অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘ঢাকা স্ট্রিম’-এর গ্রাফিক ডিজাইনার স্বর্ণময়ী বিশ্বাসের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশের দেওয়া ‘পারিবারিক কারণে আত্মহত্যা’র চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করেছেন আদালত। রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানার উপপরিদর্শক সাইফুল ইসলামের দাখিলকৃত এই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, দীর্ঘ তদন্ত ও ময়নাতদন্ত রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, স্বর্ণময়ী পারিবারিক অভিমান ও বিষণ্নতা থেকেই আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। তবে এই প্রতিবেদনকে ঘিরে শুরু থেকেই নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে, বিশেষ করে তার কর্মস্থলে চলা যৌন নিপীড়নের অভিযোগ এবং কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাকে আড়াল করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।
গত বছরের ১৯ অক্টোবর নিজ বাসা থেকে স্বর্ণময়ীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মৃত্যুর কিছুদিন আগে তিনিসহ একদল সংবাদকর্মী প্রতিষ্ঠানের বাংলা কনটেন্ট এডিটর আলতাফ শাহনেওয়াজের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করা হয়েছিল, অভিযোগ দেওয়ার পরও দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও ঢাকা স্ট্রিম কর্তৃপক্ষ কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় স্বর্ণময়ী প্রচণ্ড মানসিক চাপে ছিলেন। তবে তদন্ত কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, ঘটনাস্থলে প্রাপ্ত সুইসাইড নোটে স্বর্ণময়ী তার অভিমান ও হতাশার কথা লিখে গেছেন, যা কোনো ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে নয় বরং পরিবারের প্রতি বলেই পুলিশ মনে করছে।
পুলিশের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উদ্ধারকৃত নোটবুকে স্বর্ণময়ী লিখেছেন— “আমি যাদের ওপর খুব ভরসা করেছিলাম, তারা খুব নড়বড়ে... আমি না থাকলে তোমাদের দিব্যি চলবে।” তদন্ত কর্মকর্তা সাফ জানিয়েছেন, সুইসাইড নোটে কারণ স্পষ্ট থাকায় তিনি কর্মস্থলের কারো সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজন বোধ করেননি এবং স্বর্ণময়ীর পরিবার থেকেও কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আসেনি। এদিকে অভিযুক্ত আলতাফ শাহনেওয়াজ নিজেকে ‘অফিস পলিটিক্সের শিকার’ বলে দাবি করেছেন। যদিও প্রতিষ্ঠানের এক বিবৃতিতে স্বীকার করা হয়েছিল যে, আলতাফের বিরুদ্ধে অসৌজন্যমূলক আচরণের প্রমাণ পাওয়ায় তাকে বার্তাকক্ষ থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল।
স্বর্ণময়ীর সহকর্মী শতাব্দীকা ঊর্মি পুলিশের এই তদন্ত নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, যৌন নিপীড়নের অভিযোগে স্বর্ণময়ী নিজেও স্বাক্ষর করেছিলেন এবং কর্মক্ষেত্রে সেই হ্যারাসমেন্টের কোনো সুষ্ঠু বিচার হয়নি। এখন ছয় মাস পর পুরো বিষয়টিকে কেবল ‘পারিবারিক কারণ’ হিসেবে চালিয়ে দিয়ে প্রকৃত সত্যকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। একজন সংখ্যালঘু নারী সংবাদকর্মীর এই করুণ পরিণতি এবং পরবর্তী তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।
মতামত