ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের মানুষের আড্ডা, মুক্তচিন্তা ও দীর্ঘদিনের সামাজিক মেলবন্ধনের অন্যতম পরিচিত ঠিকানা ‘বাদল স্টল’-এর আলো নিভে গেল। শহরের ট্যাংকেরপাড় অন্নদা স্কুল রোডের ঐতিহ্যবাহী এই আড্ডাস্থলের কর্ণধার সমীর দাস (৬০) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। গত বুধবার দুপুরে একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর প্রয়াণ ঘটে এবং বৃহস্পতিবার বিকেলে শাস্ত্রীয় রীতি মেনে তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। তাঁর এই অকালপ্রয়াণে পুরো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সনাতন ধর্মাবলম্বী সমাজসহ সর্বস্তরের অধিকারকামী ও প্রগতিশীল মানুষ এই অসাম্প্রদায়িক জননেতার সমতুল্য ব্যক্তিত্বকে হারিয়ে গভীরভাবে মর্মাহত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সর্বস্তরের মানুষ তাঁর সাথে কাটানো অজস্র স্মৃতি রোমন্থন করে শ্রদ্ধা ও শোক জ্ঞাপন করছেন।
শহরের মানুষের কাছে ‘বাদল স্টল’ কখনোই কেবল একটি চায়ের দোকান ছিল না; এটি ছিল সর্বস্তরের মানুষের মতামত বিনিময়ের এক মুক্তমঞ্চ, যেখানে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই এক টেবিলে বসতেন। অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের শৈশব এবং কৈশোরের স্মৃতিতে জড়িয়ে আছে এই ঐতিহ্যবাহী স্থানটি। চা, পুরি, সমুচা, সিঙ্গারা ও লাড্ডুর মিষ্টি স্বাদের পাশাপাশি বন্ধুদের প্রাণের আড্ডায় জায়গাটি সব সময়ই মুখরিত থাকত। স্থানীয়দের দৃষ্টিতে এটি ছিল অনেকটা কলকাতার ঐতিহাসিক কফি হাউসের মতো, যেখানে মতাদর্শ বা রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে সবাই সৌহার্দ্যের মেলবন্ধনে আবদ্ধ হতেন। (News copied from- 'হিন্দুস নিউজ') পিতার প্রয়াণের পর সমীর দাস পরম মমতায় ও দক্ষতায় বাদল স্টলের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি টিকিয়ে রেখেছিলেন। তাঁর বিনয়ী, হাস্যোজ্জ্বল ও মানবিক আচরণ প্রতিনিয়ত আসা মানুষকে এক অদ্ভুত ভালোবাসায় বেঁধে রাখত।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া টেলিভিশন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আল আমিন শাহীন এক গভীর শোকবার্তায় বাদল স্টলকে প্রবীণ ও নবীনদের মেলবন্ধনের এক অনন্য প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং শিক্ষার্থীদের আবেগজড়িত স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানান। অন্যদিকে জেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি জহিরুল ইসলাম খোকন তাঁর দীর্ঘদিনের স্মৃতিকথা স্মরণ করে বলেন যে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও সমীর দাসের সেই দোকানে সবাই এক সাথে আড্ডায় মেতে উঠতেন। সমীর দাসের চলে যাওয়ার মাধ্যমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ইতিহাস ও মুক্তচর্চার একটি সোনালী অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। সময়ের আবর্তে শহরের নানা পরিবর্তন হলেও সমীর দাস তাঁর সততা ও আন্তরিকতা দিয়ে যে ঐতিহ্যের ধারা ধরে রেখেছিলেন, তাঁর প্রয়াণে সেই স্মৃতির ক্যানভাসে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হলো।
মতামত