আজ ৫ই ফেব্রুয়ারি,বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির এক সময়ের অন্যতম প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর, সাবেক সংসদ সদস্য ও বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ৯ম মৃত্যুবার্ষিকী। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি শুধু একজন দক্ষ সংসদ সদস্যই নন, বরং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা ও আইনের শাসনের পক্ষে নির্ভীক অবস্থান নেওয়া একজন সংগ্রামী রাজনীতিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের জন্ম ৫ মে ১৯৪৬ সালে সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার আনোয়ারপুর গ্রামে।
একটি শিক্ষিত হিন্দু পরিবারে বেড়ে ওঠা এই রাজনীতিক শৈশব থেকেই মেধা ও মননের পরিচয় দেন। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং ইতিহাস বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে সেন্ট্রাল ল’ কলেজ থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি নিয়ে তিনি একজন আইনজীবী হিসেবে পেশাজীবন শুরু করেন এবং সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য হন।
ছাত্রজীবন থেকেই বামপন্থী ও প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) প্রার্থী হিসেবে প্রথমবার জাতীয় রাজনীতিতে আলোচনায় আসেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং স্বাধীনতার পর নতুন রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়ায় যুক্ত হন। বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য হিসেবে তিনি মৌলিক রাষ্ট্রকাঠামো নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, যা তার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গৌরবময় অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং পরবর্তী কয়েক দশক ধরে সংসদীয় রাজনীতিতে দৃঢ় অবস্থান বজায় রাখেন। তিনি একাধিকবার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং দীর্ঘ সময় সুনামগঞ্জ-২ আসনের জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সংসদে তার উপস্থিতি মানেই ছিলো যুক্তিনির্ভর, স্পষ্টভাষী ও তীক্ষ্ণ বক্তব্য। বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে তিনি বারবার সোচ্চার হয়েছেন, যা তাকে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর কাছে আস্থার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

গণমানুষের কাছে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ছিলেন একজন সহজপ্রাপ্য নেতা। এলাকায় উন্নয়ন কাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সামাজিক অবকাঠামো গড়ে তুলতে তার ভূমিকা স্থানীয় জনগণের কাছে আজও স্মরণীয়। একই সঙ্গে তার ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিলো বহুভাষায় দক্ষতা ও সাহিত্যপ্রেম, যা তাকে একজন সাংস্কৃতিক মননের রাজনীতিক হিসেবেও পরিচিত করে তোলে।
২০১৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তার প্রয়াণে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক শূন্যতা সৃষ্টি হয়, যা আজও অনুভূত হয় বলে মনে করেন তার সহকর্মী ও অনুসারীরা।
আজ তার ৯ম মৃত্যুবার্ষিকীতে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে স্মরণ করা মানে কেবল একজন রাজনীতিককে স্মরণ করা নয়, বরং একটি আদর্শকে স্মরণ করা। এমন এক রাজনীতি, যেখানে সংসদ হবে ন্যায়, যুক্তি ও মানবাধিকারের পক্ষে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরের মঞ্চ। সামনে ১২ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে অনেকের প্রত্যাশা—সংসদে যেন আদর্শিক, ন্যায়পরায়ণ ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রকৃত প্রতিনিধিরা নির্বাচিত হয়ে আসেন। এটিই হতে পারে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর সবচেয়ে অর্থবহ উপায়।
মতামত