হিন্দুস নিউজ
Topic Ads 1
১০ অক্টোবর এবং নোয়াখালী: সনাতনীদের ওপর চলা সুপরিকল্পিত নির্মমতার এক যুগসন্ধিক্ষণ

১০ অক্টোবর এবং নোয়াখালী: সনাতনীদের ওপর চলা সুপরিকল্পিত নির্মমতার এক যুগসন্ধিক্ষণ

​১৯৪৬ সালের ১০ই অক্টোবর। কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার আনন্দ যখন ঘরগুলোতে ছড়িয়ে পড়ার কথা, ঠিক তখনই এক অভিশপ্ত রাতে রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল ব্রিটিশ ভারতের পূর্ববঙ্গের নোয়াখালী ও ত্রিপুরা অঞ্চলের মাটি। ধর্ম, সম্প্রীতি ও সর্বজনীন মানবাধিকারকে পদদলিত করে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নেমে এসেছিল নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ। ইতিহাসের অন্যতম জঘন্য এই বিভীষিকা আজও মানবাধিকারের ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত হিসেবে বিরাজ করছে। মূলত তৎকালীন কলকাতা দাঙ্গার রেশ ধরে নোয়াখালী ও তার পার্শ্ববর্তী প্রায় দুই হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে সুপরিকল্পিতভাবে সংখ্যালঘু সনাতনী জনগোষ্ঠীর ওপর চালানো হয় নৃশংস অত্যাচার। এই ভয়াবহ জাতিগত নিপীড়ন কেবল একটি সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ছিল না, তা ছিল সমগ্র মানবজাতির মৌলিক অধিকার ও অস্তিত্বের ওপর এক মারাত্মক চপেটাঘাত।​নোয়াখালী ও ত্রিপুরা জেলার বিভিন্ন থানায় শুরু হওয়া এই গণহত্যা, নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, অপহরণ, সম্পত্তি লুটপাট এবং বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের তাণ্ডব প্রায় চার সপ্তাহ ধরে অব্যাহত ছিল। গোলাম সরোয়ার হুসেনির মতো উসকানিদাতাদের প্ররোচনায় মুসলিম ন্যাশনাল গার্ড ও বিভিন্ন মিলিশিয়া গোষ্ঠী এই পরিকল্পিত হামলায় লিপ্ত হয়। সরকারি হিসেবে মৃতের সংখ্যা শতকের ঘরে দেখানো হলেও তৎকালীন বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকদের মতে এই হামলায় প্রায় পাঁচ হাজারেরও বেশি নিরীহ সনাতনী প্রাণ হারান। হাজার হাজার সনাতনী নারীকে ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য করা হয় এবং বহু নারীকে অপহরণ ও যৌন সহিংসতার শিকার হতে হয়। আক্রান্তদের অনেককে নিজ ঘরে বন্দি রেখে, এমনকি তৎকালীন মধ্যযুগীয় 'জিজিয়া' করের মতো চাঁদা আদায় করে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য করা হয়। বঙ্গীয় আইন সভার সদস্য হারান চন্দ্র ঘোষ চৌধুরী এবং বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় যথার্থই তুলে ধরেছিলেন যে, এটি সাধারণ কোনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছিল না, বরং সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়কে নিশ্চিহ্ন করার এক সুসংগঠিত চক্রান্ত ছিল।​(News copied from- 'হিন্দুস নিউজ')​এই অভিশপ্ত ঘটনার পর হাজার হাজার হিন্দু বাধ্য হয়ে নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে কুমিল্লা, চাঁদপুর, আগরতলা, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের শরণার্থী শিবিরগুলোতে আশ্রয় নেন। মানবতাবিরোধী এই নির্মমতার পর পরিস্থিতি শান্ত করতে এবং ক্ষতে প্রলেপ দিতে মহাত্মা গান্ধী নিজে নোয়াখালীর দাঙ্গাপীড়িত গ্রামগুলোতে দীর্ঘ সময় ধরে শান্তি মিশন নিয়ে অবস্থান করেন। আচার্য্য কৃপালনির স্ত্রী সুচেতা কৃপালনিসহ বহু স্বেচ্ছাসেবক আক্রান্ত নারীদের উদ্ধারে এগিয়ে আসেন। তবে এই শান্তি প্রচেষ্টা কিংবা পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পীড়িত মানুষদের পুরোপুরি স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে পারেনি। আজ এতদিন পরেও ১৯৪৬ সালের সেই কোজাগরী রাতের আর্তনাদ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, যেকোনো জাতির ওপর ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন সমগ্র মানবজাতির জন্যই চরম এক ট্র্যাজেডি। সেই নৃশংস হামলায় প্রাণ হারানো প্রতিটি নিরীহ আত্মার প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।