পার্বত্য জেলা বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ের কোলজুড়ে ম্রো জনগোষ্ঠীর বসবাস। আলীকদম, থানচি বা চিম্বুকের মতো প্রান্তিক অঞ্চলগুলোতে বসবাসকারী এই জনগোষ্ঠী তাদের স্বতন্ত্র ভাষা ও ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দারিদ্র্য ও শিক্ষার অভাবকে পুঁজি করে ম্রো শিশুদের নাম ও ধর্ম পরিবর্তনের এক আশঙ্কাজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে, বিনামূল্যে উন্নত শিক্ষার প্রলোভন দেখিয়ে কোমলমতি শিশুদের তাদের আদি পরিচয় থেকে বিচ্যুত করা হচ্ছে, যা এই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অস্তিত্বের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বান্দরবানের বিভিন্ন দুর্গম পাড়া থেকে অন্তত ২২ জন ম্রো শিশুকে কৌশলে ধর্মান্তরিত করার প্রমাণ পাওয়া গেছে। অভিযোগের তীর মূলত ইকরা তাহসীনুল কুরআন মাদ্রাসা, আস আদ একাডেমি এবং ১১ কিলো মডেল একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে। এসব প্রতিষ্ঠানে শিশুদের নেওয়ার পর তাদের আদি ম্রো নাম পরিবর্তন করে রাখা হচ্ছে আরবি নাম এবং চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে ভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতি। এই পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অনেক সময় অভিভাবক বা শিশুদের কোনো সম্মতি নেওয়া হয় না বলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো দাবি করেছে।
এমনই একজন শিশু লাংরাও ম্রো। মা-বাবার মৃত্যুর পর চরম দারিদ্র্যের শিকার চাচার আশ্রয়ে ছিল সে। শিক্ষার খরচ মেটানোর সামর্থ্য না থাকায় ২০২৩ সালে তাকে বিনামূল্যে পড়ানোর প্রতিশ্রুতিতে একটি মাদ্রাসায় পাঠানো হয়। সেখানে যাওয়ার পর পরিবারের অগোচরেই তার নাম ও ধর্ম পরিবর্তন করে দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এসব শিশুদের তাদের নিজস্ব ভাষার পরিবর্তে ভিন্ন ভাষায় শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে এবং পড়াশোনায় সামান্য ভুল হলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে নিজ সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন ম্রো অভিভাবকরা।
ম্রো সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ মনে করেন, এটি কেবল ধর্ম পরিবর্তন নয় বরং একটি সুসংগঠিত সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। শিশুদের নিজস্ব ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করার এই প্রক্রিয়া চলতে থাকলে ভবিষ্যতে ম্রো সংস্কৃতি বিলুপ্তির পথে ধাবিত হবে। এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ সরকারের প্রতি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটির মতে, আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী প্রতিটি ম্রো শিশুর নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চা, ভাষা ব্যবহার এবং আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য বজায় রাখার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। কোনো বেসরকারি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান যেন শিশুদের এই মৌলিক অধিকারে হস্তক্ষেপ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
বর্তমানে সরকারি জরিপে ম্রো জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৫৬ হাজার বলা হলেও স্থানীয়দের দাবি এই সংখ্যা অন্তত ৮০ হাজার। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে তাদের সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার আওতায় আনা এবং দুর্গম এলাকায় মানসম্মত প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। অন্যথায় প্রলোভন আর দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে প্রান্তিক শিশুদের পরিচয় পরিবর্তনের এই ধারা তাদের জাতিগত অস্তিত্বকে চরম সংকটে ফেলবে।
মতামত