দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী কান্তজীউ বিগ্রহের নৌবিহারকে ঘিরে এবার নেমে এসেছে শোকের ছায়া। বুধবার (২ সেপ্টেম্বর ২০২৬) কান্তনগর থেকে দিনাজপুর শহরের রাজবাড়ীতে কান্তজীউ বিগ্রহ নিয়ে আসার নৌযাত্রায় ঢেপা নদীতে একটি নৌকা উল্টে স্বাক্ষর কুন্ডু টয় (২৫) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে।
নিহত স্বাক্ষর কুন্ডু টয় দিনাজপুর শহরের কালিতলা পুকুরপাড় (হাড়িপাড়া) এলাকার বাসিন্দা এবং সিন্টু কুন্ডুর ছেলে। নৌকাডুবির পর দীর্ঘ সময় তার সন্ধান না পাওয়ায় স্থানীয়ভাবে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। পরে তার মৃত্যুর খবর এলাকায় পৌঁছালে পরিবার, স্বজন ও স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে নেমে আসে গভীর শোক।
প্রতি বছরের মতো এবারও রাজ পরিবারের ঐতিহ্য ও প্রথা অনুযায়ী কাহারোল উপজেলার ঐতিহাসিক কান্তনগর মন্দির থেকে শ্রী শ্রী কান্তজীউ বিগ্রহকে নৌপথে দিনাজপুর শহরের রাজবাড়ীতে আনার আয়োজন করা হয়। বুধবার সকালে পূজা-অর্চনা শেষে ঢেপা নদীর কান্তনগর ঘাট থেকে বিশাল নৌবহর নিয়ে বিগ্রহটি দিনাজপুর শহরের উদ্দেশে যাত্রা করে।
দীর্ঘ প্রায় ২৫ কিলোমিটার নদীপথ পাড়ি দিয়ে সন্ধ্যার আগে সাধুঘাটে পৌঁছানোর কথা ছিল কান্তজীউ বিগ্রহের। এরপর শহরের বিভিন্ন মন্দিরে পূজা-অর্চনা শেষে রাতের দিকে রাজবাড়ীর কান্তজীউ মন্দিরে বিগ্রহটি স্থাপনের রীতি রয়েছে। কান্তজীউর এই নৌবিহারকে ঘিরে নদীর দুই পাড়ে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটে। বিভিন্ন ঘাট ও সড়কের পাশে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের মধ্যে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।
তবে এবারের নৌযাত্রায় দুর্ঘটনা সেই উৎসবের পরিবেশকে বিষাদে পরিণত করে। কান্তনগর থেকে রাজবাড়ীর পথে ভক্তদের উৎসর্গের বিভিন্ন সামগ্রী বহনকারী একটি নৌকা উল্টে গেলে স্বাক্ষর কুন্ডু টয় নিখোঁজ হন। ঘটনার পর স্থানীয় প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল নদীতে অভিযান চালায়।
টয়ের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর কালিতলা এলাকার পাশাপাশি কান্তজীউ মন্দির ও আশপাশের এলাকায়ও শোকের আবহ তৈরি হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, টয়ের অকাল মৃত্যুতে শোকাহত অনেক হিন্দু ভক্ত কান্তজীউ কালিতলা মন্দিরের সামনের পথ দিয়ে প্রবেশ করতে পারেননি। পরে তারা বিকল্প পথ হিসেবে মালদাহপট্টি হয়ে চুড়িপট্টি দিয়ে যাওয়ার সময় চুড়িপট্টি কাস্টম গোডাউনের সামনে নৌযাত্রার ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট কমিটির ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
এ সময় সেখানে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তবে নৌকাডুবির সুনির্দিষ্ট কারণ, নৌকার নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং আয়োজক কমিটির কোনো গাফিলতি ছিল কি না—এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
কান্তজীউ বিগ্রহের নৌবিহার দিনাজপুরের অন্যতম প্রাচীন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। রাজ পরিবারের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী বছরের প্রায় নয় মাস কান্তনগর মন্দিরে এবং বাকি তিন মাস দিনাজপুর শহরের রাজবাড়ীতে অবস্থান করেন শ্রী শ্রী কান্তজীউ বিগ্রহ। যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই প্রথাকে ঘিরে প্রতিবছরই নদীপথের দুই পাশে বিপুলসংখ্যক ভক্ত ও দর্শনার্থীর সমাগম হয়।
এবারও কান্তনগর ঘাট থেকে সাধুঘাট পর্যন্ত বিভিন্ন ঘাটে নৌকা ভেড়ানোর ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা মোতায়েনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নৌকাডুবিতে একজন তরুণের মৃত্যুর ঘটনায় আয়োজনের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
স্বাক্ষর কুন্ডু টয়ের অকাল মৃত্যুতে পরিবার ও স্বজনদের পাশাপাশি স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেও গভীর শোকের সৃষ্টি হয়েছে। উৎসবের দিনে এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে কান্তজীউর নৌবিহারকে ঘিরে আনন্দের পরিবেশ মুহূর্তেই পরিণত হয়েছে শোক ও ক্ষোভে।
মতামত