হিন্দুস নিউজ

এক হাঁড়িতে রান্না, এক ছাদের নিচে ৫০ জন: মৌলভীবাজারে ৮০ বছরের হিন্দু একান্নবর্তী পরিবার


| প্রিন্ট সংস্করণ

এক হাঁড়িতে রান্না, এক ছাদের নিচে ৫০ জন: মৌলভীবাজারে ৮০ বছরের হিন্দু একান্নবর্তী পরিবার
Hindus News Voice of Hinduism
আপনার পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিন Hindus News এ।
নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় যখন একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে ছোট পরিবারে রূপ নিচ্ছে, তখন ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার বিনন্দপুর গ্রামের একটি পরিবার। 

প্রায় আট দশক ধরে একসঙ্গে বসবাস করে আসা এই একান্নবর্তী পরিবারের সদস্যসংখ্যা বর্তমানে ৫০ জন।

জুড়ী উপজেলার পূর্ব জুড়ী ইউনিয়নের বিনন্দপুর গ্রামে অবস্থিত পরিবারটির সব সদস্য এখনো একই উঠানে, একই হাঁড়িতে রান্না করা খাবার খেয়ে মিলেমিশে জীবনযাপন করছেন। এলাকাবাসীর ভাষ্য, শুধু বিনন্দপুর নয়, আশপাশের কোনো গ্রামেও বর্তমানে এমন বড় একান্নবর্তী পরিবার আর নেই।

পরিবারটির একান্নে থাকার যাত্রা শুরু হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে। পরিবারের পূর্বপুরুষ ভীম রুদ্রপাল ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলা থেকে জীবিকার সন্ধানে তৎকালীন ব্রিটিশ শাসনামলে সপরিবারে এ অঞ্চলে আসেন। তিনি ধামাই চা-বাগানে শ্রমিক হিসেবে কাজ নেন। পরে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের আগেই বিনন্দপুর এলাকায় সস্তায় কিছু জমি কিনে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। এরপর আর নিজ জন্মভূমিতে ফেরা হয়নি তাঁর।

Hindus News Voice of Hinduism
আপনার পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিন Hindus News এ।
ভীম রুদ্রপাল ও তাঁর দুই ছেলে—মুরারি রুদ্রপাল ও কেশব রুদ্রপাল—এখন আর বেঁচে নেই। তবে তাঁদের বংশধরেরা আজও পূর্বপুরুষের সেই একান্নে থাকার ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। মুরারি ও কেশবের মোট নয় ছেলে। তাঁদের মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেলেও ছেলেরা স্ত্রী, সন্তান ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে একই পরিবারে বসবাস করছেন।

সম্প্রতি এক বিকেলে পরিবারটির বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, প্রবেশপথের এক পাশে বড় পুকুর, অন্য পাশে সবুজ উদ্যান। উঠানের চারপাশে টিনশেডের চারটি দীর্ঘ বসতঘর। মাটির দেয়াল ও শণের ছাউনিতে তৈরি রান্নাঘরটি প্রায় ৮০ বছরের পুরোনো বলে জানান পরিবারের সদস্যরা।

পরিবারের বর্তমান অভিভাবক মুরারির মেজ ছেলে পলাশ রুদ্রপাল। তাঁর বয়স প্রায় ষাট। তিনি বলেন, ‘বাপ-কাকার আমল থেকে আমরা সবাই একসঙ্গেই আছি। এক ডেকচিতেই সবার রান্না হয়। সংসারের আয়-ব্যয়, উন্নতি—সবকিছু মিলেমিশেই চলে। আলাদা হওয়ার কথা কেউ কখনো ভাবেনি।’

পরিবারের আরেক সদস্য ও গ্রাম্য প্রাণী চিকিৎসক শোভা রুদ্রপাল জানান, একসময় জমিজমা কম থাকলেও বর্তমানে তাঁদের প্রায় ১০০ বিঘা জমি রয়েছে। এসব জমিতে বনজ ও ফলদ গাছের বাগান, পাঁচটি মাছের খামার, ধান ও মৌসুমি শাকসবজির আবাদ করা হয়। বছরে আউশ ও আমন মিলিয়ে ৩০০ থেকে ৪০০ মণ ধান উৎপাদন হয়, যা পরিবারের সারা বছরের খাদ্যচাহিদা পূরণ করে। মাছ, সবজি ও মসলাপাতি কিনতে হয় না বললেই চলে।

পরিবারের জ্যেষ্ঠ নারী সদস্য সত্তরোর্ধ্ব সোহাগী রুদ্রপাল বলেন, ‘ছেলে, ছেলেবউ, নাতি-নাতনিদের নিয়ে ভালই আছি। ভগবানের কাছে একটাই প্রার্থনা—সবাই যেন সব সময় এভাবেই মিলেমিশে থাকে।’

স্থানীয় দুর্গাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অশোক রঞ্জন পাল বলেন, একান্নবর্তী পরিবারে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতা গড়ে ওঠে। নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও এই পরিবারটি একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

পূর্ব জুড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ‘এই পরিবারটি শুধু বিনন্দপুর নয়, পুরো ইউনিয়নের গর্ব। তারা তাদের পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।’

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

হিন্দুস নিউজ

রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬


এক হাঁড়িতে রান্না, এক ছাদের নিচে ৫০ জন: মৌলভীবাজারে ৮০ বছরের হিন্দু একান্নবর্তী পরিবার

প্রকাশের তারিখ : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

featured Image
নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় যখন একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে ছোট পরিবারে রূপ নিচ্ছে, তখন ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার বিনন্দপুর গ্রামের একটি পরিবার। 

প্রায় আট দশক ধরে একসঙ্গে বসবাস করে আসা এই একান্নবর্তী পরিবারের সদস্যসংখ্যা বর্তমানে ৫০ জন।

জুড়ী উপজেলার পূর্ব জুড়ী ইউনিয়নের বিনন্দপুর গ্রামে অবস্থিত পরিবারটির সব সদস্য এখনো একই উঠানে, একই হাঁড়িতে রান্না করা খাবার খেয়ে মিলেমিশে জীবনযাপন করছেন। এলাকাবাসীর ভাষ্য, শুধু বিনন্দপুর নয়, আশপাশের কোনো গ্রামেও বর্তমানে এমন বড় একান্নবর্তী পরিবার আর নেই।

পরিবারটির একান্নে থাকার যাত্রা শুরু হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে। পরিবারের পূর্বপুরুষ ভীম রুদ্রপাল ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলা থেকে জীবিকার সন্ধানে তৎকালীন ব্রিটিশ শাসনামলে সপরিবারে এ অঞ্চলে আসেন। তিনি ধামাই চা-বাগানে শ্রমিক হিসেবে কাজ নেন। পরে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের আগেই বিনন্দপুর এলাকায় সস্তায় কিছু জমি কিনে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। এরপর আর নিজ জন্মভূমিতে ফেরা হয়নি তাঁর।

ভীম রুদ্রপাল ও তাঁর দুই ছেলে—মুরারি রুদ্রপাল ও কেশব রুদ্রপাল—এখন আর বেঁচে নেই। তবে তাঁদের বংশধরেরা আজও পূর্বপুরুষের সেই একান্নে থাকার ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। মুরারি ও কেশবের মোট নয় ছেলে। তাঁদের মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেলেও ছেলেরা স্ত্রী, সন্তান ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে একই পরিবারে বসবাস করছেন।

সম্প্রতি এক বিকেলে পরিবারটির বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, প্রবেশপথের এক পাশে বড় পুকুর, অন্য পাশে সবুজ উদ্যান। উঠানের চারপাশে টিনশেডের চারটি দীর্ঘ বসতঘর। মাটির দেয়াল ও শণের ছাউনিতে তৈরি রান্নাঘরটি প্রায় ৮০ বছরের পুরোনো বলে জানান পরিবারের সদস্যরা।

পরিবারের বর্তমান অভিভাবক মুরারির মেজ ছেলে পলাশ রুদ্রপাল। তাঁর বয়স প্রায় ষাট। তিনি বলেন, ‘বাপ-কাকার আমল থেকে আমরা সবাই একসঙ্গেই আছি। এক ডেকচিতেই সবার রান্না হয়। সংসারের আয়-ব্যয়, উন্নতি—সবকিছু মিলেমিশেই চলে। আলাদা হওয়ার কথা কেউ কখনো ভাবেনি।’

পরিবারের আরেক সদস্য ও গ্রাম্য প্রাণী চিকিৎসক শোভা রুদ্রপাল জানান, একসময় জমিজমা কম থাকলেও বর্তমানে তাঁদের প্রায় ১০০ বিঘা জমি রয়েছে। এসব জমিতে বনজ ও ফলদ গাছের বাগান, পাঁচটি মাছের খামার, ধান ও মৌসুমি শাকসবজির আবাদ করা হয়। বছরে আউশ ও আমন মিলিয়ে ৩০০ থেকে ৪০০ মণ ধান উৎপাদন হয়, যা পরিবারের সারা বছরের খাদ্যচাহিদা পূরণ করে। মাছ, সবজি ও মসলাপাতি কিনতে হয় না বললেই চলে।

পরিবারের জ্যেষ্ঠ নারী সদস্য সত্তরোর্ধ্ব সোহাগী রুদ্রপাল বলেন, ‘ছেলে, ছেলেবউ, নাতি-নাতনিদের নিয়ে ভালই আছি। ভগবানের কাছে একটাই প্রার্থনা—সবাই যেন সব সময় এভাবেই মিলেমিশে থাকে।’

স্থানীয় দুর্গাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অশোক রঞ্জন পাল বলেন, একান্নবর্তী পরিবারে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতা গড়ে ওঠে। নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও এই পরিবারটি একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

পূর্ব জুড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ‘এই পরিবারটি শুধু বিনন্দপুর নয়, পুরো ইউনিয়নের গর্ব। তারা তাদের পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।’


হিন্দুস নিউজ

প্রকাশক & সম্পাদক: শুভ চন্দ্র দে
HINDUS NEWS মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক ঢাকা থেকে প্রকাশিত

প্রকাশক & সম্পাদক: শুভ চন্দ্র দে,🔴HINDUS NEWS মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক ঢাকা থেকে প্রকাশিত।🔴যোগাযোগ: +88 01890890920🔴 ই-মেইল: news@hindus.news 🔴 বিজ্ঞাপন: ads@hindus.news
এক হাঁড়িতে রান্না, এক ছাদের নিচে ৫০ জন: মৌলভীবাজারে ৮০ বছরের হিন্দু একান্নবর্তী পরিবার
0:00 0:00
1.0x