিচিত জেনারেল টিক্কা খানের নামে একটি পবিত্র জনপদের নামকরণ ছিল আর্তমানবতার ক্ষতে নুনের ছিটা দেওয়ার মতো এক চরম ঔদ্ধত্য। মূলত ২৫শে মার্চের রাত থেকেই পাকিস্তানি বাহিনী বেছে বেছে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা এবং হিন্দু বুদ্ধিজীবীদের ওপর আক্রমণ চালায়, যার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল শাঁখারীবাজার। বাঙালির হাজার বছরের হিন্দু ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির শিকড় উপড়ে ফেলাই ছিল এই সাম্প্রদায়িক নির্মূল অভিযানের মূল লক্ষ্য।

​এই বীভৎসতার চিত্র আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতেও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। ব্রিটিশ সাংবাদিক সাইমন ড্রিং ‘দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বর্ণনা করেন কীভাবে পাকিস্তানি বাহিনী কামানের গোলা আর মেশিনগান নিয়ে নিরীহ বাসিন্দাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর সাংবাদিক সিডনি শ্যানবার্গ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, পাকিস্তানি সৈন্যরা পরিকল্পিতভাবে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিল। তবে বিশ্বকে সবচেয়ে বেশি নাড়িয়ে দিয়েছিল অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের সেই কালজয়ী প্রতিবেদন ‘Genocide’। ১৩ই জুন ‘দ্য সানডে টাইমস’-এ প্রকাশিত সেই প্রতিবেদনে তিনি সরাসরি পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তাদের বরাতে জানান যে, শাঁখারীবাজারের মতো হিন্দু প্রধান এলাকাগুলো ছিল তাদের ‘ক্লিনিং অপারেশন’-এর প্রধান লক্ষ্যবস্তু, যার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল একটি বিশেষ ধর্মীয় জনগোষ্ঠীকে সমূলে নির্মূল করা।


হিন্দুস নিউজ

প্রকাশক & সম্পাদক: শুভ চন্দ্র দে
HINDUS NEWS মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক ঢাকা থেকে প্রকাশিত

প্রকাশক & সম্পাদক: শুভ চন্দ্র দে,🔴HINDUS NEWS মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক ঢাকা থেকে প্রকাশিত।🔴যোগাযোগ: +88 01890890920🔴 ই-মেইল: news@hindus.news 🔴 বিজ্ঞাপন: ads@hindus.news
শাঁখারীবাজার গণহত্যা: একটি হিন্দু জনপদকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার পৈশাচিক নীল নকশা
0:00 0:00
1.0x