শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩
হিন্দুস নিউজ
Hindus News Voice of Hinduism
আপনার পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিন Hindus News এ।

বীরশ্রেষ্ঠ জগৎজ্যোতি মহান মুক্তিযুদ্ধে ক্রুসবিদ্ধ যীশুর প্রতিচ্ছবি: ইতিহাসের পাতা থেকে কেন মুছে ফেলার চেষ্টা এই বীরশ্রেষ্ঠ কে ?


| প্রিন্ট সংস্করণ

বীরশ্রেষ্ঠ জগৎজ্যোতি মহান মুক্তিযুদ্ধে ক্রুসবিদ্ধ যীশুর প্রতিচ্ছবি:  ইতিহাসের পাতা থেকে কেন মুছে ফেলার চেষ্টা এই বীরশ্রেষ্ঠ কে ?
Hindus News Voice of Hinduism
আপনার পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিন Hindus News এ।
বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর অনেক নাম হারিয়ে গেছে বিস্মৃতির অতলে, আবার অনেককে কৌশলে করা হয়েছে অবমূল্যায়ন। এমনই এক নাম বীরযোদ্ধা জগৎজ্যোতি দাস। একাত্তরের সেই উত্তাল দিনে যার বীরত্বগাথা কাঁপিয়ে দিয়েছিল পাক হানাদার বাহিনীর ভিত, আজ স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরেও তিনি নিজ দেশে ব্রাত্য, প্রাপ্য সম্মান থেকে বঞ্চিত। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ঘোষিত প্রথম ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ হওয়া সত্ত্বেও পরবর্তীতে এক অজ্ঞাত কারণে তাঁর নাম সেই তালিকা থেকে মুছে ফেলে তাঁকে কেবল ‘বীর বিক্রম’ খেতাবে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। জগৎজ্যোতি দাসের আত্মত্যাগের ধরন এতটাই বীভৎস এবং মহান ছিল যে তাঁকে তুলনা করা হয় ‘বাংলার যিশু’ হিসেবে। যিশুখ্রিস্টকে যেমন ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল, এই বীর যোদ্ধাকেও তেমনি নিথর দেহে পেরেক ঠুকে বৈদ্যুতিক খুঁটিতে ঝুলিয়ে রেখেছিল পাকি ও তাদের দোসররা।


​হবিগঞ্জ জেলার আজমিরীগঞ্জ উপজেলার জলসুখা গ্রামের এক সাধারণ হিন্দু পরিবারে ১৯৪৯ সালে জন্ম নেওয়া এই তেজোদীপ্ত যুবক ছাত্রজীবন থেকেই ছিলেন প্রতিবাদী। ১৯৬৯-এর আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে নকশালপন্থীদের সংস্পর্শে আসা—সবই তাঁকে করে তুলেছিল এক অপরাজেয় গেরিলা যোদ্ধা। একাত্তরের যুদ্ধে তিনি গড়ে তুলেছিলেন তাঁর নিজস্ব গেরিলা বাহিনী ‘দাস পার্টি’। ৫ নং সেক্টরের অধীনে এই বাহিনী সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে পাক বাহিনীর কাছে হয়ে উঠেছিল মূর্তিমান আতঙ্ক। বদলপুর অপারেশন থেকে শুরু করে জামালগঞ্জ থানা দখল—সবখানেই জগৎজ্যোতির বীরত্ব ছিল কিংবদন্তিতুল্য। তাঁর ইংরেজি ও হিন্দিতে পারদর্শিতা ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সাথে সমন্বয়ে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল, যা দাস পার্টিকে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত করতে সহায়তা করে।

​তবে এই বীরের শেষটা ছিল অত্যন্ত করুণ ও বেদনাদায়ক। ১৯৭১ সালের ১৬ নভেম্বর এক অসম যুদ্ধে গোলাবারুদ ফুরিয়ে এলে পাক বাহিনীর বুলেটে বিদ্ধ হন তিনি। তাঁর মৃত্যুর পর যে পাশবিকতা চালানো হয়েছিল তা সভ্য সমাজের কল্পনাতীত। আজমিরীগঞ্জ বাজারে হাটবারে শত শত মানুষের সামনে তাঁর মৃতদেহ একটি বৈদ্যুতিক খুঁটিতে পেরেক মেরে ঝুলিয়ে রাখা হয়। পাকিরা তাঁর শক্তির এতটাই প্রশংসা ও ভয় করত যে, শহর থেকে ফটোগ্রাফার এনে সেই লাশের ছবি তুলে রেখেছিল তারা। সারাদিন অমানবিক লাঞ্ছনার পর এক সময় ক্ষতবিক্ষত দেহটি ভেড়ামোহনা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। গুলিবিদ্ধ চোখের সেই জগৎজ্যোতি যেন কাঁটাবিদ্ধ যিশুরই প্রতিচ্ছবি।

Hindus News Voice of Hinduism
আপনার পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিন Hindus News এ।

​স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তাঁকে ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ হিসেবে একাধিকবার ঘোষণা করা হলেও স্বাধীনতার পর এক অদৃশ্য কারণে সামরিক বাহিনীর বাইরে কাউকে এই সর্বোচ্চ সম্মান না দেওয়ার এক সংকীর্ণ প্রথা চালু হয়। ৪ নং সেক্টরের সাবসেক্টর কমান্ডার মাহবুবুর রব সাদী এই অন্যায়ের প্রতিবাদে নিজের ‘বীর প্রতীক’ খেতাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন যে, জগৎজ্যোতি দাসের মতো যোদ্ধারাই প্রকৃত বীরশ্রেষ্ঠ। আজ যখন স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে আমরা নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি, তখন সময় এসেছে এই ঐতিহাসিক অবিচারের প্রতিকার করার। যে জাতি তার সূর্যসন্তানদের মর্যাদা দিতে জানে না, সে জাতির পতন অনিবার্য। জগৎজ্যোতি দাসের হৃত সম্মান ও বীরশ্রেষ্ঠ খেতাব ফিরিয়ে দিয়ে রাষ্ট্রকে তাঁর কাছে ক্ষমা চাওয়াই হবে আজকের দিনের শ্রেষ্ঠ অঙ্গীকার।

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

হিন্দুস নিউজ

শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬


বীরশ্রেষ্ঠ জগৎজ্যোতি মহান মুক্তিযুদ্ধে ক্রুসবিদ্ধ যীশুর প্রতিচ্ছবি: ইতিহাসের পাতা থেকে কেন মুছে ফেলার চেষ্টা এই বীরশ্রেষ্ঠ কে ?

প্রকাশের তারিখ : ২৬ মার্চ ২০২৬

featured Image
বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর অনেক নাম হারিয়ে গেছে বিস্মৃতির অতলে, আবার অনেককে কৌশলে করা হয়েছে অবমূল্যায়ন। এমনই এক নাম বীরযোদ্ধা জগৎজ্যোতি দাস। একাত্তরের সেই উত্তাল দিনে যার বীরত্বগাথা কাঁপিয়ে দিয়েছিল পাক হানাদার বাহিনীর ভিত, আজ স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরেও তিনি নিজ দেশে ব্রাত্য, প্রাপ্য সম্মান থেকে বঞ্চিত। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ঘোষিত প্রথম ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ হওয়া সত্ত্বেও পরবর্তীতে এক অজ্ঞাত কারণে তাঁর নাম সেই তালিকা থেকে মুছে ফেলে তাঁকে কেবল ‘বীর বিক্রম’ খেতাবে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। জগৎজ্যোতি দাসের আত্মত্যাগের ধরন এতটাই বীভৎস এবং মহান ছিল যে তাঁকে তুলনা করা হয় ‘বাংলার যিশু’ হিসেবে। যিশুখ্রিস্টকে যেমন ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল, এই বীর যোদ্ধাকেও তেমনি নিথর দেহে পেরেক ঠুকে বৈদ্যুতিক খুঁটিতে ঝুলিয়ে রেখেছিল পাকি ও তাদের দোসররা।


​হবিগঞ্জ জেলার আজমিরীগঞ্জ উপজেলার জলসুখা গ্রামের এক সাধারণ হিন্দু পরিবারে ১৯৪৯ সালে জন্ম নেওয়া এই তেজোদীপ্ত যুবক ছাত্রজীবন থেকেই ছিলেন প্রতিবাদী। ১৯৬৯-এর আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে নকশালপন্থীদের সংস্পর্শে আসা—সবই তাঁকে করে তুলেছিল এক অপরাজেয় গেরিলা যোদ্ধা। একাত্তরের যুদ্ধে তিনি গড়ে তুলেছিলেন তাঁর নিজস্ব গেরিলা বাহিনী ‘দাস পার্টি’। ৫ নং সেক্টরের অধীনে এই বাহিনী সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে পাক বাহিনীর কাছে হয়ে উঠেছিল মূর্তিমান আতঙ্ক। বদলপুর অপারেশন থেকে শুরু করে জামালগঞ্জ থানা দখল—সবখানেই জগৎজ্যোতির বীরত্ব ছিল কিংবদন্তিতুল্য। তাঁর ইংরেজি ও হিন্দিতে পারদর্শিতা ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সাথে সমন্বয়ে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল, যা দাস পার্টিকে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত করতে সহায়তা করে।

​তবে এই বীরের শেষটা ছিল অত্যন্ত করুণ ও বেদনাদায়ক। ১৯৭১ সালের ১৬ নভেম্বর এক অসম যুদ্ধে গোলাবারুদ ফুরিয়ে এলে পাক বাহিনীর বুলেটে বিদ্ধ হন তিনি। তাঁর মৃত্যুর পর যে পাশবিকতা চালানো হয়েছিল তা সভ্য সমাজের কল্পনাতীত। আজমিরীগঞ্জ বাজারে হাটবারে শত শত মানুষের সামনে তাঁর মৃতদেহ একটি বৈদ্যুতিক খুঁটিতে পেরেক মেরে ঝুলিয়ে রাখা হয়। পাকিরা তাঁর শক্তির এতটাই প্রশংসা ও ভয় করত যে, শহর থেকে ফটোগ্রাফার এনে সেই লাশের ছবি তুলে রেখেছিল তারা। সারাদিন অমানবিক লাঞ্ছনার পর এক সময় ক্ষতবিক্ষত দেহটি ভেড়ামোহনা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। গুলিবিদ্ধ চোখের সেই জগৎজ্যোতি যেন কাঁটাবিদ্ধ যিশুরই প্রতিচ্ছবি।

​স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তাঁকে ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ হিসেবে একাধিকবার ঘোষণা করা হলেও স্বাধীনতার পর এক অদৃশ্য কারণে সামরিক বাহিনীর বাইরে কাউকে এই সর্বোচ্চ সম্মান না দেওয়ার এক সংকীর্ণ প্রথা চালু হয়। ৪ নং সেক্টরের সাবসেক্টর কমান্ডার মাহবুবুর রব সাদী এই অন্যায়ের প্রতিবাদে নিজের ‘বীর প্রতীক’ খেতাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন যে, জগৎজ্যোতি দাসের মতো যোদ্ধারাই প্রকৃত বীরশ্রেষ্ঠ। আজ যখন স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে আমরা নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি, তখন সময় এসেছে এই ঐতিহাসিক অবিচারের প্রতিকার করার। যে জাতি তার সূর্যসন্তানদের মর্যাদা দিতে জানে না, সে জাতির পতন অনিবার্য। জগৎজ্যোতি দাসের হৃত সম্মান ও বীরশ্রেষ্ঠ খেতাব ফিরিয়ে দিয়ে রাষ্ট্রকে তাঁর কাছে ক্ষমা চাওয়াই হবে আজকের দিনের শ্রেষ্ঠ অঙ্গীকার।


হিন্দুস নিউজ

প্রকাশক & সম্পাদক: শুভ চন্দ্র দে
HINDUS NEWS মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক ঢাকা থেকে প্রকাশিত

প্রকাশক & সম্পাদক: শুভ চন্দ্র দে,🔴HINDUS NEWS মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক ঢাকা থেকে প্রকাশিত।🔴যোগাযোগ: +88 01890890920🔴 ই-মেইল: news@hindus.news 🔴 বিজ্ঞাপন: ads@hindus.news
বীরশ্রেষ্ঠ জগৎজ্যোতি মহান মুক্তিযুদ্ধে ক্রুসবিদ্ধ যীশুর প্রতিচ্ছবি: ইতিহাসের পাতা থেকে কেন মুছে ফেলার চেষ্টা এই বীরশ্রেষ্ঠ কে ?
0:00 0:00
1.0x