নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এর সঙ্গে গাইবান্ধায় হঠাৎ স্থাপিত রামমূর্তি থেকে শুরু করে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূতের ‘হামাস তত্ত্ব’-এরও যোগসূত্র টানা হচ্ছে। তবে প্রশ্ন উঠেছে, এই বিশাল কর্মসূচির অর্থায়ন আসছে কোথা থেকে? আর গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর চোখের সামনে দিয়েই বা কীভাবে চলছে এই ক্যাম্পেইন?
ঘটনার সূত্রপাত ১৩ জুন। চট্টগ্রামের লালখান বাজারের জামিয়াতুল উলুম আল-ইসলামিয়া মাদ্রাসা থেকে পরিচালিত ‘আল-কুরআনের দারস’ নামের একটি ফেসবুক পেজে বিশ্বকাপ উপলক্ষে বিদেশি পতাকার পরিবর্তে কালেমার পতাকা টানানোর আহ্বান জানানো হয়। পোস্টের ভিডিওতে হারুন ইজহারকে বলতে শোনা যায়, ‘যদি জঙ্গিবাদ হয়ে থাকে, তাহলে আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলের পতাকাও নামাতে হবে। এগুলোর পরিবর্তে থাকবে আমাদের কালেমার পতাকা।’
ফুটবল বিশ্বকাপের উন্মাদনার মধ্যেই মুফতি হারুন ইজহারের এই বক্তব্যের পর সারা দেশে সাদা-কালো পতাকা উত্তোলন, শোডাউন ও মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা শুরু হয়। শোডাউনের আয়োজক এবং পরে ফ্লাইওভারে পতাকা টাঙানো কয়েকজনের পরিচয়ও নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাদের মধ্যে ছিলেন তামিম আল আদনান, যিনি ফেসবুকে ‘টক অব ইনসান’ পেজ পরিচালনা করেন। একইভাবে জাহিদুল ইসলাম মিরাজ ‘আস-সিদ্দিক’ নামে প্রায় দুই লাখ অনুসারীর একটি পেজ পরিচালনা করেন। এনামুল হাসান পরিচালনা করেন ‘ইবারা’ নামে একটি ফেসবুক পেজ।

১৭ জুন রাত ১২টা ৫৮ মিনিটে যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার থেকে লাইভে এসে এনামুল হাসান বলেন, কেউ এসব পতাকা খুলে ফেললে তারা ‘কঠিন পদক্ষেপ’ নিতে বাধ্য হবেন। পতাকা লাগানো তাদের অধিকার উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যদি ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকা ওড়ানোর অধিকার থাকে, তাহলে আমাদেরও কালেমা-খচিত পতাকা ওড়ানোর অধিকার রয়েছে। রাষ্ট্র বা অন্য কোনো পক্ষ যদি এতে বাধা দেয়, তাহলে আমরা কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হব, ইনশাআল্লাহ।’ লাইভে তার সঙ্গে ছিলেন তামিম আল আদনান, বায়েজিদ খান, শাফায়েত হোসাইন রিহাব ও জাহিদুল ইসলাম মিরাজ। এ সময় ফ্লাইওভারের দুই পাশে লাগানো পতাকা দেখিয়ে এনামুল বলেন, ‘ঢাকাসহ বিভিন্ন অলিগলিতে আমরা পতাকা লাগিয়েই যাব।’ তিনি আরও দাবি করেন, এ কাজে ‘দাওয়া ফাউন্ডেশন’ তাদের সহযোগিতা করছে। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে চালু হওয়া ওই ফাউন্ডেশনের ফেসবুক পেজ ঘেঁটে অর্থায়নের তথ্য পাওয়া গেছে। একটি পোস্টে উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের পক্ষ থেকে সাধ্যমতো এই ক্যাম্পেইনের অর্থ জোগান দেওয়া হয়েছে।
ফ্লাইওভার থেকে পতাকা সরিয়ে নেওয়ার পরদিন, অর্থাৎ ১৯ জুন শুক্রবার, জুমার নামাজের পর হাটহাজারীতে বিক্ষোভ হয়। সেখানেও দেখা যায় একই ধরনের সাদা-কালো পতাকা। এরপর হাটহাজারীসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায়, রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বর, মিরপুর, সাভার, পাবনা ও ফরিদপুরেও এসব পতাকা নিয়ে শোডাউন, মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় পতাকা উত্তোলনের খবর সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
‘ইবারা’, ‘আস-সিদ্দিক’ ছাড়াও ‘নুসাইবা শপ’, ‘আত্তিজারা’, ‘মুসলিম বঙ্গ’ ও ‘শাইখুনা মিডিয়া’ নামের ফেসবুক পেজ থেকেও পতাকা বিক্রি ও প্রচার করা হচ্ছে। সারাদেশে এসব পতাকা টাঙিয়ে সেগুলোকে ‘কালেমার পতাকা’ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।
তবে সামাজিক মাধ্যমে পতাকাগুলোর উদ্দেশ্য নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক দেখা দিয়েছে। পতাকাগুলো দুই ধরনের। একটিতে সাদা পটভূমিতে কালো আরবি হরফে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ লেখা, অন্যটিতে কালো পটভূমিতে সাদা আরবি হরফে একই বাক্য লেখা।
বিশ্লেষকদের মতে, সাদা পটভূমিতে কালো লেখার পতাকাটি আফগানিস্তানের তালেবানের দাপ্তরিক পতাকার সঙ্গে নকশা ও ক্যালিগ্রাফিতে মিল রয়েছে। অন্যদিকে কালো পটভূমিতে সাদা লেখার পতাকাটি আল-কায়েদা এবং তাদের বিভিন্ন শাখা-সংগঠনের ব্যবহৃত পতাকার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। বাংলাদেশের নিষিদ্ধ সংগঠন হিজবুত তাহরীরও বিভিন্ন কর্মসূচিতে এই দুই ধরনের পতাকা ব্যবহার করেছে।
এ বিষয়ে তরুণ আলেম ফারুক ফেরদৌস ফেসবুকে লিখেছেন, ‘কালেমা নিয়ে প্রশ্ন নয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও কালেমা-খচিত পতাকা ব্যবহার করে। প্রশ্ন হলো, নির্দিষ্ট ডিজাইনের এমন পতাকা, যা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গোষ্ঠীর পতাকার সঙ্গে মিলে যায় এবং অপপ্রচারের সুযোগ সৃষ্টি করে।’
অন্যদিকে আলেম মনজুরুল হক লিখেছেন, ‘কালেমার পতাকা একটি রাজনৈতিক প্রতীক মাত্র। এতে ইসলাম প্রতিষ্ঠার চেয়ে পতাকাধারীদের রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার আহ্বানই বেশি।’

২২ জুন রাতে পেজের এক পোস্টে জানানো হয়, ৫,০০০ পতাকা বিনামূল্যে এবং আরও ৫,০০০ পতাকা বিনা লাভে বিতরণ করা হবে। একই সময় ‘দাওয়া ফাউন্ডেশন’-এর পেজ থেকে জানানো হয়, রাতে লাগানো পতাকাগুলো দুপুরের দিকে কেউ সরিয়ে নিয়েছে। তারা এ ঘটনাকে ‘ইসলামবিদ্বেষী’ কাজ বলে আখ্যা দিয়ে নিন্দা জানায় এবং নতুন করে শাপলা চত্বরে পতাকা লাগানোর ঘোষণা দেয়।
ফেসবুকে আমিনুল হক নিজেকে ‘সাদাক্কাহ প্রজেক্ট’-এর অ্যাডমিন হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তবে পেজে দেওয়া নম্বরে যোগাযোগ করলে তিনি ১০,০০০ পতাকা বিতরণের বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, তারা মূলত বিক্রির লক্ষ্য নিয়েছেন। একই সঙ্গে শাপলা চত্বরে নিজেরা পতাকা লাগানোর বিষয়টিও অস্বীকার করেন।
সাদাক্কাহ প্রজেক্টের অ্যাডমিন আমিনুল হকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। এর মধ্যে রাজধানীতে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দুটি মামলা রয়েছে—একটি মোহাম্মদপুর থানায়, অন্যটি ভাটারা থানায়। ২০২৪ সালের ১ এপ্রিল তিনি কাশিমপুর কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান। এরপর থেকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আটক অন্য বন্দিদের মুক্তির দাবিতে আন্দোলনে সক্রিয় রয়েছেন।
পতাকা লাগানোর পরদিন, অর্থাৎ ১৮ জুন বিকেল ৫টা ১০ মিনিটে, এনামুল হাসান ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে জানান, অজ্ঞাত ব্যক্তিরা পতাকাগুলো খুলে নিয়ে গেছে। আরেকটি ভিডিওতে তিনি দাবি করেন, পুলিশ গাড়ি নিয়ে এসে পতাকাগুলো খুলে নিয়েছে।
পরে রাত সাড়ে ৯টার দিকে দেওয়া আরেক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আমাদের ভাইয়েরা টিম নিয়ে যারা পতাকা খুলেছে, তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে। তারা সুসংবাদ দিয়ে আমাদের আশ্বস্ত করেছেন। তবে সেই সুসংবাদ কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত আমরা বিশ্বাস করতে পারছি না। এরপর তিনি আবার ফ্লাইওভারে পতাকা লাগানোর খবর দেন এবং নতুন করে লাগানো পতাকার ভিডিও শেয়ার করেন।
বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে বিদেশি পতাকার প্রতিবাদে কালেমার পতাকা টাঙানোর কথা বলা হলেও এনামুল হাসানের পুরোনো ফেসবুক পোস্টে দেখা যায়, এর আগেও তিনি বিভিন্ন স্থানে একই ধরনের সাদা-কালো পতাকা প্রদর্শন করেছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাতীয় সংসদ চত্বরে ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদীর জানাজাতেও একই পতাকা প্রদর্শন করেন তিনি ও তার সহযোগীরা।
ওই সময় তামিম আল আদনানের ‘টক অব ইনসান’ পেজ থেকে শেয়ার করা একটি ভিডিওতে এনামুল হাসানকে বলতে শোনা যায়, ‘দিনের মধ্যেই সংসদ ভবনের ওপর উঠবে, ইনশাআল্লাহ, এই কালেমার পতাকা। সংসদ ভবনের ওপরই থাকবে, ইনশাআল্লাহ।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর চিহ্নিত কিছু গোষ্ঠী নতুন করে নিজেদের সংগঠিত করার চেষ্টা করছে। সাদা-কালো পতাকার মাধ্যমে তারা নিজেদের ব্র্যান্ডিং করছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আরও সক্রিয় থাকলে এ ধরনের কার্যক্রম প্রতিরোধ করা সম্ভব হতো। এখনই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে না দেখলে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে। তাদের মতে, পতাকা ওড়ানোর ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; এর সঙ্গে সীমান্ত পরিস্থিতি এবং গাইবান্ধায় রামবিগ্রহ স্থাপনের ঘটনাও আলোচনায় এসেছে।
মতামত