কক্সবাজারের চকরিয়ার মালুমঘাটে সনাতনী ধর্মাবলম্বী সুশীল পরিবারের ওপর নেমে আসা সেই ভয়াবহ ট্র্যাজেডি কোনো সাধারণ সড়ক দুর্ঘটনা ছিল না, বরং তা ছিল এক নৃশংস ও পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। ২০২২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে পিতার পরলৌকিক ক্রিয়ার অংশ হিসেবে দশাহ্ অনুষ্ঠান শেষে রাস্তা পার হওয়ার অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় উগ্র উন্মত্ততায় পিষে মারা হয় সুরেশ চন্দ্র সুশীলের ছয় সন্তানকে। দীর্ঘ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে বেরিয়ে এসেছে সেই রক্তহিম করা সত্য—যেখানে স্রেফ দুর্ঘটনার তকমা দিয়ে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল একটি সুপরিকল্পিত নিধনযজ্ঞকে।
সেদিন ভোরে হাসিনাপাড়ার বাসিন্দা সুরেশ চন্দ্র সুশীলের ছেলেরা যখন তাদের পিতার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ধর্মীয় বিধান পালন করছিলেন, ঠিক তখনই একটি সবজি বোঝাই পিকআপ কালনাগিনীর মতো ধেয়ে আসে। ঘটনার প্রাথমিক বিবরণে পুলিশ ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে একে কেবলই 'সড়ক দুর্ঘটনা' হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সত্যের জয় হয়েছে। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর সূক্ষ্ম অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চালকের উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত পৈশাচিক। প্রথম দফায় চারজনকে চাপা দেওয়ার পর চালক গাড়িটি থামিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু এখানেই শেষ নয়। আহতদের যন্ত্রণায় কাতরাতে দেখেও মানবিকতা জাগেনি তার মনে; বরং গাড়িটি পেছনে নিয়ে পুনরায় আহতদের ওপর তুলে দিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে সেই ঘাতক। এরপর আরও সামনে এগিয়ে বাকিদের ওপর গাড়ি চালিয়ে দিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে সে।
এই পৈশাচিক হামলায় ঘটনাস্থলেই অনুপম, নিরুপম, দীপক ও চম্পক প্রাণ হারান। পরে হাসপাতালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন স্মরণ ও রক্তিম। একটি সাজানো গোছানো হিন্দু পরিবারের মেরুদণ্ড মুহূর্তেই গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রথম দিকে বিষয়টি সাধারণ ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের মামলা হিসেবে দেখা হলেও পিবিআই-এর তদন্তে চালকের আচরণগত বীভৎসতা ফুটে ওঠে। তদন্তে প্রমাণিত হয় যে, প্রথম ধাক্কাটি অসতর্কতাবশত হলেও পরবর্তী সময়ে বারবার গাড়ি চালিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করা দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় সুস্পষ্ট পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
তদন্তকারী সংস্থা আরও জানায়, ঘাতক পিকআপটির কোনো বৈধ ফিটনেস ছিল না এবং চালকেরও ছিল না কোনো লাইসেন্স। হিন্দু ধর্মাবলম্বী একটি পরিবারের শোকের মুহূর্তে এমন পৈশাচিক আচরণ সাম্প্রদায়িক সংবেদনশীলতা ও চরম নৃশংসতারই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রায় চার বছর ধরে চলা আইনি লড়াই শেষে আদালত ঘাতক চালককে আমৃত্যু সশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড প্রদান করেছেন। যদিও পরিবারের হারানো ছয় ভাইয়ের অভাব কোনো বিচারেই পূরণ হওয়ার নয়, তবুও এই রায় প্রমাণ করেছে যে দুর্ঘটনার আড়ালে লুকিয়ে থাকা কোনো ষড়যন্ত্রই শেষ পর্যন্ত চাপা থাকে না। আজ সুরেশ চন্দ্র সুশীলের সেই শূন্য ভিটেয় কান্নার রোল কিছুটা থামলেও ছয় ভাইয়ের অকাল প্রয়াণের ক্ষত আজীবন বয়ে বেড়াবে কক্সবাজারের হিন্দু সমাজ। এই মামলার রায় ভবিষ্যতে এ ধরনের ছদ্মবেশী হত্যাকাণ্ড রুখতে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।
মতামত