ঠাকুরগাঁও জেলার সদর উপজেলার চিলারং ইউনিয়নের কিসমত পাহাড়ভাঙ্গা গ্রামে এক ব্যতিক্রমী ও বর্ণিল আয়োজনের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়েছে বট ও পাকুড়গাছের বিয়ে। মানুষের বিয়ের আদলে ঢাকঢোল, সানাই, উলুধ্বনি ও আলপনায় সাজানো মণ্ডপে সনাতন ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে এই আয়োজন ঘিরে পুরো গ্রামজুড়ে সৃষ্টি হয় উৎসবের আমেজ। প্রকৃতি সংরক্ষণ ও বৃক্ষপ্রেম জাগ্রত করার বার্তা ছড়িয়ে দিতেই এমন উদ্যোগ নিয়েছেন আয়োজকেরা।
শুক্রবার দুপুরে কালীমন্দির সংলগ্ন পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা পাকুড়গাছকে সাদা ধুতি এবং বটগাছকে লাল-হলুদ শাড়ি ও ফুলের মালায় সাজানো হয়। ধান-দুর্বা, হলুদ, সিঁদুর, ধূপকাঠি, কলা, দই ও সন্দেশসহ নানা উপাচারে সজ্জিত ছিল বেদি। পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় বিয়ের মূল আনুষ্ঠানিকতা। উপস্থিত অতিথিদের উলুধ্বনি ও কাঁসরের শব্দে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। মন্ত্রপাঠ শেষে প্রতীকীভাবে সাত পাকে বাঁধা পড়েন বর ও কনে।
বিয়ের আয়োজন শুরু হয় আগের দিন গায়েহলুদের মাধ্যমে। আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে ছিল আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও আশপাশের গ্রামের মানুষ। প্রায় চার শতাধিক পরিবারকে নিমন্ত্রণ করা হয় এবং বিয়ের পর সবার জন্য আয়োজন করা হয় মধ্যাহ্নভোজের। অনুষ্ঠানে অতিথিরা উপহার দিয়ে আশীর্বাদ জানান এই প্রতীকী নবদম্পতিকে।
বিয়ের পুরোহিত শুভন চক্রবর্তী বলেন, বট ও পাকুড় হিন্দুশাস্ত্রে দেববৃক্ষ হিসেবে পরিচিত এবং পূজা-অর্চনায় এই দুটি গাছের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ব্যক্তি ও সমাজের মঙ্গল কামনার পাশাপাশি প্রকৃতি ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার বার্তা দিতেই এই বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে।
কনেপক্ষের দায়িত্ব পালন করেন চিলারং গ্রামের পরিমল চন্দ্র বর্মন। তিনি জানান, কয়েক বছর আগে এই দুটি গাছ রোপণ করা হয়েছিল। প্রবীণদের পরামর্শে প্রকৃতির কল্যাণ কামনায় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বৃক্ষরোপণে উদ্বুদ্ধ করতেই এ আয়োজন। বরপক্ষের দায়িত্বে থাকা বলরাম সরকার বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষের গুরুত্ব অপরিসীম। সেই সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে গ্রামবাসী একযোগে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছেন।
স্থানীয় প্রবীণ শিক্ষাবিদ মনতোষ কুমার দে এই আয়োজনকে একটি লোকাচার হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, বট-পাকুড়ের বিয়ে আসলে পরিবেশ সংরক্ষণের প্রতীকী বার্তা বহন করে। এই গাছগুলো দীর্ঘজীবী ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত উপকারী। তাই মানুষকে প্রকৃতিপ্রেমী করে তুলতেই এমন উদ্যোগ সময়োপযোগী।
ব্যতিক্রমী এই আয়োজন ঘিরে গ্রামবাসীর মধ্যে যেমন ছিল আনন্দ, তেমনি ছিল সচেতনতার বার্তা—গাছ বাঁচলে বাঁচবে প্রকৃতি, আর প্রকৃতি বাঁচলে বাঁচবে মানুষ।
মতামত