২০২১ সালের কুমিল্লার নানুয়ারদিঘীর পূজামণ্ডপে কোরআন রাখার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়া সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং সম্প্রতি সিলেটের বালাগঞ্জে পূজামণ্ডপে প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ঘিরে ‘মানসিক অসুস্থতা’র প্রসঙ্গ সামনে আসায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, কোনো ব্যক্তি মানসিকভাবে অসুস্থ কি না, সেটি তদন্ত ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিষয় হলেও সেই দাবিকে সামনে রেখে সংঘটিত অপরাধের দায় ও ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায়বিচারের বিষয়টি কি আড়াল হয়ে যাওয়া উচিত?
২০২১ সালের ১৩ অক্টোবর কুমিল্লা শহরের নানুয়ারদিঘীর পাড়ের একটি পূজামণ্ডপে কোরআন রাখার ঘটনা ছড়িয়ে পড়ার পর কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ওই সময় হিন্দু মন্দির, পূজামণ্ডপ, বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের কথা উঠে আসে। সহিংসতায় একাধিক মানুষের প্রাণহানিও ঘটে।
ঘটনার তদন্তে মো. ইকবাল হোসেনকে নানুয়ারদিঘীর পূজামণ্ডপে কোরআন রাখার ঘটনায় অভিযুক্ত করা হয়। পুলিশি তদন্তে পাওয়া সিসিটিভি ফুটেজের ভিত্তিতে তাকে শনাক্ত ও পরে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ইকবালের পরিবারের পক্ষ থেকে সে সময় তার দীর্ঘদিনের মানসিক ভারসাম্যহীনতার দাবি করা হয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়। তবে ২০২৩ সালে কুমিল্লার ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি মামলায় ইকবাল হোসেনকে আদালত এক বছর চার মাসের কারাদণ্ড দেন। আদালতে তিনি নিজের অপরাধ স্বীকার করেছিলেন বলে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা জানিয়েছিল।
অন্যদিকে, কুমিল্লার মূল ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘটিত পরবর্তী সহিংসতার সঙ্গে জড়িতদের বিচার নিয়ে প্রশ্ন এখনও রয়েছে। ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২১ সালের ঘটনার পর কুমিল্লা জেলায় ১২টি মামলা করা হয়েছিল। CID ছয়টি মামলা তদন্ত করে কয়েকটি মামলায় অভিযোগপত্র জমা দিলেও তখনও এসব মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়, অভিযোগ গঠন হলেও মামলাগুলো বিচার শুরুর পর্যায়ে এগোয়নি।
এদিকে চলতি সেপ্টেম্বর মাসে সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলায় একটি দুর্গাপূজার মণ্ডপে প্রতিমা ভাঙচুরের অভিযোগে সাইদুজ্জামান শিমুল (২৯) নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পশ্চিম বাজার নবীনগর সার্বজনীন পূজামণ্ডপে ঢুকে তিনি দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী ও কার্তিকের প্রতিমার বিভিন্ন অংশে আঘাত করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পুলিশ তাকে আটক করার পর তার কাছ থেকে একটি ধারালো অস্ত্র উদ্ধারের কথা জানিয়েছে। এ ঘটনায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও প্রতিমা ভাঙচুরের অভিযোগে মামলা হয়েছে এবং আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
ঘটনাটি সামনে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিমুলের মানসিক অবস্থা নিয়েও বিভিন্ন আলোচনা ও দাবি ছড়িয়ে পড়েছে। তবে তার মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে যথাযথ চিকিৎসা ও তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি নির্ধারণ করা প্রয়োজন। একইভাবে, মানসিক অসুস্থতা প্রমাণিত হলেও সংঘটিত ঘটনার ক্ষয়ক্ষতি, ভুক্তভোগীদের অধিকার এবং আইনগত দায় নির্ধারণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট আইন ও আদালতের প্রক্রিয়ার মধ্যেই নির্ধারিত হওয়া উচিত।
এখানেই কুমিল্লা থেকে বালাগঞ্জ—দুটি ঘটনার মধ্যে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা তৈরি হয়েছে। কোনো অপরাধীর ব্যক্তিগত বা মানসিক পরিস্থিতি অবশ্যই মানবিকভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে। কিন্তু সেই মানবিক বিবেচনা যেন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কষ্ট, সম্পদের ক্ষতি, ধর্মীয় উপাসনাস্থলে হামলা কিংবা বৃহত্তর সহিংসতার বিচারপ্রক্রিয়াকে আড়াল না করে—এমন দাবি উঠছে সনাতনী সম্প্রদায়ের বিভিন্ন মহল থেকে।
অপরাধীর ধর্মীয় পরিচয় কিংবা ব্যক্তিগত পরিচয় নয়, ঘটনার সত্যতা ও অপরাধের ধরন অনুযায়ী নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়াই ন্যায়বিচারের মূল বিষয়। একজন ব্যক্তি এককভাবে কোনো ঘটনা ঘটালে তার দায় নির্ধারণ যেমন জরুরি, তেমনি সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে অন্যরা যদি মন্দির, পূজামণ্ডপ, বাড়িঘর বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট করে থাকে, সেসব অভিযোগেরও পৃথকভাবে তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কুমিল্লার ঘটনায় এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে করা মামলার বিচার হয়েছে—এটি একটি পৃথক আইনি প্রক্রিয়া। কিন্তু ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরবর্তী সহিংসতায় যারা জড়িত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে, তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার অগ্রগতি ও বিচারও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে বিচারিক কার্যক্রম পিছিয়ে থাকার যে চিত্র উঠে এসেছিল, তা এ বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি জবাবদিহির প্রয়োজনীয়তাকে সামনে আনে।
মানবিকতা অবশ্যই সবার জন্য সমান হওয়া উচিত। মানসিক অসুস্থতা থাকলে তার চিকিৎসা ও মানবিক বিবেচনা প্রয়োজন, আবার কোনো অপরাধে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও পরিবারের ন্যায়বিচারের অধিকারও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে কোনো একটি ঘটনার ক্ষেত্রে মানবিকতার প্রশ্ন সামনে এলেও অন্য ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অধিকার যেন উপেক্ষিত না হয়—এটাই মূল প্রশ্ন।
সনাতনী সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে তাই প্রতিশোধ নয়, বরং প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রকৃত দায়ীদের শনাক্তকরণ, ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায়বিচার এবং দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন মামলাগুলোর দ্রুত আইনানুগ নিষ্পত্তির দাবি জানানো হচ্ছে।
কারণ অপরাধী যে ধর্মেরই হোক, তার পরিচয়ের চেয়ে অপরাধের বিচারই রাষ্ট্রের আইনি ব্যবস্থার মূল বিষয় হওয়া উচিত।
মতামত